তাজউদ্দীন আহমেদঃ যোগ্য নেতার প্রকৃত উদাহরন

150

বার পঠিত

তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন এক ব্যতিক্রমধর্মী, মৌলিক চিন্তাশীল, বিস্ময়কর রকমের ন্যায়নিষ্ঠ, দুর্দান্ত রকমের সত্যপ্রিয়, দুরদৃষ্টি সম্পন্ন, আত্মপ্রচার বিমুখ ও স্বাধীনচেতা মানুষ যার নির্মল জীবনাদর্শনকে অনুসরনের মধ্যে শান্তি ও ন্যায়ের সুকঠিন পথটি নির্মান করা সম্ভব। বঙ্গতাজ তাজঊদ্দীন আহমেদ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান পরস্পর পরস্পরের কাধ মিলিয়ে তৎকালীন সময়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন আওয়ামী লীগ। তাদের দুইজনের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রমেই ধাবিত হচ্ছিল স্বাধীনতার দিকে। তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন তখন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক। দলের যাবতীয় সকল নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের খসড়া প্রনয়ন করতেন তিনি যাতে তুলির শেষ আচড় পড়ত বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গতাজের জুটি সেই সময় বাংলার রাজনীতি অঙ্গনে এসেছিল আশীর্বাদ রূপে। তারা দুইজন যেনো ছিলো মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বঙ্গবন্ধু ছাড়া বঙ্গতাজ যেরকম অপুর্ণ তেমনি বঙ্গতাজ ছাড়া বঙ্গবন্ধুও অপুর্ণ। ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত সৎ একজন ব্যক্তি। কোনো কিছুর উপর কখনই কোনো প্রকার লোভ ছিল না। কুটনীতিক দিক দিয়ে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি। ন্যায় এবং নিষ্ঠার সাথে জীবদ্দশায় কোনো আপস করেন নি। সেই সাথে দেশের মঙ্গলের জন্য তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। তার পরিচয় পাওয়া যাই জুলফিকার আলী ভুট্টোর উক্তির মাধ্যমে। ৭১ এ যখন ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলো নীতিনির্ধারণী আলোচনার জন্য তখন তিনি তার সফরসঙ্গীদের সতর্ক করার জন্য এই উক্তিটি করেছিলো বঙ্গতাজের ব্যাপারে- “আলোচনার বৈঠকে মুজিবকে আমি ভই পায় না। ইমোশনাল অ্যাপ্রোচে মুজিবকে কাবু করা যায় কিন্তু তার পিছনে ফাইল বগলে চুপচাপ যে নটোরিয়াস লোকটি বসে থাকে তাকে কাবু করা শক্ত। দিস তাজউদ্দীন, আই টেল ইউ, উইল বি ইউর মেইন প্রবলেম। ” দেশের স্বার্থে এতোটাই কঠোর ছিলেন তিনি। ৭১ এর ২৫শে মার্চ বঙ্গবন্ধু কে গ্রেফতারের পর মুক্তিযুদ্ধে সামনে থেকে তাজউদ্দীন আহমেদই যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বঙ্গতাজ। মুজিবনগর সরকার গঠনের পিছনেও তার অবদানই ছিল সবচাইতে বেশী। তিনি দেশের সীমান্ত বরাবর একটি ছোট ডাকোটা বিমানে চড়ে হাই কমান্ডের বাকি চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম এম মনসুর আলী , কামরুজ্জামান এবং খন্দকার মোসতাক আলীকে খুজে খুজে বের করে গঠন করে ছিলেন সেই ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যান্য বাঙ্গালীদের জন্য তার ছিলো অসীম সহানুভুতি। যুদ্ধের ঐ ৯ মাস তার পরিবার কলকাতায় থাকা সত্ত্বেও তিনি একটা দিনের জন্যও পারিবারিক জীবনযাপন করেননি। এই বিসয়ে তার মতামত ছিল মুক্তিযোদ্ধারা দেশের স্বার্থে তাদের পরিবার পরিজন থেকে দূরে এসে লড়াই করতেসে তবে আমি কেনো স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনযাপন করব। আর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটা ক্ষেত্রেই মুক্তির মিছিলে সামিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তিকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা দের নিয়ে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের প্রস্তাব দেন ( যদিও পরবর্তীতে সেই প্রস্তাব পাশ হইনি)। এছাড়া দেশের সব কয়টি সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তরভুক্তির ব্যাপারে জোড় প্রদান করতে থাকেন। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তার বক্তব্য ছিল- “ আমরা বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব, যা সোভিয়েত রাশিয়া বা চীনের ধরনে হবে না, বরঞ্চ তা হবে আমাদের নিজেদের মতো। আমরা গনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মাঝে একটি সুষম সমন্ব্য ঘটাব, যা বিশ্বে একটি অসাধারান ব্যাপার হবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭২ এর ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু কে প্রধানমন্ত্রীত্ব দিয়ে তিনি সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহন করেছিলেন। যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি গরীব দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার দায়ীত্ব ছিলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শুন্য কোষাগার পুরন করার সাথে অন্যান্য দেশের থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মতো অতি কঠিন কাজ তিনি সাবলীলতার সাথে পালন করেছিলেন। তার ই তৎপরতায় বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যঙ্ক এবং ADB এর সদস্য হয়েছিল। বঙ্গতাজের কল্যানে দিন দিন বাংলাদেশের বৈদেশিক রিজার্ভ বেড়েই চলেছিলো। বিদেশ সফরের সময় তিনি কখনোই বিলাসিতা করে নি। এই বিষয়ে তাজউদ্দীন আহমেদের মতামত ছিল যুদ্ধবিদ্ধস্ত গরীব দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেশের কোষাগারের টাকা নিজের বিলাসিতার জন্য খরচ করা আমার অনুচিত। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার সাফল্যের ধারনা তাকে নিয়ে নিম্নোক্ত উক্তি গুলার মাধ্যমে পাওয়া যায়।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামার তার সঙ্গে কাজ করে বলেছিলেন – ” He probably is the best Finance Minister at present in the world” বঙ্গতাজের সঙ্গে কাজ করে শুধু ম্যাকনামারই নন সব বিদেশী কর্মকর্তাই মুগ্ধ হন। তিনি তার কাজের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।
আর নেতা ও রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি কেমন ছিলো সেই বিষয়ে প্রফেসর নুরুল ইসলাম এর আলোচ্য কথা টই ব্যবহার যোগ্য। প্রফেসর নুরুল ইসলাম এর ভাষ্যমতে- “তাজউদ্দীন আহমেদ অত্যন্ত নির্ভুলভাবে খুব অল্প কথায় সব বিষয় তুলে আনতে পারতেন। তার এই বিশেষত্ব টা ছিল। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন এবং রাজনীতিবিদরা, সাধারনত যে ধরনের কথাবার্তা বলেন তিনি তেমন বলতেন না। আর এই পরিষ্কার এবং স্ট্রেট কথার ফলে সবাই তার প্রতি আকৃষ্ট হতেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে সহজেই বিষয়গুলা নিয়ে আসা সম্ভব হতো। তার ক্যাপাসিটি সম্পর্কে কারোর কোনো সন্দেহ ছিলো না। আর একটা জিনিস ছিলো তার, যেখানে কোনো ভুল হচ্ছে তিনি সেই ভুলটা স্বীকার করে করতেন এবং বুঝতে পারতেন সঙ্গে সঙ্গেই। ”
স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের কুচক্রান্তে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার সম্পর্ক ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। সেই চক্র তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে বঙ্গতাজের নামে ক্রমেই কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে যাচ্ছিল। এর ধারাবাহিকতায় বঙ্গতাজ মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর ঐতিহাসিক চরমপত্রের রচয়িতা এম আর আখতার মুকুল তার পদত্যাগ সম্পর্কে লিখেছিলেন- ” মন্ত্রীসভা থেকে তাজউদ্দীনের বিদায় নিলেন। মনে হলো বঙ্গবন্ধুর কোমর থেকে শাণিত তরবারী অদৃশ্য হয়ে গেল। ছায়ার মতো যে নির্লোভ ব্যক্তি অসাধারন নিষ্ঠার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে অনুসরন করেছেন এবং নিঃস্বার্থ ভাবে পরামর্শ দিয়ে বহু বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন এবং গোপ্ন চক্রান্তের ফাদে পা দিয়ে শেখ সাহেব সেই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করলেন”
বিপক্ষ শক্তি জানতো যে যতদিন পর্যন্ত বঙ্গতাজ ও বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক অটুট থাকবে ততদিন তাদের স্বার্থসিদ্ধি সম্ভব নয়। তাজউদ্দীনের পদত্যাগের মাধ্যমেই তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধির পথে প্রথম পা দিয়ে ফেলেছিলো। যারই ধারাবাহিকতায় ১৫ই আগস্টের সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। অবশ্য ঘাতক চক্র শুধু এতেই থেমে থাকে নি সেই সাথে তারা জাতীয় চার নেতা বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম এম মনসুর আলী এবং কামরুজ্জামান কে গ্রেফতার করে ১৯৭৫ সালের ৩ই নভেম্বর জেলের ভিতর গুলি করে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গতাজের মধ্যের সম্পর্কের মধ্যে যদি ফাটল না বাধতো তাইলে ১৯৭৫ এর ইতিহাসটা অন্যরকম হতো এটা অন্তত নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। তার মতো সুযোগ্য নেতার অভাব দেশের বর্তমান অবস্থায় বড্ড বেশী অনুভুত হয়।

বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমেদের মত নেতা শত বছরে একটিই জন্মায়।

আত্মপ্রচার বিমুখ তাজঊদ্দীন আহমেদ তার সারাজীবনের চিন্তায় ও কাজে যে মহৎ উদাহরন গুলা সৃষ্টি করেছিলেন তা নতুন, সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার জন্য সমুজ্জ্বল দিক নির্দেশক।

private dermatologist london accutane

You may also like...

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

will metformin help me lose weight fast

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong> wirkung viagra oder cialis

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.