“শৈল্পী”

881

বার পঠিত

(১)

“আর কদ্দিন রে শুভ্র? তোর মত একটা জিনিয়াস যদি……..” হতাশার তোড়ে তৃপ্তির কথা আটকে যায়। শুভ্র হেসে ফেলে বান্ধবীর অবস্থা দেখে। তার সামনে একটা পোর্টেট। তৃপ্তির দিকে তা ফিরিয়ে বলে,”দেখতো এবার।” “ওয়াও!!!” তৃপ্তি চেঁচিয়ে ওঠে হটাত! “এটা আমি? সত্যি আমি? আমি এত্ত মায়াবতী?” “মিথ্যে মিথ্যে ফুটিয়ে তুললাম আর কি!” খোঁচাটা এড়িয়ে তৃপ্তি বলল,”নিয়ে যাই? বাঁধিয়ে ঝুলিয়ে রাখব বসার ঘরে। পিক তুলে ফেবুতে ও দিব। লোকে ডাকবে,”তৃপ্তি দ্য মায়াবতী।” আহ ভাবতে ও আবেগাপ্লুত হয়ে যাচ্ছি। নিই?” “না……..সবার সাথে একত্রে নিস।” “মানে কী?” “রাহা,সান্জু,রুপা,সাদিয়া -এরা সবাই তোর আগে রিকোয়েস্ট করেছিল। তোকে আগে কীভাবে দিই?” “আমি এখনই চাই….. এখনই….. এখনই!” “না মানে না! ব্যস। চল আম্মু নাস্তা নিয়ে বসে আছে।” বলেই শুভ্র তৃপ্তির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে,বেচারী তখনও নিজের পোর্টেটটার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে!

(২)
শুভ্র বান্ধবীদের সবগুলো ছবি চারপাশে ছড়িয়ে বসে আছে। খুঁটিয়ে দেখে মন্তব্য করছে প্রতিটার! “তৃপ্তির নাক ছোট,তবে চোখজোড়া অসাধারণ। বড়বড় আর টলটলে। সান্জুর ঠোঁট দু’টো,বলার অপেক্ষা রাখেনা।” “রাহার নাক আর হাসিটা অন্নেক গর্জিয়াস!” “রুপার কপালতো! সাথে আছে থুতনির তিলটা।” “সাদিয়ার চুলের জন্য ওকে মিস হেয়ার অফ এশিয়া করা উচিত!”
হটাত কী মনে হতেই একটা আর্ট পেপার নিয়ে সেখানে মন্তব্যকৃত বিশেষ অংশগুলো সামঞ্জস্য রেখে বসাতে থাকে। একসময় শেষ হয় ছবিটা। সবুজ ঘাসের পটভূমিতে নীল শাড়ি পড়া এক তরুণী। যাব চোখজোড়া তৃপ্তির,ঠোঁট সান্জুর,হাসি আর নাক রাহার,থুতনির তিল আর কপাল রুপার,আর লম্বা ঝলমলে চুল সাদিয়ার মত। নিজের সৃষ্টিতে নিজেই মুগ্ধ হয় শুভ্র। এত মায়াবতী কেন মেয়েটা? এত শৈল্পিক! সে নিজের অজান্তেই পোর্টেটটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল,”আর……তোমার সব সুন্দর……শৈল্পী!”

(৩)
জানালার ওপাশে মেঘলা আকাশ,বিষণ্ণ। আর এপাশে নীল শাড়ি পড়া কেউ একজন। জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো। এলো চুল উড়ছে। “কে?কে তুমি?” শুভ্র পেছন থেকে জানতে চায়। তরুণী হাসিমুখে ফেরে শুভ্রের দিকে। “তুমি আমাকে চেনোতো শুভ্র! আমি শৈল্পী।” “শৈল্পী!!! তুমি……আছো? তোমার অস্তিত্ব আছে?” “আছেই তো! তোমার মাঝে।” শুভ্র বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। “শুভ্র…আমি যাই।” “কোথায়? কোথায় যাবে তুমি???” শৈল্পী কিছু না বলে আলো-আঁধারির ছায়ায় হারিয়ে যেতে থাকে। ঠোঁটে তখনও হাসি ধরা। মেঘলা আকাশের বিষণ্ণতা সেখানে। শুভ্র চেঁচিয়ে কিছু বলতে চায়! আর তাতেই ওর ঘুম ভাঙ্গে। ঘর্মাক্ত মুখটা মুছতে গিয়ে দেখে ওর বিছানার পাশেই গতরাতে আঁকা সেই পোর্টেট টা। শৈল্পী। জানালা দিয়ে চুইয়ে আসা রোদ মেখে তাকিয়ে আছে। রোদের মতই ঝলমলে হাসিমুখে।

(৪)
শুভ্র একমনে ছবি আঁকছে। নূপুরের শব্দে থামে কিছুক্ষণ। শব্দটা ভীষণ পরিচিত। “শৈল্পী….” “হুঁ?” “আজ এত দেরী করলে?” চাপা খিলখিল শব্দে মেয়েটা হেসে ফেলে। চুড়ির শব্দ পাওয়া যায় সে সাথে। শুভ্র ঘুরে তার মুখোমুখি হয়। “হাসছ যে?” “তোমার রাগ করার ভান দেখে।” “ভান কেন হবে? আমি সত্যি রেগে আছি!” “হুম… মানলাম।” বলেই শৈল্পী আবার হেসে ফেলে। শুভ্র অসহায় বোধ করে। “আমার না…. আসলে সারাক্ষণ তোমার সাথে থাকতে ইচ্ছে করে!” “কাল বকা দিয়েছিলে কেন,তাহলে?” “এজন্য রাগ করে আসোনি?” শুভ্র অবাক হয়ে খেয়াল করে মেয়েটা কেমন দুঃখী চোখে তাকিয়ে আছে। চোখজোড়া টলটলে। শুভ্রর নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে থাকে। সে তার কল্পিত মানবীর প্রেমে পড়ে গেছে!

(৫)
“হ্যালো।” “স্লামালাইকুম। আন্টি,আমি তৃপ্তি।” “ওয়ালাইকুম সালাম। ভাল আছো,মামণি?” “জ্বী আন্টি। আপনারা সবাই ভাল?” “এইতো তোমাদের দোয়ায়।” “আন্টি,আমি আসলে শুভ্রকে নিয়ে কথা বলতে ফোন করেছি। আপনি ওর সাথে এবার একটু খোলাখুলি কথা বলুন। ….ওতো আমাদের কারো কথাই শুনছেনা! এদিকে সমস্যাটা ও দিন দিন বাড়ছে।”
মিসেস আহমেদ বিব্রতবোধ করছেন। তিনি নিজেই বেশ কয়েকদিন ধরে বুঝতে পারছিলেন,শুভ্রর কিছু একটা হয়েছে। অদ্ভুত কিছু একটা! “আন্টি?” “হ্যা,তৃপ্তি….আমি কথা বলব ওর সাথে। এখন রাখছি।” “জ্বী আন্টি,ধন্যবাদ।” ফোন নামিয়ে রেখে তিনি একটা ট্রেতে নাস্তা সাজিয়ে নিলেন। তারপর ছেলের ঘরের দিকে রওয়ানা হলেন। শুভ্র আজকাল নিজের ঘর ছেড়ে কোথাও যায় না। বন্ধুদের আড্ডা,আত্মীয়-স্বজনদের বাসা কোথাও না। সারাদিন দরজা আটকে বসে থাকে ঘরে,ছবি আঁকে। আর বেশীরভাগ সময়ই শৈল্পী নামক কল্পিত কারো সাথে একা একা কথা বলে। কী যে হচ্ছে ছেলেটার! এসব ভাবতে ভাবতে শুভ্রর ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকেন তিনি। আর ঢুকেই থমকে দাঁড়ান। ঘরের এখানে ওখানে ছড়ানো অনেক অনেক ছবি। সব ছবিই কোন এক তরুণীর। ছায়াছায়া,অস্পষ্ট,জলচিত্র,তৈলচিত্র,পেন্সিল স্কেচ। সব সেই একই তরুণীর। হাসিমুখ,রাগ,বিরক্তি,বিষণ্ণতা,রোদ পোহানো,বৃষ্টিতে ভেজা,চাঁদ দেখা। সবরকম ভঙ্গী সেখানে। এ তাহলে শৈল্পী!!!
মিসেস আহমেদ ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ছেলের পাশে বসেন। সে তখন হাঁটু জোড়ার উপর থুতনি রেখে একমনে শৈল্পীর বিশাল এক পোর্টেট দেখছে! তাই মায়ের উপস্থিতি টের পায়নি!
“ও কে, শুভ্র?” “শৈল্পী!” “কোথায় থাকে?” “এইতো এখানেই! আশেপাশে কত্ত গুলো ও! দেখো মা,দেখো। ঐযে ওটাতে হাসছে। ওর হাসি অনেক সুন্দর,তাইনা মা? এটাতে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সবকিছুতেই অবাক হয় ও। আর এটাতে রেগে আছে। অল্পতেই রেগে যায়। অভিমানী তো! আর সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে. . . .” “শুভ্র…” “বলো মা. . . . ” “বাবা,শৈল্পী তোর কল্পনা। শুধুমাত্র কল্পনা। বাস্তবে ওর কোন অস্তিত্ব নেই। তুই খামাখা কষ্ট পাচ্ছিস,পাবি!” “মা,তুমিও?. . . . . তুমিও সবার মত বলছ?” “এটাই সত্য ,বাবা! শৈল্পী তোর খেয়ালি মনের কল্পনা ছাড়া আর কিছুইনা।” “কিন্তু মা. . . . ও যে অনেক বাস্তব?” “তুই অনেক ভাল আঁকিস,তাই। ভালভাবে তাকিয়ে দেখ,তোর বান্ধবীদের চেহারার বিশেষ কয়েকটা অংশ মিলিয়েই শৈল্পী! এর বেশী তো কিছুনা। কেন বুঝছিস না? একবার ভাল করে ভেবে দেখ! তোর উচিত এই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসা। আমি জানি,তুই পারবি বাবা। নাস্তা রেখে গেলাম।” শুভ্র উত্তর খুঁজে পায় না। মা চলে যাওয়ার পর ও বসে থাকে অনেকক্ষণ। সেভাবেই,সেই পোর্টেটের সামনে! যেখানে বিষণ্ণ শৈল্পী অপলক তাকিয়ে আছে।

(৬)
“মন খারাপ,তোমার?” শুভ্র চমকে তাকিয়ে দেখে,শৈল্পী ওর পাশে বসে আছে। “শৈল্পী. . . . .” “হুঁ?” “তুমি কি সত্যি শুধু আমার কল্পনা?” নিষ্প্রাণ একটা হাসি হেসে মেয়েটা জানতে চায়, “তোমার কী মনে হয়?” “আমি বিভ্রান্ত!” “একটা কথা বলব,শুনবে?” “বলো,শৈল্পী!” “আমার সবগুলো ছবি পুড়িয়ে ফেলো।” “নাআআ! আমি পারবনা! তোমার অস্তিত্ব নিজ হাতে. . . . . আমি তোমাকে ছাড়া. . . . এ অসম্ভব!” “এটাই একমাত্র পথ।” “না! তোমার অস্তিত্ব আমার মাঝ থেকে হারাতে পারেনা,শৈল্পী. . . কিছুতেই না!” শৈল্পী হাসার চেষ্টা করে। বড় বেশী বিষণ্ণ সে হাসি।

(৭)
ছাদে খোলা আকাশের নীচে ছোট একটা অগ্নিকুণ্ড। তাতে শৈল্পীর ছবিগুলো পুড়ছে। অগ্নিকুণ্ডের একপাশে বিধ্বস্তের মত বসে আছে শুভ্র! তার বিপরীতে শৈল্পী। দু’হাতে হাঁটু জড়িয়ে ধরে গুটিসুটি মেরে বসে,একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে অগ্নিকুণ্ডের দিকে। আগুনের শিখার আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাকে। নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম।বড়বড় চোখজোড়া স্বাভাবিকের চাইতে বেশী টলটলে। যেন এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে! শুভ্রর খুব ইচ্ছে হলো,ছুটে গিয়ে মেয়েটার হাত ধরতে! আশ্বাস দিয়ে বলতে, “তুমি কল্পিত সত্ত্বা,আমি জানি। বিশ্বাস করো,তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসেনা! আমি যে তোমার এ কল্পিত অস্তিত্বটাকেই ভালবাসি!!!” “শুভ্র. . . কবিতা শুনবে?” দলা পাকানো কষ্টগুলোকে চেপে রাখতে বেগ পেতে হল তার। “হুঁ. . . . ” “চোখ বন্ধ করো,তাহলে!” শুভ্র বাধ্য ছেলের মত চোখ বন্ধ করতেই…
“জানি,তোর বিষণ্ণ লাগছে আমার ও কষ্ট হচ্ছে খুব… এই বিদায় ক্ষণে! তবে দেখিস,আমি ফিরে আসব। তোর গীটারে ধুলো হয়ে জমব, এক ফু’তেই উড়ে যাব…. দু’দিনের অবহেলায়, আবার ফিরে আসব। আমি সত্যি ফিরে আসব, চুপিচুপি কিংবা প্রকাশ্যে। হয়তবা তোর চায়ের কাপে, দুমড়ানো ভিজিটিং কার্ডের ফাঁকে, হয়ত লুকিয়ে থাকব! আমি ফিরে আসব, দেখিস,বালক…. আমি ফিরে আসব! সত্যি ফিরে আসব…..”
আবৃত্তির রেশ মিলিয়ে যেতেই শুভ্র চোখ মেলে। ওর সামনে একগাদা ছাই ছাড়া আর কিছুই নেই। সেগুলোও একটু একটু করে বাতাসে ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে শৈল্পীর স্মৃতি,অস্তিত্বটুকু। বুকের বাঁ পাশের চরম শূণ্যতা টের পেল শুভ্র। বিড়বিড় করে বলল,”ভাল থেকো শৈল্পী…. ভাল থেকো অভিমানী কল্পিত মেয়ে…… খুব ভাল।”

rx drugs online pharmacy

You may also like...

  1. গল্পটা পড়তে পড়তে আমার মাথায় আরেকটার প্লট চলে এলো। কিন্তু, অ্যাডমিশন কোচিংয়ের চাপে মনে হয় না লিখতে পারব। :(

  2. গল্পটা কেমন হয়েছে, সেটা পড়ে বলছি। আগে একটা ছোট্ট জিজ্ঞাসা, সাদিয়া নামটা কি এমনি এমনি মাথায় এসেছে নাকি সত্যিই এই নামের আপনার পরিচিত কেউ আছে?

    কিছু মনে করবেন না, নামটা খুব যন্ত্রণার আমার কাছে… [-(

  3. সাদীয়া নামে কমপক্ষে আধাডজন মেয়ে আমার ফেবু এবং বাস্তব বান্ধবী।

  4. অংকুর বলছেনঃ

    জানি,তোর বিষণ্ণ লাগছে আমার ও কষ্ট হচ্ছে খুব… এই বিদায় ক্ষণে! তবে দেখিস,আমি ফিরে আসব। তোর গীটারে ধুলো হয়ে জমব, এক ফু’তেই উড়ে যাব…. দু’দিনের অবহেলায়, আবার ফিরে আসব। আমি সত্যি ফিরে আসব, চুপিচুপি কিংবা প্রকাশ্যে। হয়তবা তোর চায়ের কাপে, দুমড়ানো ভিজিটিং কার্ডের ফাঁকে, হয়ত লুকিয়ে থাকব! আমি ফিরে আসব, দেখিস,বালক…. আমি ফিরে আসব! সত্যি ফিরে আসব…

    গল্পটা অস্থির লেগেছে। হুদ্দা বলছিনা। সত্যিই অস্থির

  5. প্রেমে পড়ার জন্য থ্যাংকু রক্তজবা :p

  6. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    এক কথায় অসাধারণ একটা গল্প পড়লাম। আপনার গল্প নিয়মিত পড়তে চাই

    cialis 10mg or 20mg
  7. আপনার লেখার হাত বেশ ঝরঝরে, প্রানবন্ত… ^:)^ থামাবেন না কোনোভাবেই… \m/ কিপিটাপ ম্যাম… :-bd

    cuanto dura la regla despues de un aborto con cytotec
  8. ইলেকট্রন রিটার্নস বলছেনঃ

    ঝরঝরে লিখার হাত আপনার! গল্প আরো আগেই পড়েছিলাম। কমেন্ট করতে দেরী হয়ে গেল। সভ্যতায় আপনার পর্যটন মুখরিত হোক। কিপিটাপ আপ ম্যাডাম!!

  9. banglakobita বলছেনঃ

    আজকের কবিতা: মানবিকতার শিষ্য হতে হবে।

    ভিজিট করুন: https://bit.ly/2XZim8b

প্রতিমন্তব্যচাতক বাতিল

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

viagra masticable dosis