ফার্ম গেট অপারেশন এবং সাল্লু ভাইয়ের গল্প…

741

বার পঠিত

ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলাতে সালমান খানের একটা অ্যাড প্রায়ই দেখায়। ইয়া উঁচা একটা পাহাড়ের উপর থেকে লাফ দেওয়ার আগে সাল্লু ভাই বেশ ভাব নিয়া মাউন্টেন ডিউ নামে একটা ড্রিংকসে চুমুক দেয়… তারপর লাফ… বিশাল কুলনেসের ব্যাপারস্যাপার। প্রজন্মের আপডেটেড পোলাপানরে প্রায়ই সালমান খান আর তার “আজ কুচ তুফানি কারতে হ্যায়” নিয়া বেশ উত্তেজিত হইতে দেখি। অনেকেই কুল ডুড বলতে চোখ বন্ধ কইরা সাল্লুরে বুঝে, তার মসলাদার অ্যাকশন মুভি দেইখা চোখ বড় বড় কইরা বলে, কি মাইর দেয় দেখছ? পুরাই ক্র্যাক…

ধানমণ্ডি ২৮ এর হাইডআউটে জরুরী মিটিং চলতেছে। আলম, বদি, স্বপন,চুল্লু ভাই,জুয়েল, জিয়া, গাজীকে নিয়ে বসেছেন শাহাদাৎ চৌধুরী (শাচৌ)। উদ্দেশ্য নেক্সট অপারেশনের প্ল্যান রেডি করা। অনেকক্ষন ধইরাই শাচৌ খেয়াল করতেছিলেন বদি খালি উসখুশ করতেছে, আর আলম তারে চোখ দিয়া মানা করতেছে। শাচৌ বদিরে বিষয়টা খুইলা বলতে বললেন। বদি ঠাণ্ডা গলায় কইল, ফার্মগেটে পাইক্কাগুলার যে চেকপোস্টটা আছে, ওইটা আমি উড়ায়া দিতে চাই। হালারা বহুত বাড়ছে, এইটা একটা উচিৎ শিক্ষা হইব। শাচৌ কিচ্ছুক্ষণ তাকায়া থাকলেন বদির দিকে, যেন বদির কথা বুঝতে পারেন নাই। ফার্মগেট আর্মি চেকপোস্টটা ছোটখাট এক দুর্গের মত, অস্ত্রশস্ত্র আছে যুদ্ধ চালানোর মত, আর এই ছেলেটা বলতেছে, সেইটা অ্যাটাক করবে!! আলম তো প্রবল বেগে মাথা নাড়তে লাগলো, পাগলামির একটা লিমিট আছে। এইটা কি খেলা পাইছ? ব্যস, লেগে গেল বদির সাথে। শেষমেশ বদির চাপাচাপিতে শাচৌ রাজি হইলেন, সিদ্ধান্ত হল ফার্মগেটের আর্মি চেকপোস্ট উড়ায়ে দেওয়া হবে,সাঁড়াশি হামলা করা হবে দারুল কাবাবে। দুইটা টিম যাবে, ফার্মগেট অপারেশন শেষে গ্রেনেড ফাটায়ে সংকেত দেওয়া হবে, আরেকটা টিম তখন দারুল কাবাব হামলা করবে।

ফার্মগেট মোড়টা তখন পাঁচটা রাস্তার সরাসরি সংযোগস্থল। একদিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আরেকদিকে ইন্দিরা রোড, আরেকদিকে ক্যান্টনমেন্ট—সবদিক থেকেই তখন ফার্মগেট মোড়ে আসা যাইত। খামারবাড়িতে বর্তমান ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের সামনে সেই সময় চা- মিষ্টির টং দোকান ছিল, খুব ভালো সামুসা বানাইত। তো সেই টংয়ে তারপর থেকে প্রতিদিন আলম-বদি-চুল্লুভাই-মায়া-স্বপনদের দেখা যাইতে লাগলো। মিষ্টি খাইতেছে, সামুসা খাইতেছে, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতেছে আত্মকেন্দ্রিক ভালো মানুষের মত। বেশ কয়েকদিন এইভাবে রেকি শেষে দেখা গেল সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার ডিনারের টাইমটুকু ওরা একটু রিলাক্স থাকে। তবে বাইরে তিনজন গার্ডে থাকে সবসময়। সুতরাং অ্যাটাকের জন্য এইটাই বেস্ট টাইম। আলম , জুয়েল, মায়া, পুলু আর সামাদ ভাইকে নিয়ে বদির টিম , সেই টিমের লিডার বদি। ভালো নাম বদিউল আলম। এই টিম ফার্মগেটে অপারেশন সেরে একটা ইন্ডিয়ান পাইন অ্যাপেল গ্রেনেড ফাটায়ে সংকেত দিলে বর্তমান হোটেল সোনারগাওঁয়ের পাশে দারুল কাবাবে চুল্লু ভাই আর আহমেদ জিয়া অপারেশন চালাবে। দারুল কাবাবে তখন পাকিস্তানী অফিসাররা খেতে আসে, সামনে খোলা জায়গায় জীপের বনেটে বইসা আড্ডা দেয়। টার্গেট মূলত এই আড্ডা দিতে থাকা পাইক্কাগুলা। সামাদ ভাই এয়ারফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা, নিয়ন সাইনের মালিক। সংসারী মানুষ। তার টয়োটা সিক্সটি ফাইভ মডেলের মেটালিকা সবুজ সেডানে চেপে ৭টা ১৫ মিনিটে মগবাজারের বাসা থেকে বের হল ওরা, পরিপাটি পোশাকে আধুনিক স্টাইলের হেয়ার কাটিং দেখে ছেলেগুলোকে অভিজাত পরিবারের স্মার্ট ছেলেপেলে বলেই মনে হয়…

ফার্মগেট মোড়। আর্মি চেকপোস্ট। দুটো তাবু। তিনজন সৈন্যকে বাইরে দেখা যাচ্ছে। বাকিরা ভেতরে ডিনার করতেছে অথবা রেস্ট নিতেছে। গাড়ি চালাইতেছেন সামাদ ভাই, পাশে আলম, তার পাশে বদি। সামাদ ভাইয়ের ঠিক পিছনে স্বপন,তার পাশে পুলু আর বদির পিছনে বসছে মায়া। আসার কথা ছিল গাজীর, কিন্তু কোন কারনে গাজী আসতে পারে নাই, তাই পুলুকে নিয়ে আসা হইছিল। পুলুকে দেওয়া হইল গ্রেনেড লঞ্চ করার দায়িত্ব। ইন্ডিয়ান গ্রেনেডের পাশাপাশি দুইটা ফসফরাস গ্রেনেডও ছিল পুলুর কাছে। ফসফরাস গ্রেনেড দিয়ে সব পুড়ায়ে দেওয়া যায়, কিন্তু দারুল কাবারের সংকেত দিতে দরকার ইন্ডিয়ান গ্রেনেডের সাউন্ড। তখনকার টয়োটাগুলায় স্টিয়ারিং হুইল স্টিয়ারিং এর সাথে, তাই সামনে তিনজন বসতে পারে। ঠিক সাতটা ১৫ মিনিটে বদিদের গাড়িটা ডানদিকে ঘুরে তেজগাঁও সড়কে গিয়ে টার্ন নিয়ে আবার ধীরে ধীরে হলিক্রস কলেজের গেটের কাছে এসে থেমে গেল। গাড়ির লাইটটা অফ করে দেওয়া হইছে বহুত আগে। নিঃশব্দে নেমে গেল ছয়জন,চোখের পলকে অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হইয়া গেল। চেকপোস্টের চারদিকে তিন ফিট উচু দেয়াল আর তার উপর তিনফিট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া। আলম নিঃশব্দে চাইনিজ এসএমজিটা নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার উপর পজিশন নিল। ওর কপালটা খুব ভালো, রাইফেলের রেঞ্জে তিনটা গার্ডের দুইটারে পায়া গেল। সমস্যা হইতেছে, তিনটারে এক সাথে ফালাইতে না পারলে পরিস্থিতি কব্জা করা যাবে না। একটু পর দেখা গেল ৩য় গার্ড পকেটে হাত ঢুকায়ে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বাকি দুইটার আড্ডায় যোগ দিতে আসতেছে। তিনটা কাছাকাছি দেখামাত্র বদির কণ্ঠে চিৎকার শোনা গেল…

ফায়ার…

সাথে সাথে গর্জে উঠলো আলমের এসএমজি, ৩য় গার্ডটা অবাক হইয়া লক্ষ্য করল, বাকি দুইটা গার্ড কাটা কলাগাছের মত দড়াম কইরা পইড়া গেল। বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কা সামলায়া পকেট থেইকা দুই হাত বাইর করতে করতেই তারেও নরকের ওয়ানওয়ে টিকিট ধরায়ে দিল আলমের সেকেন্ড ব্রাশফায়ার। সাথে সাথে বাকিদের একসঙ্গে ব্রাশফায়ার তাবুদুইটা লক্ষ্য কইরা। হঠাৎ আবিস্কার করল আলম, তার মাথার উপর আর দুইপাশ দিয়ে সাই সাই করে বুলেট যাইতেছে, গুলির তারস্বরে চিৎকার কিছুক্ষণের জন্য বধির করে দিল চারপাশ। আশেপাশের মানুষগুলোকে দেখে মনে হইল তারা মোমের মূর্তিতে পরিণত হইছে, ভয়ের চোটে মাটিতে ডাইভ দিতেও ভুইলা গেছে সবাই। ২০ সেকেন্ড এইভাবে টানা ফায়ার চলল, তাবুর ভেতর ও বাইরে সবকিছু ঝাঁজরা হইয়া গেল। স্বপন নির্দেশ দিল, রিট্রিট… সাথে সাথে পুলু দুইটা ইন্ডিয়ান পাইন অ্যাপেল গ্রেনেড ফালায়াই হাওয়া, সবাই কোনোমতে গাড়ির দরজায় পা রাখতে না রাখতেই টান দিল সামাদ ভাই, টয়োটা সিক্সটি ফাইভ ফার্মগেট থাইকা মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশ হইয়া গেল। ঢাকার ঠিক মাঝখানে ভর সন্ধ্যায় গিজগিজে পাকিস্তানী মিলিটারির মধ্যে বিরানব্বই রাউন্ড গুলি ছুঁড়ছিল ক্র্যাকগুলা… তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম দুর্ধর্ষতম আর্মি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটা সুপ্রশিক্ষিত দলকে এভাবেই কয়েকটা অসমসাহসী ক্র্যাক ছেলে স্রেফ উড়ায়ে দিছিল… জাস্ট বিরানব্বই সেকেন্ডের মধ্যে…

আজাদের মগবাজারের বাসায় পরে এই অপারেশনের কথা বলতেছিল জুয়েল। চেক পোস্টের ১২ জনই মরছে এইটা শুইনা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আজাদ কইল, কয়জন মরল, সেইটার হিসাব তোরা পাইলি ক্যামনে?

হাসতে হাসতে জুয়েল কইল, পরের দিন আশরাফুলের বাড়ি গেছিলাম, ওইখানে আমাগো বন্ধু হিউবার্ট রোজারিও সব খুইলা কইল। তার বড় বোন তো হলিক্রসের টিচার, সেইদিন রাত্রে সব দেখছে। সারা রাইত আর্মি আইতে সাহস পায় নাই, পরেরদিন ভোরে আইসা ডেডবডিগুলা নিয়া গেছে। চিন্তা কর, এরা নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে সাহসী সোলজার, লোমভর্তি শিনা চাপড়ায়া কয়, উই আর দ্যা বেস্ট। এই হইল দুনিয়ার সেরা আর্মির নমুনা। সারা রাইত সেনাগুলা পইড়া থাকলো, কেউ তো উন্ডেডও থাকতে পারে, আইসা দেখ, হসপিটালে নিয়া যা। নাহ, ইন্দুরের বাচ্চা সব, গর্ত থাইকা মুখটা বাইর করার সাহস নাই, তাও আবার ঢাকা শহরে। আরে নিউজ শুইনা নাকি ক্যান্টনমেন্টে সব সোলজারের পেশাব পাইছে, একলগে। কার আগে কে যাইব বাথরুমে, এই নিয়া হুটপাট। শ্যাষে বাথরুমে যাওয়ার আগেই নাকি কাম হয়া গেছে, প্যান্টের মধ্যেই। মুতের গন্ধে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাওয়া যাইতেছে না… জুয়েলের রসিকতা শুইনা হাসতে হাসতে গড়ায়া পড়ে সবাই।

আজকে প্রজন্ম কুলনেস আর তুফানি বলতে বোঝে সালমান খানরে, ৪৩ বছর আগে তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম সুপ্রশিক্ষিত আধুনিক পাকিস্তানী মিলিটারিরে ইন্দুরের বাচ্চা বানায়া ফালানো তারছিঁড়া কিছু ক্র্যাকরে প্রজন্ম চেনে না। চেনার চেষ্টাও নাই। প্রজন্ম খুব বিচিত্র, নিজের শেকড় নিয়া গর্ব করতে প্রজন্ম লজ্জা পায়, মায়া-আলম-বদি-জুয়েল প্রজন্মের কাছে পুরাতন ইতিহাস মাত্র। মাঝে মাঝে অবাক হইতে ভুইলা যাই। আধুনিক প্রজন্ম তো, অবাক হওয়ার কি আছে…

You may also like...

  1. শঙ্খনীল কারাগার বলছেনঃ

    কি ঘোরের মইধ্যে আছি বোঝেন? আপনি লেখছেন অস্ত্রশস্ত্র আর আমি দেখতাছি তন্ত্র মন্ত্র।মনে মনে কই ডনের মাথা এইবার পুরাই গেছে। এই লেখায় তন্ত্র মন্ত্র আইবো কইথ্যন? ভালো কইরা চোখ ডলা দিয়া দেখি না ঠিকই আছে আমার চোখই রং নাম্বারে গেছিলগা। যাই হোক চমতাকার একটা কাহিনী জানা হইলো আপনার মাধ্যমে। পুলাপাইনের কথা আর কি কমু ওরা সাহসটাওতো বিদেশিগোত্থন ধার কইরা আনে। নিজের দেশের রিয়েল হিরোগো ওগো চৌক্ষে ধরেনা।

  2. আসলেই ভাই নিজেদের তুফানি করা হিরো গুলানরে পোলাপান চিনল না cialis online australia

    bird antibiotics doxycycline
  3. এমনকি এইসব কথা তাঁদের বলতে গেলেও আগ্রহ নিয়ে তো শোনেই না উল্টা বলে- এতকিছু কেউ করতে পারে। অতিরিকত বাড়াবাড়ি কথা এসব -_-

প্রতিমন্তব্যডন মাইকেল কর্লিওনি বাতিল

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

female viagra tablets online

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

sildenafil 50 mg dosage
using zithromax for strep throat