একজন রবীন্দ্রনাথ এবং বাঙালির আবহমান সাংস্কৃতিক ভাবনা

148

বার পঠিত

পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলা প্রদেশের অধিকাংশ মানুষই মুসলিম জাতীয়তাবাদের স্বার্থে রবীন্দ্রনাথ বিরোধী ছিলো। তাদের প্রিয় কবি হয়ে উঠেছিলো নজরুল ইসলাম। নজরুল সঙ্গীত সমূহকে দাবী করা হচ্ছিলো পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ বিকাশের ভাস্কর্য রূপে। বস্তুত সঙ্গীতের ক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন সনাতনী। তিনি ভারতীয় গানের সনাতন রীতিকেই অগ্রসর করে নিয়ে গেছেন। তাঁর গানে ছিলো আসরের আমেজ, বেলোয়ারি কাচের আওয়াজে তাঁর গান মুখরিত ছিলো। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঠিক উল্টো। তিনি বাঙালিকে আসর থেকে টেনে বের করে নিয়ে এসেছিলেন এবং সঙ্গীতকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্যক্তির কানে। ফলে, নজরুলের মাঝে আমরা একদিকে দেখতে পাই সাম্রাজ্যবিরোধীতা, অন্যদিকে একটি সামন্তবাদী সঙ্গীতচর্চার মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেয়া। এই স্ববিরোধীতা কেন নজরুল করেছিলেন সেটা সহজেই বোধগম্য। লেখক হিসেবে নজরুলের দারিদ্র বস্তুত নজরুলকে বাধ্য করেছে। নজরুল কখনোই স্থিতধী ছিলেন না। খুব সুক্ষ্ম অনুভূতিও তাঁকে কম্পিত করতো। এবং ধূমকেতুর মত তিনি সেই অনুভূতির আর্বিভাব ঘটাতেন অসাধারণ সাহিত্য শৈলীতে। কিন্তু কখনোই সেই অনুভূতি পূর্ণতা পেতনা। তাঁর সমস্ত অনুভূতি ছিলো তাৎক্ষণিক এবং সেটার বৃহত্তর প্লাটফর্ম তৈরী করার মত ধৈর্য্য তাঁর ছিলোনা। তাঁর কবিতায় মানুষ ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে, কিন্তু এই ক্রোধকে শক্তিতে পরিণত করতে পারেনা। viagra vs viagra plus

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিপরীত। প্রথমদিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্রাহ্ম সমাজের বাইরে প্রচারিত হতোনা। চলচ্চিত্রে প্রথম রবীন্দ্র সঙ্গীত করেন পঙ্কজ মল্লিক। চলচ্চিত্রের নাম ‘দিনের শেষে’। এরপরে স্বল্প বিস্তারে গুটিকয়েক রবীন্দ্রগীতি প্রচারিত হতো। কিন্তু সর্বপ্রথম তিনজন ব্যক্তি রবীন্দ্রসঙ্গীতকে মানুষের দুয়ারে এনে দাঁড় করান। তাঁরা হচ্ছেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। হেমন্তের গাওয়া “প্রাঙনে মোর শিরীষ শাখায়” ও “পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে” রেকর্ড দুটি সর্বজনবিদিত হয়। কিন্তু এই তিনজনই রবীন্দ্রসঙ্গীতের মৌলিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে পারেননি। কেবলই রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাণিজ্যিক করার পথপ্রদর্শন করেছেন। এবং এটি প্রশংসিত। কারণ, সাধারণের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের ট্রেন্ড তাঁরাই চালু করেছেন।

কিন্তু বলছিলাম পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রবিরোধী চেতনার কথা। হিন্দুস্থানী রবীন্দ্রনাথ তখন বাঙলা সাহিত্যের ঈশ্বর। কিন্তু পাকিস্তান ও মুসলিম সাম্রাজ্যের দোহাই দিয়ে তাঁকে ছাড়াই শুরু হলো বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য চারণ। এবং তার ফলাফল হলো ভয়াবহ। বাংলা কবিতায় নজরুল ইসলাম, সঙ্গীতে আলাউদ্দীন খাঁ ও আব্বাসউদ্দীন, নৃত্যকলায় বুলবুল চৌধুরী, চিত্রকলায় জয়নুল আবেদীনের আবির্ভাব ঘটে পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই। এমনকি বাঙলার রাজনীতিতে ফজলুল হকের প্রভাব বিস্তার ১৯১৬-১৯১৭ সালে। অতএব, তৎকালে যে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হলো। “হিন্দু আধিপত্যের কারণে মুসলমান সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধা পাচ্ছে” এই কথাটা সত্য নয়। পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই বাঙলা ভাষায় প্রতিষ্ঠিত মুসলমান ব্যক্তিবর্গ পাওয়া যাবে। তবে, একটি ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের দারিদ্র খুব চরমে পৌঁছেছিলো তা হচ্ছে বাঙলা কথাসাহিত্য। আজ অব্দি শরৎচন্দ্রকে কোনো মুসলমান কথাসাহিত্যিক অতিক্রম করে যেতে পারেননি। শরৎ এখনো বাঙলা কথাসাহিত্যের ধ্রুব সম্রাট। metformin tablet

১৯৪৭ এর পরে পাকিস্তান যে ধর্মীয় জোশ থেকে রবীন্দ্রকে হটিয়ে নজরুলকে চেতনার আসনে বসিয়ে দিলো সেটার পরিণতি আজও আমরা টের পাচ্ছি। বিশেষ করে এখনও বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু কবি কিংবা বিভিন্ন মাহফিলে তাকে নিয়ে যেসব কুৎসা রটনা হয় তার সূচনা কিন্তু সেই পাকিস্তানকাল থেকেই। তবে, পাকিস্তানকালে কয়জন রবীন্দ্র অনুরাগী খুব মিনমিন করে রবীন্দ্রনাথকে ডিফেন্ড করেছিলেন। সন্দেহ নেই, তাদের উদ্দেশ্য সৎ ছিলো। কিন্তু তাদের রবীন্দ্রপক্ষের এইসব আলোচনা মূলত বঙ্গ প্রদেশে রবীন্দ্রনাথকে আরো হুমকির মুখে ফেলে দিলো। রবীন্দ্রনাথের পিতা ছিলেন ইরানী কবি হাফিজের ভক্ত, রবীন্দ্রনাথ একেশ্বরবাদী ছিলেন, তিনি ছিলেন সুফিকবি, মুসলিম বিদ্বেষহীন কবি, তিনি টুপি ইজার আলখাল্লা পরতেন, দাঁড়ি রাখতেন, মোঘলাই পরিবেশে থাকতেন রবীন্দ্র। এসব গোঁজামিল যুক্তি দিয়ে রবীন্দ্রপ্রেম করতে গিয়ে তারা রবীন্দ্রকে বানিয়ে দিলেন আধা মুসলমান। অথচ, রবীন্দ্রবিরোধীরাই তাকে এরচেয়ে বেশি সম্মান দিয়েছে তাকে হিন্দুকবি বলে! কারণ, ওরা প্রচন্ড সূর্যের তাপ স্বীকার করে নিয়েছে এবং অন্ধকারকে বেছে নিয়েছে বসবাসের জন্যে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাঙালি মুসলমানদের একাংশ এবার স্বাধীন দেশে শুরু করলেন আবারও রবীন্দ্রকীর্তন। এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের আরো বেশি বিরাগভাজন হয়ে গেলেন রবীন্দ্র। যারা এতদিন রবীন্দ্র সাহিত্যের বিরোধীতা করে এসেছে তাদের মুখেও রবীন্দ্রস্তুতি। বলা হলো, রবীন্দ্রনাথ আমাদের স্বাধীনতা স্পৃহা ও সংগ্রাম প্রেরণার উৎস। কিন্তু আসলে এই তথ্যগুলো মোটেই সত্য নয়। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের অন্যতম ভিত্তি ছিলো সমাজতন্ত্র। রবীন্দ্র সমাজতন্ত্রের ঘোরবিরোধী ছিলেন। তিনি পারিবারিকভাবেই ছিলেন সামন্ত- বুর্জোয়া। তিনি সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার এই চরিত্রকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন কিন্তু পারিবারিক চরিত্র ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ চাইতেন সুশাসন ও সুপোষণ। স্বশাসন ও স্বাধিকার নিয়ে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। তিনি বিপ্লব পছন্দ করতেন না। তাঁর ধারণা ছিলো ঐ পথ সংকীর্ণ ও দিশা হারানোর ঝুঁকি সঙ্কুল। শেষ বয়সেও তিনি ব্রিটিশ যুবরাজের দিল্লীবাস কামনা করেছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই রবীন্দ্রপ্রভাব বর্জিত ছিলাম। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির আত্মার খোরাক, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব, মনীষায় মহত্তম মানবীয় সাহিত্যিক তিনি। বাঙালির জীবনাচারণ ও জীবনধারণের সাথে তাঁর রচনা মিশে আছে ভালোভাবেই। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে, কেবল আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রভাবিত করেননি।

এই পর্যায়ে অনেকের মনে হতে পারে আমি নজরুলের কথা বলতে চাইছি। মূলত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন চরিত্র নজরুল ইসলাম তাৎক্ষণিক ভাবাবেগ সম্পন্ন ক্ষমতাবান কবি ছিলেন। কিন্তু তাঁর কবিতা আমাদের মর্মে আঘাত করেছে, কর্মকে প্রলম্বিত করেনি। এমনকি, নজরুল ছিলেন ভারত ভাগের ঘোরতর বিরোধী। হিন্দু মুসলিম অনুসারে উপমহাদেশ ভাগ হয়ে ভারত পাকিস্তান হবে এই দাবী নজরুল কখনো মেনে নেননি। পাকিস্তানকে তিনি “ফাকিস্তান” বলেছিলেন। জিন্নাহকে সরাসরি “কাফের” বলে সম্বোধন করেছিলেন নজরুল ইসলাম। এজন্য তাঁকে পাকিস্তানি মৌলবাদের বিরাগভাজন হতে হয়েছে। চিকিৎসার টাকাও পাননি তিনি পাকিস্তানের কোনো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। তবে, তিনি কী করে সেই পাকিস্তানের আবার ভাঙনের ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস হতে পারেন? নজরুল বিভাজনে বিশ্বাসী ছিলেন না কখনো। তিনি পাকিস্তান সৃষ্টিরই বিরোধীতা করেছিলেন। তবে,যেহেতু বাংলাদেশে স্বাধিকার আন্দোলনের আগে এবং সেই সময়েও তিনি শক্তি হারিয়েছিলেন,এই বিষয়ে আমরা স্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে পারিনা। আর এই সিদ্ধান্তহীনতাই বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন নিয়ে নজরুলের চিন্তার ব্যাপারটা আমাদের কাছে অজানা এবং রহস্যাবৃত থেকে যায়।

এক্ষেত্রে আমি মনে করি, সর্বাগ্রে সুকান্তের নাম আসাটা যুক্তিসঙ্গত। হ্যাঁ। আমাদের বিদ্রোহ, আমাদের স্বাধিকারের চেতনা সমস্ত কিছুতেই যে ব্যক্তিটি জড়িয়ে আছেন তিনি রবীন্দ্র বা নজরুল নন, তিনি সুকান্ত। কিন্তু এই সত্যটা আমি কারো মুখে উচ্চারিত হতে দেখিনা। রবীন্দ্র নজরুলের এই কৃত্তিম বিরোধে কবি সুকান্ত যেন একেবারেই অপাঙক্তেয়। ১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট গোপালগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা এই কবির জন্মদিন সঙ্গত কারণে কখনো পালিত হয়না, হওয়ার কথাও নয়। কারণ, এই ১৫ই আগস্টেই যে আমরা হারিয়েছি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সর্বকালের সেরা বাঙালি, গোপালগঞ্জেরই সন্তান বঙ্গবন্ধুকে। কি নিষ্ঠুর নিয়তি! যেদিন আমরা পেলাম আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নচারীকে, সেই দিনই আমরা হারালাম আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ককে!

রবীন্দ্রনাথ বাঙালি মুসলমান সমাজের সংস্কৃতির জন্যে হুমকি, এই প্রোপাগান্ডাটা আজ অব্দি টিকে আছে। কয়দিন টিকে থাকবে জানিনা। তবে, এর পেছনে যদি কেউ মনে করেন মুসলমান সমাজ রক্ষার মন্ত্র দীক্ষিত আছে তবে ভুল করবেন। মুসলমান সংস্কৃতির প্রতি টান নয়, বরং হিন্দু বিদ্বেষই চালিত করছে এই অযৌক্তিক প্রোপাগান্ডা। আর অবশ্য সেটা সবাই স্বীকার করেন। কেবল চালাক প্রজাতির সুশীল বুদ্ধিজীবিরা আজও ইনিয়ে বিনিয়ে বলেন, বর্তমান বাংলাদেশের মুসলিম সংস্কৃতি বিকাশে রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে চলা আমাদের নৈতিকভাবেই সমর্থন করা উচিত। কিন্তু চীন রাশিয়ার সাহিত্য আমরা পাঠ করছি, আমেরিকার গোয়েন্দা সাহিত্যে আজ বাজার ভর্তি। ইউরোপ তো আভিজাত্য আর কামনার স্বর্গ বলে বিবেচ্য। এমনকি মধ্যযুগের প্রাচ্য কবি ইমরুল কায়েস, হাতেমতায়ী, ইবনে সিনা, ওমর খৈয়াম, দারা নওশেরোয়াঁ থেকে রুস্তম অবধি সব কাফেরই আজ মুসলিম সমাজে সম্মানিত! অথচ কেবল রবীন্দ্রনাথকেই বাঙালি মুসলমানের এত্ত ভয়! সর্ষে ভূত তো স্পষ্টই প্রকাশ্য হয়ে গেছে।

রবীন্দ্রনাথ মানবতার মূর্ত প্রতিনিধি। আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বিকাশেই আমরা রবীন্দ্র পড়তে বাধ্য। তাঁকে অপমান করার অধিকার অবশ্যই কোনো বাঙালির নেই। তাই, রবীন্দ্র নজরুলের মাঝে এই অযৌক্তিক প্রতিযোগীতা অতি শীঘ্রই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। যে প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্র নজরুলের মাঝে বাঙালি মুসলমান একটি বিভেদ তৈরী করেছিলো পাকিস্তান আমলে সেই বিভেদের বিষবৃক্ষ আজও আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিকে তিলে তিলে মারছে। আমাদের জাতীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এর দায় আর কারো নয়, বাঙালি মুসলমান সমাজকেই নিতে হবে। এবং এই বিরোধ নিরসনে ওদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। এগিয়ে আসতে বাধ্য।

ovulate twice on clomid

You may also like...

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong> all possible side effects of prednisone

amiloride hydrochlorothiazide effets secondaires

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment. capital coast resort and spa hotel cipro

will metformin help me lose weight fast