মসলিন… বাঙালির হারিয়ে অনন্য এক গৌরবের নাম

1022

বার পঠিত

ইতিহাসখ্যাত অসাধারন এক বস্ত্রশিল্পের নাম “মসলিন” । এই মসলিনকে নিয়ে রয়েছে হাজারো কাহিনী আর গল্প গাঁথা। সেই সাথে  মসলিনের প্রতিটি পরোতে পরোতে মিশে আছে  বাঙালি তাঁতিদের নৈপুণ্যতা, পারদর্শিতা আর গর্বের ইতিহাস। ঠিক তেমনি ভাবে আবার এই মসলিনকে ঘিরেই রয়েছে এক হৃদয় বিদারক কাহিনী। সেকালে যেসব তাঁতিরা মসলিন তৈরি করতেন সেসব তাঁতিদের প্রতি অত্যাচারের কাহিনী, আঙুল কেটে ফেলার ইতিহাস- এসব  আমাদের সবারই কম বেশি জানা।

বেশ কিছুদিন ধরেই চিন্তা করছিলাম বাঙালির অন্যতম গৌরবের জিনিস এই “মসলিন” নিয়ে  লিখবো কয়েকটা লাইন। আর সেই ইচ্ছের প্রতিফলনই হল এই লেখাটি।

10557175_262188197308214_3921014116215812712_n

কিভাবে উদ্ভব “মসলিন” শব্দটিরঃ-  kamagra pastillas

হেনরি ইউল এর প্রকাশিত অভিধান হবসন জবসন থেকে জানা যায় যে- মসলিন শব্দের উদ্ভব ‘মসূল’ থেকে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে-

The Muslin was famous for fine cotton textures. Sense as our word, quoting the Arabian Nights (Macnaghten’s ed., i. 176, and ii. 159), in both of which the word indicates the material of a fine turban. [Burton (i. 211) translates 'Mosul stuff,' and says it may mean either of 'Mosul fashion,' or muslin.] The quotation from Ives, as well as that from Marco Polo, seems to apply to a different texture from what we call muslin. 1298. — “All the cloths of gold and silk that are called Mosolins are made in this country (Mausul).” – Marco Polo, Bk. i.

ইরাকের এককালের নামি ব্যবসা কেন্দ্র মসূলে তৈরি হত সূক্ষ্ম সব কাপড় । যতদূর জানা যায়, ইংরেজরা আমাদের এই সূক্ষ্ম কাপড়কে নামকরণ করে মসলিন হিসেবে ।  এই ‘মসূল’ এবং ‘সূক্ষ্ম কাপড়’ -এ দুয়ের যোগসূত্র মিলিয়ে ইংরেজরা অতিসূক্ষ্ম কাপড়ের নাম দেয় ‘মসলিন’। অবশ্য  বাংলার ইতিহাসে ‘মসলিন’ বলতে বোঝানো হয় তৎকালীন ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উৎপাদিত অতি সূক্ষ্ম একপ্রকার কাপড়কে।

আবার অনেকে বলে থাকে যে- যে উত্তর ভারতীয় বন্দর শহর মসলিপাটনাম থেকে প্রাচীন গ্রীসের বনিকরা কিনে নিয়ে যেত,ঐ শহরকে Maisolos নামেও ডাকা হত।অনেকে ধারন করেন Maisolos মসলিন শব্দটি এসেছে। আবার অনেকে ধারনা করেন মসলিন কাপড় বিক্রির জন্য প্রশিদ্ধ হওয়ায় ঐ স্থানের নাম মসলিনের নামে করা হয়েছে। বিখ্যাত পরিব্রাজক মার্কোপোলো এই অঞ্ছলে মসলিন কাপড়ের কথা বলেছেন। নামের উৎপত্তি নিয়ে যতোই মতভেদ থাকুক না কেন মসলিনের উৎপত্তিস্থল কিন্তু এই বাংলাতেই।

এবার মসলিনের জন্ম থেকে বিলুপ্তির ইতিহাসে আসা যাকঃ- thuoc viagra cho nam

বহু প্রাচীনকাল থেকে এই দেশের তাতীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উত্তম কার্পাস থেকে মিহি তন্তু উত্পাদন করে সুতিবস্ত্র বয়ন করে আসছেন। এর মধ্যে মসলিন বস্ত্র তার সূক্ষ্মতা ও নান্দনিকতায় বিশ্বের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। অনেক  বরেণ্য ব্যক্তিরা  লিখেছেন, ঈসা নবীর জন্মের প্রথম শতাব্দীকাল থেকেই বঙ্গদেশে বয়নশিল্প গড়ে উঠেছিল। বংশপরম্পরায় অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই শিল্প দ্রুত উত্কর্ষ লাভ করে। প্রাচীন আমল থেকেই বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পের সুখ্যাতি থাকলেও মূলত মুঘল আমলে ঢাকা যখন রাজধানী হয় তখন থেকেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাপড়ের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে । সম্রাট, নবাবেরা মসলিন কাপড় কেনা আরম্ভ করেন চড়া দামে। সে যুগে মসলিন তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল ঢাকা, ধামরাই, সোনারগাঁ, টিটবাদি, জঙ্গলবাড়ি আর বাজিতপুর। জঙ্গলবাড়ি অধিকাংশের পেশা তখন মসলিন বোনা। উনিশ শতকের প্রথমভাগেও সেখানে একাজে নিয়োজিত ছিলেন প্রায় একশ তাঁতি পরিবার। জঙ্গলবাড়ি থেকে মাইল কুড়ি দূরে বাজিতপুর- ওখানে জন্মাতো উচুঁমানের কার্পাস, যা থেকে তৈরি হতো উঁচুমানের মসলিন। আজ থেকে দু’শ বছর আগেও বিদেশী বণিকেরা সোনারগাঁ থেকে মসলিন বিদেশে রপ্তানী করতো। ওখানকার প্রায় দেড়হাজার তাঁতি সে সময় মসলিন বুনে সরবরাহ করতো ইংরেজ কোম্পানিকে। জেমস টেলর সাহেব ১৮৫১ সালে যখন মসলিনের উপর একটি পান্ডুলিপি তৈরি করেন মসলিনের স্বর্ণযুগ তখন পড়তির দিকে; অথচ যা জানা যায় ঢাকাতে তখনও সাতশ’ ঘরের বেশি তাঁতি নিয়োজিত ছিল এই কাজে।250px-Woman's_muslin_dress_c._1855

 লস এঞ্জেলেস কাউন্টি মিউজিয়াম অব আর্টে প্রদর্শিত আনুমানিক ১৮৫৫ সালে ইউরোপীয় নারীর জন্যে মসলিনের তৈরী পোষাক irbesartan hydrochlorothiazide 150 mg

মসলিন তৈরি করার জন্য দরকার হতো বিশেষ ধরনের তুলা, ফুটি কার্পাস। এ বিশেষ ধরনের কার্পাসটি জন্মাতো মেঘনা নদীর তীরে ঢাকা জেলার কয়েকটি স্থানে। একদম ভাল মানের কার্পাস উৎপন্ন হত মেঘনার পশ্চিম তীরে। শ্রীরামপুর, কেদারাপুর, বিক্রমপুর, রাজনগর ইত্যাদি স্থানগুলো ফুটি কার্পাসের জন্য বিখ্যাত ছিল। আজকের যে কাপাসিয়া নামটি আমরা জানি তা এসেছে এই কারপাস হতে। মেঘনা এমনিতেই খুব বড় নদী, তার উপর সমুদ্রের কাছাকাছি আবার বর্ষাকালে নদীর দু’কূল ভেসে যেত। তার ফলে যে পলি জমতো তার কারনেই ফুটি কার্পাসের উৎপাদন খুব ভাল হতো এসব স্থানগুলোতে। কিন্তু একজন কার্পাস চাষী একবিঘা জমিতে ভালমানের মসলিন তৈরির জন্য মাত্র ছয় কেজির মতো তুলা পেত। তাই মসলিনের চাহিদা যখন খুব বেড়ে গেল, সেই সময় ভারতের গুজরাট হতেও তুলা আমদানি করা হতো- কিন্তু ওগুলো দিয়ে ভালমানের মসলিন তৈরি করা যেত না- যা হতো তা খুব সাধারন মানের হতো।

সাধারনত, মহিলারাই সুতা কাঁটা আর সূক্ষ্ম সুতা তোলার মত পরিশ্রম এবং ধৈর্যের কাজে নিয়োজিত ছিল। সুতা তোলার সময় কম তাপ এবং আর্দ্রতার দরকার হতো। তাই একেবারে ভোর বেলা আর বিকালের পরে এ কাজ করা হতো। মজার ব্যাপার হলো- আর্দ্রতার খোঁজে অনেক সময় এমনকি নদীতে নৌকার ওপর বসে সুতা কাটার কাজ চলত। একজন মহিলা এভাবে প্রতিদিন সুতা কেটেও মাসে মাত্র আধা তোলা সুতা তুলতে পারতেন। এই পরিশ্রমসাধ্য কাজের কারণে দক্ষ সুতা কাটুনির সংখ্যা অনেক কমে আসতে থাকে উনিশ শতকের শুরু থেকেই। জানা গিয়েছে- এই রকম সূক্ষ্ম সুতা কাটার কাজ অঞ্চল ছাড়া অন্য কোথাও এতোটা ভাল হতো না । এর কারণ ধরা হয় দু’টো- ঢাকার ফুটি কার্পাস আর শ্রমিকের দক্ষতা ও পরিশ্রম।

বিভিন্ন সুত্র হতে যা জানা যায়- ১৮৫১ সালে লন্ডনে এক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ঢাকা হতে কিছু মসলিন পাঠানো হয়। সেখানে এক পাউন্ড সুতা দেখানো হয়েছিলো যা প্রায় আড়াইশো মাইল ছিল !! আরও মসলিন সম্বন্ধে, “মর্নিং ক্রনিকল” পত্রিকায় লিখা হয়- হাবিবুল্লাহ তাঁতির বোনা দশ গজ লম্বা একখন্ড মসলিনের ওজন মাত্র তিন আউন্স !!

1808;Warehouse;Warehouse

মসলিন তৈরির কাজটি ছিল ভীষন জটিল, কঠিন, সময়সাধ্য- তারচেয়েও বড় কথা হলো সেটা তৈরির জন্য দরকার হতো অসামান্য নৈপুণ্য আর আসুরিক ধৈর্য। মোটামুটি যে ক’ধাপ পেরিয়ে তৈরি হতো মসলিন সেগুলো হলো; সুতা নাটানো, টানা হোতান, সান বাঁধা, নারদ বাঁধা, বু-বাধাঁ, আর সবশেষে কাপড় বোনা । এসব শেষে একজন তাঁতি আর তার দু’জন সহকারীর লাগতো কমপক্ষে দু’তিন মাস।

মসলিন তৈরি শেষে ওগুলো ধোয়া হতো। সম্রাট আকবর এর আমালে সোনারগাঁ’র কাছে এগোরো সিন্ধুর পানি কাপড় ধোয়ার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। আসলে এটা যে শুধু পানির গুনে হতো তা নয়, এর সাথে ছিল ভাল ক্ষার বা সাবান আর ধোপার দক্ষতা। মসলিন ধোবার জন্য রীতিমতো একটা শ্রেনীর মানুষই তৈরি হয়েছিল। আঠারো শতকের গোড়ায় একখন্ড মসলিন ধোয়ার খরচ পড়তো দশ টাকা। আবার ধোয়ার সময় কাপড়ে কোন দাগ লাগলে বিভিন্ন ফলের রস দিয়ে সেটা তুলে দেয়া হত। কাপড় ধোবার সময় কোন সুতা সরে গেলে সেটা ঠিক করতো দক্ষ রিফুকাররা, তাদেরকে বলা হতো নারোদিয়া। এরপর শঙ্খ বা ছোট মুগুর দিয়ে পিটিয়ে মোলায়েম করা হতো। মোলায়েম করার সময় ছিটানো হতো চাল ধোয়া পানি। একাজে নিয়োজিতোদের বলা হতো কুন্ডুগার। তারপর সাবধানে ইস্ত্রি করা হতো মসলিন। কোন কোন মসলিনে ছুঁচের বা চিকনের কাজও করা হতো।

250px-Marie_Antoinette_in_Muslin_dress

১৭৮৩ সালে মেরি এন্টোইনেতে তাঁর বিখ্যাত মসলিন পোষাক পরিহিতা অবস্থায় চিত্রকর্ম

মসলিনের পার্থক্য করা হতো সূক্ষ্মতা, বুননশৈলী আর নকশার পার্থক্যে।এরই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রকার মসলিনের আলাদা আলাদা নাম হয়ে যায়। এবার নামানুসারে বিভিন্ন প্রকার মসলিন সম্পর্কে জানা যাকঃ-

 মলবুস খাস

মলবুস খাস’ মানেই হলো খাস বস্ত্র বা আসল কাপড়। এজাতীয় মসলিন সবচেয়ে সেরা আর এগুলো তৈরি হতো সম্রাটদের জন্য।আঠারো শতকের শেষদিকে মলবুস খাসের মতো আরেক প্রকারের উঁচুমানের মসলিন তৈরি হতো, যার নাম ‘মলমল খাস’। এগুলো লম্বায় ১০ গজ, প্রস্থে ১ গজ, আর ওজন হতো ৬-৭ তোলা। ছোট্ট একটা আংটির মধ্যে দিয়ে এ কাপড় নাড়াচাড়া করা যেতো। এগুলো সাধারণত রপ্তানি করা হতো।

সরকার-ই-আলা

এ মসলিনও মলবুস খাসের মতোই উঁচুমানের ছিলো। বাংলার নবাব বা সুবাদারদের জন্য তৈরি হতো এই মসলিন। সরকার-ই-আলা নামের জায়গা থেকে পাওয়া খাজনা দিয়ে এর দাম শোধ করা হতো বলে এর এরকম নামকরণ। লম্বায় হতো ১০ গজ, চওড়ায় ১ গজ আর ওজন হতো প্রায় ১০ তোলা। wirkung viagra oder cialis

 

ঝুনা
‘ঝুনা’ শব্দটি, জেমস টেইলরের মতে, এসেছে হিন্দী ঝিনা থেকে, যার অর্থ হলো সূক্ষ্ম। ঝুনা মসলিনও সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে তৈরি হতো, তবে সুতার পরিমাণ থাকতো কম। তাই এজাতীয় মসলিন হালকা জালের মতো হতো দেখতে। একেক টুকরা ঝুনা মসলিন লম্বায় ২০ গজ, প্রস্থে ১ গজ হতো। ওজন হতো মাত্র ২০ তোলা। এই মসলিন বিদেশে রপ্তানি করা হতো না, পাঠানো হতো মোঘল রাজ দরবারে। সেখানে দরবারের বা হারেমের মহিলারা গরমকালে এ মসলিনের তৈরি জামা গায়ে দিতেন।

আব-ই-রওয়ান

আব-ই-রওয়ান ফার্সি শব্দ, অর্থ প্রবাহিত পানি। এই মসলিনের সূক্ষ্মতা বোঝাতে প্রবাহিত পানির মতো টলটলে উপমা থেকে এর নামই হয়ে যায়। লম্বায় হতো ২০ গজ, চওড়ায় ১ গজ, আর ওজন হতো ২০ তোলা। আব-ই-রওয়ান সম্পর্কে প্রচলিত গল্পগুলোর সত্যতা নিরূপন করা না গেলেও উদাহরণ হিসেবে বেশ চমৎকার। যেমন: একবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে তাঁর মেয়ে উপস্থিত হলে তিনি মেয়ের প্রতি রাগান্বিত হয়ে বললেন তোমার কি কাপড়ের অভাব নাকি? তখন মেয়ে আশ্চর্য হয়ে জানায় সে আব-ই-রওয়ানের তৈরি সাতটি জামা গায়ে দিয়ে আছে। অন্য আরেকটি গল্পে জানা যায়, নবাব আলীবর্দী খান বাংলার সুবাদার থাকাকালীন তাঁর জন্য তৈরি এক টুকরো আব-ই-রওয়ান ঘাসের উপর শুকোতে দিলে একটি গরু এতোটা পাতলা কাপড় ভেদ করে ঘাস আর কাপড়ের পার্থক্য করতে না পেরে কাপড়টা খেয়ে ফেলে। এর খেসারৎস্বরূপ আলীবর্দী খান ঐ চাষীকে ঢাকা থেকে বের করে দেন।

খাসসা

ফার্সি শব্দ খাসসা। এই মসলিন ছিলো মিহি আর সূক্ষ্ম, অবশ্য বুনন ছিলো ঘন। ১৭ শতকে সোনারগাঁ বিখ্যাত ছিলো খাসসার জন্য। ১৮-১৯ শতকে আবার জঙ্গলবাড়ি বিখ্যাত ছিলো এ মসলিনের জন্য। তখন একে ‘জঙ্গল খাসসা’ বলা হতো। অবশ্য ইংরেজরা একে ডাকতো ‘কুষা’ বলে।

শবনম

‘শবনম’ কথাটার অর্থ হলো ভোরের শিশির। ভোরে যদি শবনম মসলিন শিশির ভেজা ঘাসে শুকোতে দেয়া হলে শবনম দেখাই যেতোনা, এতোটাই মিহী আর সূক্ষ্ম ছিলো এই মসলিন। ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ প্রস্থের শবনমের ওজন হতো ২০ থেকে ২২ তোলা।

নয়ন সুখ

মসলিনের একমাত্র এই নামটিই বাংলায়। সাধারণত গলাবন্ধ রুমাল হিসেবে এর ব্যবহার হতো। এজাতীয় মসলিনও ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ চওড়া হতো।

বদন খাস

এজাতীয় মসলিনের নাম থেকে ধারণা করা হয় সম্ভবত শুধু জামা তৈরিতে এ মসলিন ব্যবহৃত হতো, কারণ ‘বদন’ মানে শরীর। এর বুনন ঘন হতো না। এগুলো ২৪ গজ লম্বা আর দেড় গজ চওড়া হতো, ওজন হতো ৩০ তোলা।

সর-বন্ধ

ফার্সি শব্দ সর-বন্ধ মানে হলো মাথা বাঁধা। প্রাচীন বাংলা উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা মাথায় পাগড়ি বাঁধতেন, যাতে ব্যবহৃত হতো সার-বন্ধ। লম্বায় ২০-২৪ গজ আর চওড়ায় আধা থেকে এক গজ হতো; ওজন হতো ৩০ তোলা।

ডোরিয়া

ডোরা কাটা মসলিন ‘ডোরিয়া’ বলে পরিচিত ছিলো। লম্বায় ১০-১২ গজ আর চওড়ায় ১ গজ হতো। শিশুদের জামা তৈরি করে দেয়া হতো ডোরিয়া দিয়ে।

জামদানী

জামদানীও এক প্রকার মসলিনের অন্তর্ভুক্ত। তবে আগেকার যুগে ‘জামদানী’ বলতে বোঝানো হতো নকশা করা মসলিনকে।

এছাড়াও আরো বিভিন্ন প্রকারের মসলিন ছিলো: ‘রঙ্গ’, ‘আলিবালি’, ‘তরাদ্দাম’, ‘তনজেব’, ‘সরবুটি’, ‘চারকোনা’ ইত্যাদি।

 

মসলিন তৈরির প্রক্রিয়াটা এত জটিল আর সময় সাপেক্ষ ছিল যে সম্রাটদের জন্য উন্নত মসলিন তৈরি করেই দিন কাটতো তাঁতিদের- বাড়তি মসলিন তৈরি করার সময় মিলতো তাই কম।
যতদূর জানা যায়, ঢাকা শহরে ‘মলবুস খাস’ তৈরির কারখানা ছিল বর্তমানের নাজিমুদ্দিন রোডে। ১৭৭২ সালের এক হিসাব থেকে দেখা যায় যে ওই বছর সম্রাটকে পাঠানো হয় একলক্ষ টাকার ‘মলবুস খাস’ আর বাংলার নবাবকে পাঠানো হয় তিনলক্ষ টাকার ‘সরকার-ই-আলি’। ওলোন্দাজ ব্যবসায়ীরা ইউরোপে রপ্তানীর জন্য ১৭৮৭ সালে একলক্ষ টাকার মসলিন রপ্তানী করে। ইংরেজ কোম্পানী ওই বছর সংগ্রহ করে তিন লাখ টাকার মসলিন।

 images (1)

চার-পাঁচশো বছর আগে যে মসলিন হয়ে উঠেছিল পৃথিবী বিখ্যাত, মাত্র দেড়শো বছরের মধ্যেই তা হারিয়ে গেল কেন? levitra 20mg nebenwirkungen

১৮৪৪ সালে ঢাকার কমিশনার আই. ডানবার কোম্পানীর সদর দপ্তরে মসলিন শিল্প বন্ধ হবার কারণ উল্লেখ করে একটি রিপোর্ট পাঠান। ডানবার সাহেবের মতে মূল কারণগুলো ছিলঃ

১) ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে সস্তায় সুতা আর কাপড় উৎপন্ন হতে থাকে। ফলে দামি মসলিনের চাহিদা কমে যায়।

২) বিলেতের সস্তা সুতা ঢাকায়, ভারতে আসতে থাকে, সে থেকে তৈরি হতে থাকে কাপড়, হারিয়ে যেতে থাকে মসলিন।

৩) বিলাতে ঢাকাই মসলিনের ওপরে উচ্চহারে কর আরোপ করা হয়, ফলে মসলিনের দাম ওখানে বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। স্বভাবতাই বিক্রি কমে যায় মসলিনের।

এছারাও মসলিন শিল্প হারিয়ে যাবার পিছনে ইংরেজ এবং দেশীয় গোমাস্তারাও দায়ী ছিল।  মসলিনের সাথে জড়িত আমাদের দেশের প্রতিটি কৃষক, শ্রমিক, তাঁতীকে নানাভাবে ঠকাতো  এবং নির্যাতন  করতো তারা। গরীব চাষিকে টাকা ধার দিয়ে তার কাছ হতে খুব কম দামে কার্পাস নিয়ে যেত একশ্রেনীর দেশী মানুষ। দেশী মানুষরা যারা দালাল-পাইকার হিসেবে কাজ করতো তারাও তাঁতীদেরকে ঠকাতো নানা ভাবে। গোমস্তারাতো রীতিমত অত্যাচার করতো তাঁতীদেরকে। হিসেবে দেখা যায়, আনুমানিক ১৭৪০ সালের দিকে এক টাকায় পাওয়া যেত প্রায় একমণ চাল। আর একজন তাঁতী মসলিনের কাজ করে পেত মাসে দুই টাকা, অর্থাৎ দুই মণ চালের দাম! যাতে তার পরিবারের খাবারই ঠিকমত চলতো না, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যতো অনেক দূরের কথা।

কি ভীষন ট্রাজেডি, যারা তৈরি করতেন বাংলার গর্ব-যাদের তৈরি কাপড় গায়ে উঠতো সম্রাটের, রপ্তানী হত বিদেশে, তাঁর গায়েই থাকতো না কাপড়, পেটে পড়ত না ঠিক মত খাবার। আর সবচেয়ে দুঃখজনক বোধহয় এটাই যে-এই অবিচারের পিছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলো এ দেশেরই দালার, পাইকার আর গোমস্তারাই।

প্রচলিত আছে যে- ইংরেজরা নাকি মসলিন তাঁতীদের আঙুল কেটে ফেলতো। আবার এও শোনা যায় যে- তাঁতীরা নিজেরাই নাকি নিজেদের আঙুল কেটে ফেলতো, যাতে করে এই অমানুষিক পরিশ্রম আর কম পারিশ্রমিকের কাজে তাদের বাধ্য না করা হয়। তবে আঙুল কেটে ফেলা ঘটনার কোন ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমানিত না হলেও কার্পাস কৃষক আর তাঁতীদের উপর কোম্পানী, ব্যবসায়ী, গোমস্তা আর পাইকাররা যে অমানুষিক অত্যাচার চালাত সেটি জাজ্বল্যমান সত্যি। আমাদের গর্বের এই মসলিনের সঙ্গে কালিমার মত লেপ্টে আছে এই রূঢ় সত্যটাও।

খুব গর্ব হয় যখন ভাবি যে মসলিনের মতো এমন একটি শিল্পের জন্ম এই বাংলাতে; খুব আফসোসও হয় অসাধারণ এই শিল্পটির বিলুপ্তির ইতিহাস আর সেই মসলিন শিল্পীদের করুণ পরিণতির কথা জেনে।

 

তথ্যসূত্রঃ-

You may also like...

  1. শঙ্খনীল কারাগার বলছেনঃ

    অসাধারণ তথ্যবহুল। অনেক কিছু জানলাম। পরিশ্রমলব্ধ পোস্টটির জন্য ফাতেমাকে এক আউন্স মসলিন তুল্য ধন্যবাদ।

  2. লেখাটি পড়বার জন্য আপনাকেও এক আউন্স মসলিন তুল্য ধন্যবাদ :-D

  3. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    অসাধারন বললে কম হবে! সেই লেভেলের পোস্ট!! দারুণ লাগলো। আপনাকে ধন্যবাদ এই কষ্টসাধ্য কাজটি করবার জন্য, সেল্যুট আপনাকে!

    acquistare viagra in internet
  4. দুরন্ত জয় বলছেনঃ

    এক কথায় অসাধারণ পোস্ট। আমাদের এই সভ্যতা ব্লগে অনেক পোস্ট আছে সংরক্ষন করার মত।

    ব্লগ কতৃপক্ষ যদি এগুলো আলাদা ভাবে সংরক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহন করতো তবে ভাল হত।

    মসলিন সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম

    স্টিকি করার অনুরোধ কতৃপক্ষের কাছে

  5. আপনার পাণ্ডুলিপিগুলো পড়লে সিরিয়াসলি আপনাকে আমার হিংসা লাগে। প্রতিটা পাণ্ডুলিপিই এমন তথ্যবহুল এবং শ্রমসাধ্য যে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই, এতটা ধৈর্য নিয়ে কিভাবে পাণ্ডুলিপি লেখেন।

  6. will metformin help me lose weight fast
  7. একটা বানান ভুল আছে । ত্ত না তাঁত । ভাল লিখেছিস ।

  8. এই পোস্টের মান নির্নয় করা অসম্ভব। মসলিনের মতই দামী। হায় মসলিন…. আমাদের ভাগ্য দেখেন হাতে ধরেও দেখা হয়নি আসল মসলিন….

  9. ইলেকট্রন রিটার্নস বলছেনঃ

    দারুণ বর্ণনা। আপনার পোস্ট গুলো নিয়ে কিছুই বলার নাই! প্রত্যেকটা পোস্টই একে অপরকে ছাড়িয়ে যায়! কিপিটাপ আপু!

    achat viagra cialis france

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

zithromax azithromycin 250 mg

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

can your doctor prescribe accutane