এক মায়ের গল্প…

743

বার পঠিত

আজাদের বাবা ইউনুস চৌধুরীর উপর প্রচণ্ড রেগে আছেন সাফিয়া বেগম। টাটা কোম্পানির সাবেক ইঞ্জিনিয়ার ইউনুস চৌধুরী পাকিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী বিজনেস ম্যাগনেট, ফলাফলে অবাধ নারীসঙ্গের চিরাচরিত স্খলনে সংসারে আগুন। শেষমেশ মাথার দিব্যি দিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেলেন ইউনুস সাহেব। রাগ পড়ে যেতেই সাফিয়া বেগমের হঠাৎ খেয়াল হল, আজাদকে কি কাজের মেয়েগুলো মনে করে রাতে খাইয়েছে? নাহ, কাউকে দিয়ে আজকাল আর ভরসা নেই। মাছটা ছেলে খুব পছন্দ করে, কিন্তু মাছের কাঁটা বেছে খেতে পারে না। কি অদ্ভুত কথা দেখো তো…

ভাবতে ভাবতেই আজাদের ঘরে উঁকি দেন তিনি, দেখেন হোম টাস্কের খাতার উপরই মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেছে ছেলেটা। “আজাদ, খেয়েছিস? ওঠ তো বাবা, একটু খাইয়ে দেই। “ ঘুমের দেশ থেকে উত্তর এল,আরে খেয়েছি তো, এখন ঘুমাতে দাও…

নিশ্চিত হতে পারেন না মা। আজাদের ফুলতোলা প্লেটে ভাত বেড়ে রুই মাছের দুটো টুকরো বাছতে বসেন। মাছ-ভাত সাজিয়ে ছেলের ঘরে ঢুকে দেয়ালে দুটো বালিশ ঠেস দিয়ে ছেলেকে তুলে বসান,”দেখি বাবা, হাঁ করো তো” । আধো ঘুমের ঘোরে কোনোক্রমে ছেলের হাঁ করা মুখে ভাতের নলা পুরে দেন মা। ভাত গালে ছেলে আবার অতল ঘুমে তলিয়ে যায়। এইভাবে কয়েক গাল ভাত আর এক গেলাস পানি খাইয়ে তৃপ্ত হন মা, প্রশান্তি নেমে আসে তার হৃদয়ে…

মা, আমি এখানে ভালোই আছি। কিন্তু তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে একা থাকি বলেই কিনা মাঝে মাঝে প্রাণটা কেঁদে ওঠে। ঢাকায় থাকতে তোমার হাতে যে রোজই ভাত খেতাম, তা তো না। কিন্তু এই করাচিতে এসে ভাত জিনিসটা হোস্টেলের ডাইনিংয়ে না পেয়ে হঠাৎ করেই হাহাকার বোধ হয়। ভাত খেতে অনেক দূরের এক হোটেলে যেতে হয় মা। মন মানে না। এখন মনে হয় তুমি যে ভাত রাঁধতে, তাতে টগবগ টগরবগর বলক ফুটতো, মাড়ের সুন্দর গন্ধ বেরোত, সেই গন্ধটাও কি অসাধারন ছিল। শুধু একটু ভাতের গন্ধ পাবার জন্যও মনটা ব্যাকুল হয় মা। এইখানে যাদের দেখি, কাউকেই আপন মনে হয় না। শুধু মনে হয় আমরা বাঙ্গালীরা এক জাতি, আর ওরা পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুঅলারা আরেক জাতি। মুসলমান হলেই জাতি এক হয় না।

নির্ঘুম রাতজুড়ে মনে মনে কত কথা সাজায় আজাদ। মাকে লিখবে বলে। সকালে তার কিছুই লেখা হয় না। মা যেন কোনভাবেই তার কষ্ট টের না পান,সেজন্য খুব সাবধানে ছোট্ট করে সে চিঠি লেখে। করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে আরও অনেকদিন থাকতে হবে, বিএ –এমএ করতে হবে, এখনই মাকে টেনশনে ফেলা যাবে না।

“চাচি, আল্লাহর কাছে শোকর করেন। আমি আছি বইলাই আজাদরে ছাইড়া দেওয়ার একটা সুযোগ আইছে। উনারে ক্যাপ্টেন সাব পাঠাইছে। কি কয় মন দিয়া শুনেন।“

সাদা শার্ট-কালো প্যান্ট পড়া আর্মি ছাটের কাটা চুলের মানুষটা সাফিয়া বেগমের দিকে ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তার গলার স্বরটা ততধিক ঠাণ্ডা শোনায়,

–আজাদের সাথে দেখা করতে চান?
–জি।
–ছেলেকে ছাড়ায়ে আনতে চান?
–জি!
–আজকে রাতে আজাদকে রমনা থানায় নিয়ে আসবে। দেখা করায়া দিব ওর সাথে। বুঝলেন?
–জি।
–তার সাথে দেখা করবেন। দেখা করে বলবেন, সে যেন সবার নাম বলে দেয়। অস্ত্র কোথায় রেখেছে, তা বলে দেয়।
–জি?
–সে যদি সব বলে দেয়, তাকে রাজসাক্ষী বানানো হবে। ছেলেরে যদি ফিরে পাইতে চান, তারে সব বলতে বলবেন।

আজাদের মা লোকটার পাথুরে মুখের দিকে তাকান। তার চোখে নিঃস্পন্দ শুন্য দৃষ্টি…
গরাদের ওপারে দাড়িয়ে থাকা আজাদকে তার মা চিনতে পারেন না। প্রচণ্ড মারের চোটে চোখমুখ ফুলে গেছে, ঠোঁট কেটে ঝুলছে, ভুরুর কাছটা কেটে গভীর গর্ত হয়ে গেছে।

–“মা, কি করব? এরা তো খুব মারে। স্বীকার করতে বলে সব। সবার নাম বলতে বলে।“
–“বাবা, তুমি কারোর নাম বলোনি তো?
–না মা, বলি নাই। কিন্তু ভয় লাগে, যদি আরও মারে, যদি বলে দেই…
–বাবারে, যখন মারবে, তুমি শক্ত হয়ে থেকো। সহ্য করো। কারো নাম বলো না।
–আচ্ছা মা। ভাত খেতে ইচ্ছে করে। দুইদিন ভাত খাই না। কালকে ভাত দিয়েছিল, আমি ভাগে পাই নাই।
–আচ্ছা, কালকে যখন আসব, তোমার জন্য ভাত নিয়ে আসব।

সাফিয়া বেগমের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গায়ে হাত তোলা তো দূরে থাক, ছেলের গায়ে একটা ফুলের টোকা লাগতে দেননি কোনোদিন। সেই ছেলেকে ওরা এভাবে মেরেছে… এভাবে…

মুরগির মাংস, ভাত, আলুভর্তা আর বেগুনভাজি টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে পরদিন সারারাত রমনা থানায় দাড়িয়ে থাকেন সাফিয়া বেগম, কিন্তু আজাদকে আর দেখতে পাননি। তেজগাঁও থানা, এমপি হোস্টেল, ক্যান্টনমেন্ট-সব জায়গায় খুজলেন, হাতে তখন টিফিন ক্যারিয়ার ধরা, কিন্তু আজাদকে আর খুঁজে পেলেন না।

ক্র্যাক প্লাটুনের বাকি সদস্যদের মত আজাদকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাফিয়া বেগম আর একটাবারের জন্যও ভাত মুখে তোলেননি। বেঁচে থাকার জন্য রুটি খেয়েছেন, পানি দিয়ে ভিজিয়ে পাউরুটিও খেয়েছেন কখনও, কিন্তু ভাত না। তার আজাদ যে ভাত খেতে চেয়েও ভাত খেতে পায়নি…

আজাদ, বদি, রুমিদের আত্মদানের কথা কি আজকের প্রজন্ম জানে? প্রজন্মের শরীরের একটা বড় অংশে তো পঁচন ধরা। সেই পঁচা-গলা অংশরা স্টেডিয়ামে গিয়ে একটা টেররিস্ট কান্ট্রি’র অপবিত্র পতাকা উড়ায়। লেজ নেড়ে ঘেউ ঘেউ করে বলে, “জিতেগা ভাই জিতেগা…!”

৪৩ বছর পর আজ আজাদের মাকে রুপকথার চরিত্র বলে মনে হয়.. মুক্তিযুদ্ধকে গণ্ডগোল বলে উড়িয়ে দেওয়া প্রজন্মের সামনে আজাদেরা মায়েরা আজ নিতান্তই বিস্মৃত অতীত…

You may also like...

  1. আজকের প্রজন্মের ছেলেরা এমন হয় কি??? হয় কি মায়েরা এমন??

  2. ৪৩ বছর পর আজ আজাদের মাকে রুপকথার চরিত্র বলে মনে হয়.. মুক্তিযুদ্ধকে গণ্ডগোল বলে উড়িয়ে দেওয়া প্রজন্মের সামনে আজাদেরা মায়েরা আজ নিতান্তই বিস্মৃত অতীত…।

zithromax azithromycin 250 mg

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

achat viagra cialis france

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

zoloft birth defects 2013
viagra vs viagra plus