কিছু অসমসাহসী বাঙ্গালী আর এক অদ্ভুত পাগলের গল্প…

517

বার পঠিত

n l

ছেলেটা খুব অবাক হত। খুব ছোটবেলার থেকেই, যখন থেকে ক্রিকেট নামের খেলাটা সে বুঝতে শিখেছে, তখন থেকেই সে দেখে আসছে, তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, কাজিন কিংবা মহল্লার বড়ভাইয়েরা সবাই ক্রিকেট খেলার প্রসঙ্গ উঠলেই কেন যেন ভারত কিংবা পাকিস্তানকে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। কোন দল সেরা তা নিয়ে যুক্তি-পাল্টাযুক্তিতে মারামারি লেগে যাবার উপক্রম হয়। ছেলেটা যতদূর জানে তাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তান নয়। সুতরাং বাংলাদেশের কথা কেউ না বলে কেন অন্যদেশ নিয়ে এতো আলোচনা-সমালোচনা, সেটা তার ৬-৭ বছর বয়সী ব্রেনে ঢুকত না। বিশেষ করে ভারত আর পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের নিয়ে এতো উৎসাহ আর মাতামাতি দেখে তার মনে হত তাদের কি এরকম কোন খেলোয়াড় নেই যাদের নিয়ে এভাবে উন্মাদনা দেখানো যায়। অনেক চেষ্টাচরিত্র করে শেষপর্যন্ত একদিন সে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের কিছু ক্রিকেটারের সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জেনে ফেলল। সে জানতে পারল ৪ বছর পরপর বিশ্বকাপ নামে একটা টুর্নামেন্ট হয় এবং ভারত-পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়াসহ হাতে গোনা কয়েকটা দেশ তাতে অংশ নেয়। আর সেই বিশ্বকাপে প্রত্যেকবার নতুন কিছু দল সুযোগ পায়। নতুন দলগুলোকে আইসিসি ট্রফি নামে আরেকটা টুর্নামেন্ট খেলতে হয়। ওইখানে যারা যেতে , তারাই মূল বিশ্বকাপে সুযোগ পায়। বাংলাদেশ প্রতিবছর অনেক ভালো খেলেও শেষপর্যন্ত আর জিততে পারেনা।এরমধ্যে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ অল্পের জন্য কেনিয়ার কাছে হেরে গিয়ে আর ফাইনালে যেতে পারেনি। কথাগুলো জেনে তার খুব কান্না পেলেও একইসাথে নিজের অজান্তেই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি তার ভালোবাসা যে হিমালয় ছাড়িয়ে গেলো, সেটা সে মোটেও টের পেল না। টের পেল ১২ই এপ্রিল,১৯৯৭ সাল।

994660_1415995738632805_1160259989_n

আর্জেন্টিনাকে প্রথম ম্যাচে হারিয়ে শুভসূচনা করা বাংলাদেশ এরপর একে একে পশ্চিম আফ্রিকা, ডেনমার্ক আর আরব আমিরাত ও স্বাগতিক মালয়েশিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ চলে এল কোয়াটার ফাইনালে। প্রথম ম্যাচে হংকংকে হারিয়ে মহাকাব্য রচনার পথে থাকা বাংলাদেশ ২য় ম্যাচে পড়ল এক অদ্ভুতুড়ে বাধার সামনে। আয়ারল্যান্ডকে মাত্র ১২৯ রানে বেঁধে রেখে ব্যাটিং করতে নেমে যখন বাংলাদেশের রান ৬ ওভারে ২৪, তখন বৃষ্টি শুরু হল। বাংলাদেশের নতুন টার্গেট দাঁড়াল ২০ ওভারে ৬৬ রান। যেহেতু আয়ারল্যান্ড হল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে যাওয়ার পথে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে, সুতরাং তারা মাঠ খেলার অনূপযুক্ত,এই অভিযোগে খেলতে অস্বীকৃতি জানাল। মাঠকর্মীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের কোচ গরডন গ্রিনিজ আর খেলোয়াড়েরা নেমে পড়লেন তোয়ালে নিয়ে মাঠ শুকোতে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। পরের ম্যাচ হল্যান্ডের সাথে। জিতলে সেমিফাইনাল, হারলে বাদ। হল্যান্ডকে ১৭১ রানে আটকে রেখে যখন ব্যাটিংয়ে নামলো বাঙলাদেশ, তখন ২২ গজ উইকেট যেন মৃত্যুকূপে পরিনত হয়েছে। ৮ ওভার শেষে বাংলাদেশ ১৫/৪ আবারও আশাভঙ্গের আশঙ্কায় আর উত্তেন্যায় কাঁপতে থাকা বাংলাদেশ এক মজার নাটক দেখতে পেল। হঠাৎ করে আসা এ প্রচণ্ড বৃষ্টিতে মাঠ থকথকে কাদায় ভেসে গেলেও বাংলাদেশের জন্য নতুন টার্গেট সেট করা হল। মাঠ খেলার অনুপযোগী ,বাংলাদেশের এই আপত্তি আম্পায়াররা শুনতে চাইলেন না। ৩৩ ওভারে ১৪১ রানের নতুন টার্গেটে খেলতে নামতেই হল বাংলাদেশকে। খালেদ মাসুদ পাইলট প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ, আমার প্রিয় কাওকে তুলে নাও, কিন্তু আজ বাংলাদেশকে জিতিয়ে দাও। ১২ কোটি মানুষের হৃদয়ের বিনীত প্রার্থনার শক্তি স্রষ্টা আকরাম খানের ব্যাটে পৌঁছে দিলেন। হার্ডহিটার আকরামের ব্যাট থেকে ৯২ বলে আসা ৬৮ রান বাংলাদেশকে এক অভাবিত জয় এনে দিল, নিয়ে গেলো সেমিফাইনালে। এটা যে কত বড় এক অর্জন ছিল তা যারা তখন রেডিওতে খেলার ধারাবিবরণী না শুনেছে, তারা বুঝতে পারবে না। এই নিয়ে একজন ব্লগারের স্মৃতিচারন তুলে ধরা হল,

“”এই খেলা শুরু হওয়ার আগে আয়ারল্যান্ডের পয়েন্ট ছিল ৫, বাংলাদেশের ৩ আর হল্যান্ডের ১ আয়ারল্যান্ড ততক্ষনে সেমিফাইনালে উঠে গিয়েছিল। তাই বাংলাদেশ আর হল্যান্ডের মাঝে যে জিতবে সে-ই যাবে সেমিফাইনালে, হল্যান্ড জিতলে দুইদলের পয়েন্ট হবে সমান কিন্তু হেড টু হেডে বাংলাদেশ বাদ পরে যেত। ১৫ রানে ৪ উইকেট পড়ার পরে আকরাম খান আর নান্নু ক্রিজে ছিল, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল, যেহেতু ম্যাচ পরিত্যাক্ত হলে বাংলাদেশের পয়েন্ট হবে ৪ আর হল্যান্ডের ২, তাই বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠে যেত। তাই আকরাম আর নান্নু নানা ধরনের টালবাহানা করছিল, যেমন – ওভারের মাঝখানে হেলমেট চাওয়া, গ্লাভস বদলানো, পানি খাওয়া ইত্যাদি। আকরাম আম্পায়ারকে বলেছিল, যে বৃষ্টির কারনে বল দেখতে অসুবিধা হচ্ছে, কিন্তু আম্পায়ার তাও খেলা চালিয়ে যাচ্ছিল। আকরাম আর নান্নু অনেক স্লো খেলে উইকেট ধরে রাখছিল যেন D\L মেথডে এগিয়ে থাকা যায়, কিন্তু বৃষ্টির কারনে আম্পায়ার ঐদিনের খেলা বন্ধ ঘোষনা করার কিছুক্ষন আগে নান্নু রানআউট হয়ে যায়। খেলা বন্ধ হওয়ার পর খেলোয়াড়, সাংবাদিক, দর্শক সবাই ভেবেছিল বৃষ্টির কারনে খেলা পরিত্যক্ত হলে বাংলাদেশ ১ পয়েন্ট পেয়ে সেমিফাইনালে উঠে যাবে, কেউ তখনও খেয়াল করেনি যে D\L মেথডে খেলার ফল নির্ধারনের জন্যে প্রয়োজনীয় ওভার ততক্ষনে খেলা হয়ে গিয়েছে এবং আর খেলা না হলে D\L মেথডে বাংলাদেশ হেরে যাবে। তাই সবাই রাতভর প্রার্থনা করেছিল যেন পরদিন আর খেলা না হয় কারন উইকেটে আকরাম খান ছাড়া আর কোন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান ছিল না। পরদিন সকালে বৃষ্টি দেখে যখন সবাই খুশি তখনই আম্পায়ার দুঃসংবাদটা দেন। আর তাই যারা এতক্ষন বৃষ্টি হওয়ার প্রার্থনা করছিল তারাই তখন বৃষ্টি থামার জন্যে প্রার্থনা শুরু করে দিল, শুরু হয় উৎকণ্ঠার প্রতিটি মূহুর্ত। বাংলাদেশের ক্রিকেট ভবিষ্যৎটাই তখন হুমকির মুখে। সবাই তখন ১৯৯৪ সালের দুর্ভাগ্যের কথা মনে করছিল। সেদিন ছিল শুক্রবার, মালয়েশিয়ার বাংলাদেশী শ্রমিকরা কাজ ফাঁকি দিয়ে স্টেডিয়ামে এসেছিল আর প্রার্থনা করছিল, অবশেষে বৃষ্টি থামল আর বাংলাদেশের নতুন টার্গেট ঠিক হল ৩৩ ওভারে ১৪১ তারপর আকরামের সাথে সাইফুল ইসলামের সেই শ্বাসরুদ্ধকর পার্টনারশীপ এবং বাংলাদেশের জয়। সবাই কেঁদেছিল সেদিন – খেলোয়াড়, কোচ, সাংবাদিক, সমর্থক, সংগঠক সবাই। এই জয়ের গুরুত্ব বা জয়ের অনুভূতি প্রকাশ করার ভাষা সবচেয়ে ভাল লিখা হয়েছিল ক্রিকইনফোতে thuoc viagra cho nam

“Gordon Greenidge crying. Just imagine a win that makes Greenidge cry; a man who had come from a different country, a different culture. The owner of one of the fiercest square-cuts ever seen, the man with the double-century on one leg, the man whose image first comes to mind when the words “beware the wounded batsman” are said; Greenidge cried after that win. That’s how much it meant to the team.”

এরপর আর কি-ই বা বলার থাকতে পারে!””

 

সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ আয়ারল্যান্ড। ছেলেটার বাসায় রেডিওর ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে। এদিকে বাবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আর মা রান্নাঘরে। পড়ালেখা বাদ দিয়ে সারাদিন রাজ্যের বই আর ব্যাটবল নিয়ে পড়ে থাকায় এমনিতেই বাপমা ছেলেটার উপর যে পরিমান ক্ষ্যাপা, তাতে মার কাছে চাইলে ব্যাটারি কিনতে টাকা দেবার সম্ভাবনা মাইনাস ১০০% , সাথে ফ্রি কিছু মাইরও কপালে জুটতে পারে। কিন্তু আজকে যে সেমিফাইনাল, ব্যাটারি যে কোনমূল্যে চাই।দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ছেলেটা জীবনে প্রথমবারের মত চৌর্যবৃত্তিতে নামলো। পরবর্তীতে অবশ্য আম্মুর ডানো দুধের টিন থেকে নেয়া সেই টাকাটা সে ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষমা চেয়েছিল, কিন্তু মাইর একটাও মাটিতে পড়ে নাই। যেই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রথম উইকেট পড়ল, তারপর সে সহ বাংলাদেশের আরও ১২ কোটি মানুষ রেডিওতে যে কথাটা শুনে স্পিকার হয়ে গেলো, তা হচ্ছে, ১১ নাম্বার ব্যাটসম্যান খালেদ মাসুদ পাইলট ওয়ান ডাওনে নামছেন। শেষপর্যন্ত অবশ্য কোচের ক্ষুরধার দূরদৃষ্টি কাজে লেগে গেলো। মাসুদ করলেন ৭০ রান, বাংলাদেশ করল ২৪৩ রান। বোলারদের অভূতপূর্ব নৈপুণ্যে স্কটিশরা আটকে গেলো এ রানের বহু আগেই। শেষ ক্যাচটি নিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুল যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানেই সেজদা দিলেন। বাংলাদেশ ফাইনালে উঠে গেলো। আর ছেলেটা আনন্দের প্রচণ্ড আতিশয্যে লাফ দিয়ে উঠতেই তার কোলে থাকা রেডিওটি পড়ে গেল। ভেতরের কিছু একটা হয়তোবা নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকবে, রেডিওটা আর চলছে না। ছেলেটার কিন্তু এইসব কোনকিছুর দিকেই খেয়াল নেই, সে ততক্ষনে বাঈরে বেরিয়ে গেছে। সারাদিনের উদযাপনের শেষে অপরাধী সন্ধ্যার কিছু আগে ঘরে ফিরল। পরবর্তীতে সন্ধ্যায় যখন পিতা ফিরলেন, পুত্রের এহেন কীর্তি শোনার পরেও আশ্চর্যজনকভাবে সামান্য কিছু বকাবকি ছাড়া তিনি কোনরূপ উত্তমমধ্যমের মাঝখান দিয়ে গেলেন না। তার কারনটা পুত্র হঠাৎ আবিস্কার করল ১২ই এপ্রিল, কেনিয়া আর বাংলাদেশের ফাইনালের দিন…

 

পিতা হঠাৎ ঘোষণা করলেন,আজ তিনি বাঈরে যাবেন না। আজ তিনি খেলা দেখবেন থুক্কু খেলার ধারা বিবরনী শুনবেন। ছেলে কিছুক্ষনের জন্য বাকহারা হয়ে গেলো। তার রাশভারী পিতা আজ তার সাথে বসে ধারাবিবরণী শুনবেন, এইটা তো অসম্ভব কল্পনাতেও আসে নাই। ক্যামনে কি? কিন্তু সব অসম্ভবকে সম্ভব করে ছেলেটার পরিবারের সবাই একসাথে খেলার ধারাবিবরণী শুনতে বসল। কিন্তু কেনিয়া তখন সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। আর ষ্টিভ টিকলো হলেন একজন সুপারম্যান। সুতরাং খেলার প্রথম অংশে যা হবার, তাই হল। বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে টিকলো করলেন ১৪৭ রান, আর কেনিয়া করল ২৪১ রান। বৃষ্টি নামলো এবং খেলার বারটা বেজে গেলো। ঠিক হল বাংলাদেশ ব্যাট করবে পরের দিন। ডি/এল মেথডের অদ্ভুত কারসাজিতে বাংলাদেশের টার্গেট দাঁড়াল ২৫ ওভারে ১৬৬ রান। ছেলেটার বাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকাতে তিনি আজ আর খেলার বিবরনী শুনতে ছেলেটার সাথে থাকতে পারলেন না। টেনশনে ঘরে একলা থাকতে পারল না ছেলেটা। চলে গেলো বাড়ির পাশে থাকা ক্লাবে। যেখানে বড় ভাইরা বিশাল দুইটা স্পিকার দিয়ে খেলার ধারা বিবরণী প্রচার করছে। ২৫ ওভারে যে ১৬৫ করলে ম্যাচ টাই হবে, তা কিন্তু নয়। ১৬৬ না করতে পারলে ম্যাচ জেতা যাবে না। আর জিততে না পারলে ৯৯ সালের বিশ্বকাপ খেলা সম্ভব না। মারটিন সুজির করা প্রথম বলেই নাইমুর রহমান দুর্জয় ক্লিন বোল্ড। ছেলেটা টেরও পায়নি, কখন তার চোখে পানি এসে গেছে। মোহাম্মাদ রফিক ১৫ বলে ২৩ রান করে কিছুটা এগিয়ে রাখলেন। শেষ ১০ ওভারে প্রয়োজন ৭৯ রান। শুরু হল পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা নাটিকা। প্রতি ওভারে একটা করে ৬ হয় আর একটা করে উইকেট পড়ে। শেষ তিন ওভারে যখন প্রয়োজন ৩৩ রান, তখন সাইফুল ইসলাম আসিফ করিমের প্রথম বলটা পাঠালেন গ্যালারিতে। ভদ্র ও মার্জিত হিসাবে পরিচিত ছেলেটা হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে আসিফ করিমকে একটা সদ্যশেখা অশ্রাব্য গালি দিয়ে ছয়টাকে স্বাগত জানালো। কেন সে এ কাজটি করেছিল, সেটা আজো জানতে পারেনি। তারপরেই অবশ্য সাইফুল আউট হয়ে গেলেন। কিন্তু খালেদ মাসুদ বাঘের গর্জনে শেষ বলটাকে আবারও গ্যালারিতে ফেললেন। সবার চিৎকারে কানে তালা লেগে গেলো। ২ ওভারে লাগে ১৯ চাচা খালেদ মাহমুদ স্ট্রাইকে এসেই চার মেরে লক্ষ্যটা ১৫ তে নামিয়ে আনলেন। কিন্তু পরের বলেই সামনে এগিয়ে আসায় স্ট্যাম্পিং হয়ে গেলেন চাচা। লাস্ট ওভারে লক্ষ্যটা নেমে এল ১১ রানে। তৎকালীন অন্যতম দুর্ধর্ষ বোলার মারটিন সুজিকে পাইলট ভাই প্রথম বলেই আছড়ে ফেললেন তেনাগা ন্যাশনাল স্পোর্টস কমপ্লেক্সের গ্যালারিতে, বাঁধভাঙ্গা চিৎকারে কান পাতা দায় হয়ে গেলো। ৫ বলে আর দরকার ৫রান। পরের বলটা মিস হল। ৪ বলে ৫ রান প্রয়োজন। অতিরিক্ত উত্তেজনায় কিনা সুজি পরের বলটি ওয়াইড দিয়ে বসলেন। ৪ বলে ৪ পরের বলটা কোনমতে ব্যাটে লাগিয়েই দৌড় দিলেন মাসুদ। ৩ বলে ৩ রান। পরের বলটা শান্ত মিস করলেন। আর ছেলেটা মিস করল তার একটা হার্টবিট। তারপরের বলে শান্তর প্রচণ্ড শট আটকে গেলো কাদায়। পার হল না বাউন্ডারি। দু রান নেয়ায় লাস্ট বলে দরকার এক রান। ছেলেটা যদিও খেলাটা দেখতে পারছে না, কিন্তু তবুও সে বন্ধ করে ফেলল দুচোখ। আর ঠিক তার পরমুহূর্তে কি হল সেটা তার স্পষ্ট স্মরন হয় না আজো। শুধু এতটুঁকু মনে আছে ধারাভাষ্যকার কাঁপা কাঁপা গলায় চিৎকার করে বলেছিলেন বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন। দিগ্বিদিকশূন্য এক বড় ভাই খপ করে তাকে ধরে কাঁধে তুলে ফেললেন, আর দৌড়াতে দৌড়াতে বাইরে চলে গেলেন। তারপর তাকে ঘাড়ে নিয়েই উঠে বসলেন ট্রাকে… ট্রাকে চড়ার সে কি বাঁধভাঙ্গা আনন্দ…  সে যে কোথায় কোথায় গেলো, সেটা তার পুরোপুরি মনে নেই। তবে এতদুর মনে আছে, জরি আর রঙ মেখে পুরোপুরি আলিফ লায়লার জীন হয়ে সন্ধ্যায় সে যখন বাসায় ফিরল, ততক্ষনে তাকে খুজতে খুজতে ক্লান্ত পাড়ার সবাই। যে পিতামাতা পারলে ছেলেকে সিন্দুকের মাঝে ভরে চাবিটা গিলে ফেলেন যেন কেউ তাদের সোনামানিকের কোন ক্ষতি করতে না পারে, সেই ছেলে যদি কাউকে কিছু না বলে এভাবে ট্রাকে করে সারা ঢাকা শহর চষে বেড়ায়, তবে এইটা কোন বিচারেই ক্ষমার যোগ্য না। ইতিমধ্যে দুবার মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দেয়া হয়ে গেছে যে,ছেলেটা হারিয়ে গেছে, যদি কোন সহৃদয়বান ব্যক্তি যদি তাকে খুঁজে পেয়ে থাকেন, তবে যেন তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। তারপরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। ছেলেটাকে হাতের নাগালে পাওয়া মাত্রই পিতামাতা কতৃক স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ ধোলাই প্রদান এবং ক্রিকেট সংক্রান্ত সকল ধরনের কর্মকাণ্ডের উপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু তারা তো জানতেন না, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ছেলেটার হৃদয়ে পাকাপাকিভাবে ঘরবাড়ি বানায়া ফেলছে, শত চেষ্টা করলেও এইটা মোছা সম্ভব না..

আজ এ পর্যন্তই থাক। এই পাগল ছেলেটার পাগলামি সেই যে ‘৯৭ সালে শুরু হইছিল, সেইটা আজো থামে নাই। বরং দিনকে দিন এইটা বাড়তে বাড়তে এখন মোটামুটি ম্যানিয়াক পর্যায়ে চলে গেছে। সে কাহিনী আরেকদিন বলা যাবে.. লেখাটা ২য় বারের মত নিউজিল্যান্ডকে বাংলাওয়াশ দেয়ার দিন লিখেছিলাম। পুরাতন কিন্তু এভারগ্রীন সেই দিনগুলার কথা মনে পড়ে গেলে প্রচণ্ড আবেগপ্রবন হয়ে যাই। সেই আবেগের তোড়ে তাই লেখাটা হয়ে গেছে বিশাল। ভেবেছিলাম কিছুটা কাটছাঁট করে দেবো, কিন্তু পরে দেখি কিছুই কাটছাঁট করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অপরিমিত ভালোবাসা কাটছাঁট করা সম্ভব নয়। তাই পুরোটাই দিয়ে দিলাম। লেখাটার বিভিন্ন তথ্যের জন্য কৃতজ্ঞতা ব্লগার রাসয়াত রহমান জিকো ভাইকে…

জয় বাঙলা…

 In Tiger We Trust…

You may also like...

  1. ক্রিকেট নিয়ে আপনার লেখাগুলো সত্যিই অসাধারণ। যেন সবকিছু চোখের সামনে দেখতে পাই।

    এই হতাশার সময়ে এমন কিছু লেখা সত্যিই প্রয়োজন। খুব বেশি প্রয়োজন।

    buy kamagra oral jelly paypal uk
    • এখনই হতাশ হচ্ছেন ভাই? এই আমরাই কিন্তু ৯৯ সালের পর টানা পাঁচ বছর একটা ম্যাচও জিততে পারি নাই। তখন যদি হতাশ না হই, তাহলে এখন কেন হব বলেন?

      পড়বার জন্য অশেষ ধন্যবাদ ও শুভকাম্না… নেক্সট ম্যাচটা যেদিন জিতবে , সেইদিন আপনারে ট্রিট দিব … ঠিকাছে?

  2. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    আপনি ভাই আসলেই ক্রিকেট খোর…
    ভাল লাগলো পড়ে!!

  3. চাতক বলছেনঃ

    ক্রিকেট নিয়ে এতো বড় পাগল আমি আগে দেখি নি। কিন্তু দেশের জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের কি সেই দেশপ্রেম আছে?

    • নষ্ট কথন বলছেনঃ

      আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার যোগ্যতা আমার আছে কিনা আমি জানি না। তবে রিসেন্ট কয়েকটা জেতা ম্যাচে যেভাবে কিছু ব্যাটসম্যান দায়িত্বজ্ঞানহীনের মত ব্যাট চালিয়ে ম্যাচটা হেরে আসায় সবাই খুব হতাশ হয়েছে। কিন্তু আমি এখনও ১০৩ ডিগ্রি জ্বর গায়ে টাইগার মাশরাফির সেই ভারতবধ কিংবা অসহ্য যন্ত্রণার পরেও ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে টাইগার মুশির দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার উপর বিশ্বাস রাখতে চাই… সব কিছুর পরও বিশ্বাসটাই তো সব, তাই না?

    metformin tablet
  4. স্পীকার বলছেনঃ

    জয় বাঙলা

    মনে হচ্ছিল আমিই বুঝি ঐ খেলা দেখছি। চোখে পানি চলে আসল

accutane prices

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.