মোমেনার অপারেশন

565

বার পঠিত

১)
ভাদ্র মাসের তীব্র গরম। আধার ঘনিয়ে সন্ধ্যা নামছে। আজ সোমবার, রূপপুর বাজারের হাটের দিন ।গ্রামের ছেলে বুড়ো সবাই আজ হাটে। তাই অন্যান্য দিনের চেয়ে ব্যতিক্রম হয়ে বাড়ির সামনের বাঁশের মাচা গুলো আজ ফাকা পড়ে আছে। এরকম একটি বাঁশের মাচায় বসে মোমেনা বেগম আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ভরা পূর্ণিমার চাঁদ ওঠেছে। পূর্ণিমার রুপালি আলোয় আলোকিত বিস্তীর্ণ প্রান্তর।আকাশের চাঁদ দেখে মোমেনার আজ ছোট বেলার কথা মনে পড়ে যায় ।ছোট বেলায় তার দাদীও এরকম জোস্না রাতে বারান্দায় বসে গল্পের আসর জমাত।কমলা সুন্দরীর গল্প, ডালিম কুমারের গল্প কতই না রং বেরঙের গল্প ছিল সেগুলো। দাদীর মুখে সেসব শুনতে কত ভালই না লাগত তার। দাদী মারা গেছে কত বছর আগে মনে করার চেষ্টা করে মোমেনা কিন্ত সঠিক সালটি মনে করতে পারে না সে। শুধু মনে আছে শ্রাবনের এক বৃষ্টি ভেজা রাতে হাঁপাতে হাঁপাতে মারা গিয়েছিল দাদী। দাদীর কথা ভাবতেই চোখ ভিজে আসে মোমেনার।

কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভিতর থেকে মোমেনার একমাত্র মেয়ে সালেহার ডাক শোনা যায়।

-মা, রাত হইছে। ঘুমাবু না

-হ। আইতাছি।

সালেহা তার একমাত্র মেয়ে। এক সপ্তাহ হল সে বাপের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। আগামী কাল চলে যাবে ঢাকায়। ঢাকায় এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি্তে চাকরী করে সে । প্রথম যখন সালেহা ঢাকায় যেতে চেয়েছিল মোমেনা রাজী হয়নি। গার্মেন্টসের মেয়েদের নিয়ে গায়ের লোকজন কত কটু কথাই না বলে। জবাবে সালেহা বলেছিল -মা সংসারে এত অভাব। ঢাকায় চাকরী কইরা সংসারে যদি কিছু বাড়তি আয় রোজগার হয় তো মন্দ কি? জবাবে মোমেনা বলেছিল -দরকার নাই তোর চাকরী করার। তোক বিয়া দিতে হবি না। গার্মেন্টসের বেটিগো নিয়া মাইনষে নানা রকম কথা কয়। কিন্ত সালেহা নাছোড়বান্দা। সে বলেছিল-মা মোক যে বিয়া যে দিবূ হের লাইগ্যা তো টাকার দরকার। বুঝিস না কেন? আর সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। গায়ের মাইনষে কি কইল হেইটা দিয়া হামার কোন লাভ আছে।
শেষ পর্যন্ত দারিদ্রের কাছে হার মেনেছিল মোমেনার সকল বাধা। কিছু দিন পরে সালেহা ঢাকা থেকে টাকা পাঠাতে লাগলো। সেই সঙ্গে আস্তে আস্তে মোমেনার সংসারের গতিও ফিরতে লাগলো। কিছু দিন পর সালেহার পাঠানো টাকায় মোমেনার ছোট ছেলে সুরুজ একটা মুদি খানার দোকান দেয়। সেই দোকানের আয়ে তাদের সংসার মোটামুটি ভালই চলে যায়। হঠাৎ একদিন সালেহা মোবাইল করে জানাল যে সে বিয়ে করেছে। জামাইয়ের বাড়ি বরিশাল। জামাইও একই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। এই খবর শুনে প্রচন্ড মন খারাপ করে মোমেনা।কত শখ ছিল তার ধুম ধাম করে মেয়ের বিয়ে দিবে। হোক না সে গরীব একটু ধুম ধাম করে মেয়ের বিয়ে দেয়ার শখ আহ্লাদ তো তারও আছে। তবে মেয়ে জামাইটিকে বেশ পছন্দ হয় মোমেনার। দিল খোলা মানুষ,সব সময় হাসি মুখে কথা বলে। আদব কায়দাও মাশাল্লাহ। বাজারে গেলে মোমেনার জন্য পান-সুপারি কিনে আনে। এইতো গতকালই পাশের বাড়ির করিমের মাকে গর্ব করে বলেছে সে যে জামাই কখনো খালি হাতে বাজার থেকে ফেরে নি। মনে মনে আল্লাহর কাছে শোকর আদায় করে মোমেনা। এরকম জামাই পাওয়া আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার। এবার সুরুজের একটা ঠিক ঠাক ব্যবস্থা করতে পারলে শান্তিতে মরতে পারবে সে।

-জামাই ভাত খাইছে । সালেহাকে উদ্দেশ্য করে বলে মোমেনা। will i gain or lose weight on zoloft

-খাবার বসিছে।তুইও আয়।

-না থাক ,জামাই আগে খাক তারপর খাম ।

বারান্দা থেকে সালেহার জামাই মনিরের ডাক শোনা যায়। -আম্মা আসেন একসাথে খাই।

অনিচ্ছা স্বত্তেও বারান্দায় গিয়ে বসে মোমেনা। মেয়ে ও মেয়ে জামাইয়ের কথার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস হয় না তার। সালেহা কাতল মাছের মাথা মনিরের প্লেটে তুলে দিতে উদ্যত হয়।

আরে কর কি, কর কি- চিৎকার করে উঠে মনির। মাথাটা আম্মারে দাও।

-না বাবা তুমিই খাও। আমি মাথা খাইতে পারি না।

-আমরা তো সবসময় খাই । আজ আপনি খান। nolvadex and clomid prices

তোমাগো জামাই যখন কইতাছে খাও বলে মাছের মাথাটা মোমেনার পাতে তুলে দেয় সালেহা।

মোমেনা কিছু একটা বলতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত বলতে পারে না। নিঃশব্দে খেতে থাকে।

-আম্মা আপনি তো ঢাকায় এসে আমাগো বাড়িতে কিছু দিন থেকে যেতে পারেন। মোমেনাকে উদ্দেশ্য করে বলে মনির।

-না বাবা, এই গ্রাম ছাইড়া যাইতে আর মন চায় না।

-তারপরও কয়েকদিন এসে বেড়ায় যাইতে তো পারেন। মাঝে মধ্যে গায়ে অন্য জায়গার আলো বাতাস লাগা ভাল। metformin synthesis wikipedia

সালেহার চার বছরের মেয়ে সোমা মোমেনার হাত ধরে টানতে টানতে বলে – নানী আসো না আমাগো বাড়ি। আসো না।

-ঠিক আছে মা ,যামু। সোমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে মোমেনা।

মোমেনার গলার ব্যাথাটা আজ আরও বেড়েছে। অনেকক্ষণ ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছে না। ব্যাথার চোটে আজ সারা রাত বোধ হয় তাকে না ঘুমিয়েই পার করতে হবে।

-মা তোর গলার ব্যাথাটা কি বাড়ছে?

মোমেনা দেখে খাটের সামনে সালেহা দাড়িয়ে।

-হ। মাছের মাথাটা খাওন মনে হয় ঠিক হয় নাই।

-মা তুই ঢাকায় আয়। তোর একটা ভাল চিকিৎসা করাই। -মোমেনার গলার টিউমারে হাত বোলাতে বোলাতে বলে সালেহা।

-চিকিৎসা কইরা আর কি হবি । কবরে এক পা দিয়াই আছি। missed several doses of synthroid

-তারপরও আয় তুই। চিকিৎসা করাই। এই টিউমার লইয়া তো বহুত কষ্ট করছিস।

মোমেনা কিছু বলে না। কৈশোর থেকেই এই টিউমারের ব্যাথা তার চির সঙ্গী। আজ প্রায় তেতাল্লিশ বছর হল এই টিউমারটিকে সঙ্গী করে সে বেঁচে আছে। কখনো ভাবেনি যে গলায় এত বড় একটা টিউমার নিয়ে এতকাল সে বেঁচে থাকতে পারবে। গলায় এই টিউমারের কারনে যে কত জনের কত কটু কথাই না শুনতে হত । এমনকি দুই বার বিয়েও ভেঙ্গে গিয়েছিল তার। পাত্র পক্ষ যখন জানতে চাইত গলায় এত বড় একটা টিউমার হল কি করে তখন সে কিছু বলতে পারত না, বলতে চাইতও না। তার জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ অভিজ্ঞতাটির কথা সে কাঊকে বলতে চায় না ,লুকিয়ে রাখতে চায় সে এটিকে মনের গহীন কোণে।

২)
আজ থেকে তেতাল্লিশ বছর আগের কথা। ১৯৭১ সাল। মোমেনার বয়স তখন তের কি চৌদ্দ। দেশে তখন তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধ কি সেটা তখনো ঠিক মত বোঝে না মোমেনা। শুধু লোকমুখে শুনেছে যে এই যুদ্ধ হচ্ছে বাঙ্গালীদের সাথে পাকিস্তানী খানদের। মোমেনাদের গ্রামের উত্তর পাড়ায় কয়েক ঘর হিন্দুর বসবাস। পেশায় জেলে, তিস্তায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত তারা। একদিন মুক্তি বাহিনীর খোঁজে সেই পাড়ায় হামলা চালায় রাজাকারেরা । গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, ছেলে বুড়ো যাকে যেখানে পায় সেখানেই হত্যা করে । পুরুষশুন্য ঘর গুলোতে ঢুকে নারীদের ধর্ষণ করতে থাকে। নরপশুদের নৃশংসতার হাত থেকে বাদ যায়নি মোমেনার খেলার সাথী সুশীলা থেকে শুরু করে নগেন কাকার ৬৫ বছরের স্ত্রী পার্বতী কাকী। কপাল ভাল যে মোমেনারা ঠিক তার আগেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিল। সেখান থেকে তারা আশ্রয় নিয়েছিল মোমেনাদের মামার বাড়িতে। কিন্ত মুক্তি বাহিনীর খোঁজে সেদিকেও ধেয়ে আসছে পাকিস্তানী সেনা আর রাজাকারেরা। তাই আজকের মধ্যেই উলিপুর বর্ডার দিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে তাদের । শুধু তারা একাই নয় আরও শত শত মানুষ। সবাই ক্লান্ত ,বিপর্যস্ত , প্রাণ ভয়ে শঙ্কিত। প্রাণের মায়া যে কি সেদিনই প্রথম উপলব্ধি করে মোমেনা। জমির আইল দিয়ে দৌড়াতে থাকে মোমেনা দৌড়াতে দৌড়াতে একবার পিছনে ফিরে গ্রাম গুলোর দিকে তাকায় সে । আগুনের লেলিহান শিখা আর কালো ধোঁয়া ছাড়া কিছুই দেখে না । দৌড়াতে দৌড়াতে মোমেনার মনে পড়ে শংখপুর মেলা থেকে কেনা তার শখের ময়না পাখিটির কথা। বারান্দার এক কোণে খুটির সঙ্গে বাধা আছে খাঁচাটি। তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরোতে গিয়ে পাখিটির কথা ভুলে গিয়েছিল সে। অথচ এই পাখিটিকে সে কত ভালই না বাসত।পাখিটির কথা ভাবতে গিয়ে কান্না পায় মোমেনার। এসময় কে যেন হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে- শুইয়া পড়েন, শুইয়া পড়েন। খানেরা গুলি চালাইতাছে। সবাই আর্তনাদ করে উঠে। যে যেখানেই পারে সেখানেই শুয়ে পড়ে। হঠাৎ মোমেনা তার গলার কাছে একটা তীব্র আঘাতের অস্ত্বিত্ব টের পায়। লক্ষ্য করে যে তার গলার কাছটা যেন রক্তে ভেসে যাচ্ছে। অস্ফুট স্বরে শুধু একবারই বলে-”মাগো”। মোমেনার মা রমিজা চিৎকার করে ওঠে -কে আছেন বাঁচান,বাঁচান।আমার মোমেনারে গুলি লাগছে। মধ্য বয়সী এক লোক মোমেনাকে কোলে তুলে নেয়। তারপর দৌড়াতে শুরু করে। মোমেনার চোখে যেন আধার নেমে আসে তবুও সর্ব শক্তি দিয়ে সে নিজের চোখদুটি খোলা রাখার চেষ্টা করে। মায়াময় এই পৃথিবীর রূপ, রস ,গন্ধ সে আরও কিছুদিন উপভোগ করতে চায় কিন্ত পারে না। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারায় সে। জ্ঞান যখন ফিরে তখন সে নিজেকে ছোট একটি খাটে শোয়ারত অবস্থায় দেখতে পায়। মধ্য বয়সী এক গ্রাম্য ডাক্তার তার চিকিৎসা করছেন।তিনি বলেন -গলায় গুলি লেগেছে।কিন্ত শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্থ হয় নাই বলে এখনো বেঁচে আছে। সীমান্তের উপারে ভাল ডাক্তার দেখাইয়েন।

এরপরের ৯ মাস মোমেনারা কাটায় সীমান্তের উপারে রিফিউজি ক্যাম্পে । কি করুণ এক জীবন সেখানে। একটা বিশাল খোলা মাঠের মত জায়গায় হাজার হাজার মানুষ ছোট ছোট তাঁবু খাটিয়ে গাদা গাদি করে বাস করে। খাদ্য নেই,বস্ত্র নেই, চিকিৎসা নেই। প্রত্যেকেই রোগে শোকে যন্ত্রণায় কাতর। রোগে-ক্ষুধায় প্রুতিদিন যে কত মানুষ মারা যায় তার কোন হিসেব নেই।মাঝে মধ্যে কিছু লোক এসে রিলিফের চাল ডাল দিয়ে যায়। সেটা দিয়েই খেয়ে না খেয়ে কোন রকম দিন পার করে তারা। পাশেই একটা অস্থায়ী হাসপাতাল।একটা স্কুলের দূটো ঘর নিয়ে এই হাসপাতাল বানানো হয়েছে। একটা ঘরে ঔষধ পত্র নিয়ে অল্প বয়সী এক ডাক্তার আপা ও তার দুই সহকারী বসেন। আর একটা ঘরে থাকে অসুস্থ রোগীরা। মোমেনাকেও এই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। একদিন ডাক্তার আপা মোমেনার বাবাকে ডেকে বলেন- মোমেনার গলায় আটকে আছে একটা বুলেট।এই বুলেটটি বের করতে হলে অত্যন্ত কষ্ট সাধ্য এক অপারেশন করতে হবে। সেই অপারেশনে শ্বাস নালী ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে তার মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এ ধরনের জটিল অপারেশন করার মত অভিজ্ঞ ডাক্তারও তিনি নন। তিনি এও জানান যে অপারেশন না করিয়েও মোমেনা বেঁচে থাকতে পারবে। পরে সুবিধামত সময়ে অভিজ্ঞ কোন ডাক্তারকে দিয়ে অপারেশন করিয়ে বুলেটটি বের করতে হবে।
ডাক্তার আপার পরামর্শ অনুযায়ী মোমেনা আরো কিছু দিন সেই হাসপাতালে থাকে। মোমেনা লক্ষ্য করে প্রতিদিন সেখানে তার মত আরো কিছু লোক গুলিবদ্ধ হয়ে আসে। কেউ বেঁচে ফেরে আবার কেউ ফিরে না। সবাই বলাবলি করে তারা মুক্তি বাহিনীর লোক। মোমেনা এতদিন শুধু মুক্তি বাহিনীর নাম শুনেছে। আজ চোখের সামনে মুক্তি বাহিনী দেখে তার একটু ভয় ভয় করে। কিন্ত কিছুদিন যেতেই সে আবিস্কার করে যে তারাও ঠিক তাদের মতই সাধারন মানুষ। কেউ ছাত্র ,কেউ শিক্ষক কেউ কৃষক, কেউ চাকরিজীবি । শুধু একটা প্রশ্নে তারা সকলেই একমত ,তা হল স্বাধীনতা। তাদের কাছ থেকে একটা কথা খুব ভাল করে শেখে মোমেনা , জয় বাংলা।

তারপর একদিন যুদ্ধ শেষ হয় । মোমেনারা জয় বাংলা বলে চিৎকার করেতে করতে গ্রামে ফিরে। গ্রামে ফিরে দেখে তাদের সেই ছোট্ট সবুজ শ্যামল গ্রামটি আর সেই আগের গ্রাম নেই ।চারদিকে ধবংস , মৃত্যু লীলা, পচা লাশের বীভৎস গন্ধ। তবুও সব কিছু ভুলে মানুষ আবারও নুতুন করে বাঁচার প্রস্তুতি নেয় । শিবপুর গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে আবারও নুতুন করে ঘর ওঠে । প্রতি শনি ও মঙ্গলবার আবারও বাজারের হাট জমে যায়। মানুষ যেন তিক্ত অতীত ভুলে আবারও নুতুন করে জীবন শুরু করে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দুর্ভীক্ষ পীড়িত দেশে সবকিছু গুছিয়ে ওঠতে মোমেনাদের কয়েক বছর লেগে যায়। এদিকে ততদিনে কৈশোর থেকে যৌবনে পা দিয়েছে মোমেনা । বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে দিন কে দিন মোমেনার গলার টিউমারের আকৃতিও বাড়তে থাকে। গ্রামের লোকজন নানারকম কথা বলে। কেউ বলে জাদুটোনা , কেউ বলে জ্বিনের আছর। গলায় আস্ত একটা বুলেট নিয়ে যে সে বেঁচে আছে তা কেউ বিশ্বাস করে না। মোমেনা বাবা-মা মোমেনার বিয়ে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ইতমধ্যে দুই বার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে তার। শেষ পর্যন্ত মোমেনার বিয়ের দায়িত্ব নেয় তার বড় মামা। একদিন তিনি মোমেনাকে ডেকে বলেন -”মা , মন খারাপ করিস না। আগামী দুই মাসের মধ্যে তোর বিয়া দিয়া দিব ।না পারলে আমার নাম আব্দুল মজিদ না। আমার নাম কুত্তা মজিদ। আব্দুল মজিদ এক কথার মানুষ।” তিনি বাক্স পেটরা গুছিয়ে মোমেনাকে তার সঙ্গে যেতে বলেন। মোমেনা বাক্স পেটরা গুছিয়ে মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বড়মামা ঠিকই দুই মাসের মধ্যে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলে। পাত্রের নাম আবুল কাশেম। বাড়ি ফুলবাড়ি মহকুমার রুপপুর গ্রামে। পাত্রের স্বভাব চরিত্র মাশাল্লাহ খুবই ভাল। পাত্রের চার বিঘা ধানি জমি আর ভাইদের সাথে শরীকানায় একটা দিঘি আছে। শুধু সমস্যা হল পাত্রের একটা চোখ অন্ধ। বড় মামা মোমেনাকে ডেকে বলেন – মা, জন্ম , মৃত্যু বিয়া সবই আল্লাহপাকের হাতে। তিনি যেইখানে ঠিক কইরা রাখছেন সেইখানেই বিয়া হবে। তার হুকুম ছাড়া একখান পাতাও নড়ে না এই কথা মনে রাখিস। মনে কোন আফসোস রাখিস না।”
মোমেনা কোন আফসোস রাখে না। মামার বাড়ি থেকেই তার বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন হয় । বড়মামা তার সাধ্য অনুযায়ী আয়োজনের কোন কমতি রাখেন না । বিয়ের পর কিছু দিন মোমেনার সংসার ভালই কেটে যায়। বছর খানেক পর তার ঘর আলো করে আসে বড় মেয়ে সালেহা। তার দুই বছর পর ছেলে সুরুজ। সব কিছু ভালই চলছিল । মোমেনার সংসারে আধার নেমে আসে যখন তাদের বসত বাড়ি আর চার বিঘা ধানি জমি তিস্তার ভাঙ্গনের শিকার হয়। ছেলে-মেয়ে নিয়ে একেবারে পথে নামে সে। ধারদেনা করে কিছু টাকা দিয়ে এক খন্ড জমি কিনে ঘর তুলে কোন রকমে বসবাস করতে থাকে তারা। মোমেনার জীবন সংগ্রাম আরও কঠিন করে হুট করে একদিন আবুল কাশেম মারা যায়। ভাল মানুষ ক্ষেত থেকে ফিরে এসে মোমেনাকে ভাত দিতে বলে। মোমেনা ভাতের থালা নিয়ে এসে দেখে আবুল কাশেম চিত হয়ে মরে পড়ে আছে। তারপর থেকে অনেক কষ্ট ,অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মোমেনা আজকের পর্যায়ে এসেছে। সে সব দিনের কথা ভাবতেই চোখ ভিজে ওঠে মোমেনার।

মা ঘুমাইছিস নাকি ? দরজা খোল। -দরজার ওপার থেকে চিৎকার করে বলে সালেহা। zovirax vs. valtrex vs. famvir

মোমেনা বিছানা থেকে ওঠে গিয়ে দরজা খুলে বলে -কি হইছে? কিছু কবু?

-হ। তোর জামাই কইছে ,কাল তুইও হামার সাথে ঢাকাত যাবু ।

-কেন ?

-তোক ডাক্তারের কাছে নিয়া যাম।

- কি দরকার মা , খালি টাকা পয়সা নষ্ট।

-হেইটা নিয়া তোর অত চিন্তা করন লাগবো না। ব্যাগ দিতাছি ,কাপড় চোপড় গোছায় নে ।

মোমেনা কি করবে ভেবে পায় না , ঠায় হয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে। এক পর্যায়ে সালেহার দেওয়া ব্যাগে কিছু কাপড় গুছিয়ে বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে কিন্ত অনেক চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারে না । আজ রাতও বোধ হয় তাকে না ঘুমিয়েই কাটাতে হবে।

৩)
আজ মোমেনার অপারেশন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। হাসপাতালের তরুণ ডাক্তারটি যখন জানতে পারে যে মোমেনার গলায় আটকে আছে আস্ত একটা বুলেট তখন তার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। তার বিস্ময়ের মাত্রা আরও বাড়ে যখন সে জানতে পারে যে দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে এই বুলেটটি মোমেনা বেগম নামের এই মহিলার চিরসঙ্গী। তার এত বছরের ডাক্তারী বিদ্যায় মাথায় ঢোকে না গলায় আস্ত একটা বুলেট নিয়ে কি করে একটা মানুষ এত দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। তবুও মুখটা যতটা সম্ভব হাসি হাসি করে সে বলে -”খালা ভয় পাইয়েন না। জাষ্ট ছোট একটা অপারেশন।” মোমেনা ভয় পায় না। ছাদে ঘূর্ণায়মান সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকে আশ্চর্য রকমের নির্লিপ্ত মনে হয় ।

জ্ঞান ফিরতেই মোমেনা নিজেকে হাসপাতালে কেবিনে শোয়ারত অবস্থায় দেখতে পায় । একটু মাথা উঠানোর চেষ্টা করতেই সাদা পোশাকের এক নার্স এসে বলে -মাথা ওঠানোর চেষ্টা করবেন না। আপনার গলায় অপারেশন হয়েছে। আপনার আত্মীয় স্বজন বাইরেই আছে। দাঁড়ান তাদেরকে খবর দিচ্ছি।

সালেহা এসেই মোমেনাকে জড়িয়ে ধরে। চোখে মুখে আনন্দ ফুটিয়ে বলে -মা তোর গলার টিউমার ভাল হইছে। ডাক্তার গুলি বাইর কইর‍্যা ফেলছে।আর কোন ভয় নাই।সালেহার দেখা দেখি তার ৪ বছরের মেয়ে সোমাও মোমেনাকে জড়িয়ে ধরে বলে -নানী , আর ভয় নাই, আর ভয় নাই। ডাক্তার গুলি বাইর কইর‍্যা ফালাইছে।কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের তরুণ ডাক্তারটি মোমেনাকে দেখতে আসে। কেমন আছেন খালা ? বলে একটা প্যাকেটে মোড়ানো বুলেটটি বের করে সামনের টেবিলে রাখে।
-এই সেই বুলেট যা কিনা তেতাল্লিশ বছর ধরে আপনার গলায় আটকে ছিল।

সবাই বিস্মিত দৃষ্টিতে টেবিলে রাখা বুলেটটির দিকে তাকায়। শুধু মোমেনার মধ্যে কোন বিস্ময় কাজ করে না। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে শুধু একবার বুলেটটির দিকে তাকায়। তার এই অতি স্বাভাবিকতাকে অস্বাভাবিক ঠেকে কারো কারো কাছে । হঠাত মোমেনা তীব্র স্বরে কেদে উঠে।তার মনে হয় মনের গহীনে বিরাট একটা দরজা যেন আজ খুলে গেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিনের লড়াই সংগ্রাম শেষে অবশেষে আজ সে মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির আনন্দে তাই সকল ব্যাথা আজ যেন ঝরছে অশ্রূ হয়ে। আজ তেতাল্লিশ বছর পর তার মধ্যে যেন আবারও নুতুন করে স্বাধীনতার মত অনুভুতি তৈরি হয় । এই সেই তীব্র সুখকর অনূভুতি যার কোন তুলনা নেই । নিকষ কালো অন্ধকারের দীর্ঘ রজনী শেষে আজ মোমেনার জীবনে আবারও ভোরের সূর্য উদিত হয়েছে। অপার্থিব সেই সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। মোমেনা কাঁদছে , আজ সে কাঁদছে আলোর স্পর্শে।

You may also like...

  1. অসাধারন একটা গল্প পড়লাম। ভাষাবিন্যাস আর শক্তিশালী প্লটটা মনে করিয়ে দিল সেই রক্তাক্ত জন্ম ইতিহাসের কথা… কতটা যন্ত্রণা আর আক্ষেপের উপাখ্যানে এই দেশটা পেয়েছি, সেটা আরেকবার চোখের সামনে ফুটে উঠলো… অপার্থিব, টেক আ বাউ ডিয়ার…

    viagra in india medical stores
  2. কতটা যন্ত্রণা আর আক্ষেপের উপাখ্যানে এই দেশটা পেয়েছি, সেটা আরেকবার চোখের সামনে ফুটে উঠলো amiloride hydrochlorothiazide effets secondaires

    আসলেই তাই । এই স্বাধীনতার জন্য যে কত জন ত্যাগ স্বীকার করেছে , কেউ ছোট(আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে ) কেউ বড় ।কতজন যে এখনো সেই তীব্র যন্ত্রণার ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে কে জানে ? বিজয় দিবসের প্রাক্কালে তাদের সকলের প্রুতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।
    বাই দ্য ওয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ

    acne doxycycline dosage
  3. 43 বছর ধরে রাজাকার নামক বুলেট গলায় বিধিয়ে ধুকছে আমাদের দেশটাও। অপারেশন চলছে, চির মুক্তির আনন্দ পাবে এই দেশও। side effects of drinking alcohol on accutane

    আপনার লিখাটা ভাল হয়েছে।

  4. ডিসেম্বর মাসের চমৎকার গল্প ভাই। স্যালুৃট

  5. ডাক্টারের বড় অভাব, আরো ডাক্টার প্রয়োজন, দীর্ঘমেয়াদি উন্নত ট্রিটমেন্টের জন্য।

tome cytotec y solo sangro cuando orino

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন * side effects of quitting prednisone cold turkey

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

can your doctor prescribe accutane
synthroid drug interactions calcium