বিস্মৃতির অতলে চাপা পড়া এক কল্পনাতীত নিকৃষ্টতা এবং নাম না জানা কিছু মা-বোনের ইতিহাস ( ১ম পর্ব)

5315

বার পঠিত

  ‘‘বীরাঙ্গনা’’ শব্দটি বাংলা ভাষায় বীর নারী বা বীর্যবতী নারীর বিশেষণেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৭১ সালের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশের পর ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দটি ভিন্ন তাৎপর্য ধারণ করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম আঘাত আসে নিষ্পাপ অসহায় নারীদের ওপর। স্বৈরশাসক ইয়াহিয়ার প্রথম আক্রোশের আগুনে দগ্ধ হয় বাঙালি নারীরা। ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালে সরাসরি বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পাকিস্তান আর্মিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।যশোরে ছোট্ট একদল সাংবাদিকের সাথে কথা বলার সময় তিনি এয়ারপোর্টের কাছে জড়ো হওয়া একদল বাঙালির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেন যে-

” আগে এদেরকে মুসলমান বানাও…” 

এই উক্তির তাৎপর্য সীমাহীন। এর অর্থ হচ্ছে যে, উচ্চ পর্যায়ের সামরিক অফিসারদের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে বাঙালিরা খাঁটি মুসলমান নয়। এই ধারণার সাথে আরো দুটো স্টেরিওটাইপ ধারণাও যুক্ত ছিল।বাঙালিরা দেশপ্রেমিক পাকিস্তানি নয় এবং তারা হিন্দু ভারতের সাথে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ।ইয়াহিয়া খানের এই উক্তিতে উৎসাহিত হয়ে পাকিস্তান আর্মি বাঙালিদেরকে মুসলমান বানানোর সুযোগ লুফে নেয়। আর এর জন্য সহজ রাস্তা ছিল বাঙালি মেয়েদেরকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে তাদেরকে দিয়ে সাচ্চা মুসলমান বাচ্চা পয়দা করানো।পাকিস্তানি সৈন্য এবং তার এদেশীয় দোসররা শুধু যত্রতত্র ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি।জোর করে মেয়েদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ধর্ষণ ক্যাম্পে। দিনের পর দিন আটকে রেখে হররোজ ধর্ষণ করা হয়েছে তাদের। পালাতে যাতে না পারে সেজন্য শাড়ী খুলে নগ্ন করে রাখা হতো তাদেরকে। সিলিং এ ঝুলে আত্মহত্যা যাতে করতে না পারে তার জন্য চুল কেটে রাখা হতো তাদের। পাকিস্তান আর্মির দোসর রাজাকার এবং আলবদরেরা জনগণকে বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত করে দেশছাড়া করে তাদের সম্পত্তি এবং জমিজমা দখলের জন্য ধর্ষণকে বেছে নিয়েছিল।  Sujan Brownmiller নামের একজন লেখক তাঁর ” Against Our Will: Men, Women and Rape “নামক গ্রন্থে লিখেছেন-

 “একাত্তরের ধর্ষণ নিছক সৌন্দর্যবোধে প্রলুব্ধ হওয়া কোন ঘটনা ছিলনা আদতে; আট বছরের বালিকা থেকে শুরু করে পঁচাত্তর বছরের নানী-দাদীর বয়সী বৃদ্ধাও স্বীকার হয়েছিল এই লোলুপতার। পাকসেনারা ঘটনাস্থলেই তাদের পৈচাশিকতা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; প্রতি একশ জনের মধ্যে অন্তত দশ জনকে তাদের ক্যাম্প বা ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হতো সৈন্যদের জন্য। রাতে চলতো আরেক দফা নারকীয়তা । কেউ কেউ হয়ত আশিবারেও বেশী সংখ্যক ধর্ষিত হয়েছে ! এই পাশবিক নির্যাতনে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, আর কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা হয়ত কল্পনাও করা যাবে না ।(Brownmiller, p. 83)”

পাকিস্তান আর্মির উচ্চ পদস্থ অফিসাররা যে ব্যাপকহারে ধর্ষণের ব্যাপারে জানতেন এবং তাদের যে এ ব্যাপারে প্রচ্ছন্ন সম্মতিও ছিল তাতে সেটা বোঝা যায় নিয়াজীর করা এক মন্তব্য থেকে।  নিয়াজী একাত্তরে সংগঠিত র্ধষণের ঘটনা স্বীকার করার সাথে সাথে একটি অসংলগ্ন উক্তি করেছিল- viagra en uk

 ” আপনি এরূপ আশা করতে পারেন না যে, সৈন্যরা থাকবে, যুদ্ধ করবে এবং মুত্যু বরণ করবে পূর্ব পাকিস্তানে আর শারীরবৃত্তীয় চাহিদা নিবৃত্ত করতে যাবে ঝিলামে ! “

দেশ স্বাধীন হবার পর যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদেরকে ” বীরঙ্গনা ” বলে ভূষিত করা হয়। কিন্তু পরিবারের সম্মানের কথা ভেবেই নিজেদেরকে লুকিয়ে ফেলেছিলেন বীরাঙ্গনা নারীরা। এই নিষ্ঠুর সমাজের কাছে কোন চাওয়া-পাওয়া ছিল না তাঁদের। নিয়তির কাছে সপে দিয়েছিলেন তাঁরা নিজেদেরকে। একাত্তরে যে দুঃসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁদেরকে তার যাতনা ভুলে থাকা রীতিমত অসাধ্য ছিল তাঁদের জন্য। কিন্তু নিজের সমাজও তাদেরকে গ্রহণ করেনি সহজভাবে। বীরাঙ্গনা নামের উপাধি তাদের সম্মানের চেয়ে অসম্মান হয়ে এসেছিল বেশি  । কোন কিছুর প্রত্যাশাই তারা আর করেনি আমাদের কাছ থেকে। শুধু মাঝে মাঝে আক্ষেপ করেছে এই ভেবে যে, যেই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তাঁরা নিজেদের সবটুকু উৎসর্গ করে দিয়েছে আজ সেই দেশের মানুষই তাঁদের কোন রকম খোঁজ খবর রাখে না এমনকি তাঁদের প্রাপ্য সম্মানটুকুও তাঁদেরকে দেয়া হয় নাহ্‌। নীলিমা ইব্রাহিমের ” আমি বীরাঙ্গনা বলছি “ গ্রন্থে বীরাঙ্গনা রীনা তার আকাঙ্খা প্রকাশ করেছেন এভাবেঃ-

একটি মুহূর্তের আকাঙ্খা মৃত্যু মুহূর্ত পর্যন্ত রয়ে যাবে। এ প্রজন্মের একটি তরুণ অথবা তরুণী এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, বীরাঙ্গনা আমরা তোমাকে প্রণতি করি, হাজার সালাম তোমাকে। তুমি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঐ পতাকায় তোমার অংশ আছে। জাতীয় সংগীতে তোমার কন্ঠ আছে। এদেশের মাটিতে তোমার অগ্রাধিকার। সেই শুভ মুহূর্তের আশায় বিবেকের জাগরণ মুহূর্তে পথ চেয়ে আমি বেঁচে রইবো” 

নির্যাতিতা এসব নারীদের প্রতি উন্নত সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী পোষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ বিশেষণে সম্মানিত করলেও পুরুষ প্রধান ও ধর্মপীড়িত সমাজ এতে কোন তাড়না বোধ করেনি। বঙ্গবন্ধু নিজে এদের বিয়ে করার আহ্বান করেও সফলতা পাননি।বরং এ খেতাব তাদের এক অদৃশ্য শ্রেণীতে পরিণত করেছিল। সমাজ জীবনের স্বাভাবিক স্রোতধারায় মিশে যাওয়ার পথও রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর অনেকে তাদের নিয়ে যেন এক ধরনের জুয়া খেলায় নেমেছিল কেউ টাকার লোভে বিয়ে করে পরবর্তীতে তালাক দিয়েছে কেউ বা এদের নাম ব্যবহার করে কিছু লোভী ব্যবসায়ী বাজারে ছেড়েছে এমন সব বই যেগুলোতে সাহিত্যের মূল্যের চাইতে বেশি ছিল অশ্লীলতা তথা এক ধরনের বিকৃতি। যুদ্ধপরবর্তী ১৯৭২ সালে, এসব নারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জাতীয় পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন ছাড়াও গঠিত হয় কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থা যদিও পুনর্বাসন নামে কিন্তু কার্যত : অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের গর্ভের এসব অনাকাঙিক্ষত শিশুদের ভ্রুণেই হত্যা বা জন্ম নেওয়া সন্তানদের দত্তকের ব্যবস্থা এ সংস্থার মাধ্যমে করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এর পরিণতিও হয়েছিল দুঃখজনক। অনেক মায়েদের অকালে মৃত্যুবরণও করতে হয়েছিল। এক্ষেত্রে সহায়তা দিয়েছিল International planned parent hood, the International Abortion Research and training center. আর একই সাথে এসব ‘শত্রু শিশুদের’ গর্ভেই হত্যা দত্তকের জন্য সারাদেশে সেবাসদনও খোলা হয়েছিল। নিরপরাধ এ শিশুদের এদেশ গ্রহণ করেনি বরং দত্তক হিসাবে তাদের পাঠানো হয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা,নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।আর বীরাঙ্গনাদের জীবনে নেমে এসেছে নিঃসঙ্গতার অবহেলার এক দুঃখময় অধ্যায় তাদের পরিত্যাগ করেছে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজ। শতকের শেষ দিন পর্যন্ত তারা যেন করুণা অথবা ঘৃণার পাত্রী ‘সতীত্ব’ হারানো এসব নারীরা স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার পরিবর্তে বরং এক বিকট অর্ধঃস্তনতার শিকারে পরিণত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে  প্রথমবারের মত বিটিভিতে ড. নীলিমা ইব্রাহিমের উপস্থাপনায় ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছিল এবং সেই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরো জাতি সম্ভবত প্রথমবারের মতো বেদনাহত হৃদয়ে এসব নারীদের করুণ কাহিনী অনুধাবন করেছে। এরপরে ১৯৯৯ সালে ২৩ নভেম্বর দৈনিক জনকণ্ঠে একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে ফেরদৌসী প্রিয় ভাষিনী সুদীর্ঘ আটাশ বছর পরে  পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন।সেই প্রতিবেদনটির  প্রতিবেদক তাসলিমার ভাষায়-

“২৮ বছর কেন অপেক্ষা করতে হয় একজন নারীকে তার নিপীড়নের কথা বলতে কিংবা যতটুকু বলেছেন তার জন্য আবার তাকে কতটা মাশুল দিতে হচ্ছে?” 

সাহসী নারী  ফেরদৌসী প্রিয় ভাষিনীর ভাষায়-

”৭১ এর নয় মাসের নির্যাতন আমার জীবনের সব অনুভূতিকে যেন ভোঁতা করে দিয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বরের পরে অনেক লাশ দেখেও আমার মনে তেমন পরিবর্তন আসেনি কারণ আমি নিজেই তখন এক জীবন্ত লাশ।”

তাকে কর্মস্থল থেকে বের করে দিয়ে সামাজিকভাবে এক ঘরে করে রাখা হয়েছিল এবং এমন কি গ্রামের অন্য মেয়েরাও তার সাথে কথা বলতো না। তারপরেও তিনি বেঁচে উঠেছেন শুধু নিজের প্রতি প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ও অসম্ভব উদার ও সহযোগী একজন স্বামী পেয়ে। তিনি নিজেকে ‘বীরাঙ্গনা’ পরিচয় দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এবং এখন নিজস্ব আলোতে উদ্ভাসিত কিন্তু একই সাথে একই সময়ে আবার যখন পত্রিকায় দেখতে হয় ‘তিনজন নারী নিজেদের নির্যাতনের কাহিনী প্রকাশ করায় সমাজ তাদের ত্যাগ করে একঘরে করেছে। তখন এক দ্বিমুখী ভাবনায় মন ভারাক্রান্ত হয়েছে। এভাবে যখনই মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত মহান এই নারীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে তখনই কোন না কোন ভাবে আমাদের এই সমাজ তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে গর্বের ইতিহাস। কিন্তু গর্বের এই মুক্তিযুদ্ধে যেন অগৌরবের কাঁটা এদেশের লাখো ধর্ষিতা নারী। আমরা বলি ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে আমরা গান গাই ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’। এই ফুল হলো নারী-দেশ-মা। আমরা নিপীড়িত নারীদের বলেছি ‘কতকুলের কুলঙ্গনা, নাম দিয়েছি বীরাঙ্গনা’। বীরাঙ্গনা মানে বীর নারী। অথচ সম্মান বাস্তবে কতোটুকু সম্মান তাঁরা পেয়েছে আমাদের কাছ থেকে !!! অত্যন্ত কষ্ট আর লজ্জার হলেও সত্য যে আজকাল আমরা আমাদের এসব বীরঙ্গনা মায়েদের সঠিক সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন টক শো বা সভা-সেমিনারে সন্দেহ প্রকাশ করি !! অনেকেই বলে থাকে যে, যুদ্ধ হয়েছিলো ৯ মাস, দিনক্ষণ হিসেব করলে প্রায় ২৬৫ দিন। পাকিস্তানি সেনা ছিল ৯৪০০০; এখন ৯ মাসে ২ লাখ নারীকে ধর্ষণ করতে হলে দিনে ৭৮১ জন নারীকে ধর্ষন করতে হতো। যেটা একেবারেই অসম্ভব, ভুল, মিথ্যা, বানোয়াট একটা হিসেব।নির্যাতিত নারীর সংখ্যা নাকি তাঁদের মতে ২০-২৫ হাজার… !!!সত্যিই বড় অদ্ভুত আমাদের দেশের মানুষ। যেসব নারীরা দেশের জন্য তাঁদের নিজেদের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ উৎসর্গ করে দিইয়েছিলেন আজ ক্যালকুলেটর নিয়ে, হাতের কর গুনে গুনে তাঁদের হিসেব করা হয়। এ যেন দায় মুক্তির একটা নোংরা প্রচেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা বাঙালির বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।যার উদ্দেশ্য ছিল, দানবীয় ত্রাস সৃষ্টি করা, মনোবল ভেঙ্গে দেয়া, বাঙালি নারীর গর্ভে পকিস্তানী সন্তানের বিস্তারের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে নির্মূল করা, আর বাঙালি নারীর শরীরকে শত্রু দ্বারা কলঙ্কিত করে বাঙালি পুরুষের গর্বকে নষ্ট ও ধ্বংস করা। শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নয়, বিশ্বযুদ্ধ, কসোভো, রুয়ান্ডা সহ প্রত্যেকটি যুদ্ধে জাতি নির্মূল ও ত্রাস সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। যুদ্ধের সময় নারীর শরীর দেশের মতোই আর একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসাবে গণ্য হয়েছে। ধর্ষণের যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে পরাজিত করা হয় সেই যুদ্ধক্ষেত্রকে। এর উৎস সেই যৌনবাদী মানসিকতা, একে সফলও করে সেই একই মানসিকতা। তাই আমরা যখন আমার দেশের বীরাঙ্গনাদের ইতিহাসের কলঙ্ক হিসেবে ঢেকে রাখি, তখন আমরা যৌনবাদী এই যুদ্ধাস্ত্রকে সফল করি, শক্তিশালী করি, আর সেই সাথে জয়ী করি ঐ পাকিস্তানি হায়নাদের। যুদ্ধকালীন সময়ে জাতিগত পরিচিতির কারণে নারীদের প্রতি অবর্ণনীয় যৌন সহিংসতা আইনের ভাষায় গণহত্যার সমার্থক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু শুধু ক্যাম্পের নির্যাতন নয়, একে সম্পূর্ণ করে পরবর্তীকালে স্বজাতির কাছ থেকে পাওয়া গঞ্জনাও। সব মিলিয়ে তা শ্রেফ গণহত্যার মতো অযৌন কোনো বিষয় না। বরং এটা এক নিরন্তর গণহত্যা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এই সহিংসতা চলতে থাকে যৌনবাদের হাত ধরে। তাদের সম্মান বাঁচানোর নামে যখন, তাদেরকে ইতিহাস থেকে মেরে ফেলা হয়, যখন নির্যাতনের সমস্ত প্রামাণ্য দলিল ধ্বংস করে, তাদের বিচার পাবার পথটিও বন্ধ করা হয় তখন এই গণহত্যার ষোলকলা পূর্ণ হয়। একদিকে বীরাঙ্গনা উপাধি দেয়া, আরেক দিকে তাদেরকে ইতিহাসের লজ্জা হিসেবে গায়েব করার এই স্ববিরোধ যৌনবাদকে মোকাবেলা করেনা। তার সঙ্গে মানিয়ে চলে। আরো শক্তিশালী করে। যার কারণে পরবর্তীতে বীরাঙ্গনা নামের অর্থটাই উল্টে যায়। ‘নষ্ট’ নারীর খেতাব হয়ে যায়। একাত্তরে ন’মাসের যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়েছে। ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের স্বাধীনতা। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত করা হলেও আমাদের বীরঙ্গনা মায়েদের বলতে গেলে কোনোরকম সম্মাননাই প্রদান করা হয়নি। কালে কালে ” বীরঙ্গনা ” পদবীটির অন্তরালে চাপা পরে গিয়েছেন তাঁরা। হয়তো তাঁরা অস্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করে নি। কিন্তু দেশের জন্য তাঁদের যে অপরিসীম ত্যাগ সেটা কিন্তু অস্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। তারপরেও তাঁদের নুন্যতম সম্মাননা দেয়া তো দূরের কথা তাঁদের কথা আমরা মনে করার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করি নাহ্‌। দেশ স্বাধীন হবার সুফল কমবেশী আমরা সবাই ভোগ করেছি। কিন্তু যাদের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ কোন কিছুই করেনি-তারা হচ্ছেন যুদ্ধে সব হারানো সেসব নারী যাদের আমরা বলি ‘বীরাঙ্গনা’। আর  এই ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব দিয়ে তাদের ঠেলে দেয়া হয়েছে বিড়ম্বিত জীবনের দিকে। বীরাঙ্গনা খেতাব দিয়ে মহিমান্বিত করার পাশাপাশি সব হারানো এসব নারীকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। অন্যদিকে, এদেশে সরকার বদলালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বদলায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় উঠে আসে নতুন নতুন মুখ। ৪৩ বছরে বিভিন্ন সরকারের আমলে বহুবার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ না করেও অনেকে মুক্তিযোদ্ধা সেজে গেছেন। মিথ্যে সার্টিফিকেট দিয়ে অনেকে সরকারি চাকুরীতে পদন্নোতিও নিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য বদলায় না শুধু বীরাঙ্গনা নারীদের। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার যখন ক্ষমতায় তখনও বীরাঙ্গনারা থেকে যায় দৃশ্যপটের বাইরে। মুক্তিযুদ্ধের জন্য যাদের জীবন এমন বিপর্যস্ত তারা তো যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তাদের নাম অর্ন্তভূক্ত করার দায়িত্ব তো সরকার তথা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। সবশেষে একটা কথাই বলতে চাই, বর্তমানে এই সমাজে এমন একটা ব্যবস্থা করা হোক যাতে করে আমাদের বীরঙ্গনা মায়েরা  যতদিন বেঁচে থাকবে ঠিক ততদিন সম্মানজনক অবস্থায় মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারে এবং যথাযথ সম্মানের সাথেই মৃত্যুবরণ করতে পারে।আর এই প্রক্রিয়াটা সরকারকেই নিতে হবে এবং সমাজকেই তৈরি করতে হবে। তথ্যসূত্রঃ-(১) https://www.amarblog.com/index.php?q=%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%AB%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%AA%E0%A7%AF%E0%A7%AC/posts/162955 (২)  http://www.rnews24.com/open-pen/2013/03/24/1107#sthash.gw37RxuD.dpuf (৩) http://www.bsu1952.org/archive/articles/165-amader-birangona-nari-o-juddhoshishura 

 

 

   

You may also like...

  1. অংকুর বলছেনঃ

    “সত্যিই বড় অদ্ভুত আমাদের দেশের মানুষ। যেসব নারীরা দেশের জন্য তাঁদের নিজেদের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ উৎসর্গ করে দিইয়েছিলেন আজ ক্যালকুলেটর নিয়ে, হাতের কর গুনে গুনে তাঁদের হিসেব করা হয়। এ যেন দায় মুক্তির একটা নোংরা প্রচেষ্টা।” আফসোস আমাদের বীরাঙ্গনা মা দের আমরা অপমান ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি । আমাদের ক্ষমা করে দাও মা ।

  2. synthroid drug interactions calcium
  3. ডার্ক ম্যান বলছেনঃ

    এই দায় মুক্তি কি কখনো হবে?? আমরা কি কখনো ক্ষমা পাব???

  4. দায়মুক্তি !!! হ্যাঁ সেটা হয়তো না হলেও হিসেব কষে,ইতিহাস বিকৃত করে আমরা করেই নেব…

    কিন্তু ক্ষমা !!! সেটা আমাদের মিলবে কি করে !!! যেখানে আমাদের ক্ষমা চাইবার-ই যোগ্যতা নেই… :(

  5. জন কার্টার বলছেনঃ

    দায়মুক্তি!!!! কথাটি একটু কটু নয় কি??? দায়মুক্তি! আসলে কি বীরঙ্গনাদের প্রতি আমাদের দায়মুক্তি কখনও সম্ভব? নারীর সব থেকে মূল্যবান সম্ভ্রম এর বিনিময়ে যেসব বীরঙ্গনা আমাদের মহান স্বাধীনতা নিয়ে এসেছেন, অদ্য কি তাদের ঋণ কখনও শোধ করা সম্ভব?

    যাই হোক সভ্যতার বিনির্মাণে স্বাগতম…….

  6. মাশিয়াত খান বলছেনঃ

    এরকম কোন পোস্ট পড়ে খুব ভাল লাগল। তবে আমাদের ইতিহাস বরাবরই বিকৃত। মুনতাসির মামুন তার বীরাঙ্গনা ৭১- বইটীতে দেখিয়েছিলেন যে বীরাঙ্গনার সংখ্যা ২ লাখ নয় বরং ৫ লাখ বা তার কিছু বেশি।

  7. শঙ্খনীল কারাগার বলছেনঃ

    viagra vs viagra plus

    চমৎকার লিখেছেন।

  8. /blockquote> “মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে গর্বের ইতিহাস। কিন্তু গর্বের এই মুক্তিযুদ্ধে যেন অগৌরবের কাঁটা এদেশের লাখো ধর্ষিতা নারী ।” — আমি এটা মনে করি না। আমার মা বোনেরা যারা সম্ভ্রম হারিয়েছেন তারা সকলেই আমার কাছে এক বীর যোদ্ধা।

    আর একাত্তরের সেই সময় শুধু পাক সেনারাই নারীদের ভোগ করে নি, এ দেশে জন্ম নেয়া কিছু জারজও এ কাজে লিপ্ত ছিল।

    একাত্তরের সেই হিংস্র পশুদের কাছে ও বর্তমানে যারা বীরাঙ্গনাদের সম্মানের চোখে দেখে না সেই শ্রেনীর কাছে নারী শুধু ভোগের বস্তু…… বীরাঙ্গাদের প্রতি সম্মানের বরাবরই ছিল তার সাথে আছে এই জারজ শ্রেনীর প্রতি ঘৃণা। tome cytotec y solo sangro cuando orino

    ধন্যবাদ সুন্দর হয়েছে পোস্টটি…… লিখে যান……

  9. নীহারিকা বলছেনঃ

    অনেক সুন্দর লিখেছিস ফাতেমা । =D> =D> =D>

  10. অসীম নন্দন বলছেনঃ

    তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
    সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
    সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।

  11. চাতক পাখি বলছেনঃ

    তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
    সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
    সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।

    চমৎকার অসীম ভাই। :-bd :-bd :-bd

    আর জোহরা’পু আপনাকে :জয় গুরু: :জয় গুরু: :জয় গুরু:

    আর ৩.৫ লাখ মা – বোনকে অনন্ত অসীম সালাম।।

    side effects of drinking alcohol on accutane
  12. সবশেষে একটা কথাই বলতে চাই, বর্তমানে এই সমাজে এমন একটা ব্যবস্থা করা হোক যাতে করে আমাদের বীরঙ্গনা মায়েরা যতদিন বেঁচে থাকবে ঠিক ততদিন সম্মানজনক অবস্থায় মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারে এবং যথাযথ সম্মানের সাথেই মৃত্যুবরণ করতে পারে।আর এই প্রক্রিয়াটা সরকারকেই নিতে হবে এবং সমাজকেই তৈরি করতে হবে।

    :দে দে তালি: :দে দে তালি: :দে দে তালি: :দে দে তালি:
    :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি: :কুপায়ালাইছ মামা-ভিক্টরি:

    অসাধারন একটা পোস্ট এর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ :)

  13. আমার পড়া আপনার সেরা লেখা ছিলো এটি…

    দায়মুক্তি বলুন আর দায়িত্ববোধ বলুন পুরুষশাসিত এ সমাজে কোনোটাই সেভাবে করা সম্ভব হবে না| দুজন. বীরাঙ্গনা বলে ফুল দিবেন, দশজন পেছনে উল্টাপাল্টা কথা বলবে|
    যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদেরই উপযুক্ত সম্মান দেয়া এখনো সম্ভব হয়নি সেখানে বীরাঙ্গনাদের ক্ষেত্রে কদ্দূর কী করা সম্ভব হবে কে জানে!

  14. মগরেবের নামাজের শেষে মায়ে-ঝিয়ে
    খোদার কালামে শান্তি খুঁজেছিলো,
    অস্ফুট গোলাপ-কলি লহুতে রঞ্জিত হ’লে
    কার কী বা আসে যায়।
    বিপন্ন বিস্ময়ে কোরানের বাঁকা-বাঁকা পবিত্র হরফ
    বোবা হ’য়ে চেয়ে দ্যাখে লম্পটের ক্ষুধা,
    মায়ের স্নেহার্ত দেহ ঢেকে রাখে পশুদের পাপ।
    পোষা বেড়ালের বাচ্চা চেয়ে-চেয়ে নিবিড় আদর
    সারারাত কেঁদেছিলো তাহাদের লাশের ওপর।

    এদেশে যে ঈশ্বর আছেন তিনি নাকি
    অন্ধ আর বোবা
    এই ব’লে তিন কোটি মহিলারা বেচারাকে গালাগালি করে।

    -আসাদ চৌধুরি (রিপোর্ট ১৯৭১)

    আর কিছু বলার নেই…

    glyburide metformin 2.5 500mg tabs
  15. শতভাগ মানুষ এর মানসিকতায় পরিবর্তন না আনতে পারলে কখনোই আমরা মায়ের যোগু সম্মান আনতে পারব না। হ্যাটিস অফ টু জোহরা আপু।

  16. মানবিকতা বা শ্রদ্ধাবোধ বাদ দিলাম।
    আজ আমাদের গণতান্ত্রিক সমাজ কি এদেরকে মানুষ হিসেবে নুন্যতম অধিকার দিয়েছে?
    সুকান্ত থাকলে চাঁদকে ঝলসানো রুটি না বলে ধর্ষিতার হাসি বলতেন।
    যে তাচ্ছিল্যের হাসি মেঘে ঢাকা।
    লজ্জা।

  17. অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন । আপনাকে ধন্যবাদ %%- %%- %%-

  18. অসসধারণ এই কর্মের জন্য ধন্যবাদ ………

  19. ণ

    বলছেনঃ

    It was many and many a year ago,
    In a kingdom by the sea,
    That a maiden there lived whom you may know
    By the name of Annabel Lee

    আমার প্রিয় কবিতার চারটি লাইন শুধু, আর কিছু বলার ক্ষমতা নাই

  20. :চক্ষু চড়কগাছ: :চক্ষু চড়কগাছ: :-S :-S :প্লিজ, টেল মি মোর: :প্লিজ, টেল মি মোর: :প্লিজ, টেল মি মোর: :-?? :-?? :-? :-? :-/ :-/ :-SS :-SS :বাত্তি বাত্তি: :বাত্তি বাত্তি:

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.