মুক্তিযুদ্ধের গল্প ১ : সন্তান হারানো এক মায়ের করুণ আহাজারি।

324

বার পঠিত

১৯৭১ সাল। স্থান : সিলেটের গোয়াইনঘাট থানাধীন ফতেপুর ইউনিয়নের রাতারগুল গ্রাম(পর্যটন কেন্দ্র সুন্দরবন যে গ্রামে অবস্থিত)।

সম্ভবত আগষ্টের মাঝামাঝি কোন একদিন।সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা। খবর এসেছে, মিলিটারি আসছে এদিকে। এমনিতেই প্রতিদিনই দিনের পুরোটা সময় আতঙ্কে কাটে কখন পাকি মিলিটারিরা চলে আসে, সন্ধ্যার পর যেন সেই আতঙ্কটা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। খবরটি চাউর হতেই সারা গ্রামে হুলস্থুল পড়ে যায়। কেননা এই খবরের সাথে বাড়তি যোগ হয়, গ্রামে মুক্তি ঢুকে কোথায় জানি ওঁত পেতে আছে; তাই পাকি মিলিটারিরা মুক্তিদের খুজে বের করে মারবে আর না পেলে পুরো গ্রাম ধ্বংশ করে দেবে। অগ্নিসংযোগও করা হতে পারে।(খবরটি আসলেই সত্য ছিল এবং দুজন মুক্তিযোদ্ধা আগেরদিন সন্ধ্যার পর আমার নানাবাড়ীতে এসে ভাত খেয়ে কয়েকটা আনারস নিয়ে চলে যায়। তারা কেন এসেছিল, কোথায় থাকবে, সাথে আর কেউ আছে কিনা তারা নিজেরা কিছুই জানায়নি এবং আমার নানাও জানতে চাননি)। খবর শুনে কে কোথায় পালাবে ঠিক নাই। গ্রামের উত্তর পাশের বাড়ীগুলো সব হিন্দুদের। সাধারণত প্রতিদিন সন্ধ্যার পর গ্রামের হিন্দু পুরুষেরা পরিচিত মুসলিমদের বাড়ীতে আশ্রয় নেয় নয়তো ঝোপের ভিতর বড় গর্ত করে সেখানেই রাত কাটায়। যুবতী নারীরা সবাই গর্তেই রাত কাটায় প্রতিদিন। শুধুমাত্র বৃদ্ধ ও শিশুরা থাকে বাড়ীতে। তো খবর আসা মাত্রই শুরু হয় দৌড়াদোড়ি, চিৎকার চেচামেচি ও কান্নার রোল। গ্রামের মসজিদের ইমাম সাব আসেন আমার নানার কাছে। [আগেই বলে নিই, ঐ গ্রামটিতেই আমার নানাবাড়ী এবং আমার নানা মোটামুটি ধনী ও গ্রামের মুরুব্বি ছিলেন। তখনকার দিনে সারা গ্রামে ঐ একটিই পাকাবাড়ী ছিল যা আমার নানার ঘর। ঐ বাড়িটিকে গ্রামের সবাই পাক্কাবাড়ী বলে ডাকতো। অবশ্য এখনো ডাকে। রাতারগুল গ্রামে প্রায় সব বাড়ীই টিলার উপর এবং আমার নানাবাড়িটাও টিলার উপর ছিল। বাড়ীতে আনারস কাঠাল সহ অনেক ফল ফলাদিও ছিল।] তো ইমাম সাবের সাথে কি সব পরামর্শ শেষে নানা আমার বড় মামাকে দূরে একটি টিলার গর্তে লুকিয়ে থাকার নির্দেশ দিয়ে আমার আম্মা সহ তাদের ৩ বিবাহযোগ্য বোনকে হোগারে(ধানের গোলা) লুকিয়ে থাকতে নির্দেশ দেন। আমার নানীকে নামাজের কাপড় পরার কথা বলেন।[উল্লেখ্য যে, নামাজের কাপড় সাধারণত সাদা থাকে এবং সাদা শাড়ী পরিহিত মহিলাদের দিকে পাকি আর্মিরা সেই সময় একটু কম কুনজরে তাকাতো]।

ততক্ষণে রাত হয়ে এসেছে। এদিকে পাশের হিন্দু বাড়ীতে চিৎকার চেচামেচী আর কান্নার শব্দ যেন পুরো গ্রামটিকেই অন্যান্য দিনের চাইতে অধিক আতংকিত করে তুলছে। চিন্তা আর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটতেছে সবার… নানা রাত্রি জেগে বাহিরে পায়চারি করছেন। ভোর রাতে নানাবাড়ীতে আসে পাকি মিলিটারিরা। সংখ্যায় কতজন ছিল অন্ধকারে আন্দাজ করা সম্ভব হয়নি। নানার ঘর টিলার বেশ উপরে থাকায় তারা ৮/৯ জন উপরে গেল এবং আরো বেশ কয়েকজন নিচেই দাড়িয়ে ছিল। সাথে আছেন মসজিদের ইমাম সাব ও আরো একজন অপরিচিত বাঙালী লোক। উপরে যাবার পর মিলিটারিরা প্রথমে কিসব জানতে চাইলো। নানা সাথে থাকা বাঙালি লোকটির মাধ্যমে যথা সম্ভব উত্তর দিলেন। এরপর তারা পানি খেল এবং উঠোনে বসে পুরো এক বস্তা আনারস খেল। আমার নানী রান্নাঘরে খাবারগুলো তৈরী করে দিচ্ছেন আর আমার ছোট ছোট দুজন খালা পরিবেশন করতেছেন। আর্মিরা কিছু সময় বসে তাদের মধ্যে কিসব আলাপ করলো এবং ফর্সা হয়ে আসার আগে আগেই সাথে আরো এক বস্তা আনারস নিয়ে চলে গেল।

মিলিটারি চলে যাবার পর আম্মারা বের হয়ে এলেন। চারিদিক নিরব নিস্তব্ধ। তখন ভোর হয়ে গেছে। মামা সহ গ্রামের যুবকেরা ফিরে আসতেছে। পাশের হিন্দু বাড়ীতে আবার কান্না এবং বিলাপ শোনা যাচ্ছে। কি হয়েছে জানতে আম্মা ঐ বাড়ীতে গিয়ে শুনেন, সীমান্ত ক্রস করে ইন্ডিয়ায় পাড়ি জমানোর জন্য অনেকে রাতের মধ্যেই সীমান্তবর্তী কোন এক গ্রামে পাড়ি জমিয়েছে। এবং বাড়ীতে কেউ না থাকায় ঐ রাতে কে বা কারা যেন সবকটি হিন্দুবাড়ীর গরু ছাগল সহ বাড়ীর সব মালামাল লুট করেছে। সব শেষ হয়ে যাওয়ায় বয়স্ক কয়েকজন হিন্দু মহিলা ও পুরুষ কান্নাকাটি করতেছে। গ্রামের কিছু মুরুব্বি গোছের লোক তাদের সান্তনা দেবার চেষ্টা করছেন। খবর নিয়ে জানা গেল, ঐদিন পাকি আর্মিরা রাতারগুল গ্রামে কোন তান্ডব চালায়নি। পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, তবে কেউ হতাহত হয়নি।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়, দিন দুই পরে মামা এসে জানান, গ্রামের একেবারে পূর্বে একটি মাঠে কয়েকটি গরু জবেহ করা হয়েছে। ওখান থেকে সস্তায় লোকেরা মাংশ কিনে নিচ্ছে এবং তিনি খোজ নিয়ে জানতে পারেন ঐ গরুগুলি পাশের বাড়ীর হিন্দুদের ছিল। তিনি আরো জানান, ঐ রাতে অনেকের মত পাশের হিন্দুবাড়ীর এক মহিলা একটি দুধের শিশু, তার স্বামীসহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছাকাছি একটি গ্রামে আপাতত আশ্রয় গ্রহণের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে পৌছে দেখেন তার কোলে শিশুটি নেই। আতঙ্কে তাড়াহুড়া ও দৌড়াতে গিয়ে তার দুধের শিশুটিকে কোথায় ফেলে গেছেন মহিলাটি বুঝতে পারেননি। শিশুটি ঘুমিয়ে ছিল এবং উপরে কিছু কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। ঐ মহিলা ঝাপটে ধরে শিশুটিকে নিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু গন্তব্যস্থানে পৌছে দেখেন কাপড় আছে কিন্তু শিশুটি নেই। কানতে কানতে ঐ মহিলা বার বার মুর্ছা যাচ্ছিলেন, কিন্তু করার কিছুই ছিল না। মহিলার আহাজারি সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ঐদিন ভোর রাতেই জীবনের মায়া ত্যাগ করে মহিলার এক আত্মীয় ও শিশুটির বাবা গ্রামে ফিরে এসে শিশুটির খোজ করেছেন কিন্তু পাননি। zovirax vs. valtrex vs. famvir

[আম্মার মুখ থেকে শোনা]

You may also like...

  1. কি ভয়াবহই না ছিল দিন গুলো !!! তবুও শালারা বলে এত বছর পরে বিচার করে লাভ কি? posologie prednisolone 20mg zentiva

  2. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    বাস্তব সব সময়ই আরও নৃশংসও! মূলত একাত্তরের হায়েনাদের নৃশংসতা ছিল আরও বর্বরোচিত

    levitra 20mg nebenwirkungen
    zoloft birth defects 2013
  3. ঐ রাতে অনেকের মত পাশের হিন্দুবাড়ীর এক মহিলা একটি দুধের শিশু, তার স্বামীসহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছাকাছি একটি গ্রামে আপাতত আশ্রয় গ্রহণের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে পৌছে দেখেন তার কোলে শিশুটি নেই। আতঙ্কে তাড়াহুড়া ও দৌড়াতে গিয়ে তার দুধের শিশুটিকে কোথায় ফেলে গেছেন মহিলাটি বুঝতে পারেননি। শিশুটি ঘুমিয়ে ছিল এবং উপরে কিছু কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। ঐ মহিলা ঝাপটে ধরে শিশুটিকে নিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু গন্তব্যস্থানে পৌছে দেখেন কাপড় আছে কিন্তু শিশুটি নেই। কানতে কানতে ঐ মহিলা বার বার মুর্ছা যাচ্ছিলেন, কিন্তু করার কিছুই ছিল না। মহিলার আহাজারি সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ঐদিন ভোর রাতেই জীবনের মায়া ত্যাগ করে মহিলার এক আত্মীয় ও শিশুটির বাবা গ্রামে ফিরে এসে শিশুটির খোজ করেছেন কিন্তু পাননি।

    উফফ অসহ্য যন্ত্রণা… :cry:

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.