২৫ শে মার্চ কালরাত্রিঃ ইতিহাসের জঘন্যতম কিছু চরিত্র এবং বর্বরচিত একটি হত্যাযজ্ঞ…

608 side effects cialis vs viagra

বার পঠিত

ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশে যে হত্যাকাণ্ডচালিয়েছে তা নাদির শাহর নৃশংসতাকেওহার মানিয়েছে। বাংলাদেশে লুটপাট, বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করা পোড়ামাটিনীতিতে ইয়াহিয়া খান দিল্লীর সুলতানমাহমুদকেও হার মানিয়েছে। বাংলাদেশ নিধনেইয়াহিয়া মুসলিনীকেও হার মানিয়েছে।ইয়াহিয়া খান হার মানিয়েছে হিটলারকেও’’

—–জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড এর কয়েকটি লাইন।

শুধুই কি ইয়াহিয়া? ইতিহাসের জঘন্য এই চরিত্রটির সাথে জড়িয়ে আছে আরো কিছু জঘন্যতম চরিত্র। যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি চরিত্র হল পাকিস্তান বাহিনীর ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং ৫৭ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী খান, মূলত এই নরপিশাচেরাই তৈরি করেছিলো ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তর গণহত্যার নীল নকশা; যা “অপারেশন সার্চলাইট” হিসেবে পরিচিত। ১৯৭১ সালের ১৭ই মার্চ পাক বাহিনীর চীফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ খানের নির্দেশে জেনারেল রাজাপরদিন ঢাকা সেনানিবাসে জিওসি অফিসে অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনা চূড়ান্তকরেন। পাঁচ পৃষ্ঠার এই পরিকল্পনাটি রাও ফরমান আলী নিজ হাতে লিখেন। এইপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২৪-২৫ মার্চ জেনারেল হামিদ, জেনারেল এ. ও মিঠঠি, কর্নেল সাদউল্লাহ হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন সেনানিবাসে  পরিদর্শন করেন। সিদ্ধান্ত হয়, ২৫ মার্চ রাত ১টায় অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় অভিযানে ঢাকায় নেতৃত্ব দিবেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। দেশেরঅন্যান্য অঞ্চলে নেতৃত্ব দিবেন জেনারেল খাদিম রাজা। লে. জেনারেল টিক্কা খান৩১ ফিল্ড কমান্ডে উপস্থিত থেকে অপারেশনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এছাড়া এ অভিযানকে সফল করার জন্য ইতোমধ্যে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের দু’জনঘনিষ্ঠ অফিসার মেজর জেনারেল ইখতেখার জানজুয়া ও মেজর জেনারেল এ.ও মিঠঠিকে ঢাকায় আনা হয়।

পাঠক লক্ষ্য করুন, ইতিহাসের জঘন্য নরপিশাচ ইয়াহিয়ার সাথে সাথে আরো বেশ কিছু নরপিশাচের নামও আমরা এপর্যায়ে পেলাম। এরা হলেন-জিওসি জেনারেল আব্দুল হামিদ, জেনারেল মিঠঠি, কর্ণেল সাদউল্লাহ, জেনারেল টিক্কা খান এবং ইখতেখার জানজুয়া। মূলত, অপারেশন সার্চলাইট  অভিযান শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল ২৬ মার্চ রাত ১টা।কিন্তু ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে কোনো ইতিবাচক ফলাফল নাপেয়ে সবাইকে সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য তৈরি হওয়ার আহবান জানান। সে রাতেইঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিকামী বাঙালি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ও এ.এ.কে নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালেক মন্তব্য করেছেন যে, বাঙালি বিদ্রোহীদের প্রবল প্রতিরোধসৃষ্টির আগেই পাকিস্তান বাহিনী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পৌঁছার লক্ষ্যে অভিযান এগিয়ে ২৫ মার্চ রাত ১১-৩০ মিনিটে শুরু হয়। অবশ্য ৫ আগস্ট প্রকাশিত পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, আওয়ামী লীগ ২৬ মার্চভোরে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। শ্বেতপত্রে উল্লেখিত এতথ্যকেও অভিযান এগিয়ে আনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এখানে আমরা আরো দুজন নরপিশাচের নাম পেলাম- এ.এ.কে নিয়াজী এবং মেজরসিদ্দিক সালেক। নাহ্‌… ইতিহাসের জঘন্যতম এসব চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, আমার উদ্দেশ্য মানুষরূপী এই হায়নাগুলোর নৃশংস, বীভৎস কর্মকান্ডের সামান্য কিছু নমুনা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা। তবে মাথায় নিয়ে রাখুন এই নামগুলো, হয়তো কাজে লাগলেও লাগতে পারে।ওহ্‌, আরেকজন পিশাচ ছিলো এসবের পিছনে- জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে থেকে অভিযান প্রত্যক্ষ করেন এবং পরদিন ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে উনি সেনাবাহিনীর পূর্ব রাতের কাজেরভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেন, ‘আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যে পাকিস্তানকেরক্ষা করা গেছে।’ ইয়াহিয়া খানসহ সামরিক কর্মকর্তাদের সকলে অভিযানেরপ্রশংসা করেন। metformin and insulin bodybuilding

“অপারেশন সার্চলাইটের” নামটির আওতায় কি কি পরিকল্পনা ছিল? turtle eggs viagra

মূলত বাঙালির মনোবল দুর্বল করে দেয়া,বাঙালি নামের জাতিটিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে দেয়া এবং “পাকিস্তান” নামের একটি দুর্বল রাষ্ট্রকে জন্ম দেয়াই ছিল এই অপারেশনের প্রধান পরিকল্পনা। তাছাড়াও অপারেশন সার্চলাইট সফলভাবে পরিচালনার জন্য কিছু পার্শ্বপরিকল্পনা ছিল এরকম-

১. propranolol hydrochloride extended release capsules একযোগে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন শুরু হবে।
২. সর্বাধিক সংখ্যক রাজনীতিক ও ছাত্রনেতা, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার চরমপন্থীদের গ্রেফতার করতে হবে।
৩. ঢাকার অপারেশনকে শতকরা ১০০ ভাগ সফল করতে হবে। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে হবে।
৪. সেনানিবাসের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
৫. যাবতীয় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে দিতেহবে। টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, রেডিও, টিভি, টেলিপ্রিন্টার সার্ভিস, বৈদেশিককনস্যুলেটসমূহের ট্রান্সমিটার বন্ধ করে দিতে হবে।
৬. ইপিআর সৈনিকদের নিরস্ত্র করে তদস্থলে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদেরঅস্ত্রাগার পাহারায় নিয়োগ করতে হবে এবং তাদের হাতে অস্ত্রগারের কর্তৃত্বদিতে হবে।
৭. প্রথম পর্যায়ে এ অপারেশনের এলাকা হিসেবে ঢাকা খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটকে চিহ্নিত করা হবে। চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, রংপুর ও কুমিল্লায় প্রয়োজনে বিমানযোগে পরিকল্পনা বাস্তবায়নকরা হবে।

অপারেশন সার্চলাইটে ঢাকা শহরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রাধান্য দিয়েপাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ উপরোক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিম্নোক্তসিদ্ধান্ত নেয়:

১. পিলখানায় অবস্থিত ২২নং বালুচ রেজিমেন্ট বিদ্রোহী ৫ হাজার বাঙালি ইপিআর সেনাকে নিরস্ত্র করবে এবং তাদের বেতার কেন্দ্র দখল করবে। 3rd round of clomid 100mg
২. আওয়ামী লীগের মুখ্য সশস্ত্র শক্তির উৎস রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এক হাজার বাঙালি পুলিশকে নিরস্ত্র করবে।
৩. ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট শহরের হিন্দু অধ্যুষিত নবাবপুর ও পুরনো ঢাকা এলাকায় আক্রমণ চালাবে।
৪. ২২নং বালুচ, ১৮ ও ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বাছাই করা একদল সৈন্যআওয়ামী লীগের বিদ্রোহী শক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরইকবাল হল (জহরুল হক হল), জগন্নাথ হল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াকত হলআক্রমণ করবে।
৫. বিশেষ সার্ভিস গ্রুপের এক প্লাটুন কমান্ডো সৈন্য শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি আক্রমণ ও তাঁকে গ্রেফতার করবে।
৬. glyburide metformin wikipedia ফিল্ড রেজিমেন্ট দ্বিতীয় রাজধানী ও সংশ্লিষ্ট বসতি (মোহাম্মদপুর-মিরপুর) নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
৭. শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশে এম ২৪ ট্যাংকের একটি ছোট্ট স্কোয়াড্রন আগেই রাস্তায় নামবে এবং প্রয়োজনে গোলা বর্ষণ করবে।
৮. উপর্যুক্ত সৈন্যরা রাস্তায় যেকোন প্রতিরোধ ধ্বংস করবে এবং তালিকাভুক্ত রাজনীতিবিদদের বাড়িতে অভিযান চালাবে।

 

 কি ঘটেছিলো সেই রাতে?

সেদিন রাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা ১১.৩০ মিনিটে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে এসে ফার্মগেটেমিছিলরত বাঙালিদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের সূচনাঘটায়। এরপর পরিকল্পনা মোতাবেক একযোগে পিলখানা, রাজারবাগে আক্রমণ চালায়।রাত ১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তারকরে। গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হলসহ শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় আক্রমণ চালিয়ে ৯ জন শিক্ষকসহ বহুছাত্রকে হত্যা করে। একই পরিকল্পনার আওতায় পুরনো ঢাকা, তেজগাঁও, ইন্দিরারোড, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ঢাকা বিমানবন্দর, গণকটুলী, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান প্রভৃতি স্থানে আক্রমণ চালায়। এ রাতে চট্টগ্রামে পাক সেনাদেরগুলিতে অনেকে হতাহত হয়। মার্চ মাসের মধ্যেই অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনায়সেনানিবাসকে কেন্দ্র করে পাকবাহিনী তান্ডব চালায়। এ ছাড়া বাঙালিরমুক্তির আন্দোলনে সমর্থনের কারণে ইত্তেফাক, সংবাদ ও দি পিপলস অফিসেঅগ্নিসংযোগ করে। বহু সংবাদকর্মী আগুনে পুড়ে মারা যান।

এইটুকুতেই কি শেষ? অবশ্যই না!! সেদিন রাতের হত্যাযজ্ঞের তীব্রতা সম্পর্কে সামান্য ধারণা পাওয়া যাবে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য জানলে-

 

শ্রী পূর্ণচন্দ্র বসাক

১৮,তাঁতিবাজার লেন,ঢাকা।

সেদিন রাতে আমার তাঁতিবাজার বাসায় ছিলাম।রাত ১২টার দিকে হঠাৎ উত্তরদিক থেকে কামানের আকাশফাটা গর্জন শুনে দৌড়ে ছাদে গিয়ে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে আগুনের ফুলকি ও লক্ষ লক্ষ গুলির আগুনের ফুলকিতে আকাশ ভরে গেছে। বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই সদরঘাট খ্রিস্টানদের গীর্জার সম্মুখে সামরিক গাড়ি অ ট্যাংকের আওয়াজ শুনলাম। এ সময়ে শতকন্ঠের “মাগো, বাবাগো, বাঁচাও,বাঁচাও,” আর্তনাদ শুনলাম। রাত ২টার সময় মাইকে যার যার বাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা ছিলো তা নামিয়ে যাতে পাকিস্তানের পতাকা লাগানোর নির্দেশ দেয়া হল।ধীরে ধীরে ভোর হবার আগে চারিদিকে নীরব, নিস্তব্ধ, শ্মশানের হাহাকার, আগুন আর আগুন জ্বলছে দেখলাম। পুরো রাজধানী জ্বলছে তখন।

ভোর হতেই আমি বের হলাম আমার বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর, পরেশ চন্দ্র মন্ডলের খোঁজে বের হলাম। জগন্নাথ হলের দেয়াল লক্ষ লক্ষ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে ছিল। হলের পুকুরপাড় দিয়ে অগ্রসর হবার সময় দেখলাম একজন মানুষ পুকুরের মধ্য থেকে ভয়ে ভয়ে মাথা বের করছে।আমাকে দেখে দিশেহারা করে কাঁদতে কাঁদতে বলল- tadalafil 5mg daily

“দাদা, ওদিকে যাবেন না, ওদিকে যাবেন না। ওরা আমাদের সব মেরে ফেলেছে”।

আমি লোকটিকে উন্মাদ মনে করে তাঁর কথায় কান না দিয়ে ক্যান্টিনের দিকে যেতে থাকলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম কোথাও কোন জনমানব নেই, নীরব নিস্তব্ধ সবকিছু। ক্যান্টিনের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলাম একটা যুবকের লাশ পড়ে আছে-মাথার চুল আগুনে পোড়া,সারাদেহে গুলিতে ঝাঁঝরা। আমি আর দোতালায় না উঠে সোজা শহীদ মিনারের দিকে যেতেই দেখলাম শহীদ মিনার ভেঙে খান খান হয়ে পড়ে আছে। শহীদ মিনারের পেছনেই সদ্য মাটি তোলা প্রায় একশো ফুট লম্বা এক বিরাট গর্ত দেখলাম-মনেহল গর্তটি কিছুক্ষণ আগেই ভরাট করা হয়েছে।গর্তের উপরের মাটি ভেদ করে কারো কারো হাতের পাঞ্জা, পায়ের আঙুল দেখা যাচ্ছে।

এরপরে কোয়ার্টারের দিকে অগ্রসর হলাম। সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই দেখলাম জমাট বাধা রক্ত আর কেমন একটা পচা গন্ধ পেলাম। যেদিকেই তাকাই সেদিকেই রক্ত। এসব দেখে আমি ভড়কে গেলাম এবং দ্রুত ওখান থেকে চলে আসলাম।

 

সুবেদার খলিলুর রহমান, আর্মস এস আই বি আর পি

রাজারবাগ পুলিশলাইন, ঢাকা।

সেই বিভীষিকাময় রাত আমি কোন দিন ভুলবো না। উপরওয়ালার রহমতে কিভাবে বেঁচে আছি জানি না। সেদিন রাতে আমি আর আমার কয়েকজন সহকর্মী যখন দেখলাম ওদের আটকানো যাবে না তখন আমরা পালিয়ে যাই। এরপরে ২৯ মার্চ পর্যন্ত পালিয়ে থাকি। ২৯ তারিখ সকালে মিলব্যারাক পুলিশ লাইনে উপস্থিত হয়ে আমাদের প্রিয় পুলিশ সুপার মি. ই চৌধুরী,পুলিশ কমান্ডেট হাবিবুর রহমান, ডি এস পি লোদী সাহেব সহ আরো দু’একজনকে উপস্থিত দেখলাম। মি. ই চৌধুরী ক্ষুধার্ত,তৃষ্ণার্ত, আহত, ক্ষত-বিক্ষত সিপাহীদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন এবং বললেন-“তোমাদের কোন অসুবিধা নাই। তোমরা নীরবে কাজ করে যাও”। আমাকেসহ আরো ২০ জনকে কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব দেয়া হল। আমরা থানায় প্রবেশ করেই মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত দেখতে পারলাম, থানার দেয়াল গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে ছিল। এরপরে সেখান থেকে গেলাম বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে। সেখানে অসংখ্য মানুষের মৃত দেহ দেখলাম। হঠাৎ দেখে আমাদের কনস্টেবল আবু তাহেরের (নং ৭৯৮) পোশাক পরা লাশ নদীতে ভাসছে। আমি কাঁদতে কাঁদতে ওর লাশ ধরতে গেলে পেছন থেকে এক পাঞ্জাবী সেনা কর্কশভাবে চিৎকার করে বলতে থাকে-

“শুয়োর কা বাচ্চা, তোমকো ভি পাকড়াতা হায়, কুত্তা কা বাচ্চা, তোমকো ভি সাথ মে গুলি করেগা”।

সাব ইন্সপেক্টর হওয়া সত্ত্বেও একজন সামান্য পাকসেনার এমন আচরণে অপমানে, লজ্জায় আমি যেন অবশ হয়ে পড়লাম। এরপরে কোতোয়ালী থানা বরাবর সোজাসুজি গিয়ে লঞ্চঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম অসংখ্য বিকৃত,ক্ষত-বিক্ষত লাশ ভাসছে।অনেক উলঙ্গ যুবতীর লাশ দেখলাম, সাথে ছিল অসংখ্য শিশু, যুবক,বৃদ্ধা-যুবার লাশ।কিছু যুবতীর লাশ দেখে মনে হল- এও পূত পবিত্র মেয়েগুলোকে পাকিস্তানী সেনারা কুকুরের মতো ছিন্ন ভিন্ন করে খেয়েছে। তাঁদের যোনিপথা, স্তন, মুখ,ঠোঁট বীভৎস অবস্থায় ছিল।দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাশ দেখলাম লাশ- অসংখ্য লাশ- নিরীহ বাঙালির লাশ। প্রতিটি লাশে বেয়ানটের আঘাত দেখলাম, দেখলাম কারো মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে, কারো পাকিস্থলী সমেত হৃদপিণ্ড বের করে নেয়া হয়েছে, কারো হাত পায়ের গিঁট ভাঙা। সদরঘাট টার্মিনাল শেডে গিয়ে দেখলাম রক্ত, চাক চাক রক্ত। এই টার্মিনাল শেডেই ছিল ২৫ মার্চ রাতে পাকিদের জল্লাদখানা। ওরা বহু মানুষকে এখানে এনে জবাই করেছে, বেয়ানট চার্জ করে হত্যা করেছে। এরপরে লাশগুলোকে পানিতে ফেলে দিয়েছে। শেডের বাইরে গিয়ে দেখলাম অসংখ্য শকুন আর কাক মানুষের সেই রক্তের লোভে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।ওখান থেকে বের হয়ে দেখলাম নদীর পাড়ের বাড়িগুলো ভেঙে পড়ে আছে আর কিছু কিছু বিধ্বস্ত পিলার বীভৎসতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলাম, রাস্তার পাশে মিউনিসিপালিটির কয়েকটি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। তাতে সুইপারেরা অনেক লাশ টেনে টেনে তুলছে। পাঞ্জাবী সেনারা দাঁড়িয়ে কুকুরের মতো পাহারা দিচ্ছে। আমি আর ওদিকে যাবার সাহস না পেয়ে থানায় দিকে পা বাড়ালাম। ফেরার পথে দেখলাম বিহারীরা উন্মাদের মতো আনন্দ করছে। কেউ কেউ রাস্তায় পড়ে থাকা লাশের উপর লাথি দিচ্ছে, কেউ আবার লাশগুলোকে দা দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে আনন্দ করছে, কেউ আবার আগুন দিচ্ছে, অনেকে লাশের উপর প্রসাব করছে। এসব দেখে আর সহ্য করতে না পেরে দ্রুত থানায় চলে আসলাম।

 

মোহাম্মদ হোসেন

পুলিশের সিপাহী, রমনা থানা।

২৫ শে মার্চ রাৎ ১০ টার দিকে আমার কর্তব্য শেষ করে আমি ব্যারাকে চলে যাই। কিছুক্ষণ পরেই অনেক হৈ চৈ শুনে বাইরে এসে দেখি জনতা রাস্তায় ইট,কাঠ,গাছের গুঁড়ি দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করছে। এসময়ে আমাদের থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার আমাদের সবার হাতে অস্ত্র দিয়ে দেয়। আমরা যে যার মতো পজিশন নেই। আমরা সেদিন শপথ করেছিলাম যেকরেই হোক পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ করবোই, কিন্তু ওদের অস্ত্রের সাথে আর আমরা পেরে উঠতে পারি নি। একটা সময়ে ওরা আমাদের ঘিরে ফেলে, আমাদের অস্ত্র নিয়ে গিয়ে পশুর মতো লাথি দিতে দিতে পুলিশ ব্যারাকের সামনে এনে জড়ো করে। ওরা আমাদের উন্মত্তভাবে পেটাচ্ছিলো আর বলছিলো-

“শালা মালাউন কা বাচ্চা, হিন্দুকা লাড়কা, শোয়ারকা বাচ্চা তোমহারা মুজিব বাবা আভি কাহা হায় ! শালা হারামী, আভি শালা জয় বাংলা বোলাতা নাই”। lasix mechanism action

এক পর্যায়ে আমাদের নাক-মুখ থেকে রক্ত বেরুতে লাগলো। কারো হাত পা ভেঙে গিয়ে ছিলো। আমাদের অধিকাংশ বন্দিদের উলঙ্গ করে রাখা হয়েছিলো। এরপরে আমাদের একটা লাইনে দাড় করিয়ে সবাইকে গুলি করা হয়। কিন্তু আগ্যক্রমে আমি বেঁচে যাই।

 

মতিউর রহমান

সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ

রমনা থানা, ঢাকা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আমি সারাদিন থানা সংলগ্ন পুলিশের সি আই অফিসে কাজ করছিলাম। রাত ১০ টা ১৫ মিনিটের দিকে আমার এক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানায় যে পাকি হানাদাররা অনেক অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করছে। এর প্রায় ৪৫ মিনিটের মাথায় আমাদের থানাতে আক্রমণ চালানো হয়। থানায় প্রবেশ করেই বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে ওরা। আমাকেসহ প্রায় ৪৫ জন পুলিশ, সিপাহীকে ওরা বন্দী করে ফেলে। আমাদের সবাইকে বেদম প্রহার করতে করতে বুটদ্বারা লাথি লাথি দিতে দিতে “নজর নিচে দেকায় মিটেট যে শো যাও” বলে লাথি মেরে আমাদের উপুড় করে ফেলে দেয়। এরপরে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে করতে আমাদের অবিরত মারতে থাকে। আমার ঘরে একটা গ্রামবাংলার ছবি দেখে আমায় আরো বেশি মারে। এক সময়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপরে জ্ঞান ফেরার পরে দেখি ৮ ফুট বাই ১০ ফুট একটি কামড়ায় ঠাসাঠাসি করে বস্তার মতো আমাদের ফেলে রাখে। এইভাবে ২৭ মার্চ পর্যন্ত আমরা বন্দি ছিলাম। ২৭ মার্চ সকালে আমাদের পিটাতে পিটাতে একটা হাউজের কাছে নিয়ে গিয়ে নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেত দেয়। অনেকে তৃষ্ণার তাড়নায় সেই পানিই পান করে। এরপরে আবারো আমাদের সেই কামড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এবং নির্যাতন চলতেই থাকে। ২ দিন আমাদের না খাইয়ে রাখা হয়। কামড়ার জানালায় একটা প্লেটে ভাত রেখে আমাদের নিয়ে উপহাস করে আমাদের সামনেই সেই ভাত ফেলে দেয়। রাগে দুঃখে অনেকে হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে। ২৯ মার্চ সকালে আমাদের অভুক্ত অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হয়। অনেকে মারাও যায়।

 

পরদেশী ডোম viagra en uk

সুইপার, সরকারী শিশু হাসপাতাল, ঢাকা।

১৯৭১ সনের ২৭ শে মার্চ সকালে রাজধানী ঢাকায় পাকসেনাদের বীভৎস হত্যাকান্ডেরপর ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মেজর সালামত আলি খান শূরের প্রশাসনিকঅফিসার মি. ইদ্রিস পৌরসভার আরও কয়েকজন অফিসার সঙ্গে নিয়ে একটি মিউনিসিপ্যালট্রাকে পশু হাসপাতালের গেটে এসে বাগের মতো “পরদেশী, পরদেশী” বরে গর্জনকরতে থাকে।

আমাদের ট্রাকে করে ঢাকা পৌরসভা অফিসে নিয়ে আমাদের প্রায় আঠারজন সুইপার ওডোমকে একত্রিত করে প্রতি ছয়জনের সাথে দুইজন করে সুইপার ইন্সপেক্টর আমাদেরসুপারভাইজার নিয়োজিত করে ট্রাকে তিনদলকে বাংলাবাজার, মিটফোর্ড ওবিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রেরণ করা হয়। আমি মিটফোর্ডের ট্রাকে ছিলাম। সকালনয়টার সময় আমাদের ট্রাক মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘরের সম্মুখে উপস্থিত হলেআমরা ট্রাক থেকে নেমে লাশঘরের ভিতরে প্রবেশ করে বুকে এবং পিঠে মেশিনগানেরগুলিতে ঝাঁজড়া করা প্রায় একশত যুবক বাঙালির বীভৎস লাশ দেখলাম। প্রতিটি লাশপা ধরে টেনে বের করে বাইরে দাঁড়ানো অন্যান্য সুইপারের হাতে তুলে দিয়েছিট্রাকে উঠাবার জন্য। সব লাশ তুলে দিয়ে একপাশে একটা লম্বা টেবিলের উপর চাদরটেনে উঠিয়ে দেখলাম একটি রূপসী ষোড়শী যুবতীর উলঙ্গ লাশ – লাশের বক্ষ, যোনিপথক্ষতবিক্ষত, কোমরের পিছনের মাংস কেটে তুলে নেওয়া হয়েছে, বুকের স্তন থেতলেগেছে, কোমর পর্যন্ত লম্বা কালো চুল, হরিণের মত মায়াময় চোখ দেখে আমারচোখবেয়ে পানি পড়তে থাকল, আমি কিছুতেই পানি আটকে রাখতে পারলাম না। আমি আমারসুপারভাইজারের ভয়াল এবং ভয়ঙ্কর কর্কশ গর্জনের মুখে সেই সুন্দরীর পবিত্র দেহঅত্যন্ত যত্ন সম্ভ্রমের সাথে ট্রাকে তুলে দিলাম।

মিটফোর্ডের সকল লাশ ট্রাকে তুলে আমরা ধলপুরের ময়লা ডিপোতে নিয়ে গিয়ে বিরাটগর্তের মধ্যে ঢেলে দিলাম। দেখলাম বিরাট বিরাট গর্তের মধ্যে সুইপার ও ডোমেরারাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আশা লাশ ট্রাক থেকে গর্তের মধ্যেফেলে দিচ্ছে। আমি অধিকাংশ লাশের দেহেই কোন আবরণ দেখি নাই। যে সমস্ত যুবতীমেয়ে ও রমণীদের লাশ গর্তের মধ্যে ফেলে দেওয়া হলো তার কোনো লাশের দেহেই আমিকোনো আবরণ দেখি নাই। তাদের পবিত্র দেহ দেখেছি ক্ষতবিক্ষত, তাদের যোনিপথপিছন দিকসহ আঘাতে বীভৎস হয়ে আছে।তুলতে যাই নাই, যেতে পারি নাই। সারাদিন ভাত খেতে পারি নাই, ঘৃণায় কোনোকিছু স্পর্শ করতে পারি নাই।

পরেরদিন (২৯ শে মার্চ) পাটুয়াটুলি ফাঁড়ি পার হয়ে আমাদের ট্রাকশাখারীবাজারের মধ্যে প্রবেশ করল। ট্রাক থেকে নেমে আমরা শাখারীবাজারেরপ্রতিটি ঘরে ঘরে প্রবেশ করলাম – দেখলাম মানুষের লাশ, নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশুর বীভৎস লাশ, চারিদিকেইমারতসমূহ ভেঙ্গে পড়ে আছে, মেয়েদের অধিকাংশ লাশ আমি সম্পূর্ণ উলঙ্গ দেখলাম, দেখলাম তাদের বুক থেকে স্তন তুলে নেওয়া হয়েছে। কারও কারও যোনিপথে লাঠিঢুকানো আছে। বহু পোড়া, ভষ্ম লাশ দেখেছি। পাঞ্জাবী সেনারা পাষণ্ডের মতলাফাতে লাফাতে গুলি বর্ষণ করছিল, বিহারী জনতা শাখারীবাজারের প্রতিটি ঘরেপ্রবেশ করে মূল্যবান আসবাবপত্র, সোনাদানা লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছিল। আমরাঅবিরাম গুলি বর্ষণের মুখে প্রাণের ভয়ে দুই ট্রাক লাশ তুলে লাশ তোলার জন্যসেদিন আর শাখারীবাজারে প্রবেশ করার সাহস পাই নাই।আমি মিলব্যারাক ঘাটে পৌরসভার ট্রাক নিয়ে পৌরসভার ট্রাক নিয়ে গিয়ে দেখলামনদীর ঘাটে অসংখ্য মানুষের লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রতিটি লাশের চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা, শক্ত করে পিছন দিক থেকে। প্রতিটি লাশের মুখমন্ডল এসিডে  জ্বলেবিকৃত ও বিকট হয়ে আছে। লাশের কোনো দলকে দেখলাম মেশিনগানের গুলিতে বুক ও পিঠঝাঁজড়া হয়ে আছে, অনেক লাশ দেখলাম বেটন ও বেয়নেটের আঘাতে বীভৎস হয়ে আছে, কারো মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মগজ বের হয়ে আছে, কারও কাটা হৃৎপিণ্ড বের হয়েআছে। নদীর পাড়ে ছয়জন রূপসী যুবতীর বীভৎস ক্ষতবিক্ষত, উলঙ্গ লাশ দেখলাম। চোখবাঁধা, হাত-পা শক্ত করে বাঁধা প্রতিটি লাশ গুলির আঘাতে ঝাঁজড়া, মুখমন্ডল, বক্ষ ও যোনিপথ রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত ও বীভৎস দেখলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের পিছনে স্টাফ কোয়ার্টার, রোকেয়া হলেরপশ্চিম দিকে জনৈক অধ্যাপকের বাসা থেকে আমি লাশ তুলেছি। অধ্যাপকের বাসা থেকেসিঁড়ির সামনে লেপের ভিতর পেঁচানো জনৈক অধ্যাপকের লাশ আমি তুলে নিয়ে গেছি।

 

চুন্ন ডোম

ঢাকা পৌরসভা, রেলওয়ে সুইপার কলোনি।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ সকালে ঢাকার পৌরসভার সুইপার ইন্সপেক্টর ইদ্রিস সাহেবরাস্তায় পড়ে থাকা লাশ উঠাবার জন্য আমাকে ডেকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিতে নিয়েযান। সেখানে গিয়ে দেখি, বদলু ডোম, রঞ্জিত ডোম (লাল বাহাদুর), গণেশ ডোম ওকানাই ডোম আগে থেকে সেখানে আছে। আমাদের একটি ট্রাকে করে প্রথমে শাঁখারীবাজারের কোর্টের প্রবেশ পথের সামনে নামিয়ে দেয়। ঢাকা জজ কোর্টের দক্ষিণদিকে ঢোকার মুখে যে পথ শাঁখারী বাজারের দিকে চলে গেছে সেখানে গিয়ে পথেরদু’ধারে ড্রেনের পাশে যুবক-যুবতীর, নারী-পুরুষের, শিশু-কিশোরের বহু পচা লাশদেখতে পেলাম। তার মধ্যে বহু লাশ পচে, ফুলে বীভৎস হয়ে গেছে। দেখলাম শাঁখারীবাজারের দু’দিকের ঘরবাড়িতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। অনেক লোকের অর্ধপোড়ালাশ চারদিকে পড়ে আছে দেখলাম। কাছাকাছি সশস্ত্র পাঞ্জাবী সৈন্যদের পাহারায়মোতায়েন দেখলাম। প্রত্যেক ঘরে দেখলাম মৃত নর-নারী-শিশু জ্বলছে, আসবাবপত্রজ্বলছে। একটি ঘরে প্রবেশ করে একজন মেয়ে, একজন শিশুসহ বারজন যুবকের দগ্ধ লাশউঠিয়েছে। সেই অবস্থার মধ্যে আমরা সবাই মিলে শাঁখারী বাজারের প্রতিটি ঘরথেকে যুবক-যুবতী, বালক-বালিকা, শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ তুলেছি।পাঞ্জাবী সৈনিকরা সেখানে থাকা অবস্থায় সেই সব অসংখ্য লাশের উপর বিহারীদেরআনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ে লুট করতে দেখলাম। প্রতি ঘর থেকে বিহারীরা মূল্যবানসামগ্রী, সোনাদানা সবকিছু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে দেখলাম।

শাঁখারী বাজারে সারাদিন ধরে অসংখ্য লাশ উঠাতে উঠাতে হঠাৎ এক ঘরে প্রবেশ করেএক আহত অসহায় বৃদ্ধাকে দেখলাম। বৃদ্ধা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ‘পানি পানি’ বলেচিৎকার করছিল। তাকে আমি পানি দিতে চেয়েও দিতে পারিনি। আমি পানি দিতেচেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের পিছনে সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনা পাহারায় থাকায় সেইবৃদ্ধাকে পানি দিয়ে সাহায্য করতে পারিনি।

আমরা নির্দেশ মত ২৮ মার্চ শাঁখারী বাজার থেকে প্রতিবার এক/ দেড়শ’ লাশ উঠিয়েতৃতীয়বার ট্রাক বোঝাই করে তিনশ’ লাশ ধলপুর ময়লা ডিপোতে ফেলেছি। ১৯৭১ সালের২৯ মার্চ সকাল থেকে আমরা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর ও প্রবেশ পথের দু’পাশথেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা কালীবাড়ী, শিববাড়ী, রোকেয়া হল, মুসলিম হল, ঢাকা হল থেকে শত শত লাশ উঠিয়েছি।” মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে লাশ তোলারলোমহর্ষক ও হৃদয় বিদারক দৃশ্য তুলে ধরে চুন্ন ডোম বলে: “২৯ মার্চ আমাদেরট্রাক প্রথম ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে যায়। আমরা উক্ত পাঁচজন ডোম মিলেহাসপাতালের প্রবেশ পথে নেমে কয়েকজন বাঙালি যুবক ও যুবতীর পচা, ফোলা, বিকৃতলাশ দেখতে পেলাম। গলে যাওয়ায় লোহার কাঁটার সঙ্গে গেঁথে লাশ ট্রাকে তুলতেহয়েছে। ইন্সপেক্টর সাহেব পঞ্চম আমাদের সঙ্গে ছিলেন। সেখান থেকে আমরা লাশঘরে প্রবেশ করে বহু যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কিশোর ও শিশুর স্তূপীকৃত লাশদেখলাম। সে যেন লাশের পাহাড়। আমি এবং বদলু ডোম লাশ ঘর থেকে লাশের পা ধরেটেনে ট্রাকের সামনে জমা করেছি। আর রঞ্জিত (লাল বাহাদুর), কানাই ও গণেশ ডোমকাঁটা দিয়ে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে পচা, গলিত লাশ ট্রাকে তুলেছে। সেখানকার প্রতিটিলাশ শত শত গুলিতে ঝাঁঝরা অবস্থায় পেয়েছি। মেয়েদের লাশের কারও স্তন পাইনি।মেয়েদের লাশের যোনিপথ ক্ষত-বিক্ষত এবং পিছনের মাংস কেটে নেয়া অবস্থায়দেখেছি। মেয়েদের লাশ দেখে মনে হয়েছে, হত্যা করার আগে তাদের স্তন ধারালোছোরা দিয়ে কেটে তুলে নেয়া হয়েছে। মেয়েদের যোনিপথে লোহার রড কিংবা বন্দুকেরনল ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। যুবতী মেয়েদের যোনিপথের এবং পিছনের মাংস যেন ধারালোচাকু দিয়ে কেটে এসিড দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি যুবতী মেয়ের মাথায়খোঁপা চুল দেখলাম। তাদের সুন্দর মুখগুলো দেখে খুব কষ্ট পেলাম বুকে। এইসুন্দর সুন্দর মেয়েদের বাবা-মা কোনদিন এদের মুখ আর দেখতে পাবে না মনে করেখুব কষ্ট হলো। মিটফোর্ড থেকে আমরা প্রতিবার এক/ দেড়শ’ লাশ নিয়ে ধলপুর ময়লাডিপোতে ফেলেছি।

 

সাহেব আলী

সুইপার ইনস্পেক্ট, ঢাকা

 ২৬মার্চ সুইপার কলোনির দোতলা থেকে নেমে বাবুবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে দেখলামফাঁড়ির প্রবেশপথে, ভেতরে, চেয়ারে বসে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে দশজন পুলিশ।ইউনিফর্ম পরা পুলিশদের সারা শরীর গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা। রক্তাক্ত হয়ে পড়েআছে। আমি বাবুবাজার ফাঁড়ির ভেতরে ঢুকে দেখলাম ফাঁড়ির চারদিকের দেয়াল হাজারহাজার গুলির আঘাতে ফোকর হয়ে গেছে। দেয়ালের চারদিকে মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত, তাজা রক্ত জমাট হয়ে আছে। সেখানে দেখলাম বাঙালি পুলিশ কেউ জিভ বের করে পড়েআছে। কেউ হাত-পা টানা দিয়ে আছে। প্রতিটি লাশের শরীরে অসংখ্য গুলির চিহ্ন। এরকম শত শত বীভত্স দৃশ্য দেখে একটি ঠেলাগাড়িতে করে আমি ও আমার সাথের ডোমরামিলে সকল লাশ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে লাশঘরে রেখে আসি। সেখান থেকেঠেলাগাড়ি নিয়ে শাঁখারী বাজারে প্রবেশ করে একেবারে পূর্বদিকে ঢাকাজজকোর্টের কোণে হোটেল-সংলগ্ন রাস্তায় এসে দশ-বারোজন অসহায় ফকির মিসকিন ওরিকশা মেরামতকারী মিস্ত্রির উলঙ্গ ও অর্ধ-উলঙ্গ লাশ দেখে আঁতকে উঠলাম।সেগুলো সব মুসলমানের লাশ ছিল। রাস্তায় পড়ে থাকা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত লাশগুলিঠেলাগাড়িতে তুলে আমরা মিটফোর্ড নিয়ে গেলাম। মুসলমানের লাশ আমরা স্থানীয়লোকজনের সাহায্যে তুলে মিটফোর্ডে জমা করেছি। রাজধানী ঢাকার সর্বত্রকার্ফ্যু থাকা সত্ত্বেও গণহত্যার সেই বীভত্স দৃশ্য দেখার জন্য ছাত্র-জনতারাস্তায় রাস্তায় বের হয়ে এলে পাকিস্তানি সেনারা ঘোষণা দেয় যে, ঢাকায়কারফিউ বলবত্ রয়েছে। কেউ রাস্তায় বের হলে দেখামাত্র গুলি করা হবে।পাকিস্তানি সেনাদের এ ঘোষণার পর আমরা সরে পড়লাম।

———————————————————————————–

২৮ মার্চ ১৯৭১-এর নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, অপারেশন সার্চলাইট-এর ঐ একরাতেরহত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারায় দশ হাজার নিরস্ত্র বাঙালী, যদিও ১ এপ্রিলনিউইয়র্ক টাইমস বলে ৩৫,০০০ হাজার বাঙালীর প্রাণহানি হয় অপারেশনসার্চলাইট’র একরাতে। সিডনির মর্নিং হেরাল্ড ২৯ মার্চ ১৯৭১-এ বলেছে অপারেশনসার্চলাইটে মোট নিহতের সংখ্যা ১০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ জন হতে পারে।

এই সম্পর্কে  জহির রায়হান স্যারের “Stop Genocide” প্রামাণ্যচিত্রটি দেখতে পারেন-

YouTube Preview Image

 

২৫ মার্চ এবং এর পরবর্তী সময়ের  কিছু আলোকচিত্র দেখা যাক-

10849729_836628439727840_406781250184188217_n২৬ মার্চ সকালের দৃশ্য

8513830795_8ecfd31520_hকাকেরও যেন অভুক্তি ধরে গিয়েছে বাঙালির শবচ্ছেদ করতে করতে

8977_836624353061582_3664525120082460235_nছিন্ন বিছিন্ন দেহ- চোখটাও বুঝি তুলে নিয়েছে

10167927_836624393061578_5629364033990956846_nকোন এক মায়ের নাড়িছেঁড়া মানিক, পরে আছে ক্ষত বিক্ষত দেহ নিয়ে

10410985_836646389726045_8644695680098541951_nএমন বীভৎসতার নমুনা কি আর কোথাও আছে !

আমি স্তব্ধ!! লেখার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলছি। আর ফেলবো না-ই বা কেন, এমন বীভৎসতার ইতিহাস জানার পরেও কি কেউ স্বাভাবিক থাকতে পারে!! কোন মানুষের পক্ষে কি এরকম বর্বরোচিত কাজ করা সম্ভব? আমি কাদের মানুষ বলছি! পশুর অপর নামই হল “পাকিস্তানী”।

জানেন তো, এত সহজে ঐ মানচিত্রটাকে পাইনি, এতো সহজে ঐ পতাকাটাকে অর্জন করিনি, এতো সহজে স্বাধীনতার স্বাদ নিই নি।কিন্তু আজকে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে যখন দেখি দেশের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা ঘটা করে “পাকিস্তান ডে” পালন করে, তখন মনে শংকা জাগে এ জাতি কি সত্যিই স্বাধীনতা ভোগ করবার যোগ্য (?) প্রশ্নটা আমি রেখে গেলাম আমার প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে…

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. http://www.janotarkontho.com/?p=40002
  2. http://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%85%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%A8_%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%9F
  3. বাংলাদেশের জন্ম; রাও ফরমান আলী খান (ভূমিকা- মুনতাসীর মামুন)
  4. মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতনের দলিল; বিপ্রদাশ বড়ুয়া
erectalis tadalafil

You may also like...

  1. আমি কাদের মানুষ বলছি! পশুর অপর নামই হল “পাকিস্তানী”। cialis 20 mg prix pharmacie

    ভুল বললেন,পাকিস্তানীরা তো পশু না,পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। কি আর বলব বলেন, ৪৩ বছর পর যখন দেশের মানুষের হৃদয়ে পাকিস্তান এর জন্য সফট কর্নার থাকে তখন মনে হয়,এরা কি এসব জানেনা? এসব বিশ্বাস করেনা? যদি জানে তাহলে কিভাবে একজন মানুষ এই জিনিসগুলা উপেক্ষা করে চলতে পারে? খুব জানতে ইচ্ছা হয়।

  2. এই নৃশংস পশুগুলোর কথা আর কি বলব! মুখের ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা। :evil: :evil: :evil:

  3. ঘুমন্ত বলছেনঃ

    মানুষ যে কিভাবে এতটা কর্পোরেট হতে পারে বুঝিনা। যারা একাত্তর সম্পর্কে জানে,পড়েছে,শুনেছে তাদের তো এমন করার কথা না। এতগুলা মানুষের রক্ত কি তাদের কাছে একটুও মূল্যবান না? তাদের কি একটিবারের মতও মনে হয়নি সেসব মানুষের কথা যারা অকারণে প্রাণ দিয়েছিল সেসময়? লজ্জা লাগেনা পাকিস্তান ডে ক্রোড়পত্র ছাপাতে? ঘৃনা হয়।

প্রতিমন্তব্যঘুমন্ত বাতিল

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

cheap 100mg viagra

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

doxycycline reviews malaria