একজন হামিদুর রহমানের গল্প…

514

বার পঠিত

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে হঠাৎ গর্জে উঠলো মেশিনগান, একের পর এক শেল পড়তে শুরু করল চট্টগ্রামে বাঙ্গালী সৈনিকদের রিক্রুট সেন্টার ইবিআরসিতে। সদ্যই ১৮ পেরোনো রিক্রুট হামিদুর রহমান ঘুম থেকে উঠে কেবল ধ্বংস, হত্যা আর আর্তচিৎকার ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না। কিন্তু সে ভয় পায়নি।

আরও বাঙ্গালী অফিসার আর সিপাহীদের সাথে কাধ মিলিয়ে অস্ত্র হাতে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলল হামিদুর, এতো ধ্বংস আর মৃত্যুর মাঝেও যে এভাবে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে, ২০ বালুচ রেজিমেন্টের পাকি সারমেয়গুলোর সেটা কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর অন্যতম দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে কয়েকটা এলএমজি আর থ্রি নট থ্রি দিয়ে কতক্ষন যুদ্ধ করা যায়? ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অকুতোভয়য় যোদ্ধারা একে একে শহীদ হইতে শুরু করল…

বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল হামিদুর, দরিদ্র বাপ পড়ালেখার খরচ দিতে পারত না। নিজের চেষ্টায় বহুত কষ্টে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়তে পারছিল। তারপর বাপের লগে কাজে নাইমা গেল। বাপে পোলারে নিয়া গর্ব করত, আমার হামিদুরের মত সৎ পোলা আর নাই, যেকোনো কাজে তার উপরে ভরসা করা যায়। একটাই সমস্যা, পোলা একটু তারছিড়া টাইপ, খেপলে সমস্যা হয়া যায়। ২৫শে মার্চ চট্টগ্রামের ইবিআরসিতে ২৫০০ বাঙ্গালীর ডেডবডি দেইখা হামিদুরের মাথার তার ছিঁড়া গেল… ১৮ বছরের হামিদুরের চোয়ালবদ্ধ শপথে মিশে থাকলো শহীদদের রক্ত বৃথা যাইতে না দেওয়ার দৃপ্ত প্রতিজ্ঞা…

২৮শে অক্টোবর ,৭১। ভোর রাত। ১২৫ জনের মুক্তিযোদ্ধাদের দলটা লেফটেন্যান্ট কাইইয়ুমের নেতৃত্বে নিঃশব্দে এগোচ্ছে শ্রীমঙ্গলের ধলই বর্ডারের পাকি ঘাঁটির দিকে। ধলই চা বাগানের পূর্ব পাশে এই ঘাঁটিটা সিলেটের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি পাকি হায়েনাদের, দুর্ধর্ষ ৩০তম ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্ট পাহারা দিতেছে ঘাঁটিটা। যেভাবেই হোক আজ এই ঘাঁটি দখল করতে হবে। হঠাৎ পায়ের তলায় একটা মাইন বিস্ফোরণ, শহীদ হলেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা, টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মেশিনগান থেকে ব্রাশফায়ার শুরু করল পাকি মেশিনগানার। যেভাবেই হোক মেশিনগানটা থামাতে হবে, নাহলে সামনে এগোনো যাবে না। কিন্তু এই অবিরাম গুলিবৃষ্টির মধ্যে সামনে যাওয়া অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাবে কে?

দলের কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কাইয়ুমের পাশে এসে দাঁড়াল হামিদুর। “স্যার, আমি যাই? দুইটা গ্রেনেড দিয়া এই পোস্ট উড়ায়া দিমু। বেশিক্ষন লাগব না। “ কাইয়ুম তার দিকে ভালোভাবে তাকালেন। চেহারা থেকে এখনো কৈশোরের ছাপ যায় নাই, একেবারে বাচ্চা বয়স। কি সুন্দর হাসিমুখে বলতেছে, স্যার আমি যাই… হামিদুরের তাগাদা, যাই না স্যার… অনুমতি দিলেন কাইয়ুম, অশ্রুসিক্ত নয়নে ভাবতে থাকলেন, এই জীবনে হয়তো এই হাসিখুশি সাহসী ছেলেটার সাথে আর দেখা হল না… kan metformin krossas

পাহাড়ি খালের ভেতর দিয়ে ক্রল করতে করতে প্রায় ১৮০ ফুট দূরত্ব পাঁড় হয়ে গেল হামিদুর, মাথার উপর দিয়ে, শরীরের আশপাশ দিয়ে শাই শাই করে গুলি ছুটতেছে, একটা মুহূর্তের বিরাম নাই। এই তো আরেকটু… মেশিনগান পোস্টের গানাররা মরার আগে একটা বিচিত্র দৃশ্য দেখলো। একটা মানুষ মুহুমুহু গুলির মাঝখানে হঠাৎ দাঁড়াইল, বাঘের মত গর্জনে জয় বাঙলা চিৎকার দিয়া গ্রেনেড ছুইড়া মারল তাদের মেশিনগান পোস্টে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মেশিনগানটা অকেজো হইয়া গেল, ছিটকায়ে গেল সব কিছু…

হামিদুর হঠাৎ টের পাইল, তার শরীর দিয়ে রক্ত পড়তেছে। এদিকে মেশিনগান বন্ধ হইলেও পোস্টের ভিতরে বেঁচে যাওয়া দুইটা পাকি বরাহ শাবক আবার গুলিবর্ষণ শুরু করছে। ওদের থামাইতে না পারলে তো মুক্তিযোদ্ধারা আগাইতে পারবে না। বাপে গর্ব কইরা কইতো, হামিদুররে যেকোনো কাজে ভরসা করা যায়, যেমনে হোক সে কাজটা শেষ করবই। বাপেরে হামিদুর সারাজীবন সঠিক প্রমান কইরা আসছে, আজকেও তার ব্যতিক্রম হইল না…

সাথে থাকা ছুরিটা নিয়ে শরীরের সবটুকু শক্তি এক কইরা ঝাপায়া পড়ল হামিদুর মেশিনগান পোস্টের ভিতরে, সঙ্গে সঙ্গে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেইকা গুলি করল এক সৈন্য, আর আরেক সেনা বেয়নেটটা ঢুকায়া দিল পেটের ভিতর। মৃত্যুর আগে অকৃত্রিম বিস্ময় এসে জমা হইল ওই দুই সেনার চোখে। অজস্র গুলি খাওয়ার পরেও হামিদুর থামে নাই, পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেইকা বুকের হাড় উড়াইয়া দেওয়ার পরও কিংবা এতো বড় একটা বেয়নেট ঢুকাইয়া দেওয়ার পরেও হামিদুর থামে নাই, ঠিকই তাদের হার্টে ছুরিটা ঢুকায়ে দিল… কি অকুতোভয় সাহস, কি অসামান্য বীরত্ব…

কিছুক্ষন পরের কথা। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ধলই ঘাঁটি দখল করেছে মুক্তিযোদ্ধারা। পূর্ব দিগন্তে ভোর হচ্ছে, একটা টকটকে লাল সূর্য উঠছে। গুলিতে আর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হামিদুরের মুখে ওই লাল সূর্যের সোনালি আভা এসে পড়ছে। স্বাধীনতার লাল সূর্যটা আনতে হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করা হামিদুরের চোখ দুটো তখনও খোলা… বারুদ মেশানো দুটো চোখ তখনও যেন চিৎকার করে বলছে— জ-য় বা-ঙ-লা…

এই মানুষগুলার লাইগা দুঃখ লাগে… নিজের জীবনটা একটা মানুষের কাছে সবচেয়ে দামী। এই তারছিঁড়া ক্র্যাক মানুষগুলা সেই জীবনেরই কোন পরোয়া করল না… দেশের লাইগা হাসিমুখে জীবনটা দিয়া গেল…  আর তাদের রক্তের দামে কেনা এই স্বাধীন দেশে তারা আজকে স্রেফ অতীত, পুরাতন ইতিহাস মাত্র… 

You may also like...

  1. চমৎকার একটা কাজ করেছেন ডন ভাই!! অফুরন্ত ধন্যবাদ অসামান্য কাজটি করবার জন্য… cialis 20 mg prix pharmacie

    আর মহান বীরশ্রেষ্ঠকে শ্রদ্ধাবনত অসীমতক স্যালুট…

  2. দারুন লিখেছেন ডনদা। অনেক কিছু জানতে পারলাম :-)

    acquistare viagra online consigli
  3. হৃদয়ের গভীর থেকে শ্রদ্ধা জানাই এই বীরকে …

  4. শঙ্খনীল কারাগার বলছেনঃ

    আপনার লেখার ধরনটা বেশ ভাল লাগলো। ইতিহাসের একটা অংশ আড্ডায় গল্প করার মত ঠিক আমাদের ভাষায়। pastillas cytotec en valencia venezuela

  5. অপার্থিব বলছেনঃ

    ভাল লাগল। ধন্যবাদ লেখকেকে ।

প্রতিমন্তব্যক্লান্ত কালবৈশাখি বাতিল

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন * domperidona motilium prospecto

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

using zithromax for strep throat

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.