স্বপ্নবন্দি

312

বার পঠিত

১.

নিউমার্কেটের দিকে আমার আসা হয় না খুব একটা। আজকে কিছু জরুরী বই খাতা কেনার জন্য নীলক্ষেত এসেছিলাম। বি.এস.সির ইন্টার্নিশীপের ওপর একটা থিসিস পেপার বই আকারে জমা দিতে হবে। শুনলাম নীলক্ষেতে নাকি এই টাইপের বই বাঁধাই করা হয়। ভাল একটা বুক বাইন্ডার খুঁজে বের করে তাদের সাথে কথাবার্তা শেষ করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। আকাশের অবস্থাও বেশি ভাল না। সারাদিন কড়া রৌদ আর ভ্যাঁপসা গরমের পর বিকেলের দিকে আকাশে বেশ মেঘ জমেছে হঠাৎ। মাঝে মাঝে বাতাসও দিচ্ছে জোরে জোরে। ভালই লাগছে বাতাসটা। এখন একটু বৃষ্টি হলে মন্দ হয় না। ঠাণ্ডা জলধারায় গা জুড়ানো যেতো…!

বৃষ্টিতে ভিজতে আমার বরাবরই ভাল লাগে। কিন্তু হাতের বই-খাতাগুলোর জন্য বোধহয় সেটা সম্ভব হবে না। সন্ধ্যার আগেই আকাশ এখন বেশ কালো। অদ্ভুত এক আলো-আঁধারি খেলা করছে স্বর্গের উঠোনময়। না সন্ধ্যা না বিকেল; ভালই লাগছে সব মিলিয়ে! এই সময়টাতে সাথে কেউ থাকলে ভাল হতো। সৌন্দর্য কিংবা “ভাল লাগা” জিনিসটা একা একা ঠিক উপভোগ করা যায় না। সাথে কেউ থাকলে ভাল লাগে। একা একা অনুভব করতে হয় কষ্ট; আনন্দের সব সময় সঙ্গী দরকার। আমি কী মনে করে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সাদ্দামকে ফোন দিলাম। ওর সচরাচর এখানে থাকার কথা না। সেও আমার মতই কালে ভদ্রে এদিকে আসে। বিশেষ করে বায়িং হাউজের চাকরিটা হওয়ার পর থেকে খুব ব্যস্ত! ওর সাথে আমারই এখন দেখা হয় মাসে দুই-একবার। তবু কেন যেন মনে হলো একটা ফোন দিই। যদিই কোন কাজে থেকে থাকে আশেপাশে। সাদ্দামের এয়ারটেল নাম্বারটাতে কল ঢুকলো না। নেটওয়ার্ক ফেইল! সাধারণতঃ ওর অফিসের ভেতর এয়ারটেল নেটওয়ার্ক পায় না। একারণে সাম্প্রতি একটা বাংলালিংক সীম চালায়। ঐ নাম্বারটাও আছে আমার কাছে। ফোন দিলাম। এটাও বন্ধ! তবে কি ও মিটিং-এ?

মোবাইলটা পকেটে রেখে দেব ঠিক সেই সময় দেখলাম Saddam bl-2 নামে আরেকটা নাম্বার সেভ করা। এই নাম্বারটা এখন আর ও ব্যবহার করে না। অনেক আগেই কী সব গার্লফ্রেন্ড সংক্রান্ত ঝামেলার জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। আমাকে বলেছেও ডিলিট করে দিতে। কিন্তু কোন কারণে ডিলিট করা হয়নি। কী ভেবে আমি ঐ নাম্বারটায় ফোন দিলাম। জানি বন্ধ দেখাবে তবুও কানে লাগালাম ফোনটা। আশ্চর্য- রিং হচ্ছে! দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ করলো; একটা নারী কণ্ঠ- হ্যালো! নারী কণ্ঠ শুনে আমি অবাক হলাম। ভুল নাম্বারে ডায়াল করিনি তো? চট করে একবার স্ক্রীনে চোখ বুলালাম। নাহ্‌ “Saddam bl-2”-ই তো লেখা! আমিও প্রশ্নবোধক স্বরে বিষ্ময় নিয়ে বললামঃ হ্যালো!? ওপাশ থেকে জবাব এলোঃ হ্যালো! হ্যাঁ, সফিক ভাই? বলেন। আমার বিষ্ময়ের মাত্রা বেড়ে গেল। তার মানে আমার নাম্বার সেভ করা। কিন্তু মেয়েটা কে? আমি ইতস্তত জবাব দিলামঃ সাদ্দাম আছে? ওপাশ থেকে স্বহাস্য জবাব এলোঃ সাদ্দাম! সাদ্দামকে এখন কোথায় পাব? তাকে তো কবেই বুশ ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে! হা হা হা… আমি কোন হিসাব মেলাতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি কে? – আমি সেঁজুতি।

- সেঁজুতি! এটা সাদ্দামের নাম্বার না? – সাদ্দামের নাম্বার ছিল এক কালে। ও আর এখন এটা চালায় না। এখন এটা আমার কাছে।

- আপনার কাছে মানে? সীমটা কি এখন আপনি চালান? – হুম, ঐরকমই…! আমি পড়ে গেলাম গোলক ধাঁধায়। সাদ্দামের “ঝামেলার” সীম সে অন্য কাউকে কেন চালাতে দেবে? তাও আবার একটা মেয়েকে! মেয়েটাই বা কে? আমি সাদ্দামের চৌদ্দ গোষ্টির প্রায় সবাইকেই চিনি। সেঁজুতি নামের কেউ কি তার মধ্যে ছিল? কিছু না বুঝেই প্রশ্ন করলামঃ আপনি এখন কোথায়? সাদ্দামের বাসায়? viagra in india medical stores

- জ্বি না, আমি এখন আপনার পেছনে!

- আমার পেছনে মানে? আমি অবাক হয়ে পেছনে তাকালাম। দুষ্টুমি করে বোকা বানাচ্ছে নাতো কেউ আমাকে? পেছনে তাকিয়ে দেখি সত্যি সত্যি আমার পেছনে ছিপছিপে-সুন্দর একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে একটা অল্প পাওয়ারের গোলাপি ফ্রেমের চশমা। সাদার ওপর লাল লাল বৃত্ত আঁকা একটা থ্রি-পিস পড়া। মাথার চুলগুলো বাচ্চা মেয়েদের মত দুই দিকে বেনি করা… এটা কি কোন নতুন ফ্যাশন? বাচ্চাদের মতই একটা ইনোসেন্স আছে চেহারায়। সেটা চশমা এবং বেনি করা চুলের কারণেও হতে পারে। আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে!

আমি বিষ্ময় গোপন না করেই বললামঃ সেঁজুতি? renal scan mag3 with lasix

মেয়েটা হেসে বললঃ কেন? আপনি আমাকে চেনেন না! আমি সত্যি মেয়েটাকে একদমই চিনলাম না। কিন্তু ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে ও আমাকে খুব ভাল করেই চেনে। অবশ্য সাদ্দামের নানা-দাদার গোষ্টির প্রায় সবাই আমাকে এক নামে চেনে। এমন অনেকে আছে যারা আমাকে দেখেনি পর্যন্ত কিন্তু নামে চেনে। কারণ গত ৩/৪ বছরে সাদ্দামের বাসার কিংবা গোষ্টির প্রতিটি জন্মদিন/বিয়ে/মৃত্যু বার্ষিকি/ঈদ/মিলাদ/খাতনা বা অন্য কিছু… আমি ছিলাম সাদ্দামের সাথে। সেসব জায়গায় গিয়ে এমন ভাবে মিশেছি যে কারো মনে হয়নি আমি সাদ্দামের বন্ধু। সবার কাছে মনে হয়েছে আমিই সাদ্দাম! বরং অনেকের সাথে সাদ্দামের চেয়েও আমি বেশি আপন হয়ে উঠেছিলাম। সেসব কোন প্রোগ্রামে কি এই মেয়েটার সাথে আমার দেখা হয়েছে? কাউকে না চিনলেও সেটা সরাসরি মুখের ওপর বলা যায় না। তাও আবার সে যদি হয় একটা সুন্দরী মেয়ে এবং বিশেষ করে সে যখন আমাকে ভাল করেই চেনে!

আমি আমতা আমতা করে বললামঃ না মানে, আপনার সাথে আমার কোথায় যেন দেখা হয়েছিল…?

সেঁজুতি ভ্রু কুচকে বললঃ আপনি আমাকে আপনি আপনি করছেন কেন? তুমি করে বলেন! আমি সাদ্দাম ভাইয়ের থেকেও তিন বছরের ছোট। আমি বিব্রত হেসে বললামঃ আমার আসলে ঠিক মনে পড়ছে না। সরি কিছু মনে করো না… কিন্তু তোমাকে দেখেছি কোথায়?

সেঁজুতি এবার অভিমানী সুরে বললঃ ম্যালা জায়গায় দেখেছেন। কোনটার কথা বলব? সাদ্দাম ভাইদের বাসায়ও তো গেছি কতবার…! আমার তবু কিচ্ছু মনে পড়লো না।

পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য বললামঃ ও আচ্ছা! অনেক বড় হয়ে গেছো দেখছি! আগে তো বোধহয় চশমাও পরতে না- তাই না? এজন্যই প্রথমে চিনতে পারিনি… বলেই আমি হে হে করে হাসলাম। কিন্তু পরিস্থিতি মোটেও সামাল দেয়া গেল না। বরং আরো ঘোলা হল।

সেঁজুতি মুখ কালো করে বললঃ সফিক ভাই! আপনি এখনও আমাকে চেনেন নাই… আমি দুই বছর বয়স থেকেই চশমা পরি।

আমি হতাস হয়ে বললামঃ ও! দেখলাম মেয়েটার মুখ গোমড়া হয়ে গেছে। কাউকে চিনতে না পারার মাঝে একটা সূক্ষ্ম অপমানের ব্যাপার আছে। কাউকে চিনতে না পারা মানে পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দেয়া- তোমাকে আমি ভুলে গেছি। তুমি আমার স্মৃতিতে জায়গা করে নেবার মত অতো গুরুত্বপূর্ণ কেউ নও! এই অপমানটা আমি করতে চাইনি। কারও মনে আঘাত দিতে আমার খুব খারাপ লাগে। ওর মন ভাল করার জন্য কিছু করা দরকার। কিন্তু আমি কী বলব বুঝতে পারছি না। আবার না উল্টাপাল্টা কিছু বলে ফেলি! আমি একটা পুরনো কৌশল অবলম্বন করলাম। গুছিয়ে বলার মত যখন কোন সদূত্তর মাথায় আসছে না তখন সোজাসুজি সত্য বলে ফেলা… – আসলে সাদ্দামের অনেক কাজিনকেই আমি চিনি। কিন্তু তাদের মধ্যে এতো সুন্দর কেউ ছিল বলে মনে পড়ছে না। তোমাকে যদি আমি আগে দেখেও থাকি তাহলে সেসময় নিশ্চয়ই তুমি এতো সুন্দর ছিলে না! মানে রিসেন্টলি তুমি অনেক সুন্দর হয়েছো… নইলে সাদ্দামের এতো কিউট একটা কাজিনের কথা আমি ভুলে যাব কেন? একথায় কাজ হলো। মানুষ মাত্রই প্রশংসা পছন্দ করে। সেটা যদি হয় কোন মেয়ের রূপের তাহলে তো কথাই নেই! সেঁজুতি হেসে ফেলল। লাজুক হাসি!

আমি সাহস পেয়ে বললামঃ আসলে সারা দিনের রৌদ্র-গরমে মাথাটাই গেছে উল্টাপাল্টা হয়ে। এইযে যেমন দেখ- আমার এখনও মনে পড়ছে না যে তোমাকে কোথায় দেখেছি! তোমরা কোথায় থাক… তুমি কী কর… এসব কিছুই মনে পড়বে না এখন। এই নষ্ট মাথা নিয়ে যে কী করি! ম্যাজিকের মত কাজ হলো!

সেঁজুতি লাজুক হাসি প্রশস্ত করে বললঃ থাক, আর মনে করতে হবে না কষ্ট করে। আপনার নষ্ট মাথা বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসেন। আমিও একটু হাসলাম… যুদ্ধ জয়ের হাসি! যাক, পরিবেশটা একটু হালকা করা গেছে। সেঁজুতি আব্দারের সুরে বললঃ এখন চলেন, আমাকে চিনতে না পারার জরিমানা হিসেবে আপনি লাচ্ছি খাওয়াবেন। আপনিও এক গ্লাস খেয়ে ঠাণ্ডা হবেন। তাতে যদি মাথা ঠিক হয় তো ভাল, নইলে সত্যি সত্যি আজ আপনার মাথা বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসবো। বলতে বলতে সেঁজুতি আমার ডান হাতটা ওর দু’হাতে জড়িয়ে ধরে আন্তরিকভাবে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। যেন কতদিনের চেনা জানা ওর সাথে! আমি ওর স্পর্শে শিহরিত হয়ে উঠলাম। কী নরম পেলবের মত ওর হাত দু’টো! সদ্য পাড়া ডিমের মত উষ্ণতা ওর শরীরে। এক মুহূর্তে একটা ঐশ্বরিক ভালোলাগা আমার সারা শরীরে বিদ্যুতের মত খেলে গেল। আমি নির্বাক হয়ে ওর সাথে হেঁটে যেতে লাগলাম। কয়েক মুহূর্ত কোন কথাই বলতে পারলাম না! ঠিক সেই সময় মাগরিবের আজান দিল। সেঁজুতি আমার হাত ছেড়ে দিয়ে ওড়না দিয়ে মাথা ঢাকতে ঢাকতে বললঃ এইরে! আজান দিয়ে দিল? এতো দেরি হবে বুঝতেই পারিনি। আপনি এখন বাসায় যাবেন না? উত্তরা পর্যন্ত আপনার সাথে যাই?

আমি সম্বিত ফিরে পেয়ে বললামঃ হ্যাঁ চল। কিন্তু তোমার বাসা যেন কোথায়? আর তুমি একা নাকি? সাথে আর কেউ নেই? কী করতে এসেছিলে এখানে? সেঁজুতি থমকে দাঁড়িয়ে বললঃ এতো প্রশ্নের উত্তর তো আপনাকে আমি দেব না! কেন? একা একটা মেয়ে আসতে পারে না কোথাও? – না, তা পারে। কিন্তু কী কাজে এসেছিলে? – ছিল একটা কাজ। আপনাকে বলব কেন? – ও আচ্ছা। সরি। আচ্ছা চল, তোমাকে লাচ্ছি খাওয়াই। – নাহ্‌, এখন আর লাচ্ছি খাব না। অনেক দেরি হয়ে গেছে। – হুম… তা ঠিক। তো তুমি যাবে কোথায়? – আমিও বাসায় যাব। আমাদের বাসা গাজিপুরা। – ওরেব্বাবা! – আপনি “ওরেব্বাবা” বললেন কেন? গাজিপুরা থেকে আমি নিউমার্কেট আসতে পারি না? আমাকে কি কিন্ডার গার্টেনের বাচ্চা মনে হয় আপনার? – না, তা কেন হবে! কিন্তু আজকে নাহয় আমার সাথে উত্তরা নেমে পড়। সাদ্দামদের বাসায় থেকে যাও… – কেন? গাজিপুরা কি একা বলে যেতে পারবো না? আপনাকে তো বলিনি আমাকে গাজিপুরা দিয়ে আসেন। আপনার সমস্যা থাকলে আপনি আলাদা বাসে যান, আমি অন্য বাসে যাব…! আমি দেখলাম মেয়েটা অকারণেই রেগে যাচ্ছে! হয়তো ওর আত্মসম্মান বোধটা একটু বেশিই প্রবল। একা একটা মেয়ে নিউমার্কেট এসেছে বলে আমার বিষ্ময় প্রকাশ করাটা ওর ভাল লাগেনি।

আমি অজুহাতের সুরে বললামঃ না মানে আমি কি সেকথা বলেছি নাকি? তুমি এতো রেগে যাচ্ছ কেন! আমি আসলে বলতে চেয়েছি আকাশের অবস্থা ভাল না। যেতে যেতে রাতও হয়ে যাবে অনেক। অতো রাতে গাজিপুরা না গিয়ে বরং… আমার কথা শেষ করতে পারলাম না। সেঁজুতি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললঃ বৃষ্টি হলে ভাল হতো। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভিজি না! আজ বৃষ্টি হলে আপনি ভিজবেন আমার সাথে? আমি ঢোক গিললাম। বলে কী! পাগল নাকি মেয়েটা? আমার মত আধা পরিচিত একটা ছেলের সাথে ও বৃষ্টিতে ভিজবে! অবশ্য আমি ওকে এখনও পুরোপুরি না চিনতে পারলেও ও হয়তো আমাকে খুব ভাল করেই চেনে। সেজন্যই এতো সহজ ভাবে কথা বলছে। আমিই হয়তো বেশি শক্ত হয়ে আছি। আচ্ছা, কে মেয়েটা? গাজিপুরা সাদ্দামের কে থাকে? উমমম… এক ফুফু থাকে বোধহয়। বছর দুয়েক আগে ওর এক ফুপাতো বোন হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে। থানা-পুলিশ-হাসপাতাল-মর্গ কোথাও কোন খোঁজ না পেয়ে আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে অনেকে বলাবলি করেছিল- “শেয়ানা মাইয়া, দেখ কোন পোলার সাথে ভাগছে!” ঐ মেয়েটার নাম মনে পড়ছে না। তার নাম কি সেঁজুতি ছিল? নাহ্‌! তা কী করে হয়? এইতো সেঁজুতি আমার সামনে দাঁড়িয়ে… আমাকে সাত-পাঁচ ভাবতে দেখে সেঁজুতি খিলখিল করে হেসে উঠলো। – কী? খুব ভয় পেলেন নাকি? অপরিচিত একটা মেয়ে হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেঁজার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বলে…! আমি তন্ময় হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। হাসলে কাউকে এতো সুন্দর লাগে আগে কখনো খেয়াল করিনি! সামলে নিয়ে বললামঃ আরে নাহ! কী যে বল… তুমি আবার অপরিচিত হতে যাবে কেন? আসলে ভিজতে আমারও খুব ভাল লাগে। কিন্তু হাতে বই-খাতা তো… আর তুমিই বা অপরিচিত হতে যাবে কেন!

সেঁজুতি বললঃ এখনও যখন চিনতে পারেননি তখন তো অপরিচিতই- তাই না? দেন, আপনার বাই-খাতাগুলর একটা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। বলতে বলতে ওর ব্যাগ থেকে একটা পলিথিন বের করে আমার হাত থেকে নেটের ব্যাগটা নিয়ে পলিথিনে ভরে বলল- নিন, এখন আর এগুলো ভিজবে না। এখন ভিজতে আপত্তি নেই তো? নাকি এখনও লজ্জা পাচ্ছেন? আমি হেসে ফেললা। – আরে নাহ! লজ্জা পাব কেন? – সেটাই। পুরুষ মানুষের আবার লজ্জা কিসের! লজ্জা নারীর ভূষণ। আমিই যখন লজ্জা পাচ্ছি না তখন আপনার আর সমস্যা কী? বলেই হাসলো সে। আমি আবারও তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আমার মনে হলো এতো সুন্দর হাসি আমি জীবনে দেখিনি। এতো সুন্দর-নির্মল-স্নিগ্ধ একটা মেয়েও আমি আগে দেখিনি কখনও! সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ল্যাম্প পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে এই মেয়েটাকে আমার অপার্থিব সুন্দর লাগছে। ও যেন এই পৃথিবীর মানুষ নয়… অন্য কোন জগত থেকে হঠাৎ এসে পড়েছে এখানে। সবকিছুই যেন একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে… একটা অসম্ভব সুন্দর স্বপ্ন যেন! আমি খুব সন্তর্পণে স্বপ্ন দেখে চললাম; খুব আস্তে আস্তে… যেন চট করে ভেঙ্গে না যায়! সেঁজুতি আমাকে মুগ্ধ বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যেতে দেখে ভ্রু নাচিয়ে বললঃ এই যে মিস্টার! হ্যালো…! কই- চলুন ভিজি…

আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললামঃ আগে বৃষ্টি তো নামুক! সেঁজুতি হেসে বললঃ আপনি আমার সাথে রাস্তায় নামলেই বৃষ্টি হবে। আমি চাইলেই বৃষ্টি নামাতে পারি। বিশ্বাস না হলে ফুটপাত থেকে নেমেই দেখুন রাস্তায়। আমি স্বকৌতুকে রাস্তায় নামলাম। আর সত্যি সত্যি হঠাৎ বাতাস থেমে গেল। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল কয়েকটা। তারপর মুষলধারে শুরু হলো বৃষ্টি! সেঁজুতি হেসে বললঃ দেখলেন! আমি কিছু না বলে চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম ওর সাথে। ও বাচ্চা মেয়ের মত লাফাতে লাফাতে হাঁটছে। আবহাওয়ার কারণে বিকেলের পর থেকেই লোকজন কমে আসছিল। বৃষ্টি নামায় হঠাৎ করেই যেন রাস্তার লোকজন দ্রুত কমে যেতে লাগলো। ঝড়ো বাতাসের কারণে রাস্তার পাশের দোকানগুলোও সাটার নামিয়ে দিচ্ছিল। আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম যে রাস্তা-ঘাটে অদ্ভুত এক শূন্যতা। হঠাৎ করেই যেন লোকজন সব উধাও হয়ে গেছে! শুধু স্ট্রিট ল্যাম্পের হলুদ আঁধারে আমি আর সেঁজুতি কোন দিকে যেন হেঁটে চলেছি।

আমি বললামঃ কয়টা বাজে? সেঁজুতি জবাব দিলঃ বেশি না, মাত্র সন্ধ্যা সাতটা। – মাত্র সাতটা? দেখে তো মনে হচ্ছে গভির রাত! নিউ মার্কেট এলাকা এতো সন্ধ্যায় ফাঁকা হয়ে যায়! – আমরা এখন নিউ মার্কেট না, অলরেডি ঢাকা ভার্সিটি ক্রস করছি। সামনেই রাজু ভাষ্কর্য! আমি অবাক হলাম। – কিন্তু আমরা এদিকে কেন যাচ্ছি? আমাদের তো নিউ মার্কেট থেকে বাসে ওঠা উচিৎ ছিল! তাছাড়া তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে না অনেক? সেঁজুতি বললঃ হুম… তা ঠিক; কিন্তু কী আর করা? এতো দূর যখন এসেই পড়েছি তখন একবারে শাহ্‌বাগ থেকেই গাড়িতে উঠি। আমি ভ্রু কুচকে চারদিকে তাকালাম। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে এখন। চারদিক ঝাপসা দেখাচ্ছে। আকাশ নিকষ কালো প্রায়। শুধু ল্যাম্প পোষ্টের হলুদ বাতিগুলো রাস্তার কিছুটা আলো করে রেখেছে। চারদিক একটু অস্বাভাবিক রকমই নিরব-জনশূন্য। যত যা-ই হোক বিশ্ববিদ্যালয় পাড়া এতোটা জনশূন্য থাকে না কখনোই।

আমি কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেললামঃ আশপাশটা একটু বেশিই নিরব লাগছে না? একটা রিক্সা পর্যন্ত নেই কোথাও! সেঁজুতি আমার আরেকটু কাছে এসে বললঃ কেন সফিক ভাই! আপনার কি আমার সাথে ভিজতে খারাপ লাগছে? রিক্সা পেলেই কি লাফ দিয়ে উঠে পড়বেন? – আরে নাহ্‌! সেসব কিছু না। – তাহলে? আপনার বোধহয় অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে! – না, দেরি আর কী হবে? আমার সময় থেমে গেছে… ঘড়িতে কিছু বাজে না! সেঁজুতি আবার তার সেই বিখ্যাত খিল খিল হাসি হেসে বললঃ তাহলে আর সমস্যা কী? লেটস এনজয় দ্যা রেইন! আপনি আমার হাত ধরে হাঁটেন। তাহলে আর জনশূন্য মনে হবে না। আমার কাছে মনে হলো আমি সত্যিই স্বপ্ন দেখছি। সন্ধ্যা রাতের এই আলো আঁধারি, জনমানব শূন্য এই পথ-ঘাট, এই মুষলধারায় ঝুম বৃষ্টি, ল্যাম্পপোস্টের বিষণ্ণ হলুদ আলো, অদূরের ঝাপসা দেখা যাওয়া “রাজু ভাষ্কর্য”, আমার পাশে এই অপার্থিব সুন্দর মেয়েটা কিংবা তার এই বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরতে দেবার আমন্ত্রণ… সব কিছুই অদ্ভুত সুন্দর একটা স্বপ্ন যেন! যেন এক্ষুণি কর্কশ এলার্মের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যাবে আমার। আমি স্বপ্নমোহিতের মত তাকিয়ে থাকি। আমি সেঁজুতির হাত ধরতে ভয় পাই। যেন হাত ধরলেই সে স্বপ্নের মত চুরমার হয়ে ভেঙ্গে যাবে!

সেঁজুতি আমাকে নিরব-নিথর দেখে বললঃ সফিক ভাই, কিছু মনে না করলে আমি আপনার হাত ধরি? আপনি ঠিকই বলেছেন, চারদিকটা আসলেই অনেক বেশি নিস্তব্ধ! একটা কুকুরও নেই কোথাও। আমার সত্যি একটু ভয় ভয় লাগছে… বলতে বলতে সত্যি সত্যি ও আমার ডান হাত ওর দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো। তারপর আমার শরীরের সাথে লেপ্টে থেকে হাঁটতে লাগলো। আমার বাঁ হাতে ধরে থাকা পলিথিনে মোড়ানো বই খাতাগুলো অনেক হালকা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ওগুলোর কোন ওজন নেই। নিজেকেও অনেক হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে আমি হাঁটছি না, যেন উড়ে উড়ে এগিয়ে যাচ্ছি… আমার ডান হাতে লেপ্টে থাকা অপ্সরীটি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোন এক স্বপ্নপূরীর পরীরাজ্যে… শুধু প্রথমবারের মত সেই কুসুম কুসুম উষ্ণতা আর টের পাচ্ছি না এখন। বৃষ্টিতে ভিজে সেঁজুতির শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আমার শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা ওর শরীরটা মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে কেবল। সেটা শীতে না ভয়ে ঠিক বুঝতে পারছি না… কে জানে- খুশি কিংবা আনন্দেও হতে পারে! আমি স্বপ্নের মতই হাঁটতে লাগলাম ওর সাথে নিরন্তর। আমার সময় থেমে গেল, ঘড়িটা অন্ধ হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম বাংলা একাডেমীর সামনে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের কাছে ৩/৪জন পুলিশ রেইনকোট গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমাদের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে কিনা ঠিক বোঝা গেল না। এখনও বৃষ্টি হচ্ছে… তবে আগের মত জোরালো না। টিপ টিপ করে ফোঁটা পড়ছে। সব কিছু আগের তুলনায় একটু স্পষ্ট। রাস্তায় এক-দুইজন মানুষও দেখা যাচ্ছে এখন। ছাতা মাথায় দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে তারা।

আমি সেঁজুতিকে বললামঃ আমরা কোথায় যাচ্ছি? রাজু ভাষ্কর্যের সামনে থেকে বাঁ দিক দিয়ে শাহ্‌বাগ যাবার কথা ছিল না আমাদের? সেঁজুতি আমার হাতটা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললঃ ছিল; কিন্তু আমার হাঁটতে ভাল লাগছিল। রাস্তা ফুরিয়ে যাক সেটা হয়তো চাচ্ছিলাম না। তাই এদিকে চলে আসলাম। এভাবে হাঁটতে আমারও ভালই লাগছিল। সবচেয়ে বড় কথা আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি। ভাল লাগার বাইরে কোন অনুভুতি নেই সেখানে। আমি তাই চুপ করে থাকলাম। সেঁজুতি নিজেই অজুহাতের সুরে বললঃ ভালই হয়েছে শাহবাগ যাইনি। শাহবাগ এখন যা ভিড়! বাসে উঠতেই পারতাম না। তারচেয়ে ভেতর দিয়ে হেঁটে পল্টন বা গুলিস্তান চলে যাই। ওখানে বাস একটু ফাঁকা পাওয়া যাবে। আমিও ওর লজিক মেনে নিলাম নির্লিপ্তে। শুধু একটু বললামঃ আমি কিন্তু এই দিকের রাস্তা চিনি না খুব একটা… সেঁজুতি হাসল। বললঃ হারিয়ে গেলে কেমন হয়? আমিও হাসলাম। বললামঃ খুব ভাল হয়! চল হারিয়ে যাই…

সেঁজুতি বললঃ না থাক- মা বকবে! হি হি হি… ভয় পাওয়ার কারণ নেই, আমি রাস্তা চিনি। – তাই বুঝি? – হ্যাঁ। এই শহরের প্রতিটি রাস্তা ঘাট আমার খুব চেনা! – বাহ্‌ বেশ! আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রেস ক্লাব হয়ে পল্টন পৌছলাম। ভেতরের রাস্তা যতটা নিরব ছিল রাজপথ ঠিক ততটাই সরব। প্রতিটি গাড়িতে উপচে পড়া ভিড়। বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় সব মানুষ এক সাথে রাস্তায় নেমেছে। লোকাল বাসের পা-দানিতে পর্যন্ত মানুষ ঝুলছে। সিটিং বাসের অবস্থা আরো বেহাল। কেউ কেউ ছাদে পর্যন্ত উঠে পড়েছে। আমার সাথে সেঁজুতি না থাকলে আমিও হয়তো ছাদে উঠে পড়তাম। সব বাসে ওঠাও যাচ্ছে না। একা হলে উত্তরার বাস পেলেই উঠে যেতাম। কিন্তু সেঁজুতির জন্য গাজিপুরের বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। কোন লাভ হলো না। গাজিপুরের কোন বাস আসছেই না মোটে। অনেককেই দেখলাম বাস না পেয়ে হেঁটেই রওয়ানা দিচ্ছে! হেঁটে কোথায় যাবে এরা? ফার্মগেট? এয়ারপোর্ট? উত্তরা? নাকি গাজিপুর চলে যাবে হাঁটতে হাঁটতে? কেউ একজন আমাদের পরামর্শ দিলো গুলিস্তান চলে যেতে। সাথে লেডিস নিয়ে এখান থেকে ওঠা সম্ভবই না। গুলিস্তানে গিয়ে সীট না পেলেও অন্তত দাঁড়ানোর জায়গা তো পাওয়া যাবে। পরামর্শটা খারাপ না। সেঁজুতি আমাকে বললঃ চল! তারপর সোজা হাঁটতে লাগলো। আমিও ওর পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। লোকজনের সামনে এসেই সেঁজুতি কখন আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে খেয়ালও করিনি। সেঁজুতিও হয়তো খেয়াল করেনি ও কখন থেকে আমাকে তুমি করে বলা শুরু করেছে! বৃষ্টি খুব অদ্ভুত একটা জিনিস। স্বর্গ থেকে পড়ে বলেই হয়তো ওটা খুব স্বর্গীয়! বৃষ্টি শুধু আমাদের গায়ে পড়ে না, সরাসরি মনের ওপর গিয়ে পড়ে। এক সন্ধ্যায় মনের ভেতর একটা ঝড় বইয়ে দিয়ে মনটা উলট-পালট করে দিয়ে যায়। আপনিকে তুমি করে দেয়। অপরিচিত একটা মেয়ের হাত ধরে হাঁটার সুযোগ করে দেয়। আরো কত কী করে কে জানে! আমরা হাঁটতে হাঁটতে গুলিস্তান চলে এলাম। এবং এই প্রথমবারের মত খেয়াল করলাম, প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। কয়টা বাজে এখন? নগর ভবনের বিশাল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে চোখ চড়ক গাছ হয়ে গেল। নষ্ট কিনা মিলিয়ে দেখার জন্য পকেট থেকে মোবাইল বের করলাম। দেখি বৃষ্টিতে ভিজে মোবাইল বন্ধ হয়ে বসে আছে। সর্বনাশ! আমার মানিব্যাগে সব সময় একটা ছোট প্লাস্টিকের প্যাকেট থাকে। বৃষ্টি এলে আমি মোবাইল ঐ প্যাকেটে ভরে ফেলি। প্লাস্টিক আজও ছিল। সেঁজুতির কাছ থেকে পলিথিন নিয়ে বই-খাতাগুলো বাঁচিয়েছি অথচ মোবাইলের কথা বেমালুম ভুলে গেছি।

আমি সেঁজুতিকে ডেকে বললামঃ দেখো তো, তোমার ঘড়িতে কয়টা বাজে? সেঁজুতি হেসে বললঃ আমার সময় থেমে গেছে, ঘড়িতে কিছু বাজে না! শুনে আমি নিজেও হেসে ফেললাম। কিন্তু তাহলে কি নগর ভবনের ঘড়িটা ঠিকই আছে? আসলেই এখন রাত সাড়ে নয়টা বাজে? গুলিস্তান গিয়ে দেখি আরেক কাণ্ড! ওবায়দুল কাদের কী এক আইন করেছে, গাজিপুরের কোন গাড়ি এখন ফুলবাড়িয়া রাখতে পারবে না। সব গাড়ি এখন থেকে সদর ঘাটের দিকে কোথায় যেন থাকবে, সেখান থেকেই ছাড়বে! গুলিস্তানের জ্যাম কমানোর জন্য এটা নাকি নতুন পদক্ষেপ। আমার কাছে অদ্ভুত লাগলো শুনে। আবারও মনে হল স্বপ্ন দেখছি আমি। স্বপ্নে যেমন অসম্ভব-অবাস্তব-অদ্ভুত জিনিসগুলোও সত্য-স্বাভাবিক-বাস্তব মনে হয়, এখনও তেমন মনে হচ্ছে। সেঁজুতি নির্লিপ্তে সদর ঘাটের দিকে হাঁটতে লাগলো। আমি বললামঃ সেঁজুতি! আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে…! সেঁজুতি স্বকৌতুক হেসে বললঃ আমার কাছে খাবার কিছু নেই!

আমি বললামঃ না মানে, কিছু খেয়ে নিই? – এখানে কোথায় কী খাবে? কোন দোকান-পাটই তো খোলা নেই! আমিও খেয়াল করলাম আসলেই তাই। গুলিস্তানের মত জায়গায় তেমন কোন খাবারের দোকানই আজ খোলা নেই। সব বন্ধ! সেঁজুতি আমার হাত ধরে বললঃ চল সদর ঘাট চলে যাই। ওখানে সারা রাত খাবারের দোকান খোলা থাকে। আমি কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে কিংবা উড়তে লাগলাম… সেঁজুতি আমার হাত ধরলেই মনে হয় আমি বাস্তবতায় নেই। আমি স্বপ্নে দেখছি। স্বপ্নের মধ্যেই আমি উড়ে উড়ে চলছি ওর সাথে… গুলিস্তান থেকে আমরা যতই সদরঘাটের দিকে এগুতে থাকলাম ততই যেন স্বপ্নের দৃশ্যপট পালটে যেতে থাকলো। সদরঘাটে আমার খুব একটা যাতায়াত নেই। তবু কলেজে থাকতে দু’চারবার ধোলাইখাল এসেছিলাম প্রজেক্টের কাজে। আর বছর দু’য়েক আগে কুয়াকাটা গিয়েছিলাম সদরঘাট থেকে বরিশালের লঞ্চে। কিন্তু এই জায়গাগুলো এমন ছিল না। এমন হওয়ার কথাও না কখনোই। আমার মনে হচ্ছে আমরা আস্তে আস্তে একটা গ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। সদরঘাট হওয়ার কথা একটা গিঞ্জি এলাকা। প্রতি নিয়ত লঞ্চের সাইরেন, বোটের শ্যালো ইঞ্জিনের ভট-ভট শব্দ কানে আসার কথা। অথচ হচ্ছে তার উল্টোটা! চারদিক যেন আরো নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম চারপাশে আর কোন কৃত্তিম আলো নেই। না কোন ল্যাম্প পোস্ট না কোন দোকানের আলো। আমি একটা কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। মাথার ওপর আকাশের মেঘ সরে গেছে। কৃষ্ণপক্ষের এক ফালি চাঁদ ডিম লাইটের মত মায়াবী ভূতুড়ে আলো ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। সেঁজুতি এখন আর আমার হাত ধরে হাঁটছে না। সে প্রজাপতির মত আমার সামনে সামনে ভেসে ভেসে এগিয়ে যাচ্ছে। আমিও একটা শিশুর মত প্রজাপতির পেছন পেছন এগিয়ে যাচ্ছি। আমার সামনে সেঁজুতি আর পেছনে কেবল গাঢ় অন্ধকার। চাঁদের আলোয় দেখতে পেলাম জোনাকির মত আলো ছড়াতে ছড়াতে সেঁজুতি একটা নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নদীর জলে চাঁদের আলোতে আবছায়া প্রতিবিম্ব। নদীর ওপাড় দেখা যাচ্ছে না। কী নদী এটা? বুড়িগঙ্গা নয় নিশ্চয়ই। বুড়িগঙ্গা এতো বড় নয়। বুড়িগঙ্গার এপাড় থেকে ওপাড় দেখা যায় সহজেই। তাছাড়া বুড়িগঙ্গার ওপর দিয়ে সারা রাত কোষা নৌকা পারাপার হয়। নৌকায় জ্বালিয়ে রাখা হ্যারিকেনের আলো দুলতে দুলতে ইতস্তত ছুটে বেড়ায় নদীর বুক জুড়ে। কিন্তু এই নদীটায় চাঁদের আলো ছাড়া আর কোন আলো নেই! এমনকি সদরঘাটের লঞ্চ টার্মিনালে থেমে থাকা লঞ্চগুলোও দেখা যাচ্ছে না কোথাও! আমি সেঁজুতিকে ডাকলাম।

ভয়ার্ত স্বরে বললামঃ সেঁজুতি! এটা কোন জায়গা? কী নদী এটা? সেঁজুতি খিল খিল করে হেসে বললঃ এটা বুড়িগঙ্গা নদীই। আমরা সদর ঘাটের পেছনের পাশে আছি। – কিন্তু আমি কিছু চিনতে পারছি না কেন? এতো অন্ধকার কেন চারপাশে? – সেঁজুতি আমার কাছে এসে বললঃ কেন ভয় করছে? এইতো আমি! নাও আমার হাত ধর… আমি ভয়ার্ত শিশুর মত ওর হাত ধরলাম। কিন্তু আমার ভয় গেল না। আমি আরো ভয়ার্ত স্বরে বললামঃ সবকিছু এমন কেন লাগছে? সেঁজুতি স্বান্তনার সুরে বললঃ ঝড় বৃষ্টি হয়েছে তাই কারেন্ট নেই বোধহয়। কিন্তু তোমার কী হয়েছে? এমন করছো কেন? বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর-টর আসেনিতো? জ্বরের ঘোরে উল্টা-পাল্টা দেখছো সব কিছু! বলতে বলতে আমার খুব কাছে এসে কপালে হাত রাখলো সে। এতো কাছে যে ওর নিঃশ্বাস আমার মুখের ওপর পড়তে লাগলো। কেমন একটা অচেনা ফুলের গন্ধ! – কই নাতো! জ্বর তো মনে হচ্ছে না! বুঝেছি, ক্ষুধাটা একটু বেশিই লেগেছে বোধহয়। ক্ষুধায় অন্ধকার দেখছো চারদিক… বলতে বলতে আবার খিল খিল করে হেসে ফেলল সে। এই প্রথমবার ওর হাসি আমার ভাল লাগলো না। কেমন যেন অপার্থিব-অশুভ একটা হাসি মনে হলো। আমি ভয়ে ভয়ে আরেকবার চারদিকে তাকালাম। চাঁদের ক্ষীণ আলোয় আমি দেখলাম নদীর পাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছি আমি। এখান থেকে একটা পায়ে হাঁটা সরু রাস্তা সোজা নেমে গিয়ে নদীর পাড় ঘেঁষে ডান দিকে চলে গেছে। রাস্তার পাশেই হাতের ডানে একটা গীর্জা। এই এলাকায় গীর্জা কোত্থেকে এলো কে জানে! গীর্জার পাশেই নদীর তীর ঘেঁষে শত শত ক্রুশ মাটিতে গাঁথা। আমার অনেক্ষণ লাগলো এটা বুঝতে যে ওগুলো আসলে খৃস্টানদের কবর। নদীর পাড়ে শ্বশানঘাট হয় শুনেছি। কিন্তু খৃস্টানদের কবরও হয় নাকি! তাও আবার এই সদর ঘাটে, বুড়িগঙ্গার পাড়ে! সেঁজুতি আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি বললামঃ কিন্তু আমরা যাচ্ছিটা কোথায়? এটাতো সদর ঘাট না! সেঁজুতি বিরক্ত স্বরে বললঃ আহ্‌! সদর ঘাট কেন যাব? আমরা কি লঞ্চে উঠবো? লঞ্চে উঠে বরিশাল যাব? আমরা যাচ্ছি বাস টার্মিনালে। নদীর ওপর ভাসন্ত বাস টার্মিনাল বানানো হয়েছে। সামনে এগুলেই দেখতে পাবে। ঠিক আছে? কিচ্ছু ঠিক নেই। আমার মন বলছে কিচ্ছু ঠিক নেই। আমার মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নে ঠিক-বেঠিক বলে কিছু নেই। স্বপ্নে যা দেখা হয় তা-ই ঠিক, বাকি সব বেঠিক। “স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়”! আমি অজানা এক অনুভূতি নিয়ে সেঁজুতির পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। কিছুটা গিয়ে গীর্জাটা পার হয়ে একটু মোড় ঘুরতেই দূরে কিছু লোকজন দেখা গেল। চাঁদের আলোতে আবছায়া কিছু বাসের অবয়বও চোখে পড়লো। একপাশে ক্ষীণ মোমের আলোতে একটা হোটেল গোছের কিছু একটা। সেখানে কিছু লোকজন বসে নিচু স্বরে কথা বলছে। একটা বাসের ভেতর ছোট একটা বাল্ব টিমটিমে আলো ছড়াচ্ছে। বাসের ভেতর ৪/৫জন যাত্রিও দেখা গেল। এই বাসটাই বোধহয় আগে ছাড়বে। কিন্তু ড্রাইভার বা হেল্পার কাউকে দেখছি না। মনে হচ্ছে বাস ছাড়তে দেরি হবে। চারদিকে অস্বাভাবিক নীরবতা। শুধু চাঁদের আলো চুইয়ে পড়া নদীর কালো পানি বাতাসে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করে পাড়ে আছড়ে পড়ছে। নদীতে সামান্য ঢেউ আছে। সেই ঢেউয়ে বিশাল এক ফেরির মত দেখতে ভাসন্ত বাস স্ট্যান্ডটা অদ্ভুতভাবে দুলছে। আমার কাছে কিছুই এখন আর অস্বাভাবিক লাগছে না। মনে হচ্ছে এমনই হবার কথা ছিল। এইযে আমার হাতে এখন আর কোন ব্যাগ-ট্যাগ নেই; আমার বইখাতাগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে- এটাও এখন আর অবাক লাগছে না। স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়! সেঁজুতি আমার হাতে মৃদু ঝাকুনি দিয়ে বললঃ চল, বাস ছাড়তে দেরি আছে, কিছু খেয়ে নিই। আমি ওর কথায় সায় দিয়ে হোটেলটার দিকে হাঁটতে লাগলাম। এতো বড় বাস স্ট্যান্ড অথচ সর্বসাকুল্যে ৬/৭টা বাস দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। আশে পাশে ইতস্তত কিছু মানুষ বসে আছে। তাদের কারো কারো চেহারা উদ্ভ্রান্তের মত। উদাস শূন্য দৃষ্টিতে মরা মাছের চোখের মত নিষ্প্রাণ তাকিয়ে আছে তারা। কেউ কেউ আবার আমাদের দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকাচ্ছে। সেঁজুতি বোধহয় খুব মজা পাচ্ছে। তাদের অদ্ভুত দৃষ্টি পার করে আমাকে নিয়ে সে ঐ ছোট খাবারের দোকানটার দিকে এগিয়ে গেল। খাবারের দোকান মানে বাসস্ট্যান্ডের খাবার হোটেলগুলো যেমন হয় আরকি! একটা বড় টেবিল। তার চারপাশে তিনটা ছোট ছোট কাঠের বেঞ্চি পাতা। একপাশে কিচেন। সেখানে লুঙ্গি-স্যান্ডো গেঞ্জি পরা কালো মত একটা লোক ডেকচির মধ্যে কী যেন ঘটাং ঘটাং করছে। আমাদের দেখে চোখে মুখে খুশির ঝিলিক নিয়ে সে এগিয়ে এলো। – কী খাবেন মামা? বসেন। সেঁজুতি বললঃ খাবার কী আছে দেন। – ভাত আছে; ভাত দেই? সাথে ভর্তা-ভাজি-ডাইল… – দেন, একটা ভাত দেন। আমি আস্তে করে বললামঃ তুমি খাবে না? সেঁজুতি বললঃ নাহ্‌। আমি এসব বাইরের খাবার খাই না। তাছাড়া ক্ষুধা তোমার লেগেছে, আমার তো না! তুমি খাও… আমি কথা বাড়ালাম না। খাবার আসতে দেখি ভাত-সবজি সব ঠান্ডা। দোকানী মামা হেসে অজুহাতের ভঙ্গিতে বললঃ বৃষ্টির দিন, সব ঠান্ডা অইয়া গেছে। তার উপ্রে নদীর পাড়… আমি ভর্তা-ভাজির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকালাম। সব কেমন বাসি বাসি লাগছে দেখতে। দোকানী যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বললঃ সব টাটকা জিনিস। মুখে দিলেই টের পাইবেন… আমি অল্প একটু ভর্তা নিয়ে ভাত মেখে মুখে দিলাম। প্রচণ্ড ক্ষুধার কারণেই কিনা জানি না, খুব মজা লাগলো। বেশ সুন্দর একটা ঘ্রাণ! কিসের ঘ্রাণ এটা? ঘি নাকি? খেতে খেতে আমি আবেশিত হয়ে গেলাম। প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে আমার। দেখলাম সেঁজুতি আমার দিকে মায়া ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। কী দেখছে ওমন মায়া নিয়ে? আমার খাওয়া দেখছে? ক্ষুধার্ত মানুষকে খেতে দেখলে বুঝি চোখে-মুখে ওমন মায়া চলে আসে? দোকানীটাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার খাওয়া দেখছে। তার চোখে মায়া নয়, কেমন একটা লোভাতুর দৃষ্টি! অদ্ভুত লোভি চোখে সে আমাকে দেখছে। ওমন করে কী দেখে সে? আমাকে চমকে দিয়ে হঠাৎ গীর্জার ঘণ্টাটা বেজে উঠলো ঢং ঢং ঢং। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হলো আমি তলিয়ে যাচ্ছি। অনন্ত অসীম নিস্তব্ধতা গ্রাস করছে আমাকে। আমি তলিয়ে যাচ্ছি গভীর ঘুমে… শেষবারের মত একবার সেঁজুতিকে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওর দিকে চোখ ফেরানোর আগেই আমার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। খাবারের প্লেট সামনে রেখেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম! ২. অনেক দূর থেকে সাগরের গর্জন ভেসে আসছে। শব্দটা মনে হচ্ছে বাড়ছে আস্তে আস্তে। সাগর যেন গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। কিংবা আমিই এগিয়ে যাচ্ছি সাগরের দিকে। অনন্তকাল ধরে আমি শুনে যাচ্ছি ক্রমবর্ধমান সাগরের গর্জন। সময় যেন থেমে গেছে। আমার জগতে সাগরের গর্জন ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু আমি কোথায়? আমি কিছু দেখছি না কেন? তবে কি আমার চোখ বন্ধ? আমি কি তাহলে ঘুমুচ্ছি? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি? আমি চোখ খোলার চেষ্টা করলাম। হয়তো চোখ খুললাম, কিংবা খুললাম না! দৃশ্যপটের কোন পরিবর্তন হলো না। আমি কিছুই দেখছি না। অদ্ভুত দৃশ্যহীন একটা জগতে আছি আমি। এটা না অন্ধকার না আলো। না নিকষ কালো হয়ে আছে চারদিক। না কুয়াশার মত সাদা হয়ে আছে। বর্ণহীন, অনুভূতিহীন… শূন্যতা পর্যন্ত নেই যেন! অসীম অনন্ত দৃশ্যহীন অদ্ভুত এক জগৎ। আমি কি দাঁড়িয়ে আছি না বসে আছি? নাকি শুয়ে? নাকি ভেসে আছি মহাশূন্যে? নাকি আমার এখনও জন্মই হয়নি? আমি মায়ের গর্ভে বাড়তে থাকা একটা ক্ষুদ্র ভ্রূণ মাত্র? আমার হাত-পা-শরীর বলে কি আদৌ কিছু আছে? নাকি আমি এখনও কেবলই একটা আত্মা? আমার কি কোন অনুভূতি আছে? নাকি আমার তাও নেই? আমি কি তবে অনন্ত-অসীম-মহাশূন্য তবে? নাহ্‌! তা কি করে হয়? এইতো আমি সাগরের গর্জন শুনছি। তাহলে তো আমার শ্রবণ ইন্দ্রিয় আছে। নাকি আসলে আমি কিছু শুনছি না? এসবই আমার কল্পনা? শব্দ আসলে আমার ব্রেনের ভেতর হচ্ছে? সেক্ষেত্রেও তো আমার একটা ব্রেইন আছে, ইন্দ্রিয় আছে! আচ্ছা, এমনতো নয় যে, আসলে শব্দ হচ্ছে আমার অনুভূতির ভেতর? আমার আসলে ব্রেইনও নেই। ধরা ছোঁয়ার মত কিছুই নেই আমার। আমি আসলে একটা অনুভূতি সর্বস্ব বস্তু। কিংবা আমি আসলে নিজেই একটা অনুভূতি! কী অনুভূতি আমি? প্রেম? কাম? নাকি ভালবাসা? নাকি রাগ-ক্ষোভ-দুঃখ? নাকি আনন্দ-খুশি… নাকি অন্য কিছু? আচ্ছা, এর আগে কোথায় ছিলাম আমি? কী ছিলাম? আমার কি কোন অতীত আছে? নাকি নেই? আমার কোন অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ কিছুই নেই। আমি কি তবে সৃষ্টি কর্তার মত অনাদী-নিরন্তর? আমার জগতে সময়ের কোন অস্তিত্বই নেই হয়তো। আচ্ছা, আমি তো বেশ গুছিয়ে চিন্তা করতে পারছি! আমি কি তাহলে একটা ভাবনা? ভাবনা না অনুভূতি? কোনটা আমি? আমি নিজেকে পরখ করতে চাইলাম। আমি একটা সাগরের গর্জন শুনছি। তার মানে আমার শ্রবণ অনুভূতি আছে। আমি চিন্তা করতে পারছি। তার মানে আমার চিন্তা করার ক্ষমতা আছে। তাহলে আমি কী? আচ্ছা, আমি একটা স্বপ্ন নইতো? হ্যাঁ! স্বপ্ন!!! আমি আসলে একটা স্বপ্ন। আমি স্বপ্ন দেখছি? নাকি আমিই একটা স্বপ্ন- কেউ আমাকে দেখছে? কে দেখছে আমাকে? সেঁজুতি? আচ্ছা, আমার জগত তো তাহলে জনমানব শূন্য নয়! এইতো আমি একজনকে মনে করতে পারলাম। সেঁজুতি! সেঁজুতি তবে আমাকে স্বপ্ন দেখছে। নাকি আমিই সেঁজুতিকে স্বপ্নে দেখেছিলাম? আমি সেঁজুতির স্বপ্ন? নাকি সেঁজুতিই আমার স্বপ্ন? আচ্ছা, সেঁজুতি এখন কোথায়? ওকে শেষ কোথায় দেখেছি? ওর কথা ভাবতেই আমার বুকের ভেতর টন টন করে উঠলো। তাহলে আমার একটা বুকও আছে! শেষবার সেঁজুতি আমার দিকে মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে ছিল। আমি তখন কী করছিলাম? ভাত খাচ্ছিলাম। আমার তাহলে ক্ষুধাও আছে! কী যেন একটা ভর্তা দিয়ে ভাত মাখিয়ে খাচ্ছিলাম। দোকানী আমার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ওটা একটা বাসস্ট্যান্ড ছিল। অদ্ভুত একটা বাস স্ট্যান্ড। বাসগুলো নদীর ওপর একটা ভাসন্ত পাটাতনে দুলছিল। বাহ্‌! এইতো বেশ মনে পড়ছে। সব কিছু চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি! তারমানে আমার জগৎ বর্ণহীন নয়, দৃশ্যহীন নয়। এইতো আমি দেখতে পাচ্ছি! কিন্তু দৃশ্যগুলো স্থির নয়। তারা স্বাধীন ও নিরন্তর নয়। আমার ইচ্ছামত সেগুলো বদলে যাচ্ছে। আমি যেমন দেখতে চাচ্ছি তেমনই দেখতে পাচ্ছি। আমি যেটা দেখতে চাচ্ছি সেটাই ঘটছে আমার সামনে। ঠিক যেমন স্বপ্নে আমরা আমাদের ইচ্ছামত দৃশ্য দেখতে পাই! তাহলে কি সত্যি আমি স্বপ্নে দেখছি? একটা পরীক্ষা হয়ে যাক। স্বপ্নে চাইলে নিজেকেও দেখতে পাওয়া যায়। আমি এখন নিজেকে দেখার চেষ্টা করবো। যদি পারি তাহলে এটা স্বপ্নই। কিন্তু যদি না পারি? তাহলে এটা কী? স্বপ্নছাড়া অন্য কিছু! কিন্তু কী সেটা? আমি আর ভাবতে পারলাম না। এটা স্বপ্ন ছাড়া অন্য কিছু হলে ভীষণ বিপদে পড়ে যাব। ভীষণ অসহায় লাগবে আমার। স্বপ্ন সে তুলনায় ভাল। স্বপ্ন আমার পরিচিত জগৎ। যা স্বপ্ন নয় তা আমার পরিচিত নয়। একা একা অপরিচিত জগতে যেতে আমার ভয় লাগছে। স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়! অতঃপর আমি নিজেকে দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম আমি একটা নদীর পাড়ে একা দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে কোন আলো নেই। শুধু কৃষ্ণপক্ষের আধ ফালি চাঁদ চুইয়ে পড়া তরল আলো নদীর পানিতে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সেই আবছায়া আলোয় নদীর পাড়ে আমি আমার অবয়ব দেখতে পেলাম। আমাকে দেখে আমার খুব ভাল লাগলো। ভালো লাগলো কারণ আমি নিশ্চিত হতে পারলাম যে আমি স্বপ্নই দেখছি। যদিও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ ছেলেটির চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছি না। আধো আলো ছায়ায় ওর গায়ে কী জামা পরা তাও বুঝতে পারছি না। তবুও আমি নিশ্চিত জানি- ওটা আমিই! আমি যখন নিশ্চিত হলাম যে আমি স্বপ্ন দেখছি তখন আমার অনেক স্বস্তি হল। যেহুতু এটা স্বপ্ন সেহুতু এটা চাইলেই ভেঙ্গে দেয়া যেতে পারে। একটা তিব্র ঝাঁকুনি দিয়ে আমি স্বপ্নটা ভেঙ্গে দিতে পারি। স্বপ্ন ভেঙ্গে দিলেই আমি দেখতে পাবো আমার পরিচিত জগৎ। দেখবো আমি আমার পরিচিত খাটে শুয়ে আছি। ঘড়িতে কয়টা বাজবে তখন? সকাল কি হয়ে গেছে? নাহ্‌, তাহলে তো আম্মুই ডেকে তুলতো! তাহলে কি গভীর রাত এখনও? আমি কি আমার স্বপ্নটা ভেঙ্গে ফেলব? একটা তিব্র ঝাঁকুনি দিয়ে দেখবো? আমি চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভাঙ্গলো না! আমি এখনও আগের জগতেই আছি। আরেকবার চেষ্টা করলাম। দুইবার, তিনবার, চারবার…! নাহ্‌ ভাঙ্গা যাচ্ছে না। অনেক সময় এমন হয়। স্বপ্নে আমরা টের পাই যে আমরা স্বপ্ন দেখছি। তবুও সেটা থেকে বের হতে পারি না। তখন কেউ ঘুম থেকে ডেকে না তোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আমিও কি তাহলে অপেক্ষা করবো? সকাল হলেই আম্মু ডেকে দেবে… আমি কি সেই পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরে থাকবো? অপেক্ষা করা যেতে পারে। যদিও আমার আর স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করছে না। আমার ইচ্ছে করছে জেগে উঠি। কিন্তু কী আর করা যাবে? আমি যে স্বপ্নে দেখছি! আমি স্বপ্ন ভেঙ্গে জেগে উঠতে পারছি না… “স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়”! অনন্তকাল ধরে আমি স্বপ্ন দেখছি। কেউ আমাকে ডেকে তুলছে না। অবশ্য আমার কোন কষ্ট হচ্ছে এমন না। শুধু অস্বস্তি হচ্ছে। ভাল লাগছে না আর। যদিও আমার জগৎ এখন অসীম। আমি যা চাই করতে পারি- পারছি। আচ্ছা, সেঁজুতিকে নিয়ে আসলে কেমন হয়! একটা ঝলমলে সুন্দর রৌদজ্জ্বল দিনে সেঁজুতিকে সাথে নিয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে কেমন হয়? গ্রীষ্মকাল হতে পারে। দু’পাশের কৃষ্ণচূড়াগুলোতে লাল আগুন ফুটে থাকবে। রাস্তায়ও বিছিয়ে থাকবে অজস্র আগুন রাঙ্গা ফুল। তার মাঝে আমি আর সেঁজুতি হাটতে থাকবো। ডানপাশে চন্দ্রিমা উদ্যান আর বাঁয়ে সংসদ ভবনটাকে পাশ কাটিয়ে আমরা হাঁটতে থাকবো পশ্চিম দিকে। রাস্তাটা অনেক বড় হয়ে যাবে। অনন্তকাল হাঁটলেও পথ শেষ হবে না। হঠাৎ বৃষ্টি নামবে। আমরা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হাঁটবো। যেমন হেঁটেছিলাম আমরা এক সন্ধ্যায়… আমার হাত জড়িয়ে ধরে শরীরের সাথে পরগাছার মত লেপ্টে থেকে হেঁটেছিল সেঁজুতি। তেমনি ভাবে আবার হাঁটলে কেমন হয়? কিন্তু আমি সেঁজুতিকে খুঁজে পাই না। আমি একাই হাঁটতে থাকি সংসদ ভবনের সামনের রাস্তা দিয়ে। সেঁজুতি নেই কোথাও! কিন্তু নেই কেন? তবে যে বলে- “স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়”! স্বপ্নে যদি সব সত্যিই হবে তবে সেঁজুতিকে কেন আমি খুঁজে পাচ্ছি না? সে কি তবে নেই আমার এই স্বপ্ন জগতে? এই জগৎটা কি তাহলে সেঁজুতি শূন্য? অথচ ও থাকলে কতই না ভাল হতো! আমি ওর সাথে শুধু হেঁটে হেঁটেই অনন্তকাল পার করে দিতে পারতাম। একটুও কষ্ট হতো না। আইনস্টাইন তার “থিওরী অব রিলেটিভিটি” ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন- মনে কর তুমি একটা আগুনের কুন্ডুলির খুব কাছে দুই মিনিট থাকলে, তোমার কাছে মনে হবে দুই ঘণ্টা কেটে গেছে। কিন্তু তুমি যদি একটা সুন্দরী মেয়ের সাথে দুই ঘণ্টাও কাটিয়ে দাও তবু মনে হবে মাত্র দুই মিনিট! সেঁজুতির মত সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি। ওর সাথে ২ হাজার আলোক বর্ষ কাটিয়ে দিলেও আমার কাছে দুই মিনিটই মনে হবে। কিন্তু সে কোথায়? আমি তাকে শহরের প্রতিটি রাস্তায় প্রতিটি অলিতে গলিতে খুঁজতে থাকি। কিন্তু কোথাও সে নেই! আমি দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকি নীলক্ষেতের সেই বইয়ের দোকানের সামনে। যেখানে ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। কিন্তু সে আসে না। তবে কি আমাকে এই স্বপ্নের জগতে বন্ধি করে ও ছাড়া পেয়ে গেছে? ও চলে গেছে বাস্তব জীবনে? আমি কি তবে স্বপ্নবন্দি??? এজন্যই কি আমার স্বপ্ন ভাঙ্গছে না? কেউ ডেকে তুলছে না আমাকে ঘুম থেকে! আমি শিউরে উঠলাম। কী ভয়ঙ্কর!!! আমি এক অদ্ভুত অসীম জগতে বন্ধি হয়ে গেছি। আমি অনন্তকাল ধরে এখানে আছি, আরো অনন্তকাল থাকবো। স্বপ্ন দেখে মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। আমি কখনও জেগে উঠবো না। আমি একটার পর একটা স্বপ্ন দেখতে থাকবো কেবল। আমি ছুটে যেতে চাই আমার বাড়িতে। আমার বাড়িতে গিয়ে দেখতে চাই ঘুমন্ত আমাকে। আমার আম্মুকে ডেকে বলতে চাই আমাকে ডেকে তোল! আমি আঁটকে গেছি, বন্ধি হয়ে গেছি… আমাকে জাগিয়ে তোল!!! কিন্তু আমি যেতে পারি না। ফার্মগেটের পর আমি আর যেতে পারি না। আমি আঁটকে গেছি বাস্তব জগতের সদর ঘাট থেকে ফার্মগেট-এর মধ্যে। এর পরে আর পরিচিত জগৎ নেই। এর পর থেকে অন্য একটা অপরিচিত জগৎ শুরু হয়। অনাদি অনন্ত সেই জগৎ… আমি কখনো তার দিগন্তে পৌঁছাতে পারি না। তার মানে স্বপ্নেও আমি স্বাধীন নই। স্বপ্নের মাঝেও আমি বন্ধি! আমি ফার্মগেট মোড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে চাই- আমাকে কেউ জাগিয়ে তোল, আমাকে কেউ মুক্ত কর। এই একঘেয়ে স্বপ্ন জগতে আমি হাপিয়ে উঠেছি। আমি আর স্বপ্ন দেখতে চাই না। আমাকে কেউ মুক্ত কর…! কিন্তু কেউ আমার কথা শুনতে পায় না। কেউ কেউ শুনতে পায়। তারা পাগলের প্রলাপ ভেবে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আবার কেউ কেউ আছে আমারই মত। আমি বেশ বুঝতে পারি ওরাও আমার মত স্বপ্নবন্দি। ওরা ঠিক স্বভাবিক নয়। কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মত চেহারা। ওরা ইতস্তত এখানে সেখানে বসে থাকে। মরা মাছের মত শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। কেউ কেউ আমাকে দেখে মুখ টিপে হাসে। সেই হাসি অর্থপূর্ণ! এতো এতো মানুষের ভিড়ে আমি কোন পরিচিত মানুষ দেখি না। আমি অনন্তকাল ঘুরে বেড়াই ফার্মগেট-নিউমার্কেট-শাহবাগ-প্রেসক্লাব-হাইকোর্ট-গুলিস্তান কিংবা সদরঘাটের পথে ঘাটে। কোথাও কোন আপন মানুষ নেই। অস্থির হয়ে আমি হাঁটতে থাকি। কিংবা থেমে থাকি। আমি কেবল একটার পর একটা স্বপ্ন দেখতে থাকি। আমি শুধুই থাকি… ইদানিং আমার স্বপ্নগুলো সব ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। প্রায়ই দেখি আমার চারপাশের মানুষগুলো হঠাৎ একটা একটা করে বুনো মহিষ হয়ে যাচ্ছে! তারা হিংস্র দৃষ্টিতে চারদিক থেকে আমায় ঘিরে ধরছে। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। তাদের চোখ লাল। নাক দিয়ে লালা ঝড়ছে। কোন কোন মহিষের মুখে বীভৎস হাসি। ভয়ঙ্কর কুটিল হাসি হাসতে হাসতে তারা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। কিযে ভয়ঙ্কর! আমি চিৎকার দিয়ে জেগে উঠতে চাই। কিন্তু পারি না। আমার ভয় তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। প্রচণ্ড ভয়ে আমার হৃদস্পন্দন থেমে যায়। তবুও আমার স্বপ্ন ভাঙ্গে না। কেবল একটা স্বপ্ন থেকে আরেকটা স্বপ্ন তৈরী হয়। আমি স্বপ্ন থেকে স্বপ্নে ভেসে বেড়াই। স্বপ্নে আমি উড়তেও পারি। আজকাল বেশিরভাগ সময় আমি উড়েই বেড়াই। মাটিতে নামতে ভয় হয়। মাটিতে আজকাল কোন মানুষ নেই, সবাই মহিষ হয়ে গেছে। আমি উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের মগডালে গিয়ে বসি। হঠাৎ খেয়াল করি গাছের ডালেও একটা মহিষ বসে আছে। আমাকে দেখে মহিষটা লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়। বেড়ালের মত ঝাপ দেয় ওটা আমার দিকে। আমি আবার উড়াল দেই। সুপারম্যানের মত হাত পা না নাড়িয়েই আমি ভেসে যেতে থাকি বাতাসে। কিন্তু আমার ভয় দূর হয় না। আমার ভয় হতে থাকে মহিষগুলোও কোন একদিন উড়তে শিখে যাবে। তখন? কিছুই অসম্ভব নয়। স্বপ্নে সবই সত্যি। আমি তো স্বপ্নে দেখছি। স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়! দিন দিন আমি অসয়িষ্ণু হয়ে উঠছি। আমার আর ভাল লাগে না। কত সহস্র শতাব্দি ধরে আমি একা একা এই স্বপ্ন দেখে চলেছি। আমার আর ভাল লাগে না। আমি এখন আর ভয় পাই না যদিও। মহিষগুলোকে এখন আর আমার ভয় লাগে না। একদিন প্রচণ্ড ভয় পাওয়া সত্যেও দাঁড়িয়ে ছিলাম। কতদিন আর পালাবো? তারচেয়ে দেখি কী হয়। মহিষগুলো কী করে আমার কাছে এসে? আমাকে মেরে ফেলবে? ফেলুক! স্বপ্নে আবার মৃত্যু বলে কিছু আছে নাকি? মরলেও তো বেঁচে গেলাম! এতো ভয় নিয়ে অসহ্য সব স্বপ্ন দেখার চেয়ে স্বপ্নে মারা যাওয়াই ভাল না? আমি তাই পালিয়ে না গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। দেখলাম একটা খালি মাঠে আমি দাঁড়িয়ে আছি। চারদিক থেকে শত শত মহিষ আমাকে ঘিরে ধরছে। বৃত্তাকারে ঘিরে ধরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। প্রচণ্ড ভয় করতে লাগলো আমার। তবুও পালিয়ে না গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। বৃত্তটা আস্তে আস্তে ছোট হতে লাগলো। আমার ভয়ও বাড়তে লাগলো। তীব্র থেকে তীব্র হতে লাগলো। একদম কাছে চলে এলো মহিষগুলো। আমি প্রচণ্ড ভয়ে চোখ বন্ধ করে হাটু গেঁড়ে বসে পড়লাম মাটিতে। আমার ঘাড়ের ওপর ওদের নিঃশ্বাস টের পাচ্ছি। আমি জোরে চোখ বন্ধ করে রাখলাম। তারপর সময় স্তব্ধ হয়ে গেল। মহিষগুলো যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভয় দেখানোই ওদের কাজ ছিল। ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে বেড়ানোটাই ছিল ওদের দায়িত্ব। কিন্তু আমি তো আজ পালাইনি। এখন ওরা কী করবে? ওরা তাই দাঁড়িয়ে রইলো নিরীহ ভাবে। আমি ধীরে ধীরে চোখ খুললাম। আমার ভয় কেটে গেল। দেখলাম নিরীহ কয়েকটা প্রাণি আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে! আমার সাহস বাড়তে লাগলো। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিলাম এক দুইটা মহিষের মাথায়-মুখে-গলায়। ওরা চোখ বুজে আদুরে আওয়াজ করতে লাগলো। আমার হাত চেটে দিতে লাগলো কেউ কেউ। মহিষগুলোর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এরপর আমি আর কোন ভয়ের স্বপ্ন দেখিনি। এরপরেও আমি কখনও কখনও মহিষ দেখেছি। কিন্তু আমার আর ভয় করেনি। ওরা নিরীহ ভঙ্গিতে আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেছে। কুকুরের মত লেজ নাড়িয়েছে কেউ কেউ! এখন আর ওরা একদমই আসে না। আমি এখন এই স্বপ্নের জগতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মাঝে মাঝে উদ্ভ্রান্তের মত ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ানো আমার মত কিছু স্বপ্নবন্দিদের সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ওরা কোন কথা বলে না। মরা মানুষের মত চেয়ে থাকে কেবল। আমার মাঝে মাঝে এই স্বপ্ন থেকে বের হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। আমি এখন জানি কিভাবে বের হতে হবে। আমাকে কেউ বলে দেয়নি কিন্তু আমি ঠিক জানি! আমি অনেক ভেবে ভেবে এটা বের করেছি। অনেক যুক্তি-বুদ্ধি করেছি নিজের সাথে। অবশেষে আমি সিদ্ধান্তে এসেছি। স্বপ্নে বেঠিক কিছু নেই। স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়… আমি অনেক চিন্তা করে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়েছি। আমি ভেবে ভেবে বের করেছি যে কিভাবে আমি এই স্বপ্নের জগতে বন্ধি হলাম। আমি কোথায় ছিলাম এর আগে। আমার মনে পড়েছে আমি সেঁজুতির সাথে এক সন্ধ্যায় হাঁটছিলাম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে আমি এক সন্ধ্যায় আমাকে ও সেঁজুতিকে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে দেখেছি। সেদিনই আমার মনে পড়ে গেছে সব। আমি নীলক্ষেত এসেছিলাম কিছু বই-খাতা কিনতে। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। আমি সাদ্দামকে ফোন করেছি। ফোন ধরেছিল সেঁজুতি! তারপর… তারপর… তারপর…! তারপর থেকে স্বপ্নের মতই কেটে গেছে সব কিছু। তারপর থেকে আমি স্বপ্নবন্দি হয়ে গেছি। শেষবার সেঁজুতি আমার দিকে মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে ছিল। সে কি তবে জানতো সেটাই আমাদের শেষ দেখা? শেষ মুহূর্তে কি আমার প্রতি তার মায়া লেগেছিল? মায়া লেগেছিল আমাকে বন্ধি করে নিজেকে মুক্ত করতে? একটু কি অপরাধবোধ কাজ করছিল ওর? সেদিন নীলক্ষেতে সেঁজুতিকে আমি চিনতে পারিনি। অনেক ভেবে ভেবে পরে আমি ওকে চিনেছি। সেঁজুতি সাদ্দামের সেই হারিয়ে যাওয়া ফুফাতো বোনই ছিল। অনেক খোঁজ খবর নিয়েও যার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। ও কি তবে স্বপ্নের জগতে বন্ধি হয়ে গিয়েছিল? এতোদিন পর ও খুঁজে পেয়েছিল এ থেকে মুক্তির পথ? খুঁজে পেয়েছিল হঠাৎ একদিন আমাকে নিউমার্কেটে? আমাকে বন্ধক রেখে ও নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে? আমিও কি তাহলে কাউকে বন্ধক রেখে মুক্ত করবো নিজেকে? কাকে বন্ধি করবো? আমি কি পারবো? ৩. নিউ মার্কেটের ওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছি অনেক্ষণ ধরে। কেন দাঁড়িয়ে আছি ঠিক মনে করতে পারছি না। বোধহয় কারো অপেক্ষায় আছি। কিন্তু কার অপেক্ষায় আছি? হঠাৎ দেখতে পেলাম নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলোর সামনে দিয়ে বর্ষা হেঁটে যাচ্ছে। আমার কাছে মনে হলো আমি অনন্তকাল পর কোন পরিচিত মানুষের দেখা পেলাম। ওকে দেখে আমি ভীষণ খুশি হলাম। আমি কি তবে ওর অপেক্ষাতেই ছিলাম এতক্ষণ? হয়তো! কিন্তু ও জানবে কিভাবে যে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি? ওর সাথে কি আমার সেরকমই কথা হয়েছে? আমি নিশ্চিত হবার জন্য পকেট থেকে মোবাইল বের করলাম। খুঁজে খুঁজে বের করলাম ওর নাম্বার। ডায়াল করার ঠিক আগ মুহূর্তে মনে পড়লো- ওর এই নাম্বারটা অনেকদিন ধরে বন্ধ আছে। কী একটা রিলেশন সংক্রান্ত ঝামেলার জন্য মোবাইল ইউজ করাই ছেড়ে দিয়েছিল। মাঝে মাঝে ওর মায়ের নাম্বার থেকে ফোন দিতো… কিন্তু ওর মায়ের নাম্বারে ফোন ব্যাক করা নিষেধ ছিলো। কারণ ওটা সব সময় ওর কাছে থাকতো না। তাই ওর সাথে আমার কথা হতো কেবল তখনই যখন ও নিজে থেকে আমাকে ফোন দিত। শত চাইলেও ও নিজে থেকে যোগাযোগ না করলে ওর সাথে যোগাযোগের কোন উপায় ছিল না। এসব ভাবতে ভাবতেই আমি আনমনে ডায়াল করলাম ওর পুরনো নাম্বারটিতে। আশ্চর্য- রিং হচ্ছে! ও এখন ওভার ব্রিজের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। আমি ওভার ব্রিজের ওপর থেকেই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বর্ষা ওর ব্যাগ খুলে মোবাইল বের করছে। ভ্রু কুচকে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলো কয়েক সেকেন্ড। আরও দুইবার রিং হতেই ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকালো। তারপর বিষ্ময় আর প্রশ্নবোধক স্বরে বললঃ হ্যালো!? আমি এপাশ থেকে বললামঃ হ্যালো, বর্ষা! কেমন আছিস তুই? ও চোখ বড় বড় করে বললঃ স-ও-ফি-ই-ই-ক!!! তুই!?! সত্যি তুই কথা বলছিস?! এতোদিন পর কোত্থেকে??? আমি নির্লিপ্ত হেসে জবাব দিলামঃ ওভার ব্রিজের ওপর থেকে। – মানে?! – মানে তোর সামনে যে ওভার ব্রিজটা আছে- আমি তার ওপর দাঁড়িয়ে আছি। ও অবাক হয়ে ওপরে তাকালো। আমি হেসে হাত নাড়ালাম। ও বাচ্চা মেয়ের মত লাফিয়ে উঠে হাত নাড়িয়ে চিৎকার করে বললঃ ওখানে কী করছিস??? এতো জোরে বলল যে আমি মোবাইল ছাড়াই ওর কথা শোনা গেল। আশপাশের লোকজন প্রথমে ওর দিকে তারপর আমার দিকে ভ্রু কুচকে তাকালো। আমিও ফোন কানে রেখেই জোরে জোরে বললামঃ তোর জন্য অপেক্ষা করছি!!! আশপাশের পথচারীরা আবারও আমাদের দিকে তাকালো। বর্ষা আমাকে ইশারায় এখানে দাঁড়াতে বলে নিজেই ছুটে আসতে লাগলো। তারপর হয়তো খেয়াল হলো হাতে মোবাইল আছে! ছুটতে ছুটতে ওভার ব্রিজের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে হাপাতে হাপাতে বললঃ তুই দাঁড়া, আমি আসছি! এমন ভাবে বলল যেন ও না বললে আমি এক্ষুণি শূন্যে মিলিয়ে যাব! আমি হেসে ফেললাম ওর কথায়। – আচ্ছা আয়। আছি আমি…। বলে আমি লাইন কেটে মোবাইলটা পকেটে রেখে দিলাম। ওভার ব্রিজে উঠতে ওর ত্রিশ সেকেন্ডও লাগলো না। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো আমি অনন্তকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ব্রিজে উঠে ও এক রকম দৌড়ে এলো আমার কাছে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাফাতে হাফাতে চোখে-মুখে রাজ্যের বিষ্ময় নিয়ে বললঃ সত্যি তুই সফিক? আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। কোথায় ছিলি তুই এতোদিন? আমি কাব্যিক ঢং-এ বললামঃ “আমায় তুই প্রশ্ন করিস- কোথায় আমি ছিলাম? ছিলাম আমি কে তোর? ‘ইচ্ছে’ হয়ে ছিলাম আমি তোর মনেরই ভেতর!” ইন্সট্যান্ট বানানো, কিন্তু বলার পর মনে হলো কবিতাটা নকল। রবী ঠাকুর না কার যেন এরকম দুইটা লাইন আছে। কিন্তু বর্ষা সেসব খেয়াল করলো বলে মনে হলো না। আমার কাব্যের জন্যই হোক আর অন্য কোন কারণেই হোক হঠাৎ ও আমাকে আবেগে জড়িয়ে ধরলো! ওভার ব্রিজ দিয়ে পাড় হওয়া শত শত লোক হেঁটে যেতে যেতে অবাক হয়ে দেখলো গোধূলীর কনে দেখা আলোয় এক তরুণী এক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বোকা বনে যাওয়া যুবককে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে আছে। আমরা ভুলে গেলাম আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা অনন্তকাল ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমাদের সময় থেমে গেল… পৃথিবীর ঘড়িতে দশ সেকেন্ড অথচ আমার কাছে মনে হলো দশ লক্ষ আলোক বর্ষ পর বর্ষা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। অবশেষে বোধহয় ওর খেয়াল হলো যে ও নিউ মার্কেটের মত একটা ব্যস্ত-জনবহুল জায়গার ওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে এতক্ষণ আমাকে জড়িয়ে ধরে ছিল। আশপাশের উৎসুক জনতার কৌতূহলী চোখের দিকে তাকিয়ে ও আরো বিব্রত বোধ করলো। আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললঃ চল, অন্য কোথাও যাই। তোর সাথে এক সাগর কথা জমে আছে! আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম ও আমার ডান হাত ওর দু’হাতে জড়িয়ে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হলো ঠিক একইভাবে কেউ আমার হাত ধরেছিল অনন্তকাল আগে কোন একদিন! কে, কবে, কখন ধরেছিল ঠিক মনে করতে পারলাম না। শুধু মনে হলো এই অনুভূতিটা আমার খুব চেনা! বর্ষা আমার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে অভিমানি সুরে বললঃ সত্যি করে বলতো- কোথায় ছিলি তুই? তোকে আমি কত খুঁজেছি জানিস? কত লক্ষবার তোর মোবাইলে ফোন করেছি। প্রতিবারই বন্ধ পেয়েছি। কত শত ম্যাসেজ যে পাঠিয়েছি… সবগুলো সেন্ডিং ফেইল হয়েছে। হাজার হাজার মেইল করেছি তোর ইমেইলে। তোর ভাবির মোবাইলেও ফোন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নাম্বারটা আমি সেভ করে রাখিনি। শেষে অভিমান করে খোঁজাই বন্ধ করে দিয়েছি। ভেবেছিলাম তুই ইচ্ছে করেই আমাকে এভোয়েড করছিস। আমার এতো কিসের দায় পড়েছে! কিন্তু জানতাম তুই একদিন না একদিন ফোন করবিই… বলতে বলতে ওর গলা ধরে এলো। আমার মনে পড়লো একদা আমার প্রতি এই মেয়েটার অনেকখানি অনুরাগ ছিল। আমারও ছিল। কিন্তু সেটা ঠিক প্রেম ছিল না। অন্তত আমাদের সেরকমই ধারনা ছিল এবং আমরা সেরকমই স্বীকারক্তি দিতাম। আমরা খুব ভাল বন্ধু ছিলাম। প্রায়ই মজা করে বলতাম- চল বিয়ে করে ফেলি! দুষ্টুমী করতে করতে আমরা মুখে মুখে বিয়ে করে বাচ্চা-কাচ্চা বানিয়ে ফেলতাম। বাচ্চাগুলোর গায়ের রঙ কেমন হতে পারে সেটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতাম, ওদের নাম রাখতাম। বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করানো নিয়ে ঝগড়া পর্যন্ত করতাম! ওর খুব বিয়ে করে সংসার করার শখ ছিল। ছোট্ট একটা শিশুকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরার স্বপ্ন দেখতো খুব… আমি ওকে বললামঃ বিয়ে করেছিস? ও আমার হাত আরেকটু শক্ত করে ধরে বললঃ আজকেই করে ফেলব…! তারপর আমরা দুইজনেই হাসতে লাগলাম। বর্ষা আবারও জিজ্ঞেস করলোঃ কোথায় ছিলি তুই এতো দিন? আমি রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলাম। ও বললঃ থাক, তোকে বলতে হবে না। আচ্ছা, এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিলি? আমি কৌতুকের সুরে বললামঃ তোর জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম! – তাই না? – হুম… তাই। তুই কী জন্য এসেছিস? – এইতো, কিছু কেনাকাটা ছিল। – একা? – নাহ্‌, রাফি ছিল এতক্ষণ। মাত্রই ওকে বিদায় দিয়ে আমি বাসার দিকে যাচ্ছিলাম। ঈশ! রাফি তোকে দেখলে যে কী খুশি হতো! – কেন, তুই খুশি হোসনি? – হয়েছি মানে! আমার তো খুশিতে মরে যেতে ইচ্ছে করছে! আচ্ছা- লাচ্ছি খাবি? আমার হঠাৎ ভীষণ লাচ্ছির তেষ্টা পেল। মনে হলো আমি বহুকাল লাচ্ছি খাই না। অনেকদিন আগে ঠিক এভাবেই কেউ আমাকে লাচ্ছি খাওয়ার কথা বলেছিল। যদিও সেদিন কোন কারণে আমার লাচ্ছি খাওয়া হয়নি। কিন্তু কে, কবে, কখন আমাকে লাচ্ছি খাবার কথা বলেছিল মনে পড়ছে না। শুধু মনে হলো এই অনুভূতিটা আমার খুব চেনা…! বর্ষা আমার হাত জড়িয়ে হাঁটছে। ও প্রচুর কথা বলছে, প্রচুর প্রশ্ন করছে। কিন্তু কোন প্রশ্নেরই উত্তর জানার জন্য থামছে না। একাই বকে যাচ্ছে অনবরত! সত্যিই ওর এক সাগর কথা জমে আছে। শেষ হতে এক মহাকাল সময় লাগবে হয়তো… আমি ওকে থামালাম না। আমরা হাঁটতেই থাকলাম। আমরা ভুলে গেলাম যে আমাদের লাচ্ছি খাওয়ার কথা ছিল। আমি ভুলে গেলাম যে আমার ভীষণ লাচ্ছির তেষ্টা পেয়েছিল। হঠাৎ মাগরিবের আযান দিলো। বর্ষা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে ওড়না দিয়ে মাথা ঢাকতে ঢাকতে বললঃ এইরে! অনেক দেরি হয়ে গেল। আমি সেই কখন বের হয়েছি বাসা থেকে। ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাবে রে! বর্ষার এই মাথায় ওড়না দেয়া, এই বাসায় ফেরার তাগিদ আমার খুব চেনা মনে হলো। মনে হলো হুবহু একই ঘটনা আমার জীবনে আগেও একবার ঘটেছে। কিন্তু কবে, কখন, কার সাথে ঘটেছে ঠিক মনে করতে পারলাম না। শুধু মনে হলো এই অনুভূতিটা আমার খুব চেনা…! আমি হঠাৎ বললামঃ বর্ষা! চল বৃষ্টিতে ভিজি। বর্ষা অবাক হয়ে বললঃ বৃষ্টি! বৃষ্টি পেলি কোথায়? আমি বললামঃ তুই ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় নাম, তাহলেই বৃষ্টি নামবে। আমি চাইলেই যখন তখন বৃষ্টি নামাতে পারি। বর্ষা কী যেন ভাবলো। তারপর আকাশের দিকে তাকালো একবার। আকাশে মেঘ আছে, কিন্তু বৃষ্টির কোন লক্ষণ নেই। তবু কী মনে করে ফুটপাত থেকে রাস্তায় নেমে এলো। আর সাথে সাথেই হঠাৎ জোরে বাতাস দিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। বর্ষা অবাক হয়ে চমকে উঠলো। তারপর বাচ্চা মেয়ের মত খুশিতে লাফিয়ে হাত তালি দিয়ে উঠলো। আমি বললামঃ চল, জুতা খুলে খালি পায়ে হাঁটি। বর্ষা এক মুহূর্ত কী ভেবে সত্যি সত্যি জুতা খুলে হাতে নিল। অনেক কাল আগে আমি আর বর্ষা এক বুধবার দুপুরে চন্দ্রিমা উদ্যানে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম। সেদিনও আমরা জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে হেঁটেছিলাম। সেদিন আমরা হাঁটতে হাঁটতে সংসদ ভবনের সামনে দিয়ে আসাদগেটের দিকে চলে গিয়েছিলাম। সংসদ ভবনের সামনের রাস্তার কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো আমাদের সাথে চুটিয়ে ভিজেছিল। সেদিন আমাদের সময় থেমে গিয়েছিল। কৃষ্ণচূড়ার আগুন লাগা ফুলগুলো অবাক হয়ে আমাদের বৃষ্টি বিলাস দেখছিল। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সেদিন আমি হাঁটতে হাঁটতে ওকে মোহাম্মদপুরে একেবারে ওর বাসার সামনে পৌছে দিয়েছিলাম। সেদিনই আমি প্রথম খেয়াল করেছিলাম চশমা খুললে বর্ষার চোখগুলো অনেক সুন্দর দেখায়! আমরা ঠিক সেদিনের মত তন্ময় হয়ে হাঁটতে লাগলাম। রাস্তার দু’পাশে লোকজন দ্রুত কমে যেতে লাগলো। চারদিক অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ঝুম বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে পথ ঘাট। স্ট্রিট ল্যাম্পের হলুদ বাতিগুলো আঁধার ছড়াচ্ছিল রাস্তাময়। আলো আঁধারির সেই মায়ায় হেঁটে যেতে যেতে কিংবা ভেসে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হলো- ঠিক এমনিভাবে কোন একদিন আমি এই পথে আগেও হেঁটেছি অন্য কারো সাথে। কিন্তু কবে, কখন, কার সাথে হেঁটেছি ঠিক মনে করতে পারলাম না। শুধু মনে হলো এই অনুভূতিটা আমার খুব চেনা…! হটাৎ বর্ষা বললঃ আমরা কোথায় যাচ্ছি? এটা কোন জায়গা? নিউ মার্কেট এলাকা এমন লাগছে কেন? আমি বললামঃ আমরা এখন নিউ মার্কেট না, অলরেডি ঢাকা ভার্সিটি ক্রস করছি। সামনেই রাজু ভাষ্কর্য! বর্ষা অবাক হলো। – কিন্তু আমরা এদিকে কেন যাচ্ছি? আমাদের তো নিউ মার্কেট থেকে বাসে ওঠা উচিৎ ছিল! আমি বললামঃ হুম… তা ঠিক; কিন্তু কী আর করা? এতো দূর যখন এসেই পড়েছি তখন একবারে শাহ্‌বাগ থেকেই গাড়িতে উঠি। বর্ষা চুপ মেরে গেল। ভ্রু কুচকে আশপাশটা দেখে নিয়ে বললঃ আশপাশটা একটু বেশিই নিরব লাগছে না? একটা রিক্সা পর্যন্ত নেই কোথাও! আমি বললামঃ কেন? তোর কি আমার সাথে ভিজতে খারাপ লাগছে? রিক্সা পেলেই কি লাফ দিয়ে উঠে পড়বি? – আরে নাহ্‌! সেসব কিছু না। সব কেমন যেন লাগছে… একটু ভয় ভয় করছে আমার! – তুই চশমা খুলে হাট, তাহলে আর দুনিয়ার এতোসব হাবিজাবি চোখে পড়বে না; ভয়ও লাগবে না। বর্ষা সত্যি সত্যি চশমা খুলে ফেলল। তারপর বললঃ সফিক! আমার সত্যি একটু ভয় লাগছে… আমি তোর হাতটা ধরি? বলতে বলতে সত্যি সত্যি ও আমার ডান হাত ওর দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো। তারপর আমার শরীরের সাথে লেপ্টে থেকে হাঁটতে লাগলো। বর্ষা আমাকে আগে কখনও হাত ধরতে দিতে চাইতো না। ওর নাকি অস্বস্তি লাগতো! এমন না যে ও কাউকেই ওর হাত ধরতে দিতো না। রাফি-অর্ক ওরা অহরহই ধরতো… কিন্তু আমার বেলায় যত অস্বস্তি! কিন্তু আজ ও বার বার নিজে থেকেই আমার হাত ধরছে। কেন কে জানে! আমি স্বপ্নের মতই হাঁটতে লাগলাম ওর সাথে নিরন্তর। আমার সময় থেমে গেল, ঘড়িটা অন্ধ হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর আমি নিজেদের আবিষ্কার করলাম বাংলা একাডেমীর সামনে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের কাছে ৩/৪জন পুলিশ রেইনকোট গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমাদের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে কিনা ঠিক বোঝা গেল না। এখনও বৃষ্টি হচ্ছে… তবে আগের মত জোরালো না। টিপ টিপ করে ফোঁটা পড়ছে। সব কিছু আগের তুলনায় একটু স্পষ্ট। রাস্তায় এক-দুইজন মানুষও দেখা যাচ্ছে এখন। ছাতা মাথায় দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে তারা। আমার ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠলো! মনে হলো এই ঘটনাগুলো আমার জীবনে আগেও একবার ঘটেছে… ঠিক এমনিভাবে কোন একদিন আমি এই পথে আগেও হেঁটেছি অন্য কারো সাথে। কিন্তু কবে, কখন, কার সাথে হেঁটেছি ঠিক মনে করতে পারলাম না। শুধু মনে হলো এই অনুভূতিটা আমার খুব চেনা…! বর্ষা একবার বললঃ আমার বাসায় যাওয়া দরকার। আম্মু এবার চিন্তায় হার্ট এটাক করবে… পরক্ষণেই বললঃ কিন্তু বাসায় যেতে ইচ্ছা করছে না। মন চাচ্ছে আজ সারা রাত হাঁটি! বর্ষাটা একদম বদলায়নি। আগেও প্রতিবার ও এই একই রকম কথা বলতো। আমি বললামঃ চল, আজ সারা রাত হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে এই শহরের গলিঘুপচিতে হারিয়ে যাই চল! বর্ষা বললঃ না থাক- মা বকবে! তারপর হাসতে লাগলো। আমি বললামঃ বাসায় একটা ফোন করে দে, বল একটু দেরি হবে ফিরতে। – ফোন তো সেই কখনই দিতাম। আমারও দেয়া লাগতো না, আম্মুই ফোন দিয়ে পাগল করে ফেলতো। কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে আমার মোবাইল বন্ধ হয়ে গেছে। এজন্যই টেনশন হচ্ছে- আম্মু ফোন বন্ধ পেয়ে… – চিন্তা করিস না। আমি তোকে ঠিক বাসায় পৌছে দেব। আন্টিও তেমন টেনশন করবে না। বুঝবে যে বৃষ্টিতে আটকা পড়ে গেছিস কোথাও। বললাম বটে, কিন্তু আমি জানি আমি ওকে বাসায় পৌছে দেব না। কোন এক অজানা শক্তি আমাকে সদর ঘাটের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে ওকেও। আমি এও জানি ওর এখন নিজের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ও একটা ঘোরের মধ্যে আছে। আমি ওকে যেখানে নিয়ে যাব সেখানেই ও যাবে। কিন্তু আমি ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? কেন নিয়ে যাচ্ছি? আমি জানি না। সত্যি কিছু জানি না। কোন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে… আমার কোন সাধ্য নেই এথেকে বের হবার। কী সেই শক্তি? কে জানে! ওটা হয়তো আমার নিজের “ইচ্ছা শক্তি”! নগর ভবনের সামনে দিয়ে যাবার সময় বর্ষা বললঃ তোর ঘড়িতে দেখতো- কয়টা বাজে? আমি হেসে বললামঃ আমার সময় থেমে গেছে। ঘড়িতে কিছু বাজে না। বর্ষা ভ্রু কুচকে বললঃ ঘড়িটা নষ্ট না হয়ে গিয়ে থাকলে এখন রাত সাড়ে নয়টা বাজে! আমি কোন কথা বললাম না। আমি জানি নগর ভবনের ঘড়িটা কখনও নষ্ট থাকে না। ওটায় সত্যি সত্যি সাড়ে নয়টাই বাজে। অনন্তকাল আগেও একবার ওটাতে সাড়ে নয়টাই বেজেছিল। ঐ ঘড়িটারও সময় থেমে গেছে। পৃথিবী কি নগর ভবনের সামনে এসে ঠিক এই সাড়ে নয়টাতেই আঁটকে গেছে? বর্ষা একবার মিন মিন করে বললঃ সফিক! আমরা যাচ্ছি কোথায়? আমি বললামঃ জাহান্নামে। আমার সাথে জাহান্নামে যেতে কোন আপত্তি আছে? – না, নেই। কিন্তু এতো জায়গা থাকতে জাহান্নামেই কেন যেতে হবে সেটা বুঝতেছি না! – এখানে কত জ্যাম দেখেছিস! এখান থেকে তুই বাসে উঠতে পারবি? সদরঘাট থেকে সব রুটের বাস ছাড়ে। তোকে গাবতলীর বাসে তুলে দেব, তুই আসাদগেট নেমে যাবি। ঠিক আছে? বর্ষা বাধ্য মেয়ের মত ঘাড় কাত করলো। ঠিক আছে। স্বপ্নে বেটিক কিছু নেই। স্বপ্নে যা ঘটে সবই সঠিক। স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়। ফুলবাড়িয়া পাড় হবার সময় বর্ষা আবার মিন মিন করলো- ক্ষুধা লাগছেরে! আমি হেসে বললামঃ আমার কাছে খাবার কিছু নেই! – না মানে, কিছু খেয়ে নিই? – এখানে কোথায় কী খাবি? কোন দোকান-পাটই তো খোলা নেই! বর্ষা চারদিকে তাকিয়ে দেখলো আসলেই তাই। গুলিস্তানের মত জায়গায় তেমন কোন খাবারের দোকানই আজ খোলা নেই। সব বন্ধ! আমি ওর হাত ধরে বললামঃ চল সদর ঘাট চলে যাই। ওখানে সারা রাত খাবারের দোকান খোলা থাকে। গুলিস্তান থেকে আমরা যতই সদরঘাটের দিকে এগুতে থাকলাম ততই যেন স্বপ্নের দৃশ্যপট পালটে যেতে থাকলো। আমরা যেন আস্তে আস্তে একটা গ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। সদরঘাট হওয়ার কথা একটা গিঞ্জি এলাকা। প্রতি নিয়ত লঞ্চের সাইরেন, বোটের শ্যালো ইঞ্জিনের ভট-ভট শব্দ কানে আসার কথা। অথচ হচ্ছে তার উল্টোটা! চারদিক যেন আরো নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। চারপাশে আর কোন কৃত্তিম আলো নেই। না কোন ল্যাম্প পোস্ট না কোন দোকানের আলো। আমরা একটা কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। মাথার ওপর আকাশের মেঘ সরে গেছে। কৃষ্ণপক্ষের এক ফালি চাঁদ ডিম লাইটের মত মায়াবী ভূতুড়ে আলো ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। আমরা একটা নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নদীর জলে চাঁদের আলোতে আবছায়া প্রতিবিম্ব। ওপাড় দেখা যাচ্ছে না; চাঁদের আলো ছাড়া আর কোন আলো নেই কোথাও! বর্ষা এতো কিছু স্পষ্ট দেখছে কিনা জানি না। দেখার কথা না। ওর চশমা ওনেক আগেই খুলে ব্যাগে রেখেছিল। ওর ব্যাগটা যে অনেক্ষণ ধরে ওর সাথে নেই সেটা ওর খেয়াল করার কথা না। শুধু ভয়ার্ত স্বরে একবার বললঃ সফিক! এটা কোন জায়গা? কী নদী এটা? – এটা বুড়িগঙ্গা নদীই। আমরা সদর ঘাটের পেছনের পাশে আছি। কেন ভয় করছে? এইতো আমি! নে আমার হাত ধর… হাত ধরে ধরে হাঁট। বর্ষা কাঁপা কাঁপা হাতে শক্ত করে আমার হাত ধরলো। আমরা এখন নদীর পাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে একটা পায়ে হাঁটা সরু রাস্তা সোজা নেমে গিয়ে নদীর পাড় ঘেঁষে ডান দিকে চলে গেছে। রাস্তার পাশে হাতের ডানে একটা গীর্জা। গীর্জার পাশেই নদীর তীর ঘেঁষে শত শত ক্রুশ মাটিতে গাঁথা। ওগুলো খৃস্টানদের কবর। নদীর পাড় ঘেঁষে পায়ে হাঁটা সরু রাস্তা দিয়ে আমি ওর হাত ধরে নিয়ে চললাম। বর্ষার মনে হয় না ভয় কেটেছে। তবু একটু হেসে বললঃ জানিস সফিক! আমি ঠিক এরকম একটা দৃশ্য অনেক দিন কল্পনায়-স্বপ্ন দেখেছি! ঠিক এরকম একটা নদী। এরকম আধো আলো-আঁধারি চাঁদের একটা রাত। আমি কারো হাত ধরে হাঁটছি। স্বপ্নে আমি এতোদিন কারো চেহারা দেখতে পেতাম না। এখনও অবশ্য তোর চেহারা দেখতে পাচ্ছি না! বলেই ও লাজুক হাসলো। কিছুটা সামনে গিয়ে গীর্জাটা পার হয়ে একটু মোড় ঘুরতেই দূরে কিছু লোকজন দেখা গেল। চাঁদের আলোতে আবছায়া কিছু বাসের অবয়বও চোখে পড়লো। একপাশে ক্ষীণ মোমের আলোতে একটা হোটেল গোছের কিছু একটা। সেখানে কিছু লোকজন বসে নিচু স্বরে কথা বলছে। একটা বাসের ভেতর ছোট একটা বাল্ব টিমটিমে আলো ছড়াচ্ছে। বাসের ভেতর ৪/৫জন যাত্রিও দেখা গেল। এই বাসটাই বোধহয় আগে ছাড়বে। কিন্তু ড্রাইভার বা হেল্পার কাউকে দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে বাস ছাড়তে দেরি হবে। চারদিকে অস্বাভাবিক নীরবতা। শুধু চাঁদের আলো চুইয়ে পড়া নদীর কালো পানি বাতাসে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করে পাড়ে আছড়ে পড়ছে। নদীতে সামান্য ঢেউ আছে। সেই ঢেউয়ে বিশাল এক ফেরির মত দেখতে ভাসন্ত বাস স্ট্যান্ডটা অদ্ভুতভাবে দুলছে। বর্ষা বললঃ খুব ক্ষুধা লেগেছে। – বাস ছাড়তে দেরি হবে মনে হচ্ছে; চল কিছু খেয়ে নিই। আমরা হোটেলটার দিকে হাঁটতে লাগলাম। এতো বড় বাস স্ট্যান্ড অথচ সর্বসাকুল্যে ৬/৭টা বাস দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। আশে পাশে ইতস্তত কিছু মানুষ বসে আছে। তাদের কারো কারো চেহারা উদ্ভ্রান্তের মত। উদাস শূন্য দৃষ্টিতে মরা মাছের চোখের মত নিষ্প্রাণ তাকিয়ে আছে তারা। কেউ কেউ আবার আমাদের দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকাচ্ছে। তাদের অদ্ভুত দৃষ্টি পার করে আমরা ঐ ছোট খাবারের দোকানটার দিকে এগিয়ে গেলাম। খাবারের দোকান মানে বাসস্ট্যান্ডের খাবার হোটেলগুলো যেমন হয় আরকি! একটা বড় টেবিল। তার চারপাশে তিনটা ছোট ছোট কাঠের বেঞ্চি পাতা। একপাশে কিচেন। সেখানে লুঙ্গি-স্যান্ডো গেঞ্জি পরা কালো মত একটা লোক ডেকচির মধ্যে কী যেন ঘটাং ঘটাং করছে। আমাদের দেখে চোখে মুখে খুশির ঝিলিক নিয়ে সে এগিয়ে এলো। – কী খাবেন মামা? বসেন। আমি বললামঃ যা আছে দেন। – ভাত আছে; ভাত দেই? সাথে ভর্তা-ভাজি-ডাইল… – দেন, ভাত-ভর্তা-ভাজি যা আছে দেন। লোকটা অতি উৎসাহী ভঙ্গিতে খাবার আনতে গেল। এবং ফিরে এলো অস্বাভাবিক দ্রুততায়! খাবার আসতে দেখি ভাত-সবজি সব ঠান্ডা। দোকানী হেসে অজুহাতের ভঙ্গিতে বললঃ বৃষ্টির দিন, সব ঠান্ডা অইয়া গেছে। তার উপ্রে নদীর পাড়… আমি ভর্তা-ভাজির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকালাম। সব কেমন বাসি বাসি লাগছে দেখতে। দোকানী যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বললঃ সব টাটকা জিনিস। মুখে দিলেই টের পাইবেন… আমি অল্প একটু ভর্তা নিয়ে ভাত মেখে মুখে দিলাম। প্রচণ্ড ক্ষুধার কারণেই কিনা জানি না, খুব মজা লাগলো। বেশ সুন্দর একটা ঘ্রাণ! কিসের ঘ্রাণ এটা? ঘি নাকি? বর্ষাকে বললামঃ নে খা! খেতে ভালই… এরচেয়ে ভাল কিছু এখানে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। বর্ষা চুপচাপ ভাত মেখে খেতে লাগলো। খেতে খেতে আমি আবেশিত হয়ে গেলাম। প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে আমার। আমার মনে হলো এই ঘটনাগুলো আমার জীবনে আগেও একবার ঘটেছে… এই স্বাদ, এই আবেশ, এই সব কিছু আমার খুব চেনা…! ঠিক এখানেই আমি আগেও ভাত খেয়েছি অন্য কারো সাথে। কিন্তু কবে, কখন, কার সাথে খেয়েছি ঠিক মনে করতে পারলাম না। আমি প্রচণ্ড ভাবে মনে করতে চাইলাম… আমার কিচ্ছু মনে পড়লো না। আমার চিন্তা আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে, প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে…। আমি দোকানীর দিকে তাকালাম দোকানীটাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার খাওয়া দেখছে। তার চোখে কেমন একটা লোভাতুর দৃষ্টি! অদ্ভুত লোভি চোখে সে আমাদের দেখছে। ওমন করে কী দেখে সে? বর্ষার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঘুমে ওর চোখ ছোট হয়ে আসছে। ঠিক তক্ষুণি আমার মনে হলো ঘুমানো যাবে না। কিছুতেই ঘুমানো যাবে না। ঘুমালেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমি জানি না কেন, কিন্তু কিছুতেই ঘুমানো যাবে না। এই ঘুম অশুভ-অশরীরির প্রতিক। এই ঘুম সর্বনাশা। আমি বর্ষাকে ঝাঁকুনি ছিলাম ও প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি ওকে জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে ডেকে তুলে বললামঃ বর্ষা ভাগ! পালা এখান থেকে…! আমার কথার মাথামুন্ডু ও কিছুই বুঝলো না। কিন্তু দোকানীর মুখ শক্ত হয়ে গেল। আমাকে চমকে দিয়ে হঠাৎ গীর্জার ঘণ্টাটা বেজে উঠলো ঢং ঢং ঢং। ঠিক তক্ষুণি হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে গেল আমার! আমি বর্ষার হাত ধরে টেনে তুলে দৌড়াতে লাগলাম। প্রচণ্ড ঘুমে আমিও আচ্ছন্ন। পা ফেলছি মাতালের মত। আমার পেছনে বর্ষাও মাতালের মত টলতে টলতে এগুচ্ছে। আরো পেছনে দোকানীটাও আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আশপাশের উদ্ভ্রান্তের মত বসে থাকা মানুষগুলোও আমাদের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে…! গীর্জার ঘণ্টাটা তখনও বেজে চলছে। যেন একটা অশরীরি কণ্ঠ ঘণ্টার সুরে বলছে- পালাও! পালাও!! পালাও!!! আমি ছোটার চেষ্টা করলাম। বর্ষা হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ব্যথা পেয়ে বললঃ উহ! সফিক দাঁড়া! এই সফিক… এই! আমি ওর দিকে ফিরে না তাকিয়ে ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে যেতে ভাসন্ত প্ল্যাট ফর্মের একদম শেষ প্রান্তে চলে গেলাম। বর্ষা তখনও ভাঙ্গা টেপের মত বলে চলছে- এই… সফিক… এই! আমি ওকে নিয়ে নদীতে ঝাপ দিলাম। কিন্তু সাঁতরানোর শক্তিটুকু শরীরে অবশিষ্ট ছিল না। আমি নদীর শীতল পানিতে বর্ষার হাত ধরে তলিয়ে যেতে লাগলাম। আমার কানে আসতে লাগলো বাতাসে ঢেউ খেলে যাওয়া নদীর পানির ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ! আর সেই আওয়াজ ছাপিয়েও বহুদূর থেকে বর্ষা ডেকে চলেছে- এই… এই যে… এই! *** *** *** *** *** আমার ঘুম ভাংগলো কন্ট্রাক্টরের ঝাকুনিতে। একটু ঝাঁঝের সাথেই কন্ট্রাক্টর বললঃ এই… এই যে মামা… এই! বাপরে! কট্‌ঠিন ঘুম দিছেন তো! কখন থিকা ডাকতেছি। ভাড়া দেন… এয়ার পোর্ট চইলা আসছেন; সামনেই উত্তরা! আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। এটা এয়ারপোর্ট?! সব কিছু কেমন অন্য রকম লাগছে। ঘুম থেকে ওঠার জন্যই হয়তো। আসলেই কঠিন ঘুম দিয়েছি। কী সব হাবিজাবি স্বপ্ন দেখছিলাম যেন! আমি মানিব্যাগ থেকে ভাংতি পনেরো টাকা বের করে দিলাম। কন্ট্রাক্টর বিরক্ত হয়ে বললঃ কত ভাড়া দেন? নিউ মার্কেট থিকা উত্তরা পঁচিশ ট্যাকা ভাড়া! আমি বললামঃ স্টুডেন্ট! – ইস্টুডেন্টরাও বিশ ট্যাকা দেয়। – আমি পনেরো টাকাই দেই। – এখনও স্টুডেন্ট বলেন মামা… দেখি কার্ডটা দেখান তো! আমি আবার মানিব্যাগ বের করলাম। কার্ড বের করে ওর হাতে দিলাম। কন্ট্রাক্টর ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখে বললঃ পাশ কইরা বাইর হইছেন কতদিন? কার্ডের তো মেয়াদই নাই! আমি অবাক হয়ে কার্ডটা হাতে নিয়ে দেখলাম। মেয়াদ দেয়া আছে ডিসেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত। ঠিকই তো আছে! সমস্যা কী? কন্ট্রাক্টর গজগজ করতে করতে চলে গেল। তিন বছর আগের কার্ড দেখাইয়া বলে ইস্টুডেন্ট… যত্তোসব ফালতু পাবলিক আইসা উঠে বাসের মইদ্দে…! আমি ওর কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। কম ভাড়া পেয়ে উল্টা পাল্টা বকলো কিনা কে জানে! কয়টা বাজে এখন? সময় দেখার জন্য পকেট থেকে মোবাইল বের করলাম। মোবাইল বন্ধ হয়ে আছে! সুইচ অন করে দেখি টাইম রিসেট হয়ে গেছে। লাস্ট ডায়াল নাম্বারে টাইম দেখে সময় আন্দাজ করার জন্য কল লগ বের করলাম। দেখি লাস্ট তিনটা ডায়াল নাম্বারের ডিটেইলস হচ্ছে- Barsha: 27-08-2017 5:17pm Sunday Saddam bl-2: 22-05-2014 6:12pm Thursday Saddam: 22-05-2014 6:11pm Thursday যদিও বাসের হেল্পার হাউজবিল্ডিং-মাসকট-নর্থটাওয়ার বলে চিৎকার করছিল তথাপি আমি স্তব্ধ হয়ে বসে তাকিয়ে থাকলাম মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে। আমার লাস্ট ডায়াল নাম্বারটা ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে আর তার আগেরটা ২০১৪ সালের মে… মাঝখানের ৩ বছর কোথায় ছিলাম আমি!!! ———- ০ ———- -সফিক এহসান (২২ মে ২০১৪) [পুনশ্চঃ স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়!] উৎসর্গঃ সানজিদা চৌধুরী কান্তা। সত্যি সাঞ্জু, তুই বার বার ঠেলা ধাক্কা না দিলে এই গল্প আদৌ কোনদিন আলোর মুখ দেখতো কিনা কে জানে!

You may also like...

  1. চাতক বলছেনঃ

    ওবুক কত বড় গল্প! শুরু করেও শেষ করা হয় নি। ব্লগে এতো বড় গল্প পড়ার লোক আছে নাকি? সম্পূর্ণ পড়ার ইচ্ছা আছে, ভালই আগাচ্ছিলেন শুরুতে

  2. এমন চমৎকার লেখার কোন মন্তব্য নাই !!!!!!!!!!!!!!!!!
    চিৎকার করে করে তো ব্লগের উন্নতি করা যায় না !? পাঠকদেরও আগ্রহ থাকতে হয়।
    যা হোক আপনার গল্পটি খুবই ভাল লেগেছে। acquistare viagra in internet

    buy kamagra oral jelly paypal uk
  3. অংকুর বলছেনঃ

    আমি এক পর্যন্ত পড়লাম। হাফসে গেছি :-(

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

irbesartan hydrochlorothiazide 150 mg

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

metformin synthesis wikipedia
half a viagra didnt work
zoloft birth defects 2013