বাংলাদেশের পথে..

529

বার পঠিত

সোনালি সবুজ বাংলার রূপ খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। চিরকালের বাঁধাধরা নিয়মের গন্ডি পেরিয়ে কয়েকটা দিন মুক্ত হাওয়ায় নি: শ্বাস নেবার জন্য দরকার একটু গ্রাম থেকে ঘুরে আসা। বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে একটু ছুঁয়ে দেখা। অনেক জীবনের দামে এই ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় আজ আমাদের। প্রকৃতিরাণীর অপরূপ খেয়ালে সাজানো বাংলার পথে প্রান্তরে তাই জীবনের ছোঁয়া ঘুরে বেড়ায়। হাত বাড়ালেই সে জীবনকে ছোঁয়া যায়, ভালোবাসতে জানলেই সে জীবনকে ভালোবাসা যায়। সোনার বাংলাদেশ তার রুপের পসরা সাজিয়ে অপেক্ষা করে তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেবার। বাংলা মায়ের ভালোবাসা, এর সাথে আর কিছুর তুলনা হয়না কখনই…।  

আন্ত:নগর সুন্দরবন এক্সপ্রেস ছুটে চলে বাংলার পথ ধরে।  কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে একের পর এক পার হয়ে যেতে থাকে স্টেশনের নামফলকগুলো। কোনো এক ভোরে ফজরের আজানের সময় শান’ত মায়া মেখে ঢাকা থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের যাত্রা। তখনো ব্যস্ত শহরে জীবনের কোলাহল শুরু হয়নি। এখানে সেখানে এক একটা পাখির ডাক আর ভোরের মৃদুমন্দ বাতাস বইছে চারপাশে। জীবন যুদ্ধের চরম বিধ্বস্ত সৈনিকটির মনও কিছুক্ষণের জন্য হালকা করে দিতে সক্ষম এই বাংলাদেশ। 

আমরা যখন ট্রেনে উঠলাম তখন সকাল ৭ টা। সাড়ে সাতটার দিকে ট্রেন চলা শুরু হল। এরপর একে একে পার হয়ে যেতে লাগল স্টেশনগুলো। কমলাপুর – গাজীপুর – টঙ্গী- টাঙাইল – রাজশাহী – পাবনা – ঈশ্বরদী – সিরাজগঞ্জ – কুষ্টিয়া – মেহেরপুর- আলমডাঙা – চুয়াডাঙ্গা – যশোর হয়ে অবশেষে সন্ধ্যায় পৌঁছালাম দুধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ শিরোমণির স্মৃতিবিজড়িত সেই খুলনায়। পুরোটা সময় মোবাইল ক্যামেরায় অনবরত ক্লিক করে যাচ্ছিলাম।  মূহুর্তকে ধরে রাখছিলাম চিরকালের জন্য। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর দিয়ে যাওয়ার সময় যমুনার যে সৌন্দর্য দেখেছি তা আমি কখনো ভুলব না। সত্যি প্রেমে পরে গিয়েছি এই যমুনার। 

 

খুলনা তো পৌঁছালাম ,এবার ? সোনাডাঙ্গায় প্রথমেই হোটেল ঠিক করলাম।  Hotel Southern – সত্যি অনেক ভাল সার্ভিস ছিল হোটেলটার। আর এখানকার মানুষগুলো খুবই সহজ সরল। অনেক বেশিই আন্তরিক। রিক্সায় না উঠে ইজি বাইকে উঠলাম – তারপরেও রিক্সাওয়ালা সাথে এসে হোটেল দেখিয়ে দিয়ে গেল। ঢাকায় সবাই নিজের জীবন নিয়ে অনেক বেিশ ব্যস্ত। এতটা আন্তরিকতা এখানে কল্পনা করা যায়না। যাই হোক, সেই রাত ঘুমিয়ে পরদিন ভোরে উঠে বাসে করে মংলা পোর্ট। সেখান থেকে ট্রলারে করে করমজল,  অর্থাৎ সুন্দরবন। 

এটা আমার জীবনের প্রথম কোনো জলযানে চড়া। পশুর নদী, অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল আর সেই সাথে আমরা কেউ সাঁতার জানিনা,  লাইফ জ্যাকেট ও নাই। এডভেঞ্চার যেমন লাগছিল, সেই সাথে অনেক বেশি ভয়ও লাগছিল। ঢেউয়ের তালে ট্রলার একটু বেশি দুলে উঠলেই চিতকার করে উঠছিলাম।  তবে এর মধ্যেও ছবি তুলে গেছি, ধরে রেখেছি পশুর নদীর স্মৃতিকে। নদী পার হয়ে সুন্দরবনে পৌঁছালাম। সেখানে আমার মোবাইল দেখে বানরের দৌঁড়ে আসা – তারপর তাকে ফ্রুটো খাওয়ানো ( বানর আসলেও ফ্রুটো খায় – বড় বানরগুলো দুই হাত বাড়িয়ে নিয়ে তারপর আড়ালে চলে যায়। এরা আমাদের মতন ফ্রুটোর বোতলের মুখ খুলে খেতে জানে। ছোট বানরগুলো এত ভদ্রতার ধার ধারে না। বোতলের মাঝখান দিয়ে ফুটো করে খেয়ে ফেলে), হরিনকে পাতা খাওয়ানো ( এত মায়াভরা চোখ করে তাকায় এরা যে ইচ্ছে করে সারাজীবন ধরে এদের পাতা খাওয়াই) আর দুটি কুমির রোমিও জুলিয়েট এর বিলের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটেএসে রাজকীয় ভঙ্গিতে ডাঙায় ওঠা – সবুজ ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষনে দুপুর হয়ে এসেছে। 

ট্রলারে করে আবার তীরে ফিরলাম।  পাশে একটা হোটেলে হালকা নাস্তা করে বাসে করে খান জাহান আলীর মাজারে। স্থাপত্যশিল্প অনেক সুন্দর এখানে – তবে কষ্ট লেগেছে মাজারের লোকদের ব্যাবহারে। মহিলাদের তোমরা মাজারের ভেতর ঢুকতে দেবেনা জানি, মানলাম ও কিন্তু অপমান করার অধিকার কিভাবে কোথা থেকে পেলে? মাজারে ঢোকা যাবে না সে কথাটা আরেকটু ভাল করেও তো বলা যায় – এভাবে আঁতকে ওঠার কি মানে মেয়েদের দেখলেই। যাই হোক, দীঘিটাও অনেক সুন্দর। বিশেষ করে ষাট গম্বুজ মসজিদের সাথের দীঘিটা। একসাথে এত পদ্মফুলের হাসি আমি আর কখনো দেখিনি। এখানেও মসজিদের ভেতর মেয়েরা যেতে পারেনা। খারাপ লাগলেও ষাট গম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যশিল্প আর জাদুঘরে সাতশ বছর আগের স্মৃতি, কত অতীতের পুরনো বটগাছ দেখতে দেখতে হারিয়ে গেলাম পদ্মপুকুরে সূর্যের সোনালি রশ্মির মাঝে। 

এরপর আবার বাসে করে হোটেলে ফেরা – রাতে খেয়েদেয়ে একটু টিভি দেখে ঘুম। পরদিন ঘুম ভাঙল সকাল দশটায়। নাস্তা করে এগারোটার দিকে বেরিয়ে গেলাম। বিভাগীয় জাদুঘরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল – কিন্তু রবিবার হওয়ায় জাদুঘর ছিল বন্ধ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আর নিউমার্কেট ঘুরে কাটালাম দিনটা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এর অদম্য বাংলা নামের ভাস্কর্য টা সত্যি অনেক সুন্দর। সারাদিন ঘুরে, ছবি তুলে সন্ধ্যায় এলাম রেলস্টেশনে। রাত আটটায় ট্রেনে উঠলাম।  রেলগাড়ি চলতে লাগল নিজের গতিতে, জানালা দিয়ে দেখতে লাগলাম বাংলাদেশের রাত..।

সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা ছিল ভোরের দিকে। অন্ধকার কেটে গিয়ে তখন ধীরে ধীরে আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে। ভোরের প্রথম আলোয় আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য। কোন জায়গা জানিনা, তবে দৃশ্যটা চিরকাল আমার মনের মধ্যে গেঁথে থাকবে। সেই একটা মূহুর্ত  আমার ভেতরে যেন একটা ঝড় তুলে দিল। আমি সেই মূহুর্তে যেন ট্রেনে ছিলাম না – আমার মনে হচ্ছিল আমি শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর এ আছি। চারপাশে জয় বাংলা স্লোগান চলছে, কপালে পতাকাটা বেঁধে আমি, এই শান’ত নিরীহ আমি স্লোগান তুলছি – রাজাকারের ফাঁসি চাইছি। সত্যি খুব মনে পরছিল ওই মূহুর্তে সেই দিনগুলোকে। 

নির্ঘুম রাতের শ্রান্ত সফর শেষে পরদিন সকালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালাম আবার। ফিরে এলাম চিরচেনা শহরে – পুরো বাংলাদেশ পেরিয়ে আবার সেই চিরচেনা ঢাকায়। সি এন জি নিয়ে বাসায় ফিরতে  চাইলাম। কিন্তু ভাগ্যের কি অদ্ভুত পরিহাস! গত বছর এক্সিডেন্ট করার পর থেকে সি এন জিতে চড়তে এম্নিতেও আমি ভয় পাই। এর উপর এই সি এন জির চালক ছিল একটু বেশিই অসাবধান। ফলে মাঝরাস্তায় নেমে গেলাম। নেমে সামনে চেয়ে দেখি আমি প্রজন্ম চত্বরে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে জীবনের প্রবাহ। তবু সবকিছু কেমন যেন নীরব। এই নিস্তব্ধতাকে তো আমি চাইনি, এই নীরবতার স্বপ্ন তো আমি দেখিনি..।

জানি, শাহবাগের কোনো সৈনিকই এই নিস্তব্ধতাকে ভালোবাসে না। তাই দুহাত বাড়িয়ে দূরে ঠেলে দেই সব হতাশাকে।  এই ভ্রমন আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।  নিজেকে, বাংলাদেশকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে। কখনো চ্যালেঞ্জ থেকে দূরে সরব না – বরং সামনে দাঁড়িয়ে তার মোকাবেলা করব।  আমার বাংলাদেশকে ছেড়ে কক্ষনো কোথাও যাব না – অনেক বেশিই ভালোবেসে ফেলেছি এই ভূমিকে। এই ভালোবাসার জন্যই লড়ব। নিস্তব্ধতার বুক চিরেও এই সবুজ মাটিতে স্বপ্ন বোনা হয়, পদ্মা নদীর মাঝিদের স্বপ্ন…।  

You may also like...

  1. মাশিয়াত খান বলছেনঃ

    নিস্তব্ধতার বুক চিরেও এই সবুজ মাটিতে স্বপ্ন বোনা হয়, পদ্মা নদীর মাঝিদের স্বপ্ন…।

    বেশ তো… ছবিগুলো দিলেন না কেন? বিশেষত আমার একটা ছবির দরকার ছিল। অদম্য বাংলা’ ভাষ্কর্যটির ছবি ।
    আছে?
    থাকলে অন্য ছবির সাথে যোগ করে দিয়েন

  2. অংকুর বলছেনঃ

    ঘুরাঘুরি আমার খুব একটা করা হয়নি। তবে খুব ইচ্ছা আছে ঘুরার। আপনার ভ্রমণকাহিনী পড়ে খুব ঘুরতে ইচ্ছা করছে। ছবিগুলো দেখাবেন। দুধের সাধ ঘোলে মিটাই আরকি

  3. ওহ। স্যরি মাশিয়াত আপু। আর ছবি আমি দিলেই দেখাচ্ছে “media not supported ” কেমন লাগে? অংকুর ভাই, মাশিয়াত আপু ছবিগুলি ফেসবুকে আপলোড দিসি। এইখানে দেখতে পারেন – https://m.facebook.com/odhora.rajkumari/albums/1486116038297855/?ref=bookmark

    missed several doses of synthroid
  4. অংকুর বলছেনঃ

    আপনি এক কাজ করুন। ব্লগে লিংক দিয়ে ছবি আপলোড করা যায়। আপনি ফেসবুকের লিংক দিয়ে ছবিগুলো সব পোষ্টে দিয়ে দিন। ছবি ছাড়া ভ্রমণকাহিনী কেমন জানি অসম্পূর্ণ লাগে

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

can your doctor prescribe accutane

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

walgreens pharmacy technician application online

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment. about cialis tablets

puedo quedar embarazada despues de un aborto con cytotec
amiloride hydrochlorothiazide effets secondaires
doctus viagra
will metformin help me lose weight fast