আমি একটা পাতার ছবি আঁকি. . .

671

বার পঠিত

মাঝ রাত্তিরে যে তুলসী বিলে পরীর মেলা বসে সে আমি জানতাম না। তুলসী বিল আমার সাত পুরুষের সম্পদ। আমার বাবা, তার বাবা। তার দাদা, তারও দাদার বিল ছিলো এই তুলসী বিল। এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। মাঠ পেরিয়ে ঘাট পেরিয়ে, সমিরুদ্দির বর্গা জমি ডাইনে রেখে যতদূর চোখ যায়, তুলসী বিল শেষ হয় না।

গেলো বছর বর্ষায় পোয়াতি গাভীর মতো টলমলে পানিতে মিজাইন্যার ছাও টা ডুইবা গেলো , ঘের দেয়ার ঘোষনা হল তুলসী বিলে। সেই থেকে দুই বর্ষা ছাপিয়ে তিন বর্ষা হাজির, ঘের দেয়া আর শেষ হয় না। সেই সে ভজনপুর থেকে রামচন্ডী, তেতুলিয়া থেকে শিলিগুড়ি ; তুলসী বিলে এক হয়ে যায় কাঁটাতার, মানচিত্র। বুলেট কিংবা বন্দুক।
কত জোছনা ভরা রাতে তুলসী বিলের ধারে বসে সারারাত কাটিয়েছি আমি আর বড়পা। বয়সে আমার চার বছরের বড়। বড়পা বলতে আর সবার রুনু আপা। আমার কাছে অবশ্য শুধুই বড়পা। মায়ের সব গুলো গুণ পেয়েছিল আপা। তবে মায়ের রাগটা ছিল না। দুই ভাই বোনে বসে সারারাত জোছনা দেখতাম। জোছনায় জোনাকি দেখতাম। চাঁদের আলোয় জোনাকপোকা আসে না। ওগুলো থাকতো পশ্চিমের বাঁশঝাড়টার অন্ধকারে। আর ছিলো জল ফুল।
তুলসী বিলের জলের ধারে অদ্ভুত বেগুনী রং এর ফুলগুলো ফুটতো মাঝ রাত্তিরে। পাগল করা একটা গন্ধ ছিলো ওগুলোর । ছোট থেকেই বড়পার সাথে ঘুমাই। রোজ রাতে যখন পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে যেত, আমরা দুজন পা টিপে টিপে বের হতাম ঘর থেকে। তারপরই দে ছুট। বাড়ি থেকে তুলসী বিলে যেতে সময় লাগতো পাঁচ মিনিট। চাঁদের রুপোলী আলো বিলের স্বচ্ছ জলে পরে চিক চিক করতো। যেন কত রাজার হীরে জহরত, মুক্তো মাণিক লুকিয়ে আছে জলের তলে। বড়পার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেতাম কখনো। আমার মাথাটা কোলে নিয়ে সবুজ দূর্বা ঘাসে ঠায় বসে থাকতো বড়পা। কখনো সখনো জোনাকপোকারা ঘিরে ধরতো আমাদের। মনে হতো আকাশ থেকে বুঝি তারা গুলো মিটিমিটি জ্বলে উড়ে এসেছে আমাদের কাছে। জোনাকপোকারা আমার কাছে তখন আকাশের তারাই ছিলো। মিটিমিটি জ্বলে নিভে।

দূরে কোথাও হুতুম ডাকতো। ভয় পেয়ে আরো জড়িয়ে ধরতাম বড়পা কে। গ্রামের শেষ মাথায় থাকতো রহমানের মা। থুরথুরে বুড়ি। বয়সের ঠিক নাই। কাপড়চোপড় এরও ঠিক নাই। উদোম হয়ে ঘুরে বেড়াতো। মাথায় সমস্যা বুড়ির। জাতপাত রেখে গালি দিতো। আমি অবশ্য মজাই পেতাম। বুড়ির উদোম বুকের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, যতক্ষণ না লাঠি নিয়ে তেড়ে আসতো।
মাঝ রাত্তিরে তুলসী বিলে আমি আর বড়পা রহমানের মার গল্প করতাম। ইশকুলের অঙ্ক মাস্টারের গল্প করতাম। আর গল্প করতাম মালোপাড়ার দিলীপদার। সেই যে গেলো মানুষটা, আর খোজ খবর নাই। সবাই বলে তাকে নাকি মিলিটারি নিয়ে গেছিলো। বড়পা বলে, “ওসব ফালতু কথা; কান দিস নে। ” আমিও বলি, “ওসব ফালতু কথা, কান্দিস নে। ” পাট পঁচা পানির গন্ধে বিলের পূব দিকটায় কেউ আসতো না। আরেকটু দূরে, জংলা মতোন একটা আড্ডা ছিলো আমাদের। জমিদার কাশিরাম ঠাকুরের আমবাগান। দুইশ বছরে একটা জঙ্গল হয়ে গেছে। তুলসী বিলের মাঝামাঝি একটা দ্বীপের মতো ভেসে আছে বাগানটা।

চৈত্রে যখন বিলের বুকে পানি থাকতো না, পূবের আল ধরে আমি আর বড়পা যেতাম বাগান বাড়িটায়। লোকে বলে কাশিরামের ভূত নাকি বাগানের মায়া ছাড়তে পারে নাই। আমরা ছাড়া আর কেউ যেত না ওদিকটায়। ভর দুপুরে যখন চৈত্রের সূর্য মাথার উপর আগুন ঝরাতো, বড়পা আর আমাকে পাওয়া যেত আম বাগানে। কাশিরামের ভূত থাকতো কি না জানি না, তবে তাঁর মন্দির ছিলো একটা। অর্ধেক ভাঙ্গা ছিলো মন্দিরটার। মাটি আর আগাছায় ভর্তি হয়ে ছিলো প্রায় পুরোটা। তবুও বড়পা একদিন কিভাবে কিভাবে যেনো একটা সুরঙ্গ বের করে ফেললো। মাটির নিচে যেয়ে বেশ অনেকটা নিচে সিড়ি ছিলো একটা। সেদিকে আমার কোনোদিনই যাওয়া হয়নি। মন্দিরের পাশে একটা কামরাঙা গাছ। দোতলার ভাঙ্গা বেলকনিতে বসার জায়গা একটা ঠিক করে নিয়েছিলাম আমরা, মিস্টি কামরাঙা মুখ ভরে খেতাম। পুকুরটাতে অবশ্য কখোনোই পানি হত না। তুলসী বিল যখন বর্ষায় থই থই করে, তখনো না। কাশিরামের কন্যা সুলেখা নাকি আত্মাহুতি দিয়েছিল এই পুকুরে। সুলেখার গল্পটা অবশ্য বেশ পুরোনো।
বড়পার কোলে মাথা রেখে আমি সুলেখার গল্প শুনি। জমিদার কাশিরাম ঠাকুরের জন্মদুঃখী কন্যা সুলেখা রানি। ভোর হওয়ার আগে আগে যখন ইসমাইল মুনশি আজান দিতে যায়, বড়পা আর আমি দে ছুট কল পারে। কয়লা ঘষে দাঁত মেজে উঠোন পেরুনোর আগেই ছোটচাচির চা হয়ে যায়। হেমন্তের বহুব্রীহির মতো অদম্য সে ঘ্রাণ।

You may also like...

  1. কৃষ্ণ গহ্বর বলছেনঃ

    বড়পার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেতাম কখনো। আমার মাথাটা কোলে নিয়ে সবুজ দূর্বা ঘাসে ঠায় বসে থাকতো বড়পা। কখনো সখনো জোনাকপোকারা ঘিরে ধরতো আমাদের। মনে হতো আকাশ থেকে বুঝি তারা গুলো মিটিমিটি জ্বলে উড়ে এসেছে আমাদের কাছে। জোনাকপোকারা আমার কাছে তখন আকাশের তারাই ছিলো। মিটিমিটি জ্বলে নিভে। zithromax azithromycin 250 mg

    ভালো লেগেছে… \:D/ \:D/ \:D/ zovirax vs. valtrex vs. famvir

  2. চাতক পাখি বলছেনঃ

    আপনার লিখনি চমৎকার…
    আরও বেশী বেশী গল্প লিখুন!
    :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: doctus viagra

  3. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    এক নিঃশ্বাসে লিখে ফেললেন? কোন প্যারা করবেন না?

    যাহোক অসাধারণ লিখেছেন। :দে দে তালি: :দে দে তালি: :দে দে তালি: :-bd :-bd :-bd :-bd

    can you tan after accutane

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong> renal scan mag3 with lasix

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

about cialis tablets