একাত্তরের অক্ষয় ইতিহাস: বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম রঞ্জুর স্মৃতিতে একাত্তর: (১)

667 levitra generico acquisto

বার পঠিত

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি  বিয়াল্লিশ তেতাল্লিশ বছর ধরে মেমোরীতে অনেকটা আছে, অনেকটা  নষ্ট হয়ে গেছে। Evidence তো বলতে গেলে নেই ই। গেরিলা যুদ্ধের ছবি অনেকদিন ছিল আমাদের কাছে। এরপর এমন এক সময় আসল যখন মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দেয়াটাই বিপদ হয়ে দাঁড়াল। সমস্যাগুলো পঁচাত্তরের আগেও ছিল, পরেও। পঁচাত্তরের আগে সমস্যাটা ছিল জাসদ। ওরা যা যা করত,  দায়ভার পরত সরকারের ওপর। নয় মাস ধরে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল অনেক বেশি। তবে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের শুরু একাত্তরে নয়, বরং অনেক আগে…।

যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমরা থাকি খুলনায়। বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। সরকারী চাকরীর সুবাদে কোথাওই স্থায়ী হওয়া যেত না। বাবার সাথে সাথে আমরাও ছিলাম ভবঘুরে। যখন যেখানে ট্রান্সফার হতেন আমাদের সেখানেই সেখানকার স্কুলে পড়তে হত। একাত্তরে আমি ছিলাম ক্লাস টেনের ছাত্র। কিছুদিন পরেই আমার মেট্রিক পরীক্ষা।

ব্যাপারটা যখন খুব ক্রাইসিসের দিকে গেল বাবাকে চিন্তা করতে হত, তিনি পরের মাসের বেতন পাবেন কিনা। বর্তমান সময় আর তখনকার প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ  ভিন্ন। সে সময়ে একজন সরকারী কর্মকর্তাকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হত তার বেতনের উপরেই। তাই, বেতন পাওয়া না গেলে হয়তো আমাদের সবাইকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হত।

সেই সময় আমরা যারা খেলার সাথী ছিলাম, খেলার মাঠেই আমাদের মাঝে বিভিন্ন আলোচনা হত। যারা বয়সে একটু বড় ছিলেন, তারা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন — ভুট্টো কী বললেন, বঙ্গবন্ধু কী বললেন, এসব। অবশ্য তখন তো বঙ্গবন্ধু বলা হত না তাকে। তাকে বলা হত “শেখ সাহেব।” আমরা তাকে সেই নামেই ডাকতাম। শেখ সাহেবকে আমি চিনলাম আগরতলা মামলার সময়ে। তখন তার কোন মিটিং-ভাষণ না শুনেই, শুধু জানলাম পাকিস্তানীরা মিথ্যা মামলায় একজন বাঙালীকে আটকেছে। তো পাকিস্তানীরা বাঙালীকে কেন আটকাবে? খুব সোজা হিসাব। এত ঘোরপ্যাচ ছিল না তখন। তখন বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন করতে আওয়ামী লীগ করা লাগত না। তখন কেউই আওয়ামী লীগ করত না, আবার সবাইই আওয়ামী লীগ করত।

সে সময় অ্যাকটিভ দলগুলোর মধ্যে ছিল মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম আর জামাতে ইসলাম। আওয়ামী লীগের মধ্যে ছাত্রলীগটা বেশ শক্তিশালী ছিল। সত্তরের নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিই পেল আওয়ামী লীগ। বাকি দু’টোর মধ্যে একটা পেয়েছিল চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় আর আরেকটা নুরুল আমিন। পশ্চিম পাকিস্তানের একটা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেও আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল পিপলস পার্টির তুলনায়। তো স্বভাবতই আমরা ধরে নিলাম এবার আমাদের হাতে ক্ষমতা আসছে। তখন ইয়াহিয়ারও সে ধরণের মনোভাবই ছিল। তিনি বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চিন্তাভাবনাই করছিলেন। কিন্তু, লারকানায় পাখি শিকারের নামে ভুট্টো আর ইহাহিয়ার গোপন বৈঠকে ভুট্টো তাকে বোঝালেন, বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা দেয়া যাবে না। দিলেই তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে শোষণ করতে শুরু করবে আর ইন্ডিয়ার সাথে মিলে যাবে। এর পরেই ইয়াহিয়া বেকে বসতে শুরু করেন। পরিস্থিতি ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে।

আমাদের মানসিকতাও ক্রমশ এন্টিপাকিস্তানী হয়ে উঠতে শুরু করে। আমাদের উপর পাকিস্তানিদের প্রথম আক্রমণটা ছিল ভাষাকেন্দ্রিক। বাঙালি জাতির ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাতে আছে হাজার বছরের কৃষ্টি, সংস্কৃতি। তো ছাত্রদের মধ্যে হঠাৎ এতটা কনশাশনেস কোত্থেকে এলো তার প্রেক্ষাপটটা বলে নিলে ভাল হয়। তখনকার সময়ে ছাত্রদের আসল মনোযোগ ছিল, কখন ক্লাস শেষ করে ফুটবল মাঠে যাবে। এর চেয়ে বেশি চিন্তাভাবনা তাদের ছিল না। আর সপ্তাহ শেষে সিনেমা হলে যেত। আইডি কার্ড দেখালে হাফ পাস ছিল। তো সবার মূল টার্গেট ছিল সপ্তাহে কিভাবে পঞ্চাশ পয়সা যোগাড় করা যায়। এর বাইরে কারও কোন চিন্তাভাবনা ছিল না। তো এর মধ্যে আমাদের নতুন একটা বই এলো — দেশ ও কৃষ্টি। আমি বইটা পুরোপুরি পড়ি নাই। তবে যেটুকু পড়েছি, তাতেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। সেখানে পাকিস্তানের সবগুলো প্রদেশ নিয়ে লেখা হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে লেস ইম্পর্টেন্ট রাখা হয়েছে বাংলাকে। এদের কোন ইতিহাস নাই, এদের কালচার নাই, এরা শুধু মাছ খায়, এদের আর কোন কাজ নাই। ছাত্ররা ক্ষেপে উঠল — দেশ ও কৃষ্টি, দেশ ও কৃষ্টি / বাতিল কর, বাতিল কর । সেটা ঊনসত্তরের ঘটনা। তো এই আন্দোলনের মাঝে পুলিশ গুলি চালালো। সেখানে হাদীস নামে এক ছেলে মারা যায় আমার সামনেই। খুলনায় একটা পার্ক আছে তার নামে — হাদিস পার্ক । তো তখন থেকেই আমাদের মাঝে রাজনৈতিক কনশাশনেস জন্ম নেয়। মনের মধ্যে একটা আগুন জন্ম নেয়। বিদ্রোহের মত — পাকিস্তানীরা আমাদের শত্রু

তার সাথে যোগ হল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ — বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ । খুলনায় বসেই আমরা শুনছি, রেসকোর্সে লোক ধরার জায়গা হচ্ছে না। পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদ, গাছের ডালে মানুষ বসে আছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনবে বলে। এর মধ্যে হঠাৎ রেডিও বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার রেডিও চালু হল। শুনতে পেলাম বঙ্গবন্ধ বলছে — এই মাত্র খবর পেলাম, রেডিও না’কি বন্ধ হয়ে গেছে। আমার মানুষদের আমার কথা শুনতে দেয়া হচ্ছে না।  তো সেই ভাষণ আর ঠিকমত শুনতে পারিনি। কিন্তু, রেসকোর্সে এত মানুষ এসেছে শুনে খুব উৎসাহিত বোধ করলাম।

তারপর আর খুব বেশি খবর পাইনি। এর পর তো এলো অপরাশেন সার্চ লাইট। ২৫শে মার্চে আমরা খবর পাইনি। আমরা খবর পেলাম যখন মানুষ গ্রামের দিকে পালিয়ে আসা শুরু করল। আর তাদের পেছন পেছন আসতে শুরু করল পাকিস্তানী বাহিনী। তার মাঝে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শুনতে পেলাম — I, Major Ziaur Rahman, on behalf of our great leader and the supreme commander of Bangladesh, Sheikh Mujibur Rahman, do hereby proclaim the independence of Bangladesh. 

আমরা চার বন্ধু মিলে প্লান করলাম যুদ্ধে যাবার। তখন পরিস্থিতিটা এমন যে, মিলিটারিরা মংলা দিয়ে আসছে। ঘরে ঘরে ঢুকে তরুণ ছেলে যাকে পাচ্ছে তাকেই মেরে ফেলছে। কারণ, তারা ভাল করেই জানতো তাদের মূল শত্রু হচ্ছে এসব তরুণ-যুবারাই। এদেরকে মেরে ফেললে অটোমেটিক্যালি দেশ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। প্রাথমিক ভাবে তারা কিছুটা সফলও হয়েছিল।

এপ্রিল মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা ঘর ছাড়লাম। তখন সবাই ভারতে যাওয়া শুরু করেছে। কারও যাতায়াতই নিরাপদ ছিল না। কিন্তু, আমাদের মত বয়েসী ছেলেদের জন্য সেটা আরও বিপজ্জনক ছিল। আমরা প্রথমে খুলনা লঞ্চঘাট থেকে গেলাম কালীগঞ্জে। আমাদের সাথে একটা ছেলে ছিল, নাম — কুমু। কুমুর এক আত্মীয় ছিল কালীগঞ্জে। আমরা তার বাসাতেই উঠলাম। সেখান থেকে তিনি আমাদের বর্ডার পর্যন্ত পৌছে দেয়ার জন্য লোক ঠিক করলেন। সেই লোক আবার সে এলাকার বিখ্যাত ডাকাত। আমরা তার সাথেই বর্ডারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সে আমাদের ইছামতি নদী পর্যন্ত পৌছে দিল। ইছামতির এপারে বাংলাদেশ। ওপারে ইন্ডিয়া। সে আমাদের সাথে খানিকটা ভেতরে গিয়ে ওপারে ডাকাতের যে সহচর, তার বাসায় গেল। প্রচণ্ড ক্লান্ত-শ্রান্ত আর ক্ষুধার্ত। সেখানে আমাদের খেতে দিল জাউ (মাড়সহ নরম ভাত) তার ওপর কুরানো নারকেল ছিটানো আর এক পাশে খানিকটা ঝোলা (তরল) গুড়। সেই খাবারের কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে। সেটাই রীতিমত অমৃতের মত খেলাম। তারপর তারা সেখানে আমাদের পথ দেখিয়ে দিল — এই রাস্তা ধরে পাঁচ মাইল হেঁটে গেলেই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প

হেঁটে সেই ক্যাম্পে পৌছুলাম।  সেখানে যে চারজন আমরা গিয়েছিলাম তার মধ্যে একজন ছিল হীরা। আমাদের চেয়ে কয়েক বছরের বড় ছিল। সে চারজনের মধ্যে দুজন মারা গেছে,  দুজন এখনো বেঁচে আছি। একজন সেন্ট্রি আমাদের দাঁড় করিয়ে ভেতরে অফিসারদের ডাকতে গেল। তখনও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান সেভাবে শুরু হয়নি। সেখানে ছিলেন লেফটেন্যান্ট আরেফিন।  পাকিস্তান সেনাবাহিনী তে সেকেন্ড লেফটেনেন্ট থাকা অবস্থায় যিনি সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা  যুদ্ধে যোগ দেন। আমাদের আগে মাত্র একটা ব্যাচ ট্রেনিংয়ে গেছে। আমরাই ছিলাম দ্বিতীয় ব্যাচে। তাই ম্যানপাওয়ার বাড়ানোর জন্য যা যা করনীয় তারা তাই তাই করত। ফলে আমাদের ঢুকে যেতে সমস্যা হয়নি।

এটা ছিল মূলত একটা কোম্পানি ইউনিট।  নিয়মিত  বাহিনীতে তিনটা সেকশন মিলে হয় একটা প্লাটুন, তিন বা ততোধিক প্লাটুন মিলে হয় একটা ইউনিট। সেখানেই আমাদের আনুসাঙ্গিক ট্রেনিং শুরু হল। আমাদের ক্যাম্পটা ছিল একটা রাইস মিলে। রাইস মিলের সামনে ধান শুকানোর জন্য বিশাল চাতাল। তার ওপর টিনের শেড। সেখানেই আমরা সবাই থাকতাম — প্রায় দুইশত এনসিও অর্থাৎ নন কমিশন্ড অফিসার । পাশে তিন চারটা তাবুতে থাকতেন কমিশন্ড অফিসারেরা। তারা ছিলেন – ক্যাপ্টেন নূরুল হুদা, লেফটেন্যান্ট বেগ, লেফটেন্যান্ট আরেফিন আর একজন ACO অফিসার। এর বাইরে ২০০ জন ছিল NCO অর্থাৎ নন কমিশনড অফিসার এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা।

সেখান থেকে আমাদের ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হল বিহারের একটা পরিত্যাক্ত এয়ার স্ট্রিপে। ১৯৬৫ সালে সেটা প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের কারণে পরিত্যক্ত হয়। সেখানে আমাদের ট্রেনিং দেয়া হয় চার সপ্তাহ। এ ধরণের ট্রেনিং সাধারণ আর্মিদের জন্য নূন্যতম ছয় মাস হবার কথা। কিন্তু, আমাদের কেতাবী পাঠ পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়।শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে মৌলিক যে জ্ঞানটুকু দরকার, তাই দেয়া হয় — How to protect yourself and how to kill the enemy. থ্রিনটথ্রি রাইফেল ব্যবহার, গ্রেনেড ছোড়া, অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ — ইত্যাদি শেখানো হত আমাদের। আমাদের মূলত ট্রেনিং দিত ভারতীয় JCO, NCOরা আর ওভার অল তত্ত্বাবধানে থাকত কমিশন্ড অফিসারেরা।

প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের ফায়ারিংয়ের একটা পরীক্ষা দিতে হত — কার কার ফায়ারিং অ্যাভব অ্যাভারেজ। মোটামুটি সবাই পাশ করত। কারণ, তখন পরিস্থিতিটাই এমন ছিল — সবচেয়ে ভীতু ছেলেটাও গড়পততা সাহসী হয়ে যেত । অস্ত্রের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি হবার পরে মানুষের মধ্যে মানসিক একটা শক্তি এসে হাজির হত। আর বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ থাকত না কারও মধ্যে — আমি যেটা করছি, শতভাগ সঠিক জেনেই করছিpills like viagra in stores

তিন সপ্তাহ পরে ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় যে অস্ত্র — এলএমজি বা  Light Machine Gun,  তার ট্রেনিং। সেটা ছিল চমৎকার একটা অস্ত্র। একবার ট্রিগার চেপে রাখলে ম্যাগজিনে থাকা ২৮টা গুলি একবারে বেরিয়ে যেত। তখন তিনটা এলএমজি দিয়ে একটা পাকসেনাদের হেভি মেশিনগানকে কব্জা করা যেত। অস্ত্রটা আমার খুব ভাল লাগল। তো দেখা গেল ফায়ারিংয়ের পরীক্ষায় প্রায় ৭০০ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে আমি সেকেন্ড হয়ে গিয়েছি।

ট্রেনিং শেষ হবার পরেই আমার দেশের ভেতরে চলে আসার কথা। তার আগে ওখানে থেকেই কয়েকটা অপারেশন করলাম। তা দেখে ওখানকার অফিসার বললেন — এই ছেলেটা এলএমজিতে ভাল। ও এখানেই থাক।  তো আমারও আর দেশের ভেতরে ঢোকা হল না। ইন্ডিয়ার ভেতরই থাকলাম। ওখান থেকে দেশের ভেতরে ঢুকেই অপারেশন করতাম। তখন আমাদের রুটিন বাধা কাজ ছিল, প্রতিদিন বিকাল পাঁচটা খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঠিক সূর্যাস্তের সময়ে তিন চারটা গ্রুপ করে তিন চার দিকে চলে যেতাম। কে কোথায় যাবে কেউ জানতাম না। সবাই যে যার প্লাটুন কমান্ডারের নির্দেশ অনুসারে কাজ করতাম। আমার অ্যাকশন ছিল দু’রকমের — সিভিল অ্যাকশন আর মিলিটারি অ্যাকশন । সিভিল অ্যাকশন বলতে, তখন শান্তি বাহিনী তৈরি শুরু হয়ে গেল। শুরুর দিকে তারা মোটামুটি নিরপেক্ষ থাকলেও পরে পাকিস্তানীদের দালালী করা শুরু করল। তখনও রাজাকার-আলবদর সৃষ্টি হয়নি। এই শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানরাই কোথায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প আছে, সেটা পাকিস্তানীদের দেখিয়ে দিত। তো সিভিল অ্যাকশনে আমরা এদেরকে ধরতাম। খোঁজ খবর করতাম, কারা আসলেই শান্তির জন্য কাজ করছে — তাদের ছেড়ে দিতাম । আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকত, পাকিস্তানীদের সহায়তা করছে — তাদের মেরে ফেলতাম । যখন সিভিল অ্যাকশন হত, তখন দেখা যেত মানুষ ধান-চাল, মুরগি, ছাগল — যে যা পারত, তাই আমাদের দিয়ে যেত।

আর মিলিটারি অ্যাকশনে আমাদের কৌশল ছিল — হিট অ্যান্ড রান । মিলিটারি অ্যাকশন যখন হত, তখন পরিপূর্ণ সমরসজ্জায় সজ্জিত হয়ে, রাত দু’টো-তিনটার সময় গিয়ে পজিশন নিতাম। একেবারে ভোর রাতের সময়, যখন ঘুমটা সবচেয়ে বেশি গাড় হয়, সেই সময় আমরা আক্রমণ করতাম — তিন দিক থেকে ফায়ারিং । তখন প্রতি দশটা অ্যাকশনের মধ্যে একটা সফল হত, অর্থাৎ ওরা আত্মসমর্পণ করত। শুরুর দিকে আমাদের লোকবল ছিল বেশ কম। তাই আমাদের টার্গেট ছিল, নিজেদের ক্ষতি না করে পাক বাহিনীকে কতটা ক্ষতিগ্রস্থ করা যায়। আমাদের অপেক্ষাটা ছিল বর্ষাকালের জন্য। কারণ, আমরা ভালমতই বুঝতে পারছিলাম, তখন পাক বাহিনীর ওপর বেশ ভাল রকমের একটা ধকল যাবে। তার এ ধরণের পরিবেশ বা আবহাওয়া কোনোটাতেই অভ্যস্ত নয়। তখন তাদের মূল শত্রু হয়ে দাঁড়াবে বৃষ্টিই। পানিতে মুভমেন্টে সমস্যা হয়। সেটা আমাদের সুবিধা। আর আমাদের স্থানীয় জনগণের সমর্থন আছে। কোথাও থেকে একটা নৌকা জোগাড় করে সবাই মিলে দাঁড় টানলে ঝড়ের বেগে এগিয়ে যেত। বিশ মাইল, ত্রিশ মাইল দূরে অপারেশনেও সমস্যা হত না। পাক বাহিনীকে অতর্কিতে আক্রমণ করে আবার সেই নৌকায় করেই ফিরে আসতাম।

তো এর মধ্যে একদিন আমি আমার অফিসারকে বললাম — কবে মরে টরে যাই, তার কোন ঠিক নেই। আমার কোলকাতা শহরটা দেখার খুব শখ।  তিনি বললেন —  কদিন পরেই তো পরের মাসের বেতন দেবে। সেটা নিয়েই যেন যাই।  তখন আমাদের মাসে পঞ্চাশ টাকা করে বেতন দিত। সেটাই খরচ হত না। সেই সময় খাওয়া তো ক্যাম্প থেকেই দিত। আর হাতখরচ ছিল না বললেই চলে। আমার কাজ ছিল সেই টাকা দিয়ে নিত্য নতুন হাফপ্যান্ট বানানো। পরের মাসে বেতন পাবার পরে কোলকাতা শহরের যাবার প্রস্তুতি নিলাম। স্যার আমাকে আরও দশ টাকা দিলেন। তখন তাতে কোলকাতা যাওয়া আসার ভাড়া হয়ে যায়। আর আমাদের কোথাও ভাড়া লাগত না। আমাদের পোশাক দেখেই বুঝত আমরা জয় বাংলার লোক । শুধু টেম্পুতে ভাড়া দেয়া লাগত। এর আগে আমার সিনিয়র বন্ধুদের কাছে কোলকাতার সিনেমার অনেক প্রশংসা শুনেছিলাম। কয়েকটা সিনেমা দেখলাম। পঞ্চাশ টাকা পকেটে। বিশাল ব্যাপার। আমার সাথে আরেক ভাই ছিল — দুলাল ভাই । তিনি কিনলেই বই — সমরেশ, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, সবার। ম্যাগাজিনও কিনলেন অনেক — আনন্দবাজার পত্রিকার বিভিন্ন ভার্শন। এই লোকটা ছিল বই পাগল। আমরা বাকিরা শুধু সিনেমা দেখি, খাই-দাই আর কোলকাতার চেহারা দেখি। বেশ পুরোনো আমলের অনেক বিল্ডিং ছিল সেখানে। তখন ছিল পূজোর মৌসুম। দুর্গার বিশাল বড় বড় মূর্তি ছিল মণ্ডপগুলোতে। আর মহল্লায় মহল্লায় তখন গান বাজত।

বিহার থেকে ট্রেনিং শেষ করে ক্যাম্পে ফিরে এসেই দেখি, আরেকটা প্লাটুন এসেছে ট্রেনিং নিতে। ওইখানে কোম্পানি কমান্ডার আমার আরেক বড় ভাই। তো তিনি যাবার সময় আমাকে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমাকে বললেন, তুই কথা বলবি না আমি কথা বলব?আমি বললাম, আচ্ছা আমিই কথা বলে দেখি।

তো সেই বড় ভাইয়ের সাথে আমি চলে এলাম ডুমুরিয়া। সেই এলাকা তখন নকশাল অধ্যুষিত। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে এরা কিছুই না, স্রেফ ডাকাতি-টাকাতি করে। এলাকায় যারা পয়সাওয়ালা আছে, তাদের ব্ল্যাকমেইল করে টাকা পয়সা আদায় করে।

এভাবেই ছোট বড় অপারেশনের মধ্যে দিয়ে বর্ষাকাল শেষ হল। নভেম্বর আসতে আসতে বেশিরভাগ এলাকা আমাদের দখলে চলে এলো। পরিস্থিতিটা তখন এমন — পাক আর্মি যেখানে ক্যাম্প করেছে, সেই এলাকাটাই শুধু তাদের। বাকি সব এলাকা আমাদের। মোটামুটি ঘটনা প্রবাহ আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বর্ষাকালে ওরা যেই আঘাতটা পেয়েছিল, সেটা আর ওরা পুষিয়ে উঠতে পারেনি। আমরাও তখন অনেক বেশি পরিনত। আগে যা করতে হাত কাঁপত, এখন তা নির্দ্বিধায় করে ফেলি। মৃত্যুভয় প্রায় নেই বললেই চলে। একবারে ড্যাম কেয়ার সবকিছুতেই….।

“দ্বিতীয় পর্বের লিংক এইখানে”

You may also like...

  1. সোহেল রানা ভিভিওআইপি বলছেনঃ

    ভালো লাগলো

  2. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    ক) পাকি-মনারা আজও মনে করে আওয়ামীলীগের হাতে ক্ষমতা মানে বাংলাদেশ ভারত হয়ে যাওয়া যেমনটা মনে করত ভুট্টো- ইয়াহিয়া!! আদতে আওয়ালীগ ক্ষমতায় আসলেই প্রতিবেশী ভারতের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক হয় এবং দেশ তুলনামূলক বেশী এগিয়ে যায়। পাক-মনাদের এই কথা তাই খুব বাস্তব ধর্মী!! দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেই অরথে ভারতের সাথে তুলনা করা ভাল, আর পাকি-মনারা ক্ষমতায় থাকলে দেশ পাকি-পন্থী হয়ে যায় অর্থাৎ পিছিয়ে যায়!!

    খ) http://youtu.be/dS_XZSKt7Xg

    এই ভিডিও থেকে জিয়ার ঘোষনা পাঠের অংশটি ঠিক করে নিয়েন…

    খুবই সময়োপযোগী পোস্ট!! এমন এমন দুর্লভ সাক্ষাৎকারে সভ্যতা ব্লগের আর্কাইভ ভরে উঠবে একদিন!! অফুটন্ত ধন্যবাদ পোস্টকরতাকে, আর বীর মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জুকে শ্রদ্ধাবনত শত-সহশ্র সেল্যুট..

  3. খুবই প্রশংসনীয় একটা কাজ করেছো। এমনি ভাবে যদি ইতিহাসগুলো সংরক্ষণ করা যায়,তাহলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মন্তরে আমরা আমাদের মহান মুক্তিযদ্ধের ইতিহাস ধরে রাখতে পারবো। অসংখ্য ধন্যবাদ তোমায় এমন একটা কাজ করার জন্য :) acheter cialis 20mg pas cher

    • আমি আশাবাদী ফাতেমা, এভাবেই আমরা আমাদের ইতিহাসগুলো সংরক্ষন করতে পারব, ছড়িয়ে দিতে পারব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে…. কাজটা এই প্রজন্মই করবে, মায়াবী তেজস্বিনী কিংবা আপনার মত সাহসী যোদ্ধারাই করবে… :-bd

      আমি আশায় বুক বেঁধে আছি… :-w

    • অংকুর বলছেনঃ

      আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসগুলো যাতে হারিয়ে না যায় সেজন্য আমাদের সকলেরই উচিত এমন কিছু উদ্যোগ নেয়া। নিজের পক্ষে যতদূর সম্ভব। মানুষ তখন দেশের জন্য নিজের জীবনটা পর্যন্ত বাজি রেখেছে। বাঁচবে কিনা জানত না। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলে তাদের ভালোবাসার মানুষগুলো ভাল থাকবে শুধু সেই চিন্তায় তারা যুদ্ধে গিয়েছে। আমরা এই ছোট কাজটা করতে পারব না?

      online pharmacy in perth australia
  4. ধন্যবাদ সবাইকে। আর তারিক ভাইয়া, দেরি হবার জন্য স্যরি..। ঠিক করে দিয়েছি। আর এই কাজটার কৃতিত্ব আমার চেয়ে বহুতগুন বেশি ডন ভাইয়া আর ক্লান্ত কালবৈশাখীর। সাক্ষাতকারটা উনারাই নিয়ে আসছেন। আমি শুধু রেকর্ডিং শুনে লিখসি। metformin er max daily dose

  5. অনেক ইন্টারেস্টিং ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের এসব ঘটনা পড়তে অনেক ভালো লাগে। রক্ত গরম হয়ে উঠে।

    তখন বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন করতে আওয়ামী লীগ করা লাগত না। তখন কেউই আওয়ামী লীগ করত না, আবার সবাইই আওয়ামী লীগ করত

    একেবারে সঠিক কথা। :-bd :-bd

প্রতিমন্তব্যঅংকুর বাতিল

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন * prednisone side effects menopause

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment. 2nd course of accutane side effects

prednisone side effects moon face
prednisone 10mg dose pack poison ivy
diflucan 150 infarmed
cialis online australia