শেষ মধ্যাহ্নভোজ(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

2643

বার পঠিত

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা থানার একটি গ্রাম কামারগাঁও। মজার কিংবা বিস্ময়কর ব্যাপার হল এই গ্রামের সবাই চোর। শুধু চুরি নয়, এই গ্রামে খুন করা মশা-মাছি মারার মতই সাধারণ ঘটনা। ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে বুড়ো-বুড়ি সবার কাজ হল চুরি করা। আগে এ গ্রামে কোনো শিক্ষিত লোকই ছিলোনা। আজকাল এক-আধটা পরিবারের বাপ-মায়েরা বুঝতে পেরেছে যে তারা নিজেরা সারাজীবন চুরি করেছে বলে তাদের ছেলে- পুলেরাও চুরি করে জীবন-যাপন করবে এটা হতে দেয়া যায়না। সেই গ্রামের এক চোর জামাল মিয়া।

জামাল মিয়া ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। পাকঘর থেকে মুরগীর সালুনের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। জামাল মিয়া রান্না হবার অপেক্ষায় আছে। মুরগীটা সে সকালেই পাশের গ্রামের নিতাই মাস্টারের বাড়ির উঠান থেকে চুরি করে এনেছে। তার বড় ছেলে মনির উঠানে মারবেল নিয়ে খেলছে। আর ছোট মেয়ে রুবিনা বড় ভাইয়ের পিছন পিছন দৌড়াচ্ছে। এমন সময় বাড়ির বাইরে থেকে আওয়াজ এলো- জামাল বাড়িত নি? গলা একটু উঁচু করে জামাল উত্তর দিলো- অয় আছি, ভিতরে আয়।
ফারুক জামালের ছোটবেলার বন্ধু। একসাথেই ওরা বড় হয়েছে,  চুরি করা শিখেছে।
–জামাল, তর লগে জরুরি কথা আছে।
–কি কথা?
–একটু বাইরে চল।
বাইরে এসে ফারুক বলে,
–সুরুজউদ্দিন কি কামডা করসে দেখছস?
–কি করসে?
–তুই এখনো জানস না? তোর জমির দুই হাত বাইড়া আইল দিছে।
মুহূর্তে জামালের মুখের গঠন বদলে যায়। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, রাগত স্বরে বলে,
–কি কস? কোন সময়?
–এইতো এইমাত্র আমি দেইখা আইলাম। লগে মেম্বার সাবও আছিলো।
–মেম্বার! মেম্বার আমার লগে এই কামডা করবার পারলো? সুরুজ অখন কই আছে?
–বাড়িত আছে।
–তুই আলীরে খবর দে, আর কইয়া দে তার বল্লমটা নিয়া বাইর হইতে। আমি কুচটা লইয়া বাইরইতাসি।
চুতমারানির পুলারে আইজকা গাইত্থা ফালামু, বহুত বাইড়ে গেসেগা।
–মাথা গরম করিস না। আমরা দেখতাসি বিষয়টা। হাতে না মাইরা হালারে কৌশলে মারতে হইব। তুই খাওয়া দাওয়া কইরা বিষয়টা লইয়া ঠান্ডা মাথায় ভাব। আমি আলীর বাড়িতে যাইতাসি কথা কইতে।
ফারুকের কথায় জামালের মাথা কিছুটা ঠান্ডা হয়। সেও বুঝতে পারে এইভাবে হবেনা, ওরে উচিত শিক্ষা দিতে হইবে। এছাড়া খুন করলে তার নিজেরও বিপদ হবে। সবাই জানে তার লগে সুরুজের শত্রুতা।
সে ফারুককে বিদায় দিয়ে ভিতর ঘরে যাচ্ছিলো হঠাৎ তার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। ঘরের ভিতর গিয়ে সে ডাকলো, বাবা মনির কইরে? মনির তখন খেতে বসেছে, রুবিনা ঘরে নাই। ভাত মুখে নিয়েই জবাব দিল-আব্বা আমি খাইতাসি। ঘর থেকে বের হয়ে গোয়াল ঘরের দিকে গেল জামাল। সেখান থেকে শাবলটা হাতে নিলো।
আবার ঘরে এসে একটু হাক দিয়ে তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলল- কইরে, খিদা লাগসে ভাত দে।
–কিরে বাপ, মুরগীর সালুন কেমন হইসে? মনিরকে জিজ্ঞেস করে সে।
–ভালা হইসে আব্বা, খুব মজা।
–খা মজা কইরা খা। সব সময়তো তোগো ভাল-মন্দ খাওয়াইতে পারিনা।
জামাল মিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে মনিরের খাওয়া। জলে চোখ ভিজে উঠে জামালের। মুরগীর হাড়গুলো কি সুন্দর করে চিবোচ্ছে ছেলেটা। খাওয়া শেষ করে মনির পাতে হাত ধুতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে জামাল মিয়ার হাতের শাবল। মুহূর্তে মাথা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায় মনিরের। মগজ বেরিয়ে আসে মাথা থেকে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘর, ভাতের থালা হাতে জামালের বৌ এসে এই কান্ড দেখে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। জামাল মনিরের লাশটা কাঁধে নিয়ে সুরুজউদ্দিনের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। সুবিধা হয়েছে তার জন্যে। রাস্তায় কোনো মানুষ নাই, জুম্মাবার হওয়ায় লোকজন গ্রামের মসজিদে আর বাচ্চারা বাড়িতে খাবার খাচ্ছে। সুরুজউদ্দিনের বাড়ির পিছনে মনিরের লাশটা রেখে ফারুকের বাড়ির দিকে রওনা হয় জামাল। সেখান থেকে তাকে নিয়ে পুলিশ স্টেশনের উদ্দেশ্যে….হতভম্ব ফারুক প্রায় অনিচ্ছুক পায়ে হেঁটে চলে জামালের পিছন পিছন। পশ্চিম আকাশের দিকে চেয়ে দেখে জামাল, সূর্য ডোবার এখনো অনেক বাকী- এখনো অনেক বাকী।

আজ সুরুজুদ্দিন জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে, গাঁয়ের পথ ধরে বাড়ি ফিরছে। পিছনে ফেলে এসেছে ১৪ টি বছর। ক্ষেতের আইল বাঁধছিল জামাল, সুরুজকে আসতে দেখে তার মুখে ফুটে উঠলো ক্রূর বিজয়ী হাসি। সে হাসি হায়েনাদের হাসি থেকেও জঘন্য, নৃশংস।

You may also like...

  1. শেষের দিকে এসে একটা ধাক্কা খেলাম… :-SS :( X_X
    ভালো হয়েছে গল্পটা… চালিয়ে যান… :)

  2. রাজু রণরাজ বলছেনঃ

    অনেক ভালো হয়েছে গল্প। দিরাই থানায়ও দুইটা গ্রাম আছে “জাতগাঁও” আর “জাহানপুর” নামে ওখানেও সবাই চোর।

  3. অংকুর বলছেনঃ

    এহ ! কি লিখছেন ভাই । খুবই চমত্‍কার । এইটা সত্য গল্প ? এটা সম্ভব ?

  4. শঙ্খনীল কারাগার বলছেনঃ

    গল্প পড়ে একবার টাস্কি খাইলাম,এইটা সত্য গল্প সেইটা জানার পর আরো একবার টাস্কি খাইলাম।টাস্কিতে টাস্টিতে আমি টাস্কিত। চমৎকার হইছে বাহে।

  5. ভাই এইডা কি ছিল??? গল্পটা কি আসলেই বাস্তব?

  6. দুরন্ত জয় বলছেনঃ

    গল্প ভাল লেগেছে……

    নিয়মিত আপনার গল্প পাব আশা করি ।

  7. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    চমৎকার… অসাধারণ অনুগল্প!! :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :-bd :-bd
    অমিত লাবণ্য আপনাকে একই প্ল্যাটফর্মে পেয়ে দারুণ লাগছে!
    আপনার দারুণ দারুণ গল্প – কবিতা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম!
    ধন্যাবাদ সভ্যতাকে।। :গোলাপ নিন: :গোলাপ নিন: :গোলাপ নিন:

  8. গল্পটা ভাল। যদিও আপনার কবিতা পড়ে অভ্যস্ত। তবে সত্য ঘটনা’- এটা খুব অবাক করেছে

  9. গল্পের মাঝামাঝি এসেই বুঝেছি যে, একটা বড় ধরনের শক পেতে যাচ্ছি। অনুমান মিথ্যা হয়নি… X_X

    একজন কবির কাছ থেকে এ ধরনের গল্প অপ্রত্যাশিত এবং অসাধারন আনন্দের… >:D< চালিয়ে যান… :-bd

  10. মারছে, এই অবস্থা গ্রামের!!

  11. স্পীকার বলছেনঃ

    পছন্দ হয়েছে অমিত দা । বুক ফেটে কান্না বেরিয়েছে । অনেক ভালো লেগেছে । metformin synthesis wikipedia

    capital coast resort and spa hotel cipro
  12. চাতক বলছেনঃ

    ভাল লাগলো, একটু ভিন্ন সাধের বলতেই হবে

  13. সোমেশ্বরী বলছেনঃ

    আমিওও এই গ্রামের নাম শুনেছি!
    কিন্তু, এমন ভয়ংকর ঘটনা !!!
    মারাত্মক শক খেয়েছি…আপনি লিখেছেন ভালো, কিন্তু গল্পুটা পড়ে খারাপ লাছে বিধায় ভালো করে প্রশংসা করতে পারলাম না!
    বোঝা যাচ্ছে ভালো একটা আবেদন আছে আওপনার লেখনীতে, চালিয়ে যান।

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

side effects of drinking alcohol on accutane
will metformin help me lose weight fast