শঙ্খনীল কারাগারে… (পার্ট ২)

760

বার পঠিত

জেলখানার প্রথম দিনেই মন খুব খারাপ ছিলো। কিছুক্ষণ পর পর কান্না করছি। আবার কিছুক্ষণ পর মজার কোনো ঘটনা মনে করার চেস্টা করছি। নিজের সাথে নিজেই হাসার চেস্টা করছি। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে বাবা মায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। একটা জিনিস বুঝতে পারলাম যে, আমি এমন একটা জায়গায় এসে পড়েছি, এখন যদি আমি শত চেস্টাও করি এখান থেকে বের হতে পারবোনা। যা করার বাইরের মানুষগুলোকেই করতে হবে। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিলো। বারবার মনে হচ্ছিলো বিচিত্র সব চিন্তাভাবনা। যেমন, আমি চিন্তা করছিলাম, আচ্ছা যদি এমন হয় যে, আমার কেইস ফাইলটা কোথাও হারিয়ে গেল তাহলে আমি এখান থেকে বের হতে পারবো? কিংবা ধরা যাক, সেরেস্তা চা নাস্তা খাওয়ার সময় আমার কেইসের কাগজের উপর চা পড়ে সব নষ্ট হয়ে গেল। তাহলে কি হবে? এখানে ঢুকার পর তো ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া বেরই হতে পারবো না! বারবার নিজেকে সান্তনা দিচ্ছি যে এসব আজগুবি। পরমূহুর্তেই মনে হচ্ছে, ঘটনা বাস্তব হতেও পারে!

আমার রুমে আনুমানিক ১৬/১৭ জন আসামী ছিলেন। আমি সবাইকে আলাদা আলাদা ভাবে খেয়াল করছি। লোহার দরজার পাশেই লোহার জানালা। জানালার পাশের বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে শুয়ে সিগারেট টানছে একজন। তার শুচিবায় দেখে অবাক হচ্ছি। বিছানা পরিস্কার। বালিশের পাশেই বডি স্প্রে। কিছুক্ষণ পর পর গায়ে স্প্রে মারতেছেন। সবাই তাকে জাঙ্গীর ভাই বলে ডাকছে। নামটা সম্ভবত জাহাঙ্গীর। মানুষজনের এই এক সমস্যা। বাঙালি নাম বিকৃত করে মজা পায়। আমাদের গ্রামে এক প্রবীন বৃদ্ধের নাম মোবারক আলী ছিলো। কিন্তু বেচারাকে ছোটোবেলা থেকেই সবাই মরগ আলী ডাকতো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত সফল মুরগী ব্যবসায়ী না হয়েও তিনি মরগ আলী নামটা গর্বের সাথে ধারণ করে আছেন। ভোটার আইডিতেও তার নাম মরগ আলী। যাই হোক, এসব বাজে চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। আমি জাহাঙ্গীর ভাইকে ভালোভাবে খেয়াল করছি। তিনি সিগারেট না ধরেই শোয়া অবস্থায় মনোযোগ দিয়ে সিগারেট টানছেন আর HBO চ্যানেলে কোনো একটা মুভি দেখছেন। জেলখানায় টিভিটা তিনিই আনিয়েছেন। শক্তিশালী এন্টেনায় ঝাপসা ডিস ধরে। ঝাপসা স্ক্রিনে অ্যাঞ্জেলিনাদের দেখে তাকে মোটেও দুঃখিত মনে হচ্ছেনা। তার সারা গায়ে কাটা দাগ। পাশেই দেখলাম এক যুবককে। ছিমছাম। সেইরকমের স্মার্ট। তার বিছানাও পরিস্কার। একে দেখে মোটেও আসামী মনে হচ্ছেনা। আমি নিশ্চিত হলাম, এ নিশ্চয় ধর্ষন মামলার আসামী হবে। তাকে রুবেল নামে ডাকা হচ্ছে। তার পাশেই সিক্স প্যাকের এক যুবক। খালি গায়ে প্যান্ট পরে বসে আছে। তার প্যান্ট পরার স্টাইল বিচিত্র। সে প্যান্ট এমন ভাবে পরেছে যে আন্ডারওয়্যারের অর্ধেকই দেখা যাচ্ছে। এর কথাবার্তা শুনে মোটেও মনে হচ্ছেনা বড়সড় কোনো মামলা নিয়ে এসেছে। ছোটোখাটো চুরি মামলা হতে পারে। একদম কর্ণারের খাটে দুইহাতে মাথা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে চিকনা শরীরের একজন যুবক। গায়ের রঙ উজ্জ্বল কালো। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। লুঙি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে আছে। বারবার আঙুলকে নাকের গর্তে ঢুকাচ্ছে। আরেক হাত তলপেটের কিছুটা নিচে। বারবার মাইকেল জ্যাকসানের মত বিব্রতকর জায়গায় হাত দিয়ে কেঁচকি মারছে। দুনিয়া নিয়ে উদাসীন। তাকে দেখলাম সবাই আলীম ভাই বলে ডাকছে। রুমে আর কাউকে দেখছিনা। একপাশে বসে সবজি কুটছে একটা পিচ্চি ছেলে। পরে জানলাম, এ ব্যাটা পিচ্চি নয়। সে ‘ধাইন্যা মরিচ’ এবং সে এক পোলার বাপ। পোলার বাপকে দেখে রেইপ কেইসের আসামী মনে হচ্ছেনা। এই ছেলের দ্বারা কাউকে খুন করার অসম্ভব মনে হচ্ছে। সে কারো সামনে ছুরি ধরলে বেচারা ভয় পাওয়ার বদলে হাসতে হাসতে মরে যাবে, এমন টাইপের চেহারা। তাকে খুশি খুশি লাগছে। ধরে নিলাম এ অপহরণ কিংবা অস্ত্র মামলার আসামী হবে। তার পাশেই ৫০/৫৫ বছর বয়স্ক একজন খালি গায়ে পান খাচ্ছে। তাকে সন্দেহ জনক মনে হচ্ছে। সে এতক্ষণ জামা গায়ে দিয়ে ছিলো। সকাল থেকে দেখেছি, সে পান খাওয়ার আগে জামা খুলে ফেলে। পান খাওয়া শেষ করে আবার জামা গায়ে দেয়। যথারীতি এখনও পান খাওয়ার আগে জামা খুলেই পানটা মুখে দিয়ে চাবাচ্ছে। চোখ দেখে ডাকাতের মত মনে হচ্ছে কিন্তু নিষ্পাপ চেহারা। আমার ওয়ার্ডে সবচেয়ে লম্বা। তাকে সবাই জসীম ভাই বলে ডাকছে। আর তরকারি কুটায় ব্যস্ত এক পোলার বাপকে সবাই জাহিদ্যা বলে ডাকছে। তার মানে ওর নাম জাহিদ।

শাহাবুদ্দীন ভাই এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের বাবা মা রা এসেছে নাকি। আমার আবার মন খারাপ হল। জানি তারা আসবেই। কিন্তু আসছেনা কেন টেনশান হচ্ছে। আম্মুর চেয়েও আব্বুর কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে। পুলিশের হাতে যেদিন অ্যারেস্ট হলাম সেদিন সকালেই তিনি তার কর্মস্থল মীরসরাইতে গিয়েছিলেন। এরপর অ্যারেস্টের খবর শুনেই আবার চট্টগ্রাম রওনা দিলেন। চট্টগ্রাম পৌঁছতেই আমি তখন ডিবি কার্যালয়ে। আমাদের দুইজনকে আলাদা একটি রুমে আঁটকে রাখা হয়েছে। আমাদের সাথে আরেকজন আসামী আছেন। সারা রুমে প্রস্রাব, পানি, ধোঁয়া। ছোট্ট একটা জানালা। আমি এই স্মৃতিটা কখনো ভুলছিনা। বিকাল ৫-৫.৩০ নাগাদ আব্বু এলেন। এসে দাঁড়ালেন আমার জানালার সামনে। আমি নিশ্চিত, তাকে এতটা বিদ্ধস্তরূপে দেখিনি কখনো। তিনি অবিশ্বাস্য স্নায়বিক শক্তি নিয়ে জন্মেছেন বলে আমার ধারণা। তার হার্ট অ্যাটাকের দিন নিজেই হাঁটতে হাঁটতে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। ডাক্তার সবকিছু চেক করে ধমক দিলেন তাকে, “আপনি মানুষ না আজরাঈল? এখনো হাসপাতালে ভর্তি হন নাই?!” তো সেই আজরাঈল বাবাকে এত ব্রোকেন অবস্থায় দেখবো আমি ভাবিনি। তার মুখে গাঢ় বিষ্ময় নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “কিরে? তুই এখানে কেন?” এই প্রশ্নটাই আমার শোনা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন যেটার উত্তর দেয়ার মত ভাষা পাইনি আমি। আমি জেলখানায় বসে ভাবছি তিনি আবার হার্ট অ্যাটাক করলেন কিনা। মন খারাপ হয়েই বাংলা বইটা তুলে নিলাম। কয়েকটা কবিতা পড়ার ট্রাই করলাম। মাথায় কিছু ঢুকছেনা। আচ্ছা, একটা কবিতা লিখলে কেমন হয়? খাতার একটা পেইজ ছিঁড়ে একটা কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটা জেলখানায় পরে খুব বিখ্যাত হয়েছিলো। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কবিতাটা আমার মনে নেই।

দেখতে দেখতে দুইটা বা আড়াইটা বেজে গেল। এর মাঝেই সেই বিশ্রী খাদ্যটা এলো। ভাত, ডাল, সবজি। জেলখানার দুইটা জিনিস সবচেয়ে বিখ্যাত। ফাইল আর ডাইল। এখানে সকাল সাতটায় আসামীদের ঘুম থেকে তুলে ফাইল করা হয়, আবার বিকাল পাঁচটায় সবাইকে তালা লাগিয়ে দিয়ে ফাইল করা হয়। এটা দৈনন্দিন রুটিন। যিনি ফাইল করেন তাকে সবাই ওস্তাদ বলে ডাকে। আমি কোনোরকমে সেই অখাদ্য খাবারের কিছুটা গিললাম। গিলেই অপেক্ষা করছি বাবা মায়ের জন্য। অবশেষে তিনটার দিকে আমাদেরকে একজন কয়েদী ডাকতে এলো। আমি একরকম ছুটে গেলাম। আর তখনই প্রথম অনুভব করলাম, জায়গাটা অসাধারণ সুন্দর লাগছে। চারিদিকে ব্যস্ততা। পাকা রাস্তা দুইপাশে ফুলের বাগান। আসামীরা খাওয়া দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। সবাই আয়োজন করে খাচ্ছে। প্লেটের টুংটাং শব্দে আমারও ক্ষিদে লেগে গেল আবার। মেডিকেল ওয়ার্ড থেকে বের হয়েই পকেটে হাত দিয়ে হাঁটছি স্বাভাবিকভাবে। সবাই আমাকে অন্যরকম ভাবে দেখছে। আমি নিজেও খেয়াল করলাম যে, আমাকে অন্য আসামীদের মত লাগছেনা। আমি তাড়াতাড়ি সাক্ষাৎ কক্ষের সিঁড়ি ঘরে গেলাম। আমার হাতের তালুতে একজন সাক্ষাত স্লিপের নাম্বার লিখে দিলেন। আমি হাসি হাসি মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি বিব্রত হয়ে খুব সাবধানে প্যান্টের চেইন লাগালেন। আমি হাসতে হাসতে উপরে উঠে এলাম। উপরে এসেই মানুষের ভীড়ে বাবা মা কে খুঁজছি। আম্মুর গলার আওয়াজ শুনেই বুঝলাম ঐ তো আম্মু। কিন্তু দেখা করাটা আরো খারাপ লাগলো। মাঝখানে বিশাল দেয়াল। দেয়ালের মাঝে ঘন লোহার জালি। আর অন্ধকার। কেউ কাউকে পুরোপুরি দেখেনা। কেবল অনেক কষ্টে মুখের গঠনটা বুঝতে পারে আইডিয়া করে। স্পর্শ করার উপায় নেই। আমার পাশেই অন্য অনেকে স্বজনদের সাথে কথা বলছেন। কারো মাঝে তাড়া নেই। সবাই স্বাভাবিক। শুধু আমার মাঝে বাইরের সূর্যটা দেখার প্রবল আকুতি। ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়না। বরং উপায় থাকলেই ইচ্ছা করা উচিত। উপায়হীন কোনো কিছু ইচ্ছা করলে অপ্রাপ্তির জ্বালায় পুড়তে হয়। এই শিক্ষাটা সাক্ষাৎকক্ষে চূড়ান্তভাবে পেলাম। renal scan mag3 with lasix

সাক্ষাৎকক্ষ থেকে বের হয়েই মনটা ফুরফুরে লাগলো। আম্মু জুস চিপস পাঠাচ্ছে কিছুক্ষণ পর। আম্মু ভাত মাছ মাংস রান্না করে এনেছিলেন। কিন্তু সেগুলো ঢুকতে দেয়া যাবেনা। আব্বু আম্মুকে আবারও জিজ্ঞেস করলাম যে গতকাল আমাদের দুইজনের জন্য ২৪ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে কিনা। জিজ্ঞেস করাটা বোকামি হয়েছিলো। আমার সামনেই তারা টাকা দিয়েছিলেন পুলিশকে। কিন্তু সুপারভাইজার বলছেন যে তিনি টাকা পান নি! আর পুলিশ বলছে সে সুপারভাইজারকে টাকা দিয়েছে। কে মিথ্যা বলছে?

মেডিকেল ওয়ার্ডের বাইরে হাঁটছি। সূর্য পড়ে আসছে। পাঁচটা বাজেই আমাদেরকে নিজেদের রুমে ঢুকিয়ে পরদিন সকাল সাতটা পর্যন্ত তালা বন্ধ করে রাখা হবে। সিদ্ধান্ত নিলাম একাকীত্বটা কাটানোর জন্য আজকের মাঝেই পরিচিত হয়ে নিবো সবার সাথে। আসামীদের দেখে খুব আপনজন মনে হচ্ছে। সবাই কৃতকর্ম ভুলে এখানে হাসি তামাশায় ব্যস্ত। একজন আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। অনেক লম্বা। মাথায় চুল নেই। মাথায় কাটা দাগ। চোয়ালের উপরেও একটা কাটা দাগ ছিলো।

-তুমি কে?
-মানে? নাম জিজ্ঞেস করতেছেন?
-হ্যাঁ।
-ইলেকট্রন।
-এটা কি জিনিস?
-ছদ্মনাম। আসল নাম বলা নিষেধ।
-নিষেধ কেন? ইলেকট্রন মানে কি?
-কিছুনা। অর্থ নাই।
-বাড়ি নোয়াখালি?

ব্যাপারটা ভয়াবহ অড লাগলো। বাংলা কোচিং করতাম আইয়ূব স্যারের কাছে। আমি কোনো প্যাঁচানো একটা প্রশ্ন করলেই স্যার বলতেন, “তুমি নোয়াখাইল্লা!” তার মতে নোয়াখাইল্লারাই কথা প্যাঁচায়। এটা নিয়ে তিনি একটা গল্প বলেছিলেন। এক হুজুর ওয়াজ শুরুর আগেই নাকি বলেছিলেন, কোনো নোয়াখাইল্লা থাকলে বের হয়ে যান। এরপরই ওয়াজ শুরু করলেন। ওয়াজে বললেন, “গাছ থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে পড়ল। যে পাতাটা পানিতে পড়ছিলো সেটা কুমির হইলো। আর যেটা মাটিতে পড়লো সেটা মানুষ হয়ে গেল”। একজন হাত তুলে বললো, “কিন্তু হুজুর যে পাতাটা অর্ধেক পানি, অর্ধেক মাটিতে পড়ছিলো সেটা?” হুজুর চিৎকার করে বললেন, “আমি এজন্যই বলছিলাম নোয়াখাইল্লারা বাইরে যান”। গল্পটা শুনে অনেক হাসাহাসি করছিলাম। কথাটা সত্য হতে পারে যে নোয়াখালির মানুষরা জাতিগতভাবে চালাক। আমি নোয়াখালির না, আমি ফেনীর মানুষ। তবে এটা নাকি বৃহত্তর নোয়াখালির অংশ। দেখো কারবার! এখন এখানে এসেও শুনতে হচ্ছে আমি নোয়াখালির। আমি বিচলিত ভাবটা আড়াল করে বললাম,

-তার মানে গল্পটা আপনি জানেন?
-কোন গল্প? তুমি নোয়াখালি?
-না আমি রাহী। আমার বাড়ি ফেনী।
-রাহী এটা কিরকম নাম?
-রাহী এমন একটা নাম যেটাকে উল্টা করলে হয় হীরা।

এই পর্যায়ে তিনি আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছেন বলে মনে হল। রাহী নাম নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে আমি সবাইকে এইরকম উত্তরই দিই। হুঁ! ঢং দেখো। “রাহী কিরকম নাম!” আমি তাকে আর উত্তক্ত্য করলাম না। তার ব্যাপারটা পরে দেখা যাবে। লক আপের সময় চলে আসতেছে। আমি দৌড়ে রুমে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পরই আম্মুর দেয়া বিস্কুট, জুস চলে আসলো। আরো অনেক কিছু ছিলো। আমার মনে নাই। আমি বসে বসে জুস খাওয়া শুরু করে দিলাম। প্যাকেট গুলো নিচে রাখলাম। গিয়ে বসলাম জাহাঙ্গীর ভাইদের বিছানায়। লোকটাকে আজ সারাদিন ধরে খেয়াল করতেছি। তিনি হা করে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আর শুয়ে শুয়ে পা নাড়াচ্ছেন। পা নাড়ানোর তালে তালে তার ভুঁড়িটাও নড়তেছে। তার ভুঁড়ির তরঙ্গ দেখে হাইগেনের তরঙ্গসূত্রটা মনে পড়ে যাওয়া খুব বেশি অবাস্তব নয়। তিনি কিছুক্ষণ পর পর হাসতেছেন। তার হাসিটা প্রাণখোলা কিন্তু সুন্দর লাগেনা। অকারণে ভেটকায়। জোকার একটা। রুমে মোটামুটি সবাই চলে এসেছেন। ফাইল করার জন্যে ওস্তাদ চলে আসছেন। সবাই চারজন চারজন করে বসে গেল। দুই তিনবার গুণে তিনি খাতায় সেটা লিখে একটা সই করে দিলেন। পিছনেই একজন ইয়াব্বড় তালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার খয়েরি বাটা জুতাকে লাথি মেরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার সাতশো টাকার জুতা। আমি একরকম চিৎকার করে উঠলাম, “এইইইই!! এটা আমার জুতা”। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন যে, এটা তিনি নিয়ে যাচ্ছেন না। লকাপের পাশেই একটা বিশাল ঔষধের বাক্সো। সেখানেই রাখতেছেন। আমি লজ্জা পেয়ে আবার চুপ করে বসে বসে জুস খেতে লাগলাম। অজ্ঞাত কারণে সবাই আমাকে ধীরে ধীরে পছন্দ করা শুরু করলেন।

আমি মোটামুটি মধুর যন্ত্রনায় আছি বলা যায়। পড়তে খুব ইচ্ছা করছে, আবার ইচ্ছা করছেও না। এরই মাঝে দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে আসছে। তার আগে একটা কথা বলে নিই। আমি কিন্তু এই ঘটনা গুলো ডে বাই ডে লিখছি না! চব্বিশটা দিনের প্রত্যেক মুহুর্তের স্মৃতি গুলো আমার মনে নেই। আমি সর্বাত্মক চেস্টা করছি যতটুকু বলা যায়! হয়তো দেখা যাবে কয়েকটা দিন বিশেষ কিছুই ঘটেনি যেগুলা আলাদা করে বলার মত। সেই দিনগুলো কল্পনা করে নিন যে, আমি চুপ করে বসে থাকতাম, কিংবা বাইরে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, বেশির ভাগ সময় মেডিকেল ওয়ার্ডের এমাথা ওমাথা হাঁটাহাঁটি করতাম কিংবা জাহাঙ্গীর ভাইদের সাথে ফান করতাম। যাই হোক, আমি নিজের বিছানায় উঠে আসলাম। জিয়া-রুবেল-জাহাঙ্গীর ভাইরা অলরেডি গান বাজনা শুরু করে দিয়েছে। জাহাঙ্গীর ভাই বিচিত্র সব গান গাওয়া শুরু করেছেন। পরে জানলাম এগুলো নাকি জেলখানার স্পেশাল গান। জেলখানায় আসলে এইসব গান গাইতে হয়। এটাই নিয়ম। জেলখানার স্পেশাল কয়েকটা গানের টাইটেল নাম গুলো হল “মা গো মা, জামিন কর না” , “মায়ের কান্দন যাবজ্জীবন” ইত্যাদি। প্রায় সবগুলো গানই মা কেন্দ্রিক। একটা বিষয় নিশ্চিত হলাম, পিতৃতান্ত্রিক পরিবার নামে হলেও হৃদয় গত ভাবে বাংলাদেশ একটি মাতৃপ্রধান দেশ। পিতা রা দেবতার মত, তারা অধরা এবং রহস্যময় চায়ের কাপের মত। গরম হয়ে গেলে অপেক্ষা করা ছাড়া ঠান্ডা করার উপায় নেই। আর মায়েরা হচ্ছে কাস্টোমাইজড। অনেকটাই ফ্যানের রেগুলেটরের মত। যখন ইচ্ছা নিজের মত কাস্টোমাইজ করে নাও। metformin gliclazide sitagliptin

সন্ধ্যায় দেখলাম সবাই চা খাচ্ছে। এখানে চা খুব দামী বস্তু। কাপপ্রতি নয় দশটাকার মত পড়ে। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের পক্ষ থেকে আমাকেও চা দেয়া হল খানিকটা। চা অসাধারণ বানিয়েছে। বেহেস্তে শরাব আর দুধের ঝরনা নয়, চায়ের ঝরনা থাকাই উচিত ছিলো। চা শেষ করে বসে বসে আবার পড়ার চেস্টা করলাম। গোঁ গোঁ করে কিছুক্ষণ পড়লাম। দেখতে দেখতেই নয়টার মত বেজেছে। ঐদিকে টিভি তো চলতেছেই। সবাই হা করে টিভি দেখছে। নয়টা বাজার সময় কে জানি হঠাৎ করে চিক্কুর দিলো। “ও রে পাখি রে…” ব্যাপার কি সেটা দেখার জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি খালি গায়ের জসীম ভাই হা করে তাকিয়ে আছেন টিভির দিকে। খেয়াল করে দেখলাম সবার চোখ টিভির দিকে। টিভিতে স্টার জলসা চ্যানেল সুন্দর করে একটা মেয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর সম্ভবত বলছে “কেন সে আমার সাথে এমন করলো। কি পাপ করেছি আমি?”। ভয়াবহ প্রশ্ন। দুনিয়ার সকল পাপ মানুষই করে, আবার মানুষই জিজ্ঞেস করে কি পাপ করেছি আমি। এই মেয়ে কি পাপ করেছে সেটা জানার জন্য বই বন্ধ করে আমিও টিভির দিকে নজর দিলাম। সবাই পাখির জন্য আফসোস করছে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল নায়কের পায়ে কাচ ঢুকেছিলো। কাচ বের করে দেয়ায় পাখিকে ঝাড়ি দিয়েছে নায়ক। জনতা ক্ষেপে গেল নায়কের উপর। একজন মা বাপ তুলেও গালি দিয়ে দিলো এই ফাঁকে। কেউই মেনে নিতে পারছেনা পাখি এই কাজ করে ভয়াবহ অপরাধ করে ফেলেছে। আমিও মেনে নিতে পারছিনা। পলিথিনের প্যাকেট থেকে আম্মুর দেয়া চিপস বের করে খাওয়া শুরু করলাম আর গোঁ গোঁ করে বাংলা পড়তে লাগলাম। “বুঝেনা সে বুঝেনা” সিরিয়াল শেষ হওয়ার পরই সবাই ভাত খেতে বসে গেল।

জাহাঙ্গীর-রুবেল-জিয়া-আলীম এই চারজন সিন্ডিকেট। তারা নিজের পয়সা খরচ করে চিনিগুঁড়া চাল মাছ মাংস এনে জেলে বসে তৃপ্তি করে ভাত খায়। বাকিদের এত টাকা পয়সা নেই বা থাকলেও খরচ করতে উৎসাহী না। তারা সাধারণ খাবার খায়। আমি বিগত দিন কিছুই খাচ্ছি না অরুচিতে। হঠাৎ করে খেতে ইচ্ছা হল। যত খারাপই হোক রান্না, কিন্তু সেই রাতের আলু-গাজর এর তরকারি আর ডাল স্রেফ অসাধারণ লেগেছিলো। কাঠের মত শক্ত মাছ খাওয়ার মানে হয়না। আমি ডাল আর আলু-গাজর দিয়ে তৃপ্তি মোতাবেক ভাত খেয়ে উঠে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরই সবাই ঘুমিয়ে পড়বে বুঝতে পারছিলাম। আর সবাই ঘুমালে রুবেল আর জাহাঙ্গীর ভাই টিভি চালিয়ে TLC চ্যানেলে রান্নার অনুষ্ঠান দেখবে সেটাও বুঝতে পারছিলাম। TLC চ্যানেলের রান্নার অনুষ্ঠান সেই রাতে আমিও দেখেছিলাম পড়ার ফাঁকে। জীবনে প্রথম কোনো রান্নার অনুষ্ঠান দেখে লজ্জা পাচ্ছিলাম। তাই পড়ার ভান করে বই এর ফাঁকে চোখ ঘুরিয়ে দেখছিলাম। জাহাঙ্গীর ভাই সিগারেট টানছে। কিছুক্ষণ পরই বই বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। জীবন থেকে শেষ হয়ে গেল আরেকটি জেগে থাকার অনুভূতি।

(To be continued…)

You may also like...

  1. cialis new c 100
  2. লেখার মধ্যে রস-বোধ আছে। সূক্ষ্ম হাসি-ঠাট্টার ওড়না মুখে চেপে , কষ্টের কথাগুলি বলতে , কেন জানি কেউ কেউ খুব পছন্দ করে।

    নজরুলের একটা গল্পের লাইন কখনো ভুলতে পারি না – can you tan after accutane

    “মেহেদির বুকে যে কত খুন লুকানো থাকে , তার খবর কে রাখে..”

  3. জন কার্টার বলছেনঃ

    চমকপ্রদ! অসাধারণ কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন বোঝা যাচ্ছে!

    …কোথায় যেন শুনেছিলাম জীবনে একবার জেলে না গেলে জীবনে অনেক শিক্ষা ও নিজেকে চিনতে অনেকটাই বাকি থেকে যাই!

  4. লেখা হিসেবে দুর্দান্ত, সময়টা বন্ধুর হলেও!
    লেখা টা পড়ে মজা লাগছিল, কিন্তু যখনই ভাবছি এই ঘটনা গুলা আপনজনের সাথে ঘটেছে তখনই খারাপ লাগছে।

  5. শঙ্খনীল কারাগার বলছেনঃ

    আজকাল কম্পিউটার স্কিনে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারিনা। চোখ জ্বালা করে আসে, ভিজে আসে। আমি পিশাচ জাতীয় মানুষ। মন খারাপের জন্য এমনটা হয়েছে তা ভাবা বোধ হয় অনুচিত হবে। আপনার আত্বজীবনীর তৃতীয় কিস্তি পড়ার অপেক্ষায় থাকবো।

    thuoc viagra cho nam
    irbesartan hydrochlorothiazide 150 mg
  6. লেখাটা গোছানো !! মাঝে মাঝে মনেহয় তুমি মানুষ নও!! এলিয়েন জাতের কিছু একটা!! এরকম দুর্বিসহ সময়ের বিবরণ এতো রসাত্মক ভাবে কি করে দাও !! আমি হলে জেলে বসে শুধু নিজের মৃত্যু কামনা করতাম…
    ভেতরে অফুরন্ত প্রাণশক্তি তোমার। তাই হয়তো এভাবে পারো। ধরে রাখো এই প্রাণশক্তিটাকে। শুভকামনা রইলো :smile:

  7. নিজের এমন দুর্দশাগ্রস্ত কাহিনী যে এমন রম্য ভাবে উপস্থাপন করতে পারে সে একজন বিশিষ্ট লেখক হওয়ার যোগ্যতা রাখে ।

  8. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    কিছুক্ষণ পড়ার পর নিজেকে জেলখানায় কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। যথারীতি ব্যর্থ হয়ে সূর্যালোক দেখার অকুতি অনুধাবনের ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। অসাধারণ লিখনি শৈলী, আর হাস্যরস, বাস্তবতা কিছু চমৎকার চিত্রকল্প আর দারুণসব উপমা। জীবনকে ছুঁয়ে যায়…
    পরবর্তী পর্ব পড়ার অপেক্ষায় রইলাম…

    viagra vs viagra plus

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

tome cytotec y solo sangro cuando orino
ovulate twice on clomid
about cialis tablets