এক চুমুক ইতিহাস

1261

বার পঠিত

জ্বী আপু! এইতো, এইদিকে।
একটু ডানে ঘুরে সবুজ সাদার এই দোকানে।
এই যে দেখুন এই জামাটা
টকটকে লোহিত রঙা জরি চুমকির লন।
কি বললেন? হ্যাঁ, এটা অবশ্যই থ্রিপিস।
উপরে দুই পিস নিচে এক পিস-একাত্তুরে ক্ষতবিক্ষত।
এই যে দেখুন, পোয়াতি বধুর নাড়িভুড়িতে আঁকা
কি সুন্দর নকশী ডিজাইন।
বেয়নেটে খুবলে যাওয়া মাংসের মত চুমকি।
ছিন্ন ভিন্ন চুলে সিলাই করা টেকসই এক থ্রিপিস।
পাবেন কোথাও?

লাল রঙটা এতটা কালচে কেন?
একাত্তুরের রক্ত! শুকিয়ে গেছে যে আপু!
কত সুন্দর কান্নার রঙ এই পোশাকে।
ভারী কান্না, চাপা কান্না, ভীত কান্না,
লাল নীল কষ্টের মত বায়বীয় ধূসর কান্না,
অপমানের কান্না, কান্না আর কান্না।
ধর্ষিত কান্না।

জানেন আপু? এই পোশাকের ওড়নাটা পেঁচিয়ে
কত বীরাঙ্গনা আত্নহননে আত্মদহনে
আত্মমরনে, আত্মগোপনে লিখে গেছে
কত শত গর্বের সমৃদ্ধ আত্মকাহিনী?
কত শত মায়ের আর্তচিৎকারে কম্পিত এই ওড়না?
এই চিৎকার মানুষ শুনেনা আজকাল।
দুষ্টু ফিজিক্স এর নাম দিয়েছে শব্দোত্তর তরঙ্গ।

আর্তনাদের রক্তঝরা কালচে ফেব্রিক্সে
ঘুনে ধরা খাটের তেলচিটচিটে বেডশীটে,
সাঁঝের বেলায় ধূপ জ্বালানো কত রমনী
বিসর্জিত হয়েছে মালাউন ওজুহাতে।
শুয়োরের রাজ্যে পূর্ববাংলা ধর্ষনময়,
চঞ্চলা নারীরা যেন গণিমতের মাল।
সেই সব ইতিহাস লিখে গেছে মহাকাল।

এই যে আপু। দেখুন!
সেলোয়ারের নকশী নকশায় কতসুন্দর আঁকা বাঁকা ইতিহাস!
আমাদের ইতিহাস চলে বাঁকে বাঁকে,
২১, ২৬, ১৬ তে গলা জল থাকে।
বাকিটা সময় জুড়ে ধু ধু বালুচর।
আচ্ছা আপু, আপনি শেখ মুজিবের নাম শুনেছেন?
কে ছিলেন তিনি?
মনে করতে পারছেন না?
তাহলে তাঁকে নিয়ে আপনাকে স্বরচিত পদ্য শুনাই?

“তিনি জাগ্রত বন্যা।
স্বর্গ-আগত দেবদূত তিনি,
তরলিত গিরি কন্যা।
তিনি বিদ্রোহী নজরুল,
শত অন্যায়ে দোয়াত-কালি
ধ্রুব-এক-নির্ভুল।
তিনি বজ্র রবে,
যত অনাচার চূর্ন করেছেন
উন্মত্ত গজ পদে।
তিনি শতমুখী ধূমকেতু,
সঙ্কটে তিনি পাঞ্জেরি হয়ে
গড়েন সাম্যের সেতু।
তিনি বৈশাখী ঝড়,
শমশের হাতে বিক্রমশালী
রাবণ আজ নড়বড়।
তাঁর ভাষনে ভেসে,
ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে,
মুক্তির হাসি হেসে।
তিনি জয়োল্লাসের স্মারক,
তিনি অমর অব্যয় অক্ষয়,
তিনি বাংলার কর্তৃ কারক।
তিনি অত্যাচারিতের ভাষা,
তাঁর ডাক শুনে সম্মোহিত
কত কাস্তে শিল্পী চাষা।
তিনি দুর্গম দূর্গ,
কোমল নয়নে হৃদয়ে এঁকেছেন
লাশকাটা ঘর মর্গ।
তিনি মুক্তির কিষান,
আলো হাতে তিনি দিয়ে গেছেন,
লাল সবুজের নিশান।“

জ্বি আপু? মনে পড়েছে এইবার?
খুশি হলাম।
সে কী আপু? এই জামা কিনবেন না?
ইয়ে, আপনার চোখে জল?
কেন অশ্রু চিকচিকে জ্বলে?
অকাল বোধনে এল বসন্ত
কৃষ্ণচূড়া অবনত হল ফুলে?
প্লিজ কান্না থামান।
কি খাবেন? চা-কফি-কোল্ড ড্রিংকস?
আসলে আপু আমাদেরই ভুল,
করিনি একাত্তুরের হালখাতা-
তাই বুঝি আজ চেতনায় ঘুন ধরেছে
হারিয়ে গেছে মুক্তির খেরোখাতা।
জ্বি আপু? অবশ্যই রাখবো আপনার কথা।
আজই পোড়াবো এই পোশাক।
এখন আপনাকে কি দেব?
টাঙাইল, বালুচরী, জামদানী?
বেনারসি, তাঁত, আসমানী?
এই নিন আপু। এইটা আপনাকে মানাবে।
ঈদ মোবারক।
ধন্যবাদ আপু।
আবার আসবেন।

You may also like...

  1. সোমেশ্বরী বলছেনঃ

    আমি স্তম্ভিত, আমি মুগ্ধ!
    এতোটাই অসাধারণ লাগলো আরর কী বলবো!
    প্রিয়তে নিয়ে রাখলাম।

  2. এই চিৎকার মানুষ শুনেনা আজকাল।
    দুষ্টু ফিজিক্স এর নাম দিয়েছে শব্দোত্তর তরঙ্গ।

    …এবং অসাধারণ!

  3. মাশিয়াত খান বলছেনঃ

    আপনি এত সুন্দর কবিতা লিখতে পারেন_জানা ছিল না।
    যদিও কবিতা আমি কম বুঝি। কিন্তু এই কবিতাটা সত্যিই আমার চোখে পানি এনে দিয়েছে

  4. wirkdauer viagra cialis
  5. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    তুই কবিতাও লিখিস? জানতাম না!!
    অসাধারণ… এইটা আমার পড়া তোর লিখা প্রথম কবিতা! জানি না তোর ঝুড়িতে আর কি কি আছে। সব পড়ে দেখার লোভ সামলাতে পারছি না! অনবদ্য, একদম অন্যরকম কথোপকথনের মাঝে এইভাবে আমাদের ইতিহাসকে তুলে আনা যায় কল্পনায়ও ছিল না…
    আপনার কাব্য চর্চা চলুক নিরন্তর…

    • ইলেকট্রন রিটার্নস বলছেনঃ metformin and insulin bodybuilding

      মাঝে মাঝে লিখি। আর এই কবিতাটা সত্যের পটভূমিতে রচিত।
      তারিখ ২২/৭/২০১৪ । রাত আনুমানিক ১০/১১ টায়। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে আখতারুজ্জামান সেন্টারে কাপড়ের দোকানে এক কিশোরী পাকিস্তানি লন খুঁজছে। পাশে তার বাবা। কথা বলার একপর্যায়ে জানতে পারলাম তিনি মুক্তিযোদ্ধা।এইটা শুনেই আমি পায় হা হয়ে তাঁর দিকে আর তাঁর মেয়ের দিকে তাকালাম। তিনি যা বুঝার বুঝে গেলেন। বিমর্ষ কণ্ঠে বললেন,”ওরে ছোটোবেলায় তেমন বেশি জ্ঞান দিতে পারিনাই। এখন না কিনে দিলে বাসায় গিয়ে মন খারাপ করে বসে থাকবে।” তখনই মনে হল, দোষটা আসলে কার? দায়িত্বশীল সমাজ-পরিবারের নাকি মেয়েটার? সেই পটভূমিতেই কবিতাটা লিখা।

      হয়তো হঠাৎ করেই সকল পাকি পণ্য বর্জন সম্ভব নাও হতে পারে বিভিন্ন কারনে। কিন্তু আমরা তো ধীরে ধীরে আগামী প্রজন্মের মাঝে ইতিহাসটা ছড়িয়ে দিতে পারি? যে মানুষ মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি তাকে যুদ্ধের চেতনাটা বুঝানো বড়ই কঠিন। তাই এটা একদিনে সম্ভব না সেটা ভালো করেই জানি। তাই আমাদেরকে দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টি রাখতে হবে। তাহলে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, আগামী প্রজন্মে আমরা যুদ্ধের চেতনাধারী তরুণ প্রাণের মিছিল দেখতে যাচ্ছি।

  6. নির্ঝর রুথ বলছেনঃ

    বড্ড বেশী আবেগী করে দিলে, কবি !

    হাজার পাতার বই লিখে যা বোঝানো যেত , স্রেফ কয়েক পংক্তির কবিতা দিয়ে এতো সুন্দর করে সেটা বুঝিয়ে দিলে ?

    propranolol hydrochloride 40 mg uses
  7. অসাধারন লিখেছেন। একেবারে স্পিচলেস। কবিতার মাঝে এতকিছু, এত আবেগ ফুটিয়ে তোলা, এটা মাস্টারপিস।

    cena leku kamagra
  8. জন কার্টার বলছেনঃ

    ভাই রে এইডা কি ছিল? আপনি যে এতো ভালো কবিতা লিখেন তা জানায় ছিল নাহ্!!!

    …..এক কথায় চমৎকার, দুর্দান্ত, অনবদ্য!

  9. কবিতাটা অনেক ভাল লাগল ভাই। ইচ্ছে করছে প্রতিটা দোকানে যেখানে পাকিস্তানি ড্রেস বিক্রি হয় সেখানে গিয়ে এই কবিতাটার একটা কপি ঝুলিয়ে দিয়ে আসতে। তাও যদি কিছু মানুষের বোধদয় হয়! sildenafil tab 50mg

  10. অসাধারন কবিতাটা আবার পড়লাম, আবার গায়ের রোম দাড়িয়ে গেল। রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠলো… ইলেকট্রন, হোয়াট আ পয়েম, ডিয়ার… হোয়াট আ পয়েম…

  11. সবাই এত এত প্রশংসা করেছে যে, প্রশংসা করার মত নতুন কোন শব্দও আর বাকি নাই।

প্রতিমন্তব্যশিশিরস্নাত দ্রোহি বাতিল

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment. para que serve o remedio cipro 500mg