একজন অপদার্থ বাবার গল্প…

581

বার পঠিত

বাসটা হঠাৎ থেমে গেল। রুদ্র তার বাবার বুকেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, ব্রেকের হঠাৎ ঝাঁকুনিতে জেগে উঠলো।সামনে একদল কালো মিলিশিয়া দেখা যাচ্ছে,সবাই বলাবলি করে পাকিস্তানী মিলিটারির চেয়েও নাকি ভয়ংকর এরা, সাক্ষাৎ আজরাইল। রাস্তাঘাটে মিলিশিয়াদের বাস থামিয়ে চেক করাটা নতুন কিছু না, তবুও কেন জেন রায়হানের বুকেরে ভেতরটা কেঁপে উঠলো, রুদ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে।
–আব্বু, বাস থেমে গেল কেন?
–বলতে পারছি না বাবা।
–মিলিটারী থামিয়েছে?
–হ্যাঁ বাবা।
–কেন থামিয়েছে?
– মনে হয় চেক করবে।
–কি চেক করবে আব্বু?
–সেটা তো জানি না বাবা।
–মিলিটারিগুলো এমন কালো কেন আব্বু? ওরা কি “জয় বাঙলা” খুঁজছে?
–শ-শ-শ। এটা বলে না বাবা। ঠোঁটে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলে রায়হান।

রুদ্র চুপ হয়ে গেল। কালো পোশাকের মিলিশিয়াগুলোকে সে অসম্ভব ভয় পাচ্ছে, কিন্তু আশেপাশের সবার ভয়ার্ত মুখ দেখে সেটা বলার সাহস পাচ্ছে না। ছেলের পিঠে হাত রেখে রায়হান টের পেল, আবার জ্বর আসছে ওর। ঢাকা থেকে এক কাপড়ে পালিয়ে আসবার পর থেকে প্রায়ই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে রুদ্র’র, বোধহয় ম্যালেরিয়া হয়েছে। যে গ্রামে লুকিয়ে আছে ওরা, সেখানে কোন ডাক্তার নাই। তাই আজ ডাক্তারের খোঁজে ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছিল খুলনা শহরের দিকে।

রুদ্র’র বয়স পাঁচ, অসম্ভব দুরন্ত ছেলেটা সারাদিন বাড়ি মাথায় করে রাখতো।যুদ্ধের
এ কয়েক মাসের বিভীষিকায় একেবারে শুকিয়ে গেছে, আতংকের একটা স্থায়ী ছাপ পড়ে গেছে চেহারায়, সামান্য কোন শব্দেই চমকে ওঠে। ছেলেকে একটা মুহূর্ত চোখের আড়াল করে না শারমিন, যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে পারলে বুকের ভেতর সিন্দুক বানিয়ে সেখানে লুকিয়ে রাখে ছেলেকে। রুদ্রের কোন ব্যাপারে রায়হানকে একেবারেই বিশ্বাস করে না শারমিন, অন্য সময় হলে সে নিজেই বেরিয়ে যেত ডাক্তারের খোঁজে।কিন্তু দেশের এই পরিস্থিতিতে শারমিনের বের হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাই রায়হানকে বারবার তোতাপাখির বুলির মত মুখস্ত করিয়ে দিয়েছে কি কি জিজ্ঞেস করতে হবে ডাক্তারকে, কি কি বলতে হবে। শেষে ঠাণ্ডা গলায় বলেছে, রায়হান চৌধুরী, আমার ছেলেকে যদি অক্ষত ফিরিয়ে আনতে না পার, আমি কিন্তু তোমাকে ছাড়ব না। মনে রেখো… বলতে বলতে হঠাৎ কেঁদে ফেলেছে মেয়েটা। দেখো দেখি কাণ্ড, ছেলে কি শুধু ওর একার? রায়হানের না? এরকম ছেলেমানুষির কোন মানে হয়?

“শুয়ার কা বাচ্চা, উতারো সাব” অল্প বয়সের এক মিলিশিয়ার চিৎকারে হঠাৎ সচকিত হয়ে ওঠে রায়হান। বাস থেকে নেমে যেতে বলছে ছেলেটা, সেটাও অকথ্য গালি দিয়ে। কি ভয়ংকর ঘৃণা করে এরা আমাদের, ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ এক পশ্লা গুলির শব্দ পায় রায়হান। নামার সময় তীব্র আতংকে পা দুটো অসাড় হয়ে গেল, এই বাসে আর বোধহয় ফিরে আসা হল না। রুদ্র গলা জড়িয়ে বলল,
–আমাদের এখন চেক করবে,তাই না আব্বু?
– হ্যাঁ বাবা।
–চেক কিভাবে করে?
–এই তো এইভাবে…
রুদ্র কি বুঝল সেই জানে, বলল, ও আচ্ছা।
একটু পর আবার বলল, আম্মুর কাছে কখন যাব আব্বু?
–এই তো বাবা, আর একটু পরেই।
–চেক করা শেষ হলেই কি যাব?
–হ্যাঁ বাবা।
নিচে দাঁড়ানো মিলিশিয়ারা বাসের সবাইকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে থাকলো। গন্তব্যটা বোধহয় আম গাছের পিছে নদীর পাড়টা। পেছনের লোকটা হঠাৎ হাহাকারের সুরে বিলাপ করে উঠলো, আমার রাজকন্যাটা যে অপেক্ষা করে আছে কেক নিয়ে, আজকে যে ওর জন্মদিন, এরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

পাশ থেকে একজন চাপা গলায় বলে ওঠে, রোজ কিয়ামত আইজ, আল্লাহ আল্লাহ করেন ভাই।
-কিন্তু আমাকে না পেলে তো ও খুব কাঁদবে, কিচ্ছু খাবে না। শায়লা, শায়লা মা আমার… প্রচণ্ড জোরে রাইফেলের বাট দিয়ে লোকটার চোয়ালটা ভেঙ্গে দিল এক মিলিশিয়া,পড়ে গেল হুমড়ি খেয়ে, আর কিছু শোনা গেল না। দুজন সেনা একটু দাড়িয়ে বেয়নেট দিয়ে কিছুক্ষন ফালাফালা করল মানুষটাকে,তারপর আবার আগের মত দলটাকে নিয়ে চলল নদীর তীরে।

ভদ্রলোকের বিলাপ শুনে হঠাৎ রুদ্রের জন্মদিনের কথা মনে পড়ে গেল রায়হানের। রায়হানের দায়িত্বজ্ঞানের অসাধারন সুনামের কারনে এক সপ্তাহ আগেই বলে রেখেছিল শারমিন, রুদ্রের জন্মদিনে বন্ধুবান্ধবদের দাওয়াত করবে, কেক কাটবে সন্ধ্যার সময়, রায়হান যেন দেরি না করে। রায়হান কনফার্ম করেছিল, কোনোভাবেই দেরি হবে না। কিন্তু হঠাৎ জরুরি শিপমেন্ট আটকে যাওয়ায় রায়হানও আটকে গেল অফিসে, সেদিন সে ফিরতে পেরেছিল রাত ১০টা। ততক্ষণে অতিথিরা চলে গেছে, বাবার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে রুদ্র। অপদার্থ বাবার খেতাবটা সেদিনই পাকাপাকিভাবে বসে গিয়েছিল রায়হানের কাঁধে, এক সপ্তাহ কথা বলেনি শারমিন। রুদ্র’র বয়স যখন পাঁচ মাস, তখন একবার কি এক জরুরি কাজে বাইরে গিয়েছিল শারমিন, রায়হানকে সব বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, কিভাবে দুধ খাওয়াবে, কিভাবে কি করবে… সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখে, রুদ্র চিৎকার করে কাঁদছে, আর দুধ খাওয়াবার আপ্রান চেষ্টা করছে রায়হান। কিন্তু দুধ খাচ্ছে না ছেলেটা। এক নজর তাকিয়েই সমস্যাটা বুঝে ফেলল শারমিন, ফিডারের নিপলে কোন ফুটো নেই। একটা ফুটোবিহীন নিপল কিভাবে বাসায় আসলো, সেইটা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠলো না, সব দায়ভার এসে পড়ল রায়হানের উপর। একটা শিক্ষিত মানুষ কিভাবে এই লেভেলের অপদার্থ হয়? একমাত্র ছেলে রুদ্রের বাবা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য পুরো জীবনটাই পড়ে আছে, অথচ শারমিন এখনই ওকে পৃথিবীর সেরা অপদার্থ বাবার সার্টিফিকেট দিয়ে দিতে রাজি। এই দুঃখ রায়হান রাখবে কোথায়? half a viagra didnt work

হঠাৎ আঙ্গুল তুলে রুদ্র বলল, বাবা, ওরা ওখানে শুয়ে আছে কেন?

রায়হান মাথা ঘুরিয়ে দেখল, বেশ কয়েকজন গোড়ালিডোবা পানিতে শুয়ে আছে, এলোমেলোভাবে, একজনের উপর আরেকজন। কেন শুয়ে আছে এরা? রায়হানের মাথা কাজ করছে না, দ্বিতীয়বার যখন ফিরে তাকাল, হঠাৎ সে বুঝতে পারল, মানুষগুলো মৃত, গুলি করে মারা হয়েছে, একটু আগে।নদীতীরের পানি রক্তে লাল। এক কোনায় একটা বাচ্চা, রুদ্রর বয়সী, পড়ে আছে, এক হাতে তখনো বাবার গলা জড়িয়ে ধরা। সেদিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল রুদ্র, আব্বু, এরা কারা? এখানে শুয়ে আছে কেন?
- ওদিকে তাকায় না বাবা।
- কেন আব্বু?
- পরে বলব, কেমন?
- আচ্ছা।
হঠাৎ একজন মিলিশিয়া ওদের থামতে বলল। নদীর দিকে পেছনে ফিরে লাইন বেঁধে দাড় করানো হল ওদের। কেউ কি কাঁদছে? ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে।রায়হানের সবকিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে আসছে, আশেপাশে কি হচ্ছে কিছুই টের পাচ্ছে না ও। রায়হানের চিবুক ধরে প্রশ্ন করল রুদ্র,
–আমাদের এখন চেক করবে, তাই না বাবা?
– হ্যাঁ বাবা।
–কখন শেষ হবে?
–এইতো এখনই।
–শেষ হলেই আমরা যাব?
–হ্যাঁ বাবা।
–আম্মুর কাছে যাব, তাই না?
–হ্যাঁ আম্মুর কাছে যাব।
–আমার ভয় করছে আব্বু/
– আমাকে শক্ত করে ধর বাবা, শক্ত করে ধর।
কোনায় দাড়িয়ে থাকা সুবেদার র‍্যাংকের মিলিটারিটা হঠাৎ চিৎকার করে কি যে বলল, রায়হান শুনতে পেল না। মিলিশিয়াগুলো রাইফেল তাক করে ধরল। চোখের সামনে হঠাৎ শারমিনের মুখটা ভেসে উঠল রায়হানের, বড় লক্ষ্মী একটা মেয়ে, কি অসম্ভব ভালোবাসে ওদের। ওর সঙ্গে আর দেখা হল না… এই জীবনে আর শারমিনের ভুলটা ভাঙ্গানো গেল না…

রুদ্র হঠাৎ শুনলো তার বাবা তাকে ডাকছে, ফিসফিস করে…
–রুদ্র
–হ্যাঁ আব্বু।
–তুমি কি ওই বোকা রাজার গল্পটা শুনতে চাও? ওই যে বোকা রাজা আর চড়ুই পাখির গল্পটা…
–(আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল ছেলেটা)বলো আব্বু। বোকা রাজার গল্প শুনবো।
–এক দেশে ছিল এক রাজা।রাজাটা ছিল ভারি বোকা…
শুনছে রুদ্র, তার প্রিয় বোকা রাজার গল্পটা শুনছে। সামনের কালো মিলিটারিগুলোকে দেখলেই তার অসম্ভব ভয় করে, সে আর ভয় পেতে চায় না। আশেপাশের মানুষগুলো কেন কাঁদছে, সেটাও সে জানতে চায় না। তার আব্বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকবে সে, বোকা রাজার গল্প শুনবে। আব্বু থাকতে তার কোন ভয় নাই…

ঠিক সেই মুহূর্তে ৩৬পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সুবেদার জুলফিকার আলী খান হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলো , ফায়ার… সময়টা হঠাৎ থমকে গেল। মহাকালের স্তব্ধ মুহূর্তটুকুর স্থির প্রান্তে বসে এক অপদার্থ বাবা তার রাজপুত্রটাকে শুনিয়ে যেতে লাগলো এক বোকা রাজার গল্প…” তারপর কি হল জানো বাবা, রাজা তো চড়ুই পাখিটার উপর খুব রেগে গেল, মন্ত্রীকে ডেকে বলল, যেখান থেকে পার, ওকে ধরে আনো…

অনুপ্রেরণা- মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের “জনৈক অপদার্থ পিতা”, সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা…

You may also like...

  1. লাইফ ইস বিউটিফুলের গল্পগুলো পৃথিবী জানে, যন্ত্রণায় হু হু করে কাঁদে মানুষ, আমাদের গল্পগুলো কেউ জানে না, রক্তাক্ত জন্মইতিহাসগুলো হারিয়ে যায়, খুব নীরবে… নিঃশব্দে…

  2. শুভ্র তুহিন

    শুভ্র তুহিন বলছেনঃ

    আবারও পড়লাম, এবং আবারও বিষন্নতায় ছেয়ে গেলো মন।

    puedo quedar embarazada despues de un aborto con cytotec
thuoc viagra cho nam

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong> levitra 20mg nebenwirkungen

can levitra and viagra be taken together

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

zovirax vs. valtrex vs. famvir
doctus viagra
metformin tablet