আঁধার

152

বার পঠিত

ছোটবেলায় না আমি একদমই ড্রয়িং করতে পারতাম না, এখনো মনে পড়ে, সাদা ক্যানভাসে রঙ তুলি দিয়ে কিছু একটা ফুটিয়ে তোলার সে কি আপ্রাণ চেষ্টা আমার ! না পেরে চোখের পানি নাকের পানি মিশিয়ে একাকার ! তারপর কালো কালি দিয়ে সেই ক্যানভাস পুরোটা ভরিয়ে তোলা… আজকের রাতটা অনেকটা সেরকমই কালো, সেরকমই অন্ধকার। আকাশটাও যেন আমার সাথে শত্রুতা করে একটাও তারার বাতি জ্বালায়নি আজকে, এমনকি চাঁদটাকেও আসার অনুমতি দেয়নি।
থ্রি ইডিয়টস শুধু দেখেছিলাম, কোন শিক্ষা নিতে পারি নি, যার কারণেই তো কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিলাম রেসে, নেমে গিয়েছিলাম যুদ্ধে। আগে থেকেই মুখচোরা স্বভাবের ছিলাম। ভার্সিটিতে গিয়ে নতুন টাইটেল পেয়ে গেলাম, আঁতেল। আঁতেল ছাত্ররা বিয়ে করার জন্যে আদর্শ হতে পারে, বন্ধু হিসেবে যাচ্ছেতাই। তাইতো ভার্সিটি লাইফে কোন বন্ধু বানাতে পারিনি। কোন সুখস্মৃতি নেই সেদিনগুলোর। অজানা অচেনা কোন শত্রুকে একদিন দেখিয়ে দেব আমার দৌড়, এই ভাবনা মাথায় রেখে শুধু বইয়ের পাতা উল্টিয়েছি। চার বছরেই পড়াশুনা শেষ করে স্কলারশিপ নিয়ে চলে আসলাম বাইরে।ভালো একটা চাকরিও করছি। নাম না জানা শত্রুকে দেখিয়ে দিয়েছি আমি আসলে কি ! তবে মূল্যটা বোধহয় একটু বেশি দিয়ে ফেলেছি।
সে কারণেই হয়ত জীবনের ২৬টা বছর কেটে যাওয়ার পর আমার পাশে কেউ আর নেই। মা বাবা চলে যাওয়ার পরে জীবনটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল আমার। একেবারেই অন্যরকম। কোন পিছুটান নেই, নেই কারো ছলছল চোখের আবদার, অথবা কারো ফিরে আসার আহবান। মা বারবার ডাকতেন, বাবা দেশে চলে আয়, দেশে চলে আয়। শুধু বন্ধু হিসেবে নয়, পুত্র হিসেবেও যাচ্ছেতাই ছিলাম আমি। তাই মা চলে যাওয়ার সময় তার পাশে আমি ছিলাম না। ছিল অচেনা পরিবেশের অচেনা হসপিটালের কিছু ডক্টর। যেই মুখটায় একসময় প্রবল যত্নে চুমু এঁকে দিতেন আম্মা, মৃত্যুর সময় সে মুখটা আরেকবার দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। আম্মা চলে যাওয়ার পরে দেশে ফিরে যাওয়ার আর কোন আগ্রহ পাইনি আমি। পাবোই বা কেন ? কোন পিছুটান নেই, নেই কারো আকুতি, কেনই বা যাব আমি ? দেশের টানে ? অসুস্থ আম্মাকে দেখতে যেতে দেরী করে ফেলেছিলাম আমি, সেই আমি যাব দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে ? অতটাও দেশপ্রেমিক না আমি ! অনেক বেশি স্বার্থপর, হয়ত একটু বেশিই !
আমি কিন্তু এমন ছিলাম না, জন্মগতভাবেই রোবট ছিলাম না আমি। একটা সময় অনেক বেশিই ইমোশনাল ছিলাম আমি। কতবার যে বাবার পকেট থেকে না বলে টাকা নিয়ে ক্ষুধার্ত ভিখারির হাতে তুলে দিয়েছি, নিজের জমানো টাকাও দিয়ে দিতাম । আম্মা অনেক গর্ব করতেন এটা নিয়ে, বলতেন আমার বাসা থেকে কেউ খালি হাতে ফেরে না। হায়, আম্মা কি এখনো ছেলেকে নিয়ে অনেক গর্ব করেন ? কলেজে ফার্স্ট হওয়া সেই ছেলে, বোর্ডে স্ট্যান্ড করা সেই ছেলে যে তার বৃদ্ধা মা’র শেষ সময়টায় তার পাশে থাকেনি ?
তো যা বলছিলাম, এমন হার্টলেস আমি আগে থেকে ছিলাম না। আমি হাসতাম, হাসাতাম, আমি কাঁদতাম। জীবনটাকে দেখতাম অনেক বেশি আগ্রহ নিয়ে। কোন এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল হিসেবে এমন হইনি আমি। হয়ত অনেকের কাছেই খুব ক্ষুদ্র কারণ মনে হবে, তবে ক্ষুদ্র হলেও একটা কারণ আছে।
আর দশটা ছেলের মতই আমার জীবনেও প্রেম এসেছিল। তখন সবে মাত্র এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। হুট করেই একজন এলো, এবং আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তার হাসির মাঝে। হঠাত করেই জীবনটার প্রতি অন্যরকম একটা ভালোলাগা চলে এসেছিলো আমার।
দুই বছর সে সম্পর্ক টিকেছিল আমার। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি, কত স্বপ্ন দেখেছিলাম আমরা ! রিলেশনশিপ সম্পর্কে বেশি জ্ঞান না থাকার কারণেই সবকিছুকে বেশি সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলেছিলাম আমি। আমি তো আর জানতাম না যে স্বপ্ন দেখতে নেই, আশা করতে নেই। সৈকতের বালির ঘরের চেয়েও সহজে সম্পর্ক ভাঙতে পারে এটা আমার জানা ছিলোনা। তাইতো বিচ্ছেদের কষ্টটা আমি নিতে পারিনি। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি, নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে গেছি। কলেজের বন্ধুদেরকে দেখতাম, কারণে অকারণে সম্পর্ক শেষ করে ফেলছে, “ভালোলাগেনা” এই কারণ দেখিয়ে একজনের হাত ছেড়ে আরেকটা হাতকে আবার আঁকড়ে ধরছে, আমি কখনো করতে পারিনি সেটা। এই নিরীহ ছেলেটা যে বুকে এত্ত ভালোবাসা নিয়ে বসে ছিল, এতো ছোট মানুষটাও যে এতটা অভিমান করতে পারে, আমি নিজেও জানতাম না সেটা।
আমি ওকে সহজে ভুলতে পারিনি । শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত দুর্বল ফুসফুসকে আরো বেশি করে দূষিত করেছি সিগারেটের ধোঁয়ায়। আমার না, অনেক কষ্ট লাগত, বিশেষ করে রাতে… যখনি মনে করতাম ও আর আমার নেই, এই সময়টায় অন্য কারো সাথে হয়ত নতুন স্বপ্ন দেখায় বিভোর সে, তখনি শ্বাসকষ্ট শুরু হত। ইনহেলার না টেনে বেনসনের ধোয়ার সাথে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করতাম দুঃখগুলোকে। দুঃখ তো যেতই না, উল্টো কাশতে কাশতে বমি করে ফেলতাম আমি। তারপরেও গলা থেকে অভিমানের গুটলি পাকানো দলাটা সরে যেত না।
তারপর আস্তে আস্তে শক্ত হওয়া শুরু করলাম আমি। শক্ত হতে গিয়ে কখন যে নিজের সত্ত্বাটাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিলাম, আমি নিজেও জানিনা সেটা। একটা সময় তো পুরোই রোবট হয়ে গেলাম, সাতচড়েও রা করতাম না। যে মানুষটা একসময় হাতটা ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল, সে আবার এগিয়ে এসেছিল, ভালোবাসা নিয়েই হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। অভিমানে সেই হাতটাকে সরিয়ে দিয়েছিলাম প্রবল অনিচ্ছায়। অভিমান বলব না, কষ্ট পেতে পেতে তখন আর মানুষ ছিলাম না আমি। রক্ত মাংসের একটা যন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছি এখন। যার কাছে অনুভূতির কোন দাম নেই, কোন কিছুরই কোন দাম নেই। আমি চেষ্টা করেছি ঠিক হতে, কিন্তু পারিনি। আমার ভেতরটাই আসলে মরে গিয়েছিল। আমার আমি’র পুরনো জায়গাটাকে রিপ্লেস করেছে নতুন কেউ, যার কাছে জীবনের মানে ছিল একটাই, ধোঁয়া ওড়ানো আর বারে গিয়ে অর্থের অপচয় করে টলতে টলতে এপার্টমেন্টে ফেরা। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে কেউ যদি আবার আসত আমার জীবনে, আবার যদি হাসতে পারতাম আমি, আবার যদি ভালবাসতে পারতাম ! তবে সাহসটাই আর করে উঠতে পারলাম না। ভয় পাই আমি, খুব ভয় পাই। আবার যদি আগের মত কিছু একটা হয় ? আবার যদি মন ভাঙ্গার কষ্টের মাঝ দিয়ে আমাকে যেতে হয় ?
জীবনের আর কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছিনা আমি। একটা মানুষও নেই যে হয়ত আমাকে একটু হলেও সান্ত্বনা দেবে, আমাকে একটু হলেও বুঝতে চেষ্টা করবে। যেখানে জন্মেছি সেখানেই কেউ নেই, আর এই দূর প্রবাসে পাব এমন মানুষ ? সাথে মন ভাঙ্গার ভয় তো আছেই। একাই রয়ে গেছি আমি। একদম একা ! দিনের পর দিন একই রুটিন মেনে চলতে চলতে আমি আজ ভীষণ ক্লান্ত। তাইতো এতদিন পরে এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি মরে যাব, লাইসেন্সড পিস্তলটার একটা বুলেট ঢুকিয়ে দেব হৃৎপিণ্ড বরাবর। সব ঝামেলা , সব ক্লান্তির অবসান হয়ে যাবে একবারেই ! একেই নেই কোন আত্মীয়, তার মাঝে যেরকম স্বার্থপর মানুষ আমি, আমার জন্যে কেউ চোখের একটা ফোটা পানিও অপচয় করবে বলে মনে হয়না ! লাশটাও হয়ত আর দেশে যাবে না, এখানেই কোন কবরস্থানে হয়ত মৃত্যুর পরে ঠাই হবে আমার। বেঁচে থাকতেই দেশের মাটির জন্যে কোন ভালোবাসা ছিলোনা, মরার পরে আর কি আসবে যাবে ?
হুইস্কির গ্লাসটাতে শেষবারের মত একটা চুমুক দিয়ে পিস্তলটা হাতে তুলে নিলাম আমি। ট্রিগার টানার আগে আরেকবার মেঘে ঢাকা আকাশটার দিকে তাকালাম। আচ্ছা কোথায় বেশি আঁধার ? এই রাতটায়, নাকি আমার ভেতরটায় ?

You may also like...

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

synthroid drug interactions calcium

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

viagra in india medical stores

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

private dermatologist london accutane