যুদ্ধ সাংবাদিকতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

1044

বার পঠিত

যুদ্ধ সাংবাদিকতা প্রায়শই স্থান খুঁজে নেয় হলুদ সাংবাদিকতার আশ্রয়ে। সত্য মিথ্যার মিশ্রনে এমন সব প্রতিবেদন তৈরী করা হয় যুদ্ধের উপর যা সংবাদপত্রের নীতিকে সমর্থন করলেও, উহ্য থেকে যায় সাংবাদিকতার নীতিমালা কিংবা একজন মানুষ হিসেবে সাংবাদিকের নীতি। এ বিষয়ে একটি ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। হলদে সাংবাদিকতার জনক হিসেবে পরিচিত, মার্কিন সাংবাদিক জগতের প্রবাদ পুরুষ উইলিয়াম র‍্যান্ডল্‌ফ হার্স্ট। তার ফটোগ্রাফার রেমিংটনের সাথে একটি টেলিগ্রাম বিনিময় হয়েছিলো ১৮৯৬ সালে। ১৮৯৬ সালে হার্স্ট তার সহকারী রেমিংটনকে হাভানা পাঠিয়েছিলেন, আমেরিকা-স্প্যানিশ যুদ্ধের রিপোর্ট বিশেষ করে “স্প্যানিশ বর্বরতা”র ছবি পাঠাতে। রেমিংটন সেখানে গিয়ে তো অবাক। তিনি টেলিগ্রামে হার্স্টকে জানিয়ে দিলেন, “এখানে পরিস্থিতি একেবারে শান্ত। যুদ্ধ হবার লক্ষণটাও নেই। আমি ফিরে আসছি।” জবাবে হলুদ সাংবাদিকতার জনক মিস্টার হার্স্ট বললেন, “তুমি সেখানে থাকো। তুমি তোমার ছবি তৈরী কর। আমি যুদ্ধ তৈরী করবো।” তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ দৈনিক “দ্য টাইমস” এ প্রকাশিত উইলিয়াম হাওয়ার্ড রাসেলের “ক্রিমিয়ার ডায়েরী” যুদ্ধ সাংবাদিকতার এক অপূর্ব নিদর্শন।

আমরা সেক্ষেত্রে নিজেদেরকে যথেষ্ট ভাগ্যবান দাবী করতে পারি। পরাশক্তি আমেরিকা চীন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধীতা করলেও আমরা হলুদ সাংবাদিকতার উল্লেখযোগ্য শিকার হইনি যা হতে পারতো বিশ্বজনমত তৈরীর একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধক। বরং, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অধিকাংশ সাংবাদিকই বাঙালির মুক্তি আন্দোলনকে মহামান্বিত করে দেখেছেন। বৃটিশ দৈনিক দ্য অবজারভারের সম্পাদক পরবর্তীকালে তার রচিত স্মৃতিকথায় দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন বাংলাদেশের গণহত্যায় মৃতদের ছবি প্রথম পত্রিকায় ছেপেছিলেন বলে। তাঁর মত অনেকেরই এটা খুব কষ্টের জায়গা ছিলো যে, ভোরবেলা পাঠক ঘুম হতে জেগেই কাগজ হাতে নিয়ে প্রথমেই দেখবে বিভৎস মৃতদেহের ছবি- এটা সঙ্গত নয়। ডেইলী মিররের সংবাদদাতা জন পিলগারেরও দেখা যায় একই রকম প্রতিক্রিয়া। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার “দ্য হিরোজ” গ্রন্থে তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রিপোর্ট করার সময় অধিকাংশ বিদেশী সাংবাদিকই তথ্যের চেয়ে সাবজেক্টিভিটির আশ্রয় নিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলায় সংগঠিত বর্বরতা বিষয়ে পিটার হ্যাজেলহাস্টের প্রথম দিককার রিপোর্টের প্রতিক্রিয়া ছিলো ব্যাপক। তাঁর রিপোর্ট গুলোতে বর্বরতার প্রামান্য তথ্যের পাশাপাশি ছিলো মর্মভেদী, আবেগপ্রবণ সাবজেক্টিভ স্টাইল যা সে সময়কার কয়েকজন সাংবাদিকের পছন্দ হয়নি। কারণটা স্বাভাবিক। একজন সাংবাদিকের কাজ পত্রিকায় রিপোর্ট দেয়া, আবেগী ক্রন্দন নয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই আমরা ভাগ্যবান যে, আমাদের দেশের কাদামাটি জলে রক্তের গন্ধ তাদের ভালো লাগেনি, তারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রথাগত সাংবাদিকতার শ্রাদ্ধ করে, আবেগ দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে বাঙালির বীরত্ব এবং বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে সারা বিশ্বে একটা পজিটিভ ভিউ দিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন যা আঘাত করেছিলো সবার মর্মে।

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনৈতিক আর্চার ব্লাডের ভাষায় “দড়ির ফাঁস ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।” একদিকে পাকিস্তানী যুদ্ধবিমানের উপর ভারতের এমবার্গো অন্যদিকে মিত্র বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণের মুখে আমেরিকাতে বসে দিশেহারা হয়ে পড়লো নিক্সন-কিসিঞ্জার। সকাল ১১ টা ১৩ মিনিট থেকে ১২ টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হল ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের বৈঠক। পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করার সমস্ত আইনী প্রক্রিয়াও খুঁজে দেখা হল। কিন্তু সকল পথ বন্ধ। সিদ্ধান্ত নেয়া হল, সিআইএ পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন করবে। প্রতিরক্ষা দপ্তর কাশ্মীরে পাকিস্তানের সামরিক সামর্থ্য যাচাই করবে। পররাষ্ট্র দপ্তর পাকিস্তানের সামরিক শক্তির বিকল্প গুলো খতিয়ে দেখবে।

জর্ডানের বাদশা হোসেনের কাছে ইয়াহিয়া অস্ত্র সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলো। বাদশা হোসেন অনুমতি চাইলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠোর নজরদারি উপেক্ষা করে আইন ভঙ্গ করাও সম্ভব ছিলোনা। কারণ, সোভিয়েতের কারণে পাকিস্তানের ইস্যুতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কোনো রক্ষাকবচ নেই আমেরিকার কাছে এবং আমেরিকা স্বয়ং নিজে পাকিস্তানকে এই কারণে অস্ত্র সরবরাহ করতে পারছেনা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে, যুক্তরাষ্ট্র যে দেশকে অস্ত্র দিতে অপারগ, সেই দেশে তৃতীয় কোনো দেশকে অস্ত্র দেয়ার অনুমতি দেয়া যাবেনা। এই আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র বাদশা হোসেনকে অনুমতি দিতে পারেনি। ইরান সরাসরি পাকিস্তানকে অস্ত্র দেয়ার ব্যাপারে অনীহার কথা জানালো। ইরানের প্রেসিডেন্ট শাহ সরাসরি আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে জানিয়ে দিলেন, ইন্ডিয়া-সোভিয়েত জোটকে তিনি ভয় পাচ্ছেন এবং পাকিস্তানকে অস্ত্র দিয়ে সোভিয়েতের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর মানে হয়না। তবে সে একটি বিকল্প প্রস্তাব দেয় যে, জর্ডান যদি তাদের এফ-১০৪ যুদ্ধ বিমান পাকিস্তানে পাঠাতে পারে, তবে ইরান দুই স্কোয়াড্রন যুদ্ধ বিমান জর্ডানকে সাহায্যের নামে দিবে। কিন্তু এখানেও আরেক জটিলতার মুখে পড়তে হল। জর্ডানের এফ-১০৪ যুদ্ধ বিমানটি জর্ডান হাতছাড়া করতে চাইছিলোনা, কারণ জর্ডান যদি এটি হাতছাড়া করে ইসরাঈল জর্ডান আক্রমণ করে বসবে দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে। নিক্সন বললেন, তাহলে ইসরাঈলের কাছ থেকে একটি অঙ্গীকার আদায় করা যায়, যাতে সেই সময়ের মাঝে ইসরাঈল জর্ডান আক্রমণ না করে। কিসিঞ্জার একমত হন, এবং ইসরাঈলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডমায়ারের সাথে আলোচনার পরামর্শ দেয়। এবং পরামর্শ দেয়, “গোল্ডমায়ারকে শুধু বলবেন, ঐ যুদ্ধটা একটা রুশ ষড়যন্ত্র। তাহলেই কাজ হয়ে যাবে।” কিন্তু এই বিকল্পটাও যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অবৈধ তা সরাসরি জানিয়ে দিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মিশেল।

এক্ষেত্রে বিশ্ব জনমত এমনকি আমেরিকার অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় নিক্সন- কিসিঞ্জারের প্রকৃতার্থে করার মত কিছুই ছিলোনা। তারা বুঝে গেল, তারা একা। একদিকে পাকিস্তানকে সাহায্য না করতে পারার ক্ষোভ, অন্যদিকে সোভিয়েতের কঠোর নজরদারি আমেরিকাকে শিকল পরিয়ে দিলো। নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েতের ভেটো, আমেরিকাকে কোণঠাসা করে দিলো জাতিসংঘকে হাতিয়ার বানানোর ক্ষেত্রেই। পরাজয় নিশ্চিত এটা সেদিন থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো পাকিস্তানিদের কাছে যখন বন্ধু রাষ্ট্র আমেরিকা সর্বস্ব দিয়েও কিছু করতে পারছিলোনা। কিসিঞ্জার এই সংকটের সমস্ত দায় চাপিয়ে দেয় ভারতের উপর এবং মন্তব্য করে, ভারতকে শুরুতেই কঠিন ভয় দেখানো উচিত ছিলো। নিক্সনের তখন একটাই জিজ্ঞাসা, আমরা এখন কি করবো? কিসিঞ্জার বললেন, দুইটা বিকল্প। ভারতকে কঠিনভাবে ভয় দেখানো এবং দ্বিতীয়ত সোভিয়েত ইউনিয়নকে বলা যে, তোমাদের কড়া মূল্য দিতে হবে এই পরিস্থিতির জন্যে। কিন্তু নিক্সন সোভিয়েতের সাথে ঝামেলায় জড়াতে চাইলেন না। এবং, নিজেকে চূড়ান্ত অসহায় হিসেবে আবিষ্কার করলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের একটি সংবাদমাধ্যম “ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া”র ভূমিকা ছিলো অন্যতম উল্লেখযোগ্য। ১৮ ই এপ্রিল ও ১১ই জুলাই ১৯৭১ এর দুটি সংখ্যায় রাজেন্দর পুরী লেখেন, বনাগ্লাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত সম্পর্কে, যথাক্রমে “চ্যালেঞ্জ অব বাংলাদেশ” ও “ফোরওয়ার্নড ইজ ফোরআর্মড” শিরোনামে। এ দুইটি লিখাতেও যতটা না তথ্য ছিলো তারচেয়েও বেশি ছিলো আবেগ নাড়িয়ে দেয়া সাবজেক্টিভ ধারা। ৭১ এর মার্চের শেষ দিকে ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনায় অধিকাংশ সাংসদই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা দেখান। কিন্তু সমস্যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি নিয়ে আলোচনা না করায় রাজেন্দর পুরী ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

মার্কিন স্বার্থ প্রসঙ্গে রাজেন্দর পুরী বলেন, চীনের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমেরিকা চায় ভারত উপমহাদেশ রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল থাকুক কিন্তু সামরিকভাবে দূর্বল থাকুক। যদিও তার এই ভবিষ্যদ্বানী পরবর্তীতে ভুল প্রমাণ হয়েছিলো। বরং মার্কিন নীতি সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ ছিলেন। কারণ, তার ধারণা ছিলো মার্কিনিরা পাকিস্তানের খন্ডতাকে সমর্থন জানাবে একসময়। কিন্তু তার এই ভুল ভবিষ্যদ্বানীর সাবজেক্টিভ দিকটিই অনেকের আবেগ নাড়িয়ে দিতে সক্ষম ছিলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার পরবর্তী কলামটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। “ফোরওয়ার্নড ইজ ফোরআর্মড” শিরোনামের এই কলামে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগীতার অনেক যৌক্তিক কারণ বিশ্লেষন করে দেখান। এবং পটভূমিটাকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তোলেন। বিশেষত, মুজিবনগর সরকার গঠন, পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে ভারতে শরণার্থীদের আশ্রয় গ্রহণ, মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ও সংগঠন, সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চারিত্রিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর বলিষ্টতার দিক ইঙ্গিত করলেন। মাসকারেনহাসের রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য কেবল হিন্দুদের কিংবা আওয়ামীলীগ অথবা বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা নয় বরং তাদের অপারেশান চালিত হবে সমগ্র সংস্কৃতিকে ধ্বংসের জন্য।” তিনি মন্তব্য করেন যে, এই পরিস্থিতিতে কোনো রকম রাজনৈতিক সমাধান বা সন্ধি করাটা বোকামি হবে, বরং বিজয় অর্জন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত।

ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে আরেকটি গুরুত্ববহ এবং তাৎপর্যপূর্ণ কলাম ছিলো খুশবন্ত সিং এর। সূচনাটা ছিলো অসাধারণ।

“আপনি পাকিস্তান ছেড়ে আসলেন কেন?”

তিনি তার কাগজপত্র গুলো একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে মুড়ে তার ট্রাঙ্কের ভিতরে রাখলেন। “এই প্লাটফর্মে আর অন্যসব লোককে কেন জিজ্ঞেস করছেন না?” অবশেষে তিনি বললেন। “আরো যে লাখ লাখ লোক আসছে তাদের কেন জিজ্ঞেস করছেন না। আমাকেই কেন করছেন?” আবেগে তার গলা বুঁজে এলো। তিনি ভেঙে পড়লেন এবং কাঁদতে লাগলেন।

এই ছিলো খুশবন্ত সিং এর কলামটির সূচনা। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের ২৫শে জুলাই। শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া দুর্দশা ও হতাশাগ্রস্ত মানুষদের নিয়ে এই কলাম। এটি সাংবাদিকতার পরিভাষায় “হিউম্যান ইন্টারেস্ট স্টোরী” হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ঈর্ষনীয় কুশলতার সঙ্গে খুশবন্ত সিং এই অসাধারণ প্রবন্ধে মানবিক আবেদনের পাশাপাশি সন্নিবেশিত করেছেন ভারত বিভাগ, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং সেই প্রেক্ষিতে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের প্রবণতার মত গভীরতর প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর রচিত সবচেয়ে দীর্ঘ এই নিবন্ধে (৮ পৃষ্ঠা) তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন একটা মাত্র মৌলিক প্রশ্ন আর তা হচ্ছে, “আপনি কেন পাকিস্তান ছেড়ে এসেছেন?” can metformin cause severe diarrhea

তার এই প্রশ্নের জবাবে পেট্রাপোল রেলস্টেশানের প্লাটফর্মে যে মহিলা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন সেই সর্বমঙ্গলা দেবী তাকে জানান,

“আমাদের বাড়ি লুট হওয়ার পর আমরা থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশই আমাদের বলে যে, তোমরা ভারতে চলে যাও। পাকিস্তানে কোনো হিন্দুর জায়গা নেই।”

শুধু সর্বমঙ্গলা দেবীই নন, খুশবন্ত সিং ১৯৫৭ ও ১৯৬৪-র মত ১৯৭১ এর জুনেও এই একই প্রশ্ন করেছেন আরো অনেককে। তার ভাষায়, “সেবার অনেকে একই রকম উত্তর দিলেও ৭১ এ উত্তর পেয়েছি বহুরকমের।”

“পাকিস্তানী সৈন্যরা আমাদের গ্রামের সব যুবক ছেলেকে মেরে ফেলেছে, আমরা না আসলে আমাদেরও মারবে।”

“আমার বোনকে ধর্ষন করেছে। আমি বাধা দেয়ায় আমাকে মেরেছে আর বলেছে, সুযোগ পেলে একদিন আমার মাকেও ধর্ষন করবে।”

“ধর্ষনকারীরা অনেক মেয়ের স্তনের বোঁটা ছিঁড়ে নিয়েছে…”

অনেকেই বলেছে তারা সৈন্যদের অত্যাচারের কাহিনী শুনেই পালিয়ে এসেছে। খুশবন্ত সিং জানান “ভয়” কথাটা তিনি অন্তত হাজারবার শুনেছেন তাদের সবার মুখে।

৭১ এ পাকিস্তানী বাহিনী যে সারা বাংলায় অসীম ভয়ের রাজ্য গড়ে তুলেছিলো তিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাবে সেটা নিবন্ধে তুলে ধরেছিলেন। তিনি ছুটে গিয়েছেন শরণার্থী ক্যাম্পে। গিয়েছেন শরণার্থী হাসপাতালে। নিজের চোখে দেখেছেন তাদের মানবেতর জীবন। বাঁশ পলিথিন আর চাটাই দিয়ে তৈরী শরণার্থীদের আবাসগুলোকে তিনি অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন “এস্কিমোদের ইগলু” বলে। শুধু এসব দেখেই ক্ষান্ত হননি তিনি। জানতে চেয়েছেন ভারত সরকার কি করছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব নির্মল সেন গুপ্তের কাছে এ প্রশ্ন করেছেন তিনি। নির্মল গুপ্ত বলেন,

“শরণার্থীদের অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া ছাড়া গত তিনমাসে আর কিছুই করার সামর্থ্য হচ্ছেনা। পশ্চিমবঙ্গের ১৬ টি জেলার ৮ টিতে, আসামে, মেঘালয়ে ও ত্রিপুরায় এ মুহুর্তে স্থানীয় অধিবাসীর চেয়ে শরণার্থী বেশি। প্রতিদিন তাদের পেছনে আমাদের খরচ হচ্ছে এক কোটি রূপী।”

এরপর খুশবন্ত দেখা করেছিলেন কলকাতার ডেপুটি হাই কমিশনার হোসেন আলীর সাথে। তিনি আরও দেখা করেন আলবেনিয়ান সমাজকর্মী মাদার তেরেসার সঙ্গে। মাদার তেরেসার সঙ্গে দেখা করে যখন বেরিয়ে আসেন তখন তার ভাষায় ঠান্ডা বাতাস বইছে টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বর্ষার আর দেরী নেই।” এই ইঙ্গিতপূর্ণ কথার মাধ্যমে তিনি শরণার্থীদের আসন্ন ভয়াবহ দূর্ভোগকে বুঝান যখন সামনে বর্ষা আসবে। এবং এই লাইন দিয়েই তিনি তার আটপৃষ্ঠার নিবন্ধ শেষ করেন।

শরণার্থীদের অবস্থা নিয়ে “ইলাস্ট্রেটেড উইকলী অব ইন্ডিয়া”র একই সংখ্যায় ২৫ শে জুলাই ১৯৭১ এ আরেকটি প্রত্যক্ষদর্শীর প্রতিবেদন ছাপা হয়। যার নাম “রিফিউজিস স্পিক”। লিখেন নয়না গরদিয়া। এই প্রতিবেদনে তিনি শরণার্থীদের মৃত্যুর সাথে লড়াই করার এবং সীমাহীন দূর্যোগের কাহিনী ব্যক্ত করেছেন।

সাহারা ক্যাম্পে তিনি সাক্ষাৎ করেন ২৫ বছর বয়সী কালী দেবীর সাথে। কালী দেবীর স্বামী মারা গিয়েছেন কিছুক্ষণ আগে কলেরায়। তার ভাইও কিছুক্ষণের মাঝেই মারা যাবেন, বলেছেন ডাক্তাররা। তারপরও কালী দেবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন কোমরে রেশন কার্ড বেঁধে! জীবিতদের জন্য তাকে সংগ্রহ করতে হবে চাল আর ডাল! নয়না অবাক হন এই আয়রন লেডীকে দেখে। সল্ট লেক ক্যাম্পে নয়না গরদিয়া দেখা পান খুলনার ডুমুরিয়ার মনোহর রায়ের। মনোহরের নিজের ছিলো ১২০ বিঘা জমি। আর সে এখন রাত কাটাচ্ছে পরিবার নিয়ে পরিত্যক্ত ড্রেন পাইপের মধ্যে! বারাসতে তিনি কথা বলেন তরুণ বালাই রামের সাথে। “ম্যাট্রিক পাশ” বালাই চাকুরী করতে চায় কলকাতায়। কলকাতার লক্ষ লক্ষ লোক তো এমনিই বেকার, বালাই রাম কিভাবে চাকরী পাবে এই প্রশ্নের জবাবে সে ক্ষেপে যায়, উত্তর দেয়, “তাতে কি? আমাকে চাকুরী দিতেই হবে।” ঠিক কতটা দুর্দশাগ্রস্ত এবং কোণঠাসা হলে এমন অদ্ভুত উত্তর আসতে পারে ভেবে অবাক লাগে।

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে কোটি কোটি ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত এই স্বাধীনতা। সকল চক্রান্ত, সকল কুচক্র, সকল ভয় ভীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বাধিকার আদায়ের লক্ষে অদম্য লড়াই এর প্রাপ্তি এই স্বাধীনতা। একটা পতাকা, সবচেয়ে দামী পতাকা, পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ পতাকাটা পৃথিবীর আকাশে যখন উড়তে দেখি একধরনের জেদ কাজ করে নিজের মাঝে, একধরনের শক্তি, একধরণের অসঙ্গায়িত সুপারপাওয়ার ভর করে নিজের উপর। সেই সাথে আমি দেখি আমার পিছনে একঝাঁক কাপুরুষতা, স্বাধীনতার মূল্য না বুঝতে পারার যন্ত্রনা, সব মিলে মিশে যায় একসাথে। এই দেশ, এই মাতৃভূমি, হ্যাঁ আমার নিজের দেশ। অনুভূতিটা গর্বের, অনুভূতিটা অহংকারের। কাজের নেশায় চারিদিকে ছুটে চলা ব্যস্ত মানুষ গুলোও মধ্যরাতে নিজের মুখোমুখি হয়, সবচেয়ে শক্তিমান মানুষটিও রাতের আঁধারে নতজানু হয়, অবনত হয় দেশের প্রতি। এই দেশে স্বাধীনতা বিরোধীরা থাকবে কেন? থাকতে পারবেনা, থাকতে দেবোনা। যেকোনো মূল্যে এই অপশক্তি দূর করে একদিন সবাই হাত ধরে দাঁড়াবো মধ্যরাতে, একটি বৃত্ত তৈরী করবো। বৃত্তবন্ধী একটি মোমবাতি জ্বলবে, কিন্তু নিঃশেষ হবেনা। আমরা সবাই বৃত্তবন্ধী, দেশপ্রেমের অপরাধে। স্বপ্ন দেখি, একদিন সবাই মিলে এই অসাধারণ অপরাধটা করে ফেলবো।

তথ্যসূত্রঃ

  • বিদেশী সাংবাদিকদের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, অনুবাদ- মাহবুব কামাল,
  • সচিত্র সন্ধানী, স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা, ২২ মার্চ, ১৯৮৭
  • বিচিত্রা, বিজয় দিবস সংখ্যা, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৮ 3rd round of clomid 100mg
  • Bangladesh Genocide & World Press, Compiled & Edited by Fazlul Quaderi
  • Bangladesh in World Press, Vol 1, Published by Ministry Of Foreign Affairs, 1973
  • বিশ্বগণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জাকির হোসেন রাজু
  • অবরুদ্ধ সংবাদপত্র ‘৭১ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর রাজনীতি ও রণকৌশল, হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ, নভেম্বর ১৯৮৩

You may also like...

  1. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    মুক্তিযুদ্ধের এমন ইতিহাস নতুন করে যখন পড়ি তখন একটা কথায় বারবার মনে পরে। আমাদের বলেছিলেন ফতে আলী চৌধুরী। আমরা যারা আজ ইতিহাস খোঁজে ফিরে ব্যাপারটা অনুভব করার তাড়না অনুভব করি তাদের পক্ষেও বুঝা সম্ভব না ! সে জন্যেই তিনি আমাদের প্রতি সাক্ষাতে এই কথাটাই বলেন “War is not what you think war is!!’.. যুদ্ধের বাস্তবতা কিংবা বিভীষিকা কেবল যুদ্ধাবয়স্থায় বুঝা সম্ভব!!

    রিফিউজিদের জীবন, ধর্মীয় বিদ্বেষের ভয়াবহতা আর নারী নির্যাতনের এই নৃশংসতা মাঝে মাঝে আমরা হয়তো বুঝতে চেষ্টা করি মাত্র আসল বাস্তবে কখনই সম্ভব না কোন সাহিত্যে ধারণ করা কোন চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলা এমনকি কোন কবিতায় নিয়ে আসা। যুদ্ধ এতোটাই ভয়াবহ আর মির্মম। তারপরও একটাই চেষ্টা থাকে এই মানচিত্রটি আঁকতে যে ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত আর ৫/৭ নারীর সম্ভ্রম আমরা হারায়ছি তাদের ইতিহাসটা জানতে প্রজন্মকে জানাতে যদি মানুষের মনুষ্যত্ব বিকশিত হয়…

    অনেক তথ্যই নতুন করে জানলাম। অনেক অনেক ধন্যবাদ…

  2. হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই ভাগ্যবান যে ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলো হলুদ সাংবাদিকতার কবলে পরে নি। বরং বিদেশী সাংবাদিকরা নিজ নিজ দায়িত্ব এবং কর্তব্যের জায়গা থেকে সারা বিশ্বকে জানিয়েছে এ দেশে সংঘটিত বর্বরতম ঘটনার কথাগুলো। যদিও তখন অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঘটনাগুলোর অধিকাংশই অবিকৃত রয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু আক্ষেপের হলেও সত্যি যে পরবর্তী স্বাধীন বাংলাতেই মুক্তিযুদ্ধের অনেক তথ্য-উপাত্তকে বিকৃত করা হয়েছে এবং আজ পর্যন্ত হচ্ছে।
    এখানে আরেকটা বিষয় রয়েছে, অনেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এখন সেসব তথ্য ভুল ভাবে উপস্থাপন করে আবার অনেকে আছে যারা স্বাধীনতার পক্ষে কিন্তু আবেগের অতিশয্যে মূল ঘটনা থেকে সরে এসে কল্পনার আবেশে সেইসময়ের তথ্যগুলোকে উপস্থাপন করে। এতেকরে সাময়িক পাঠক জনপ্রিয়তা পেলেও আমরা কিন্তু মূল তথ্য উপাত্তগুলোকে হারিয়ে ফেলছি।

    যাহোক, অনেক কথাই বলে ফেললাম। আপনার লেখা সবসময়ই অসাধারণ তথ্যপূর্ণ হয়। এবারও সেটার ব্যাতিক্রম ঘটেনি । লিখতে থাকুন। হ্যাপি ব্লগিং।

    engravidei com clomid no 1 ciclo
    composition du medicament cialis
propranolol hydrochloride extended release capsules

প্রতিমন্তব্যতারিক লিংকন বাতিল

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

effect of viagra after ejaculation
espn mayne event viagra