মুক্তিযুদ্ধ, চীনাবাম ও বঙ্গবন্ধু

510

বার পঠিত

মুক্তিযুদ্ধে বামদের ভূমিকা নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে বেশ বিতর্ক আছে। ঐ সময় বামেরা অনেক দল ও উপদলে বিভক্ত ছিল। এমনকি চীনপন্থীদের মধ্যেও মাওপন্থী, নকশালপন্থী, হকপন্থী, তোহাপন্থী, সর্বহারা (সিরাজ শিকদারের সন্ত্রাসী গ্রুপ) সহ অসংখ্য দল, উপদল ও গ্রুপ ছিল । ৭১ এ যুদ্ধাকালীন সময়ে তাদের বেশির ভাগেরই অবস্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে।

মূলতঃ ষাটের দশকে চীন-রাশিয়া মেরু করণের সময়ে মওলানা ভাসানীকে কেন্দ্র করেই চীনাপন্থীরা একত্রিত হয়। আবার চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ভাসানী সক্রিয় হতে পারেন নি। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকায় চীনাপন্থীরা কখনোই আওয়ামী লীগকে আস্থায় নিতে পারে নি। এই আস্থাহীনতাই ৭০ এর পরে আওয়ামীলীগ ও পূর্ববাংলার চীনাপন্থী বামদের মধ্যে আলাদা দুরত্বের সৃষ্টি করে।
১৯৭১ সালে পূর্ববাংলার সব দল মিলে যখন চুড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত তখন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি মো-(লে) এর কেন্দ্রিয় কমিটির মূল্যায়ন ছিল এরকম…

আওয়ামী লীগ, ভাসানী ও অন্যান্য বুর্জোয়া, পাতি বুর্জোয়া নেতাদের নেতৃত্বে উগ্র বুর্জোয়ার জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে যে যুদ্ধ চলছে তা প্রতি বিপ্লবী যুদ্ধ, তা মুক্তিযুদ্ধ নয়। সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা-প্রত্যাশী দুই কুকুরের মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে তা হচ্ছে প্রতি বিপ্লবী গৃহযুদ্ধ।

[বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ১৫ খন্ড।]

৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকে কয়েকটি বাম সংগঠন একত্রিত হয়ে কাজী জাফরকে সদস্য ও অনুপস্থিত ভাসানীকে সভাপতি করে “বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি” নামে একটি কমিটি গঠন করে। ঐ কমিটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিনের সাথে দেখা করতে যান কাজী জাফর, রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনো। কাজী জাফর উল্লেখ করেছেন যে,

আমরা আমাদের কর্মীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়ে সহযোগিতার চাইলে তিনি আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে অস্বীকৃতি জানান এবং সরকারের মুক্তিবাহিনীতে আমাদের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকার করেন। কারণ হিসেবে তিনি (তাজউদ্দিন) হক-তোয়াহার নেতৃত্বাধীনে কমিউনিস্টদের শ্রেণী সংগ্রামের এবং স্বাধীনতা বিরোধী তৎপরতার উল্লেখ করেন।

তাজ উদ্দিনের ঐ সংশয় থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায় চীনাপন্থী বামরা তখন কি করেছিল। তাছাড়া সেই কমিটির সাথে সংযুক্ত থাকা বিশিষ্ট বাম নেতা হায়দার আকবর খান রনোও বলেছেন,

আমাদের সঙ্গে যুদ্ধরত অন্যান্য বাম-কমিউনিস্ট পার্টি ও সংগঠনের মধ্যে পার্থক্য ছিল। যথা: সুখেন্দু দস্তিদার-তোয়াহার নেতৃত্বাধীন ইপিসিপি (এমএল) এবং সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন সর্বহারা পার্টি (তখন নাম ছিল পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন) তারা প্রবাসী সরকারকে স্বীকৃতি দিতে চাননি।

বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যে অস্থায়ী সরকার পুরো মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছে সেই সরকারকে স্বীকৃতি না দিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে তারা কি ভূমিকা পালন করেছে বা করতে পারে তা আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। all possible side effects of prednisone

বামদের নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী একটি কলামে লিখেছেন….

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর পরই পশ্চিমবঙ্গে অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টির মধ্যে চরম বাম বিচ্যুতি দেখা দিয়েছিলো এবং তারা ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হায়’ শ্লোগান দিয়ে সন্ত্রাসী রাজনীতিতে জড়িত হয়ে নেহেরু সরকার কর্তৃক কিছুকালের জন্য নিষিদ্ধ দল ঘোষিত হয়েছিলো। পাকিস্তানে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই চীনপন্থী বামদের মধ্যে ডান বিচ্যুতি দেখা দেয় এবং তাদের বড় অংশটিই আইয়ুবের সামরিক সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেন।

তিনি আরো লিখেন….

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলে হত্যা ও সন্ত্রাসের রাজনীতি শুরু করার ব্যাপারে চীনপন্থী বামদের এবং আত্মগোপনকারী জামায়াতীদের সন্ত্রাসী অংশের মধ্যে রীতিমতো আঁতাত গড়ে উঠেছিলো। সত্য কথা বলতে কি, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাকশাল ভেঙে আওয়ামী লীগ পুনরুজীবিত হওয়ার পর দলটি ক্রমাগত ডানপন্থা ও সুবিধাবাদিতার দিকে ঝুঁকলেও সে সেকুলারিজমকে অন্তত শ্লোগান হিসাবেও ধরে না রাখলে বাংলাদেশে আজ হয় ফ্রাঙ্গোর স্পেনের মতো দীর্ঘস্থায়ী ফেসিস্ট সামরিকতন্ত্র অথবা জিয়াউল হকের পাকিস্তানের মতো মধ্যযুগীয় ওহাবিতন্ত্র ঘাঁটি গেড়ে বসতো। সিরাজ শিকদারের সর্বহারা দল নয়, রাজত্ব করতো বাংলাভাইয়ের দল।

শুধু গাফফার চৌধুরী নয়, অনেক ঐতিহাসিকদের মতে ৭১-এ চীনপন্থী বামেরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে মেনে নিতে পারেনি। এমনকি ৭১ এ সুবিধা করতে না পারায় স্বাধীনতার পর পর তারা নতুন ষড়যন্ত্রে নামে । ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই তারা জোরপূর্বক সমাজতন্ত্র কায়েমের নামে সারাদেশে হত্যা, খুন, লুন্ঠন ও রাহাজানির সৃষ্টি করে যুদ্ধবিদ্ধস্ত ভঙ্গুর নতুন দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি অস্থীতিশীল করে তোলে। দেশীয় পরাজিত শক্তি ও বিদেশী শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তারা নানা দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ও জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টায় নামে। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অতিষ্ট হয়ে বঙ্গবন্ধু হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হন আর; এরই প্রেক্ষিতে গঠিত হয় রক্ষী বাহিনী। এর পরের ইতিহাস তো সবারই জানা। একের পর এক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, বাকশাল গঠন এবং অবশেষে ১৫ই আগস্ট।
আফসুসের কথা এই যে, যে সমাজতন্ত্র কায়েমের দোহাই দিয়ে তারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালায় সেই সমাজতন্ত্র বঙ্গবন্ধু পাকিস্থান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে আসার আগে ভারতে দেয়া সংবর্ধনায় মাইকে ঘোষণা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ৭২ এর সংবিধানেও সমাজতন্ত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

আসলে ভুল হয়ে গেছে ৭২- এ। ঐ সময় যদি রাজাকারের বিচারের সাথে সাথে যেসব চীনপন্থি বামেরা অস্ত্র হাতে পাকিদের হয়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়েছিল তাদেরও বিচার চাওয়া হত এবং বঙ্গবন্ধু তাদের বিচার করতেন তবে হয়তো বঙ্গবন্ধুকে ৭৫-এ মরতে হত না ।

[প্রথম মন্তব্যটি অনুসরণ করুন] acne doxycycline dosage

You may also like...

  1. রবীন্দ্রনাথের ‘ভাষা ও ছন্দ’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে।’
    ইতিহাস অনেক দিকেই বাক নেয়, নিয়েছে, নিতে পারে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বামদের ভূমিকার ব্যাপারে বিশদ কোন তথ্য সংগৃহীত নেই। নেট ঘেটে টুকরো টুকরো যে সমস্ত তথ্য পেয়েছি তাই মূলত এই পোষ্টে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

    মুক্তিযুদ্ধে সব বাম যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে এমন নয়। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী অনেক দল, উপদল, গ্রুপ কখনো একত্র হয়ে কখনো বা আলাদা আলাদা পাকিস্থানিদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। অনেকে শহীদ হয়েছেন। আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বামপন্থীদের জীবিত মৃত সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। পাশাপাশি যারা সেদিন অস্ত্র হাতে পাকিদের পক্ষে এবং মুক্তিযুদ্ধাদের বিপক্ষে লড়েছিল, বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগীতা করেছিল তাদের খুজে বের করে বিচারের আওতায় আনার দাবী জানাই । renal scan mag3 with lasix

    বাম’রা অতীতে যেমন দল উপদলে বিভক্ত ছিল আজও তেমনি আছে। স্বার্থের টানে আদর্শকে ভূলে কেউ ডানে চলে গেছে কেউ বা বামে থেকেও ডানের দলে আশ্রয় নিয়েছে আবার কেউ কেউ নিজ আদর্শকে বিক্রি করে স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথেও হাত মিলিয়েছে। এরা প্রতিনিয়ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ওদের মিথ্যাচার, অপ্রচার, অপতৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সবাইকে এক হওয়ার আহবানা জানাই।
    জয় বাংলা।

  2. আরো অনেক কথা আছে…….মূল নেতা ভাষানীর বিষয়ে কিছুই লেখা হয় নাই……

    posologie prednisolone 20mg zentiva
    • হ্যা, অনেক কিছুই বাকী রয়েছে । বিশেষ করে এই পোষ্টে ভাসানীকে সম্পূর্ণ হাইড রাখা হয়েছে । মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বড় দীর্ঘ ইতিহাস । একটি ব্লগপোষ্টে একটি ইতিহাস রচনা করা বাস্তবে অসম্ভব । আমি এই পোষ্টে ১৫ই আগস্ট সৃষ্টির পেছনের একটি কারণ হিসাবে চীনাবামদের কর্মকান্ডকে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছি মাত্র।

      মুক্তিযুদ্ধে বাম সম্পৃক্ততা ও বামদের বিরুধীতা সম্পর্কে কোন তথ্য জানা থাকলে কমেন্টে প্রদান করে সহযোগিতা করার অনুরোধ রইলো ।
      ধন্যবাদ । capital coast resort and spa hotel cipro

      kamagra pastillas
    about cialis tablets

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

doctorate of pharmacy online
tome cytotec y solo sangro cuando orino
walgreens pharmacy technician application online