একটি মুভি পর্যালোচনাঃ হায়দার

541

বার পঠিত

Haider-Movie-Poster-1

অতি সম্প্রতি ভারতের প্রখ্যাত পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত হায়দার সিনেমাটি দেখলাম। যারা বিশাল ভরদ্বাজের সিনেমার সঙ্গে পরিচিত নন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি মকবুল,ওমকারা, কামিনে, সাত খুন মাফ ছবি গুলোর সুবাদে  বিশাল ভরদ্বাজ ভারতের অন্যতম সেরা  পরিচালক হিসেবে স্বীকৃত।  ভিন্ন ধর্মী ফিল্ম মেকিং ,ডার্ক কমেডি, ধারালো সংলাপ তার ছবির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। হায়দার শেক্সপিয়র ট্র্যাজেডির হ্যামলেট অবলম্বনে নির্মিত তার সর্বশেষ ছবি।   শেক্স পিয়র  সাহিত্য নিয়ে বিশাল ভরদ্বাজের কাজও নুতুন কিছু  নয়। এর আগেও তিনি শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ অবলম্বনে মকবুল , ওথেলো অবলম্বনে ওমকারা নির্মাণ করেছিলেন যা দর্শক ও সমালোচক মহলে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিল ।  হ্যামলেট শেক্সপিয়রের এক কালজয়ী  সৃষ্টি , চরিত্র গুলোর মানসিক ঘাত প্রতিঘাত ও বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার সুবাদে  ইংরেজি সাহিত্যের অত্যন্ত  জটিল ও শক্তিশালী ট্রাজেডি হিসেবে সাহিত্য জগতে  স্বীকৃত। একে বর্তমান সময়ের এবং ভারতীয় প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করা রীতিমত অসম্ভব এক ব্যাপার। বিশাল ভরদ্বাজ সেই অসম্ভব কাজটিকে দুর্দান্ত ভাবেই  সম্পন্ন করেছেন।

হায়দার ছবির প্লট গড়ে উঠেছে ১৯৯৫ সালে কাশ্মীরে সংঘটিত বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে।  এখানে হায়দার আলীগড় বিশ্ব বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এক কাশ্মীরি যুবক ও শখের কবি।  ভারতীয় সেনা বাহিনীর হাতে বন্দী হবার পর পিতা ডাঃ হিলাল  মীরের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে  সে আবার কাশ্মীরে ফিরে আসে। একদিন   চাচা খুররম মীর ও মা ঘাজালাকে  আন্তরিক খোশ গল্প রত অবস্থায় দেখে তার মধ্যে  প্রবল সন্দেহ তৈরি হয়।  সেই সঙ্গে পিতা  হিলাল মীরকে খুজে পাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ প্রতিজ্ঞ সে। পিতাকে খোঁজার মিশনে ভারতীয় সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে এফ আই আর দাখিল করতেও দ্বিধা হয়  না তার।  ঘটনা ক্রমে পুলিশ কমিশনারের  সাংবাদিক মেয়ে  আর্শিয়া তার প্রেমিকা ও সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ।  পিতাকে খোঁজার মিশনে হায়দারের পাশে দাঁড়ায় আর্শিয়া।   এরই মধ্যে একদিন গল্পে রুহদার  নামের এক রহস্যময় চরিত্রের আবির্ভাব উঠে।  মুলত এর পর থেকে গল্পের কাহিনী অন্য দিকে মোড় নেয়।  হায়দার জানতে পারে তার পিতা গ্রেফতার  ও পরবর্তীতে নিহত হওয়ার পিছনে লুকিয়ে থাকা নির্মম সত্যটিকে।  পিতৃ  হত্যার প্রতি শোধ নিতে উন্মুখ হয় হায়দার।  হায়দারের এই প্রতি শোধ প্রবণতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে বিছিন্নতাবাদীরা। পরবর্তীতে সিনেমার গল্প এগিয়েছে মা ঘাজালা ও ছেলে হায়দারের মধ্যকার নানা মানসিক টানা পোড়ন  ও কাশ্মীরের বিভিন্ন জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে।

অভিনয়ের দিক দিয়ে বলব  শহীদ কাপুর তার ক্যারিয়ার সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন এই ছবিতে । এই ছবিতে শহীদের পারফরম্যান্স বিশাল ভরদ্বাজের সঙ্গে করা তার আগের ছবি কামিনের পারফরম্যান্সকেও ছাড়িয়ে গেছে। মানসিক টানা পোড়নে আক্রান্ত ও বিভিন্ন ঘটনায় বিপর্যস্ত এক কাশ্মীরি তরুণের চরিত্রে শহীদ তার অভিনয় প্রতিভার সবটুকুই ঢেলে দিয়েছেন।  পর্দায় তার  প্রায় প্রতিটি অভিব্যক্তিই  জীবন্ত ছিল । বিশেষ করে প্রকাশ্য জটলায়  পাগল সেজে   কাশ্মীরি জনগণের করুন বাস্তবতা তুলে ধরার  দৃশ্যটির কথা না বললেই নয়। এছাড়া খুররম মীর চরিত্রে কে কে মেনন,আরশিয়া চরিত্রে শ্রদ্ধা কাপুরও যথেষ্ট ভাল পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। ছোট কিন্ত গল্পের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রুহদার রুপায়নে ইরফান খানও যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।  এছাড়া হিলাল মীরের চরিত্রে অভিনয় করা নরেন্দ্র ঝার কথাও  আলাদা ভাবে বলতে হবে। উপরোক্ত সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি হায়দার ছবির মূল প্রাণ  ঘাজালা চরিত্রে অভিনয় করা টাবু। এরকম একটি কমপ্লেক্স ক্যারেক্টার আর কোন অভিনেত্রী  এত স্বার্থক ভাবে রুপায়ন করতে পারতেন কিনা  তা নিয়ে সন্দেহ আছে। একদিকে একমাত্র সন্তানটির প্রতি অকৃত্তিম ভালবাসা আরেকদিকে  বর্তমান স্বামী খুররম মীরের প্রতি দায় বদ্ধতা , পাশাপাশি আগের স্বামীর নিহত হওয়ার পিছনে পরোক্ষ ভাবে জড়িত থাকার তীব্র  অপরাধ বোধ এরকম বিভিন্ন মানসিক দ্বন্দে আক্রান্ত একজন মধ্য বয়সী নারীর ভুমিকায় টাবু ছিলেন রীতি মত অসাধারন।  অনেক দৃশ্যে কোন সংলাপ ছাড়াই শুধু অভিব্যক্তি দিয়েই অনেক কিছু ফুটিয়ে তুলেছেন। এই অসাধারন  পারফরম্যান্সের সুবাদে টাবু যে  এবছরের  এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানগুলোতে রীতিমত দাপিয়ে বেড়াবেন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। পরিচালক ও সংলাপ রচয়িতা হিসেবে বিশাল ভরদ্বাজও পুরো মার্কসই পাবেন।  অনেক চিত্র সমালোচক হায়দারকে বিশাল  ভরদ্বাজের সেরা কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।  কাশ্মীরের নয়নাভিরাম প্রাকতিক সৌন্দর্যকে  সুন্দর করে তুলে ধরার জন্য সিনেমাটোগ্রাফার পঙ্কজ কুমারকেও কৃতিত্ব দিতে হবে। ছবিটিতে কাশ্মীরের অপরুপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে কাশ্মীর  সম্পর্কে  বহুল প্রচলিত সেই   নির্মম বাণীটিকে মনে পড়ে যায়  God made it  heaven , man has converted it into a hell।

ছবিটিতে ভারতীয় সেনা বাহিনীকে দেখানো হয়েছে কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিতে।  ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে নিরীহ ব্যক্তিদের গ্রেফতার , জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলা নির্মম নির্যাতন ,গুম ,খুন কে বেশ  দক্ষতার সঙ্গেই তুলে ধরা হয়েছে।যদিও আমার কাছে মনে হয়েছে  এ ব্যাপারে আরও একটু ডি্টেইলিং থাকলে ভাল হত।  এটাই বলতে গেলে যা একটু দুর্বলতা। অবশ্য যা দেখানো হয়েছে তাতেই ভারতের বিভিন্ন জায়গায়  বিশাল ভরদ্বাজের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনা  বাহিনীকে হেয় প্রতিপন্ন করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা  হয়েছে।  সেন্সর বোর্ডের  আপত্তির কথা মাথায় রেখে চাইলেও হয়তো তার পক্ষে এসবের  খুব বেশী দেখানো সম্ভব ছিল  না। ছবির  মিউজিক নিয়েও খানিকটা হতাশ।উল্লেখ্য বিশাল ভরদ্বাজ  শুধু মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে দুই বার ভারতের জাতীয় পুরষ্কার জিতেছেন। মিউজিক নিয়ে তার কাছে প্রত্যাশা  আর একটু বেশীই ছিল।  সেই প্রত্যাশা পুরন না হওয়ায় খানিকটা অতৃপ্তি রয়েছে । তবে আবহ সঙ্গীত যথেষ্টই  ভাল ছিল ।ছবির শেষে মেসেজ হিসেবে অতি সম্প্রতি কাশ্মীরে বন্যায় দুর্গতদের সাহায্যে ভারতীয় সেনা বাহিনীর অবদানের কথা উল্লেখ করাকে অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে।  সম্ভবত সেন্সর বোর্ডের সুনজর পাওয়ার আশায় এটি যোগ করা হয়েছে। যাই হোক যে  কোন মহৎ শিল্প কর্মই সমালোচনার  উরধে নয় ।  সব দিক বিবেচনায় বলা যায় যে হায়দার একটি  অসাধারন সিনেমাটিক এক্সপেরিয়েন্স। একটি  পরিপূর্ণ  ছবি ও নিঃসন্দেহে ২০১৪ সালের সেরা বলিউডি ছবি। (পিকের কথা মাথায় রেখেই বলছি)।  হায়দার দেখে বিশাল ভরদ্বাজের কাছে প্রত্যাশা আরও কয়েকগুন  বেড়ে গেল । বিশাল ভরদ্বাজের পরবর্তী ছবি দেখার অধীর প্রত্যাশায় রইলাম।

You may also like...

  1. দুরন্ত জয় বলছেনঃ

    দেখে ফেলব। কিছুদিনের মধ্যেই……

  2. এতো প্রশংসা শুনেছি হায়দারের যে, না দেখলেই নয়! আপনার রিভিউ সেই ইচ্ছেটাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলো।
    তবে টাবুর কথা বলার সময় কি স্পয়লার দিয়ে দিলেন নাকি? :?:

    buy kamagra oral jelly paypal uk
  3. আজাদ বলছেনঃ

    ভাবী দেবরের মধুর সম্প্ররক। এর পর দেবরের জয় তার পর ভাতিজার কাছে পরাজয়। ভালইতো ছবিটা। thuoc viagra cho nam

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.