একাত্তরের ইতিহাস,একজন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাতকার, মিরপুর জল্লাদখানা

1749 will i gain or lose weight on zoloft

বার পঠিত

শরিকুল ইসলাম বাবলু, দুই নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার গল্প আমরা শুনেছি। কিন্তু তিনি মৃত্যুর ভয়াল থাবার ভেতর থেকে ফিরে এসেছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালে মিরপুর তথা মিরপুরের জল্লাদখানায় তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হলো তার জবানীতে।জয় বাংলা।জয় বঙ্গবন্ধু।

১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল পনের বছর। তো মিরপুর এলাকায় আমরা তখন বাঙালী থাকতাম শতকরা তিনজন।মানে একশতে আমরা তিনজন থাকতাম বাঙালী আর সাতানব্বই জন বিহারী। তো মার্চ মাসে মানে সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধু যখন ভাসন দিল তখন সমস্ত বিহারীরা এলার্ট হয়ে গেল।তখন আমাদের সাথে খুব একটা যোগাযোগ, কথাবার্তা বলে না,আমাদেরকে ফলো করে।আমরা বাঙালী,আমরা কোথায় যাই, কি করি,কার সাথে কথা বলি তা ফলো করে।এমনকি আমরা যাতে বের না হতে পারি সেই ব্যবস্থাও তারা নিয়েছিল।

তো যত দিন যায় আমরা বুঝতে পারি এখানে থাকা যাবেনা।আমার বাবা,চাচা যারা ছিল তারা ঠিক করে এখানে আর থাকা যাবেনা। তো আমি আর আমার ফেমিলী এখান ছেড়ে চলে গেলাম ২৩শে মার্চ। ২৩ শে মার্চ মিরপুর ছেড়ে চলে গেলাম সাভারে।এরপর শুনছি মিরপুরে যেই বাঙালীরা ছিল প্রত্যেককে জবাই করে দেয়া হল। কেউ বেঁচে নাই।

তারপর যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জুলাই মাসের আঠাইশ তারিখ আমি মিরপুরে আসলাম।মানে কি অবস্থা দেখার জন্য আসলাম। বর্তমান বেনারসী পল্লীর এক নম্বর গেট দিয়ে জল্লাদখানায় আসার সময় নুরী মসজিদ পড়ে। যে রাস্তাটা এখন পড়ে আগে সেই রাস্তাটা ছিলনা। এটাই ( জল্লাদখানা) ছিল দশ নম্বর বাসস্ট্যান্ড।ছয় নম্বরের ভেতর দিয়ে যেত বাস। ছয় নম্বরের ভেতর দিয়ে এক নম্বর দিয়ে গাবতলীর ভেতর দিয়ে বের হত।তো যখন বলা হল “কে যাবে মিরপুরে ” তখন আমি বললাম যে আমি যাব।

শরিকুল ইসলাম বাবলু

শরিকুল ইসলাম বাবলু

কারণ আমি মনে করলাম সবাই আমাকে চেনে।আমি ক্লাস নাইনে পড়ি,বাচ্চাদের অনুষ্ঠান করি। তাই কেউ আমাকে কিছু বলবে না।

তারপর,, মিরপুরে ঢুকে বেনারসী পল্লী ক্রস করলাম। নুরী মসজিদ ক্রস করছিলাম।তখন বাজে প্রায় দেড়টা থেকে পৌণে দুইটা।তখন একজন বিহারী, সে জোহরের নামাজ পড়ে বের হচ্ছে।সে “ইধার আও, ইধার আও।সুনো, সুনো ” বলে ডাকল।

আমি ফিরে তাকালাম,দেখি না।আমাকে ডাকল না।পিছনে তিনজন বিহারী ছেলে ছিল।ওদের বয়স বিশ-বাইশ হবে,ওদেরকে ডাকল।ওদেরকে ডেকে বলে দিল,”ওইযে বাঙালী যায়।”কথাটা আমার কানে আসল। all possible side effects of prednisone

ওরা কি করল,মসজিদের কাছে একটা চার রাস্তার মোড় আছে।ঐখানে তিনজন মিলে আমাকে ঘিরে ফেলল। ওদেরকে আমি চিনি।ওরা আমাকে বলল ঐখানে চল।মানে জল্লাদখানায়।

এইটা কিন্তু তখন নির্জন এলাকা ছিল।এইদিকে কোন বাড়িঘর ছিল না।আর এইটা ছিল সেইসময় পাম্পহাউস। ১৯৬০ সালে আইয়ুব খান এইটা বানায় দিছিল। এইটা ময়লা পানি টেনে আনত আর তুরাগ নদীতে বের করে দিত।তো ওরা বলল চল এইখানে চল।আমি বললাম না আমি ঐখানে যাবনা।তোমরা যা বলার আমাকে এইখানেই বল। আমি যেই না বললাম, একজন সঙ্গে সঙ্গে ছুরী বের করল।ছুরি বের করে বলল “ঘুসা দো “, মানে ঢুকিয়ে দাও। আমার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিতে বলল। তো আমার পেটে ছুরি ঢুকাতে গেছে, আরেকজন ফট করে ওর হাতটা ধরে ফেলল। বলল যে না,উর্দূতে বলতেছে, বলতেছে যে না এখানে মারার দরকার নাই। ওকে যেহেতু ওখানেই ফেলতে হবে তো ওখানে নিয়ে যেয়েই মারি।এখানে মারলে রাস্তায় রক্ত পড়বে। নিয়ে যেতে হবে। নিয়ে যেতে যেতে আমাদের গায়েও রক্ত লাগতে পারে।তাই ওখানেই গিয়ে মারি।

তারপর ছুরিটা বন্ধ করল। বন্ধ করার পর শুরু হল মার।মারের বর্ণনা তো আমি দিতে পারব না।মার যে কারে বলে! হাজার হাজার বিহারী বের হয়ে আসল।এসব বিহারীরা ১৯৬৪ এ ইন্ডিয়া থেকে আসছে।কেউ বলল না, “ওকে মের না,ও তো এখানেই থাকে।এখানেই বড় হইছে আমাদের সামনে।” সবাই চেনে। কারণ পাশেই তো আমার বাড়ি।যেখানে ধরসে তার পাশে কিছুদূর হেঁটে গেলেই আমার বাড়ি। ওদেরকে আমি বললাম, “দেখ,আমাকে তোমরা কেন মারতছ? আমরা এতদিন একসাথে থাকলাম,খেলাধুলা করলাম” আমাকে গাল দিয়ে বলে কি, “ব্যাটা তুই বাঙালী। তুই দেশ স্বাধীন চাস। তুই জয় বাংলা।তোরে আমরা চিনি না।”
তাদের একটাই কথা।যতই বলি ততই ওই কথা বলে।মারতে মারতে মারতে মারতে…..কি করে দুইহাত দুইপা ধরে ঝুলায় উপরে ফেলে দেয়।মাটিতে পড়ি আবার তুলে,আবার ফেলে।

তো কি হইছে,সাতই মার্চ এর ভাসনের পর ওরা বিভিন্ন জায়গায় কুয়া খুঁড়ছিল। কোনটা দশ ফিট, কোনটা পনের ফিট।তো যখন প্রশ্ন করতাম কুয়া খুড়তেছ কেন? বলত সাপ্লাইয়ের পানি খাবার জন্য। কিন্তু এত ছোট কুয়াতে তো সাপ্লাইয়ের পানি পাওয়া যায়না। আসলে বাঙালীদের মেরে ফেলার জন্যই এমন করা হচ্ছিল।

তো আমাকে যখন মারছিল,আমার গায়ে কোন কাপড় নেই,খালি প্যান্ট পড়া,আমি মাটিতে পড়ে যাই।আমার গায়ে কোন শক্তি নেই।কিন্তু হুস আছে।দেখছ আমার বামদিকে ভুরু কাটা,পিঠে দাগ আছে।তারপর মাটিতে পড়ে যাবার পর সবাই আমাকে এলোপাথাড়ি লাথিয়েছে। প্রথমে উপরে তুলে নিচে ফেলে দিল,একবার না অসংখ্যবার। তারপর লাথি।সেই কি আনন্দ।কুরবানীর সময় আমরা যেরকম আনন্দ করি সেরকম আনন্দ।আমাকে টেনে উপরে ফেলছে, নিচে এসে পড়ছি,সেই কি আনন্দ।তারপর যখন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছি তখন লাথি। আমার কিন্তু নিঃশ্বাস নিতে এখনো কষ্ট হয়।

তারপর আমি যখন একদম নিস্তেজ হয়ে গেলাম তখন কি করল আমাকে পা ধরে টেনে এখান,মানে জল্লাদখানায় নিয়ে আসল। আমার পিঠের সমস্ত চামড়া ছিলে গিয়েছিল।এগুলো পড়ে শোনা,পিঠের চামড়া ছিলে সাদা অংশ বের হয়ে এসেছিল।মানে চর্বি। তখন এরকম রাস্তা ছিলনা।ছোটছোট জংগল ছিল,ইট,সুড়কি এসব ছিল আরকি। তারপর টেনে আমাকে এইটার ভেতরে আনল। এই জল্লাদখানা আগে যা ছিল তাই আছে,খালি বাইরে কিছু সংস্কার করা হয়েছে। আমার কিন্তু তখনও জ্ঞান আছে। দেখি ভিতরে রক্তে ভরা। দেখলাম ছেলেদের শার্ট, ছেলেদের প্যান্ট,জুতা, মেয়েদের শাড়ি,ওড়না, সেলোয়ার কামিজ, ছোট ছোট বাচ্চাদের জুতা। এখন যেই ঘরটাতে কুপগুলো উচু করে দেয়া আছে, আগে সেটা ছিল না। আগে সেখানে ছিল ম্যানহোলের ঢাকনা। তারা কি করল,আমাকে লম্বা করে শুইয়ে দিল। মাথাটা গর্তের মধ্যে,শরীরটা বাইরে।ওরা কি করত,গলাটা কেটে দিত,তা ম্যানহোলে পরে যেত,আর শরীরটা তারা ঠেলে ফেলে দিত।

জল্লাদখানার কুপ

জল্লাদখানার কুপ

আমাকে শোয়ানোর পরে একজন আমার পা ধরে রেখেছে, আরেকজন গেটে পাহাড়া দিচ্ছে। আরেকজন কি করল আমার গলায় একটা পোঁচ দিল। মানে ছুরিটা সামনের দিকে চালালো, সামনে একটা পোঁচ দেয়ার পরে গলাটা আমার জ্বলে উঠল। আমি তো দেলতে পারছিনা,কিন্তু গলাটা জ্বলে উঠল। মানে বুঝতে পারছি উপরের চামড়াটা কেটে গেছে। সামনে একটা পোঁচ দেয়ার পরে পিছে আর টানতে পারছে না। সামনে কিন্তু কেটেছে,যতটা কাটার কাটছে,পিছে টানলে আমার গলার রগ কেটে যায় আমি মরে যাই। কিন্তু পিছে টান দিতে পারছে না।তারা একদম স্তব্ধ হয়ে যায়। একদম চুপ হয়ে যায়।

আমি মনে করি এইটা আল্লাহর রহমত। একমাত্র আল্লাহই তাদের থামিয়ে দিয়েছেন।কারণ সামনে টান দিছে,পেছনে টান দিতে পারবেনা এমন হওয়ার তো কথা না,ধারালো ছুরি, তারা শক্তিশালী যুবক। না পারার তো কথা না। সামনে পোঁচ দিছে সেই দাগটা আমার ছিল। এমনকি আমার এলাকায় আমার নাম দিয়েছিল গলা কাটা বাবলু।

তিন চার মিনিট পর আরেকটা ছেলে আসল,বিহারী। সে বাবলুউউ বলে চিৎকার দিয়ে আমার হাত ধরে টেনে আমাকে বের করে দিল। তখন আমি মনে হয় আমার সমস্ত শক্তি ফিরে পেলাম। তখন বাকি তিনজন চমকে উঠল। চমকে উঠে মনে হয় তারা হুস ফিরে পেল।ওরা তাকে বলল,”ওই বেটা,তুই বিহারী হয়ে কেন বাঙালী বাঁচাইলি? ” ওরা মারামারি শুরু করে দিয়েছে। ও বলল, “আমরা বন্ধু,একসাথে খেলাধুলা করছি,ওকে কেন মারবি? ” ওর নাম ছিল নাসির। তখন একজন কি করল, আমার শরীর থেকে ননস্টপ রক্ত পড়ছে, ঠোট কেটে ঝুলে গেছে, সারা শরীর কাটা,গলা কাটা, গলা দিয়ে রক্ত পড়ছে। একেবারে বিভৎস অবস্থা।
তো একজন আমাকে টেনে মিরপুর দশ নম্বর ব্লক সি একজন বিহারী নেতার বাসায় দিয়ে আসল। তখন বাজে পৌণে ছয়টা। পৌণে দুইটার দিক ঘটনা শুরু তখন বাজে পৌণে ছয়টা।

তো নেতা আমাকে বলল, “কে তোমাকে আসতে বলেছে? কোন বাঙালী আছে? যারা ছিল প্রত্যেককে মেরে ফেলছে।কে তোমাকে আসতে বলছে? ” আমি নির্বাক। কি বলব আর। ঐ সময় ছয়টা থেকে ছয়টা কারফিউ থাকত। তখন উনি বলল,”দেখ,এখন পৌণে ছয়টা বাজে। এখন তো কারফিউ শুরু হয়ে যাবে।তুমি আজকে থাক।দেখা যাক কি করা যায়।”

তখন উনার মা ছিল,উনি ডেটল,গরম পানি এসব নিয়ে আমার গায়ে লাগাতে যাবে,ঠিক তার আগে তার ছেলেকে ডেকে বলল,”এক কাজ কর,ওর গলায় পারা দিয়ে ওরে মেরে ফেল।”মা ছেলেকে বলতেছে ওকে মেরে ফেল। উনি বললেন, “কেন মা? “মা বলল, “ও সহ্য কিভাবে করবে? ওর তো সবই কাটা। একমাত্র ওর পাছা ছাড়া সবই তো কাটা।ও তো সহ্য করতে পারবেনা।ওর জ্বর চলে আসছে।ওর ঠোঁট কেটে ঝুলে আছে,ওর ভুরুর ভেতরে দেখা যাচ্ছে। পিঠের চামড়াটা দিয়ে সব দেখা যাচ্ছে,সাদা অংশ দেখা যাচ্ছে ।এরচে বরং ওকে মেরে ফেল ও বেঁচে যাক। “আমি তখন কাঁপছি। জ্বর এসেছে আমি কাপছি। ছেলে তখন বলল,”মা এত কিছুর পর যখন বেঁচে গেছে, দেখ কি করা যায়। ” সেইযে কি কষ্ট আমি ভাষায় বুঝাইতে পারব না, কি কষ্ট।

এরপর রাতে মিটিং করল বিহারীরা, আমাকে তারা মারবে। কয়েকশ মিলে নেতার বাসায় এটাক করবে,রাত বারোটার পরে। কারণ সে যদি বেঁচে যায় তাহলে সাক্ষী হয়ে থাকবে।আমাদের এই কৃতকাজ সে সবাইকে গিয়ে বলবে। তো নেতা বাসায় ছিল না।নেতা কোথায় জানি ছিল।নেতা বাসায় আসল পৌণে এগারটায়।এসে বলল,”বাবলু,তোমাকে তো এখানে রাখা যাবেনা।ওরা যদি সবাই মিলে এটাক করে আমি রাখব কিভাবে। আমার পক্ষে রাখা সম্ভব না। চল তোমাকে আরেক জায়গায় দিয়ে আসি।” তখন আমার গায়ে যে কি জ্বর! ব্যাথা! মানে হাটব যে,সেই শক্তি আমার নাই। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে।উনি আমাকে দশ নম্বর থেকে তের নম্বর এক বাসায় দিয়ে আসলেন।রাস্তায় তিন জায়গায় আর্মি ধরছিল।জিজ্ঞেস করে, “কৌন হ্যায়? ” নেতা তার নাম বলে ছেড়ে দেয়।তো উনি আমাকে তের নম্বর এক বাসায় দিয়ে আসলেন। বিহারী নিঃসন্তান দম্পতী। উনারাও আমাকে চেনেন। নেতা বললেন আমাকে কচুঁখেত থেকে বাসে তুলে দিতে।এইদিকে দশ নম্বরে না নিয়ে আসতে।

তো ছয়টায় কারফিউ শেষ হল। কচুক্ষেতে তখন তো রাস্তা ছিল না।সব ধানক্ষেত। তো উনি অর্ধেক রাস্তা গিয়ে আর যাননি।কারণ কচুক্ষেতে তখন তো বাঙালী। তো সেইদিন আর্মিরা কচুক্ষেতে আক্রমণ করেছিল। তখন আমি কচুক্ষেত থেকে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। আমার আশপাশ দিয়ে শো শো করে গুলি যাচ্ছে। আর্মিরা বাঙালীদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। আমার তো দৌড়ানোর ক্ষমতা নাই।আমি তো এমনিতেই মরে গেছি। তাই হেটে হেটে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত গেলাম। সেখান থেকে বাসে উঠে আমি গুলিস্তানে গিয়ে নামলাম।গুলিস্তান থেকে গেন্ডারিয়া গেলাম খালার বাসায়। আসার সময় আমি মা কে বলছিলাম,”মা আমি খালার বাসায় যাচ্ছি।”মাকে যদি বলতাম মিরপুর যাচ্ছি মা আমাকে আসতে দিত না। তো খালার বাসায় এসে আমি বিছানায় পড়ে যাই।এমন অবস্থা যে বাথরুম করতে যাবার মত সামর্থ্য আমার নেই।তো খালা আমার সেবা শুশ্রূষা করে। তখন তো টেলিফোন মোবাইল ছিল নি। তাই কাউকে জানানো যায়নি।তো আমার সহযোদ্ধারা কি করে, তারা আমার মার কাছ থেকে আমার খালার বাড়ির ঠিকানা নেয়।কারণ তারা তো জানে আমি মিসিং। আমার খোঁজ নেয়ার জন্য খালার বাসায় আসে।আমাকে দেখে তারা হতবাক হয়ে যায়। তারা পাঁচ সাতমিনিট কোন কথাই বলতে পারেনা।

তো যাহোক,দেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু মিরপুর তখনো স্বাধীন হয়নি। সাত হাজার সশস্ত্র আর্মি এখানে লুকিয়ে ছিল। তারা আত্মসমর্পণ করেনি।স্বাধীন দেশেও তারা হাজার হাজার মানুষ মেরেছে। মানুষ মনে করেছে দেশ স্বাধীন হয়েছে, বাসা ফিরে যাই। মিরপুরে ফিরে এসে স্বাধীন দেশে তারা মারা যায়। তো মিরপুর স্বাধীন হয় ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি। মার্চ মাসে আমি মিরপুরে ফিরে আসি। এসে এই জল্লাদখানা থেকে তিন ট্রাক মাথার খুলি পাই। সেগুলো স্মৃতিসৌধে দেয়া হয়েছে।

এইখানে একটা পাইপ ছিল।পাইপ দিয়ে পানি তুরাগ নদীতে চলে যেত।অনেক লাশ নদীতে ভেসে গেছে। তারপর আমি সবাইকে খুঁজি।যারা আমাকে ধরেছিল,যারা বাঁচিয়েছিল। কাউকে পাইনা।শুধু একজনকে পাই নাসির। সে এখানে ওয়াব্দার বিল্ডিং ছিল সেখানে লুকিয়ে ছিল।আমি তাকে বলি ভয় না পেতে।কেউ কিছু বলবে না। তখন সে বেরিয়ে আসে। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এখানে কত মানুষ মেরেছে? ও প্রথমে একটু সংশয় করছিল।কিন্তু পরে বলল,”আমি যেহেতু পাকিস্তান চলেই যাব, তো বলি।” পরে বলে যে প্রায় ২৫০০০ মানুষ মারা হয়েছে। এত মানুষ কোথায় পেল।মিরপুরে তো এত মানুষ থাকত না। জিজ্ঞেস করায় বলে গাড়ি ভরে ভরে মানুষ এনে জবাই দেওয়া হত। তখন ড্রাইভার হেল্পার সবাই তো ছিল বিহারী।যখন গাড়িতে একটু বেশি মানুষ হত গাড়ি ঘুরিয়ে এখানে নিয়ে আসত…

 এই ছিল শরিকুল ইসলাম বাবলুর জল্লাদখানা থেকে বেঁচে ফেরা রোমহর্ষক ঘটনা। এরকম লাখো মানুষের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার উপাখ্যান ছড়িয়ে আছের আমাদের রক্তাক্ত জন্মইতিহাস জুড়ে। তার কয়টাই বা আমরা জানি? নতুন প্রজন্মের সামনে এই অসামান্য ইতিহাসগুলো তুলে আনা আমাদের একান্ত কর্তব্য। একাত্তরের সেই চাপা পড়া ইতিহাসগুলো তুলে আনার কাজ করছে https://www.facebook.com/groups/Nucleus2014/ (নিউক্লিয়াস) নামক একটি প্ল্যাটফর্ম। সেই প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে করজোড়ে অনুরোধ, আপনারা সেই সব নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষগুলর কথা তুলে আনুন, হারিয়ে যাওয়া বীর’দের কথা তুলে আনুন। হারিয়ে যাওয়া দুষ্প্রাপ্য ছবি, তথ্য তুলে আনুন। আপনার বাবা, মা, সহ আত্মীয় স্বজন যারা কোন না কোনভাবে জড়িত ছিলেন মহান উপাখ্যানের সাথে তাঁদের কথা তুলে আনুন। আমাদের সবাইকে জানান, নতুন প্রজন্মকে জানান। দায়িত্ব তুলে নিন। সময় খুব কম, ইতিহাসের এই অসাধারন চরিত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছেন, চলে যাচ্ছেন নীরবে-নিভৃতে। তাদের নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে আনতে হলে কাজ শুরু করতে হবে আজ, এখনই… 

জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে শহীদ হয়েছেন

জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে শহীদ হয়েছেন

You may also like...

  1. চমৎকার একটি কাজ করেছেন। দারুণ হয়েছে :)

  2. তারপরও পাকিস্তানী জারজদের অবৈধ দূষিত বীর্যে তৈরি মারখোরগুলো বলবে, ৭১ সালে কোন যুদ্ধ হয় নাই, হিন্দুস্তানি মালাউনদের সাথে সামান্য গণ্ডগোল হইছিল… >:P মারখোর কখনই মানুষ হয় না, চিরকাল মারখোর থাকে…

    অসাধারন এবং রোমহর্ষক এক অভিজ্ঞতা পড়লাম, অংকুরকে অশেষ কৃতজ্ঞতা এই মুক্তিযোদ্ধার অসামান্য অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করবার জন্য… %%- কিপ আপ দ্যা গুড ওয়ার্ক… >:D<

  3. বীর বাবলু ভাইয়ের মুখে তাঁর এই সংগ্রামী এবং বীরত্বের ইতিহাস শোনার সুযোগ হয়েছিল। আপনার দুর্দান্ত পরিশ্রমী পোস্টটি নতুন প্রজন্মেকে সত্য জানতে সাহায্য করবে নিঃসন্দেহে! আপনাকে স্যালুট মন থেকে কাজটি করবার জন্য…

    আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে দারুণ একটা তথ্য ভাণ্ডার তৈরি করতে পারব যা নতুন প্রজন্মের জন্যে কার্যকরী দলীল হবে। আশাকরি পোস্টটি কর্তৃপক্ষ আর্কাইভ করবেন! মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সকল ভাল এবং গবেষণাধর্মী পোস্টকে আলাদা করে সংরক্ষণ করা হোক। সভ্যতার মডারেশন প্যানেল আশাকরি বিষয়টি বিবেচনায় নিবেন…

  4. অসাধারণ কাজ! আপনাকে ধন্যবাদ আর বীর মুক্তিযোদ্ধা শরিফুল ইসলাম বাবলুর প্রতি অনেক অনেক শ্রদ্ধা রইল।

  5. আমি এই লিখার লিংকটা ফেসবুকে শেয়ার দিতে পারি??

  6. দৃশ্যগুলো ভাবতে পারছি না…… মানুষ কি করে এমন করে!!!

  7. দারুণ কাজ করেছেন। এ ছাড়া আর কিছু বলবার ভাষা নেই… স্রেফ শামসুর রাহমানের মতন করে বলি –

    আজ এখানে দাড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে
    অভিশাপ দিচ্ছি।
    আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ
    দিয়েছিলো সেঁটে,
    মগজের কোষে কোষে যারা
    পুতেছিলো আমাদেরই আপনজনের লাশ
    দগ্ধ, রক্তাপ্লুত,
    যারা গনহত্যা
    করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে
    আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক
    পশু সেই সব পশুদের।

  8. অত্যন্ত দারুন একটি পদক্ষেপ হয়েছে এই পোস্টটি। লেখককে অশেষ ধন্যবাদ।

    nolvadex and clomid prices
  9. শঙ্খনীল কারাগার বলছেনঃ

    মানুষ মানুষকে ক্ষমা করে দেয়, কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা। অনেকদিন ধরে বলে বলে ক্লান্ত হয়ে আছি। তবু আবারো বলছি, সকল রাজাকারের ফাঁসি চাই।
    অংকুরকে ধন্যবাদ লোমহর্ষক ঘটনাটি তুলে ধরার জন্য।

  10. তবুও কিছু বরাহশাবকেরা বলেই যাবে এগুলো কাল্পনিক……যা হয়েছিল এটা গন্ডগোল আর কসাই কাদেরের ছবি রাখবে ফেসবুকের প্রো পিক হিসাবে

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

buy kamagra oral jelly paypal uk

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment. capital coast resort and spa hotel cipro