বিদ্রোহী কবি নজরুল ; একটি বুলেট কিংবা কবিতার উপাখ্যান

4170 metformin synthesis wikipedia

বার পঠিত

ই পৃথিবীতে যুগে যুগে এসেছেন আলোকদ্যুতি ছড়ানো মহামানবরা। সভ্যতার আগ্রযাত্রায় তাঁরা রথ সারথি হয়ে গেয়ে গেছেন মানব মুক্তির জয়গান। আমি একটি সুন্দর পৃথিবী দেখতে পাই চারিদিকে। আর দেখতে পাই আবেগের বন্ধনে আবদ্ধ এক ঝাঁক দ্বিপদ মেরুদন্ডী মানব গোষ্ঠি। এদের মাঝে কেউ কেউ কালকে উত্তীর্ণ করেন। কেউ কেউ হয়ে পড়েন সকল সমাজের সকল কালের। কেউ কেউ যুদ্ধ করেন এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ তূর্য নিয়ে। কেউ গোপন পিয়ার চকিত চাহনী ছল করে দেখা অনুখনে-অজুহাতে কালবৈশাখী হয়ে ধ্বংস করে দেন অন্যায়ের বার্লিন দেয়াল কিংবা সাম্রাজ্যবাদের মহাপ্রাচীর। কেউ কেউ বিদ্রোহী ভৃগু হয়ে ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেন। আবার তিনিই জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসেন আর তাঁর ভয়ে হাবিয়া দোজখ যেন নিভে নিভে কেঁপে উঠে। হ্যাঁ, জয়ধ্বনির কবি, প্রলোয়াল্লাসের কবি, অগ্নিবীণার কবি, রক্তাক্ত মহররমের কবি, দুর্দিনের যাত্রীর কান্ডারী, যৌবনের দ্যুতি ছড়ানো, শৃঙ্খল ভঙ্গকারী সাম্যবাদের কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা বলছি। আমি  নজরুলের কথা বলছি; আমি  একজন বুলেট কিংবা কবিতার কথা বলছি। missed several doses of synthroid

শুরুর গল্পঃ আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রাম। অতীতকালে অস্ত্র নির্মাণের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলো এই গ্রামটি। এখানেই মা জাহেদা খাতুন আর পিতা কাজী ফকির আহমদের কোল জুড়ে আসেন সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৩০৬ সনের ১১ই জৈষ্ঠ্য।

নজরুলের পূর্বপুরুষরা পাটনার হাজী পুরের বাসিন্দা ছিলেন। জানা যায়, সম্রাট শাহ আলমের সময়ে তাঁরা বর্ধমান আসেন। মোঘল আমলে এখানে একটি বিচারালয় ছিলো। এই বিচারল্যের কাজীদের উত্তরপুরুষই আমাদের গর্বের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমেদের দুই স্ত্রী, সাত ছেলে দুই মেয়ে ছিলো। নজরুল দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে। এ পক্ষে নজরুলের দুই ভাই এক বোন। নজরুলের চার ভাই অকালে মৃত্যু বরণ করায় তাঁর নাম রাখা হয় দুখু মিয়া।

মাত্র আট বছর বয়সে ১৯০৮ সালে (১১ই চৈত্র ১৩১৪ বঙ্গাব্দ) নজরুল তাঁর বাবাকে হারান। দারিদ্র্যের কষাঘাতে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেল মেধাবী নজরুলের। কিন্তু কাকা মোলভী কাজী বজলে করিম ফারসি ভাষা শিক্ষা দিতেন নজরুলকে। তখনকার দিনে লেটো নামের একধরনের যাত্রা গান বিশেষ প্রচলিত ছিলো। ছেলেরাই মেয়েদের ভূমিকায় অভিনয় করতো। এই লেটো দলে যোগ দিলেন নজরুল। তিনি নিজের মেধার বিচ্চুরণে সেখানে বিশেষ জায়গা দখল করে নিলেন।

এই পর্যায়ে আমি চেষ্টা করেছি নজরুলের রচিত প্রথম কবিতাটি খুঁজে বের করতে। আমি যা খুঁজে পেয়েছি সেটা নিয়ে পন্ডিতদের মাঝে বতর্ক থাকলেও অনেক তাত্ত্বিকই ধারনা করেন আরবি-ফার্সি-উর্দু মিশ্রিত নিম্মোক্ত কবিতাটিই নজরুল ইসলামের প্রথম কবিতা।

মেরা দিল বেতাব কিয়া

তেরি আব্রু য়ে কামান side effects of quitting prednisone cold turkey

জ্বলা যাতা হ্যায়

ইশক মে জান পেরেশান।

হেরে তোমায় ধনি,

চন্দ্র কলঙ্কিনী

মরি কী যে বদনের শোভা

মাতোয়ারা প্রাণ

বুলবুল করতে এসেছে

তাই মধু পান। 

উক্ত কবিতাটিকে “নজরুল চরিতমানস” গ্রন্থের লেখক সুশীলকুমার গুপ্ত প্রথম কবিতার স্বীকৃতি দিলেও নজরুলের বন্ধু শৈলজানন্দের দাবী “রাজার গড়” হল নজরুলের প্রথম কবিতা। (আমারবন্ধু নজরুল, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়)

তবে ‘রাজার গড়’ কবিতাটি আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও পাইনি।

নজরুলের শিক্ষাজীবনের নতুন অধ্যায়ঃ  বাংলা ১৩১৮ সনেনজরুল ভর্তি হন মাথরুন হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে। কিন্তু এখানে এসে নজরুল কবিতা লিখতেন না! তিনি আগ্রহী হলেন গল্প লিখার প্রতি। কিন্তু বছর না ঘুরতেই আবার দারিদ্র্য। পরিবারের মায়া ছিন্ন করেই নজরুল রাতের আঁধারে পালিয়ে এলেন আসানসোলে। সেখানে নজরুল আবদুল ওয়াহেদ নামক এক ব্যক্তির রুটি কারখানায় কাজ নিলেন। আশে পাশের কয়লা খনির শ্রমিকরা এখানে প্রায় সময় গানের সর করতেন। আর যথারীতি এখানে সবাইকে মাতিয়ে দিতেন নজরুল তার তুখোড় সৃষ্টিশীল প্রতিভা দ্বারা।

গানের আসরে যোগ দিতে আসতেন সঙ্গীত প্রেমিক দারোগা কাজী রফিজউল্লাহ। রফিজউল্লাহ চিনতে ভুল করলেন না কয়লার মাঝে হীরকের খন্ডটিকে। তিনি নজরুলকে নিয়ে আসেন ময়মনসিংহের দরিরাম পুর হাইস্কুলে। সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হলেন নজরুল। ১৯১৪ সাল।

দেখতে দেখতেই কেটে গেল দুই বছর। নজরুল আরো দুইজন ঘনিষ্ট বন্ধু পেলেন।একজন হলেন উল্লিখিত শৈলজানন্দ। পড়ালিখায় ভালো ছিলেন বলে নজরুলের স্কুলের মাসিক বেতন এবং বোর্ডিং এ খাবার খরচ মওকুপ করা হয়। তাঁর কষ্টের এই দিনগুলো শুনে নিন তাঁর বন্ধুর স্মৃতিচারণে,

নজরুলের টাকা পয়সা থাকতো বিছানার তলায়। টাকা পয়সা বলতে শিয়ারশোল রাজবাড়ি থেকে পাওয়া মাসিক সাতটাকা। বিছানার তলাতেই থাকতো টাকা গুলো। সেখান থেকে খরচ হতে হতেই একদিন শেষ হয়ে যেত। সাত টাকার বেশিরভাগ নিতো বিস্কুটওয়ালা। তারপর চলতো ধার। সে ধার পরিশোধ করতাম আমি নয়তো আমাদের আরেক সহপাঠী বন্ধু শৈলেন ঘোষ।

এর মাঝে এক ঘটনায় নজরুল এক ইংরেজ মেম সাহেবের স্নেহধন্য হন। ঘটনাটার সূত্রপাত রাণীগঞ্জ শহরের বাইরে রেলগাড়িতে কাটা পড়া এক সাঁওতাল তরুনীকে দেখতে গিয়ে ফিরে আসার সময়ে। আসানসোলের রাস্তা খুঁজে পাচ্ছেন না এক মেমসাহেব ও তাঁর স্বামী। তারা পথিমধ্যে নজরুল ও শৈলজানন্দকে দেখতে পান এবং তাঁদেরকে সাহায্য করতে বলেন। নজরুল সাহায্য করেন আর রাস্তাটা চিনিয়ে দেন। আর ইংরেজ মেম সাহেবের সৌজন্যতায় মুগ্ধ হন নজরুল। ঐতিহাসিকদের মতে এই সময়ে নজরুল ইংরেজদের অনুকূলে জীবনের একমাত্র উক্তিটি করেন,

ইংরেজদের যতই ঘৃণা করা হোক না কেন তাঁদের চারিত্রিক গুণের জন্য তাঁরা সভ্যতার চরম শিখরে আরোহন করেছেন। বাঙালির চরিত্র কত দূর্বল! ইংরেজদের আছ থেকে এদিক থেকে আমরা কৃতজ্ঞ।

নজরুলের বিদ্রোহী হয়ে উঠার ধারাপাতঃ একবার নজরুলের এক বন্ধু পঞ্চানন ঘোষ একটি বন্দুক কিনে ফেলেন। পঞ্চুর পাখি শিকারের শখ ছিলো। কিন্তু দুই একদিন পরই খেয়ালী পঞ্চাননের শখ উবে গেল। সে নজরুলকে বন্দুকটা দিয়ে দিলো। নজরুল তার ঐ বন্দুকটাকে নিয়ে বাগানে যেতেন পাখি শিকারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু অয়াখি শিকারে আগ্রহ ছিলোনা তাঁর। তিনি বন্দুক কাঁধে নিয়ে বন্ধু শৈলজানন্দকে নিয়ে চলে আসেন সাহেবদের বাগানে। সেখানে সাহেবদের কবর ছিলো। কবর লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তেন নজরুল। শৈল অবাক এবং বিরক্ত হয়ে বলে,“এভাবে দামী গুলি গুলো নষ্ট করছিস কেন?”

নজরুল বলতেন,একদিন আমি এই দেশ থেকে ইংরেজ তাড়াবো এভাবে। নজরুল মূলত শৈশব থেকেই ইংরেজ বিদ্বেষী। একদিন শৈলকে নিয়ে নজরুল বাগানে ঢুকে পেঁপে গাছের কোনটিতে বড়লাট কোনোটিতে ছোটো লাট, কোনোটিতে পঞ্চম জর্জের নাম লিখে সেগুলো লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তেন। আর আনন্দে লাফিয়ে উঠতেন। এভাবেই তাঁর কিশোর মনে ধীরে ধীরে জমে উঠে ইংরেজ বিদ্বেষ। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডাক এলো।১৯১৭ সালে তিনি সৈনিক পদে যোগ দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কৌশল অর্জন।

এই বিষয়ে আমি আর তেমন কোনো তথ্য সংযুক্ত করতে পারিনি বলে দুঃখ প্রকাশ করছি।

নজরুলের বিদ্রোহী চেতা সাহিত্য সাধনার সূত্রপাতঃ নজরুল প্রথমদিকে গদ্য লিখতেন বেশি। তখন দেশ ছিলো ইংরেজদের শাসনে শৃঙ্খলিত। ১৯১৭ সালে বাঙালি পল্টনে যোগ দেয়ার পর ব্যারাকে তিনি সাহিত্য সাধনার জন্য প্রচুর সময় হাতে পান। মূলত এ সময়েই তাঁর কাব্য প্রতিভা পুর্ণোদ্যমে বিকশিত হয়ে উঠে। এর পাশাপাশি তিনি সঙ্গীত চর্চাও শুরু করেন।

১৯১৯ সালের মে মাসে কবির প্রথম লিখা প্রকাশিত হয় মাসিক সওগাত পত্রিকায়। সেটি ছিলো “বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী” নামক একটি গল্প। পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের প্রথম কবিতা “মুক্তি” প্রকাশিত হয়ে ১৯১৯ সালের জুলাই মাসে ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায়। করাচি সেনাশিবিরে থাকাকালীন কবি বেশ কয়েকটি গল্প এবং কবিতা কলকাতায় পত্রপত্রিকায় পাঠান এবং সেগুলো প্রকাশিত হয়। এসময় “তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা” নামক একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় মাসিক সওগাত পত্রিকায়। ১৯২০ সালের মার্চের শেষে কবি কলকাতায় ফিরে জীবন বৃত্তি হিসেবে সাহিত্য চর্চাকেই বেছে নিলেন। অন্যরা সরকারি কাজে যোগ দিলেও কবির স্বাধীনচেতা মন ইংরেজদের গোলাম হয়ে থাকতে চাইলো না।

কমরেড মুজাফফর আহমদ কবিকে নিয়ে আসেন সাংবাদিকতা পেশায়। তখন দেশব্যাপী চলছে অসহযোগ আন্দোলন। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন তখন একই ইউনিটিতে চলছে মুজাফফর আর নজরুল সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁড়া একটি এই ইস্যুতে একটি পত্রিকা বের করবেন। তখন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন হাইকোর্টের প্রথিতযশা উকিল। তিনি আশ্বাস দিলেন নজরুলকে।

১৯২০ সালের ১২ই জুলাই সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ প্রকাশিত হল। পত্রিকার দাম এক পয়সা। নজরুলের একচ্ছত্র আধিপত্যে নবযুগ পত্রিকা প্রথম দিনেই জননন্দিত হয়ে গেল। নবযুগ বাজারে বের হতেই আলোড়ন সৃষ্টি করলো। সংবাদের হেডলাইনগুলো ছিলো অদ্ভুত ভাষায়। বড় সংবাদ্গুলো নজরুল নিজের ভাষায় সংক্ষিপ্ত এবং আকর্ষণীয় করে লিখতেন। শিরোনাম হত খুবই আকর্ষনীয়। নবযুগ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন নজরুল। তাঁর লিখায় থাকতো গণজাগরনের কথা। ইঙ্গরেজদের অত্যাচারের কথা। এর জ্বালাময়ী ভাষার ব্যবহার ভারতবর্ষে তীব্র ইংরেজ বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করলো। কিন্তু ইংরজ সরকার এত সহজে কেন মেনে নিবে তাদের বিরুদ্ধাচারণ? বৃদ্ধি পেতে লাগলো নবযুগ পত্রিকার জনপ্রিয়তা। ইংরেজ সরকার তিনবার সতর্ক করে দেন নজরুলকে। এমনকি পত্রিকাকে দুই হাজার  টাকা জরিমানা করা হয়। এই পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের প্রবন্ধের কিছু অংশ উল্লেখ করছি,

…কিন্তু আমরা দাঁড়াইয়া মাইর খাইবো না। আঘাত খাইয়া খাইয়া অপমানে বেদনায় আমাদের রক্ত এইবার গরম হইয়া উঠিয়াছে।…এই অত্যাচার এই মিথ্যার বুনিয়াদে খাড়া তোমাদের ঘর- মনে কর  কি চিরদিন খাড়া থাকিবে? এই সব অপকর্মের , এই সব অমার্জনীয় পাপের, এইসব নির্মম উৎপীড়নের জন্য বিবেকের যে দংশন তাহা হইতে তোমাদিগকে রক্ষা করিবে কে? এ মহাশক্তির ভীষণতা আজো তোমাদের চোখে পড়ে নাই!……আমার যে ভাই আজ তোমাদের হাতে শহীদ হইলো, সে এক মুক্ত স্বাধীন দেশে গিয়ে পৌঁছিয়াছে, যেখানে খোদার গুলী পৌঁছাইতে পারেনা। … মনে রাখিও, সে খোদার আরশের পায়া ধরিয়া ইহার দাদ (বিচার) মাগিতেছে। দাও, উত্তর দাও! বল দেখি, তোমার কি বলিবার আছে?

তাঁর অপর একটি প্রবন্ধ “ধর্মঘট” এ তিনি কয়লা খনির চিরবঞ্চিত হতভাগ্য শ্রমিকদের নিয়ে লিখেছেন। ইংরেজদের প্রবল বিরোধের মুখে পড়ে নবযুগ পত্রিকা। এমনকি শেরে বাংলা নজরুলকে কিছুটা নরম সুরে লিখতে বলেন। শেরে বাংলার এমন কথা সহ্য হলনা নজরুলের। বরং তিনি এবার শেরে বাংলার এই কথায় আঘাত পেয়ে পত্রিকা ছেড়ে দিলেন। নজরুলের পদত্যাগে আর পত্রিকা চলেনি। অবশেষে ইংরেজ সরকার পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করে। viagra vs viagra plus

কবির প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ কিন্তু কবিতা বা গল্পের বই নয়। নবযুগে প্রকাশিত বাছাইকৃত প্রবন্ধের বই “যুগবাণী” তাঁর প্রথম গ্রন্থ। ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই ইংরেজ সরকার এটি নিষিদ্ধ করে দেয়।

সাল ১৯২২ এর শেষ দিকে। “বিজলী” পত্রিকায় হঠাৎ একদিন ছাপা হল একটি কবিতা। কবির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। কবিতার নাম “বিদ্রোহী” ছাপা হল এমন একটি কবিতা কিংবা বুলেট, যেটা লিখার পর যদি নজরুল আর কোনো কিছু নাও লিখতেন তাও তিনি অমর হয়ে যেতেন! সেই শক্তিশালী কবিতাটি কাঁপিয়ে দিলো একাধারে সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের ভিত। কবিতাটির প্রতিটি লাইন যেন মর্টার শেল হয়ে বিঁধলো সকল প্রকার অত্যাচারের ভিত্তিপ্রস্তরে। অসধারন শব্দ চয়নের এই অসামান্য ঐতিহাসিক কবিতাটি পরবর্তীতে সংকলিত হয় “অগ্নিবীণা” তে। কম্পিত হল চতুর্দিকে,

বল বীর-

চির উন্নত মমশির।

শির নেহারি আমারি নতশির ঐ শেখর হিমাদ্রীর! …

এরপর এটি “মোসলেম ভারত” সহ অন্যান্য পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয়। কবি নজরুলকে ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধাটি এনে দিয়েছিল এই ‘বিদ্রোহী কবিতা। বিদ্রোহী প্রকাশিত হওয়ার পরপরই শুরু হয় এর বিরুদ্ধে আলোচনা সমালোচনা। বাংলা একাডেমী হতে প্রকাশিত ‘নজরুল রচনাবলী’র সম্পাদক আবদুল কাদিরের মতে, ‘বিদ্রোহী’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিকে ‘মোসলেম ভারতে’র ২য় বর্ষের ৩য় সংখ্যায়’। প্রথম প্রকাশের সময় ৯টির মত চরণ বেশি ছিল। যেগুলো পরে বাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কবির ঘনিষ্ট বন্ধু মুজফফর আহমদের মত ভিন্ন। তাঁর মতে, ‘বিদ্রোহী’ প্রথমে ‘সাপ্তাহিক বিজলী’তে ছাপা হয়েছে (১৯২১ সালের ৬ জানুয়ারি ২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ)। ‘বিদ্রোহী’ প্রথম ছাপানোর সম্মান ‘বিজলীর’ই প্রাপ্য।’ আসলে প্রথম ছাপানো নিয়ে বির্তকের কারণ হলো মোসলেম ভারতের কথিত সংখ্যাটি ঠিক সময়ে প্রকাশিত না হয়ে বিলম্বে প্রকাশিত হয়েছিল। বিদ্রোহীর রচনা কাল নিয়েও দ্বিমত আছে সহিত্যবোদ্ধাদের মধ্যে।

সুশীল কুমার সেনগুপ্তের মতে,কবিতাটি রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের দুর্গাপূজার কাছাকছি সময়ে। কিন্তু কবিবন্ধু মুজাফফরের মতে, বিদ্রোহী রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের কোন এক রাত্রিতে। কাজী নজরুল ইসলাম: স্মতিকথা’য় তাঁর দাবি” কবি নজরুল ‘বিদ্রোহী’ রচনা করেন ১৯২১ সালে কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেন বাড়িতে। উক্ত বাড়ির নিচের একটি ঘরে নজরুল ও বন্ধু মুজাফফর আর পুরো বাড়িতে বিখ্যাত নবাব ফয়জুন্নিসা চৌধুরানীর নাতিরা ভাড়াটে হিসেবে থাকতেন। মুজাফফর আহমদের আরও দাবি, প্রথমে বিদ্রোহী কবিতাটি পেন্সিলে লেখা হয়েছিল এবং মুজাফফর আহমেদ এ কবিতাটির প্রথম শ্রোতা। ‘বিদ্রোহী’ রচনার পরে কবি নজরুল একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে পুরো কবিতাটি মুজাফফরকে পড়ে শোনান। কিন্তু বন্ধু মুজাফফর স্বভাবগত কারণে শোনার পর অনুভূতি প্রকাশ করেননি, তাই নজরুল মনঃক্ষুণ হন। ‘বিদ্রোহী’ প্রথম ও দ্বিতীয় বার পত্রিকায় ছাপানোর পর, কবি নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কাব্য ‘অগ্নিবীণা’তে ২য় কবিতা হিসেবে সংকলিত হয়। কাব্যটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর অবক্ষয় এবং ভারতের স্বাধীকার আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত হয়েছিল। কাব্যটির প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাব্যটি উৎসর্গ করা হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বাঙালী বারীন্দ্র কুমার ঘোষকে। কাব্যটিতে কবি ভারতীয় পুরাণ ও পশ্চিম এশীয় ঐতিহ্য ব্যবহার করেছেন দক্ষতার সঙ্গে।

এটি ছাপা হলে নজরুল জোড়াসাঁকোড় ঠাকুর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের বাড়ি হাজির হলেন কবিতাটি নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ কবিতাটি পড়লেন এবং জড়িয়ে ধরলেন নজরুলকে। বললেন,

হ্যাঁ! তুমি সত্যিই আমায় হত্যা করবে! তোমার মাঝে জগৎ আলোকিত করার জ্যোতি আমি দেখতে পাচ্ছি। কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না এসব তোমাদের আবদার বটে… আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও ঐ সূর বাজত, জনপ্রিয়তা কাব্য বিচারের স্থায়ী নিরিখ নয়, কিন্তু যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে তা শুধু কাব্য নয় মহাকাব্য।’

বিদ্রোহী কবিতাটি রচনার সময় নজরুলের বয়স ছিলো মাত্র ২২! ভাবলেই অবাক হতে হয় কি এক অসামান্য মেধাশক্তির অধিকারি ছিলেন এই নজরুল ইসলাম! সে সময় নজরুলের কবিতার একটি লাইন তরুন সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল। সেই লাইনটি হল, “আমি আপনাকে ছাড়া কাহারে করিনা কুর্ণিশ!”

কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। শুধুমাত্র উর্দু ভাষাতে কয়েক জন অনুবাদকের নাম পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে আখতার হোসাইন রায়পূরী, ইউসুফ আহমদ, মুহাম্মদ আবদুল্লাহ এবং আহসান আহমদ আশক উল্লেখযোগ্য।

এভাবেই নজরুল দেশবাসীর মনে সাহিত্য প্রতিভায় ভাস্কর হিসেবে আবির্ভূত হলেন। মূলত বিদ্রোহী কবিতাটিই তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেল। নজরুলের এই ব্যাপক জনপ্রিয়তায় অনেকেই ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়লো। মোহিতলাল মজুমদারের মত অনেক প্রথিতযশা সাহিত্যিক তাঁকে হেয় করতে লাগলেন। তিনি প্রচার করতে লাগলেন মিথ্যাচার। তিনি দাবী করে বসলেন, নজরুল তাঁর “আমি” প্রবন্ধের ভাববস্তু চুরি করেই “বিদ্রোহী” কবিতাটি লিখেছেন। আবার মোহিতলাল বিদ্রোহী কবিতার প্যারোডি করে একটু কবিতা লিখলে “ব্যাঙ”। ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার ১৩৩১ সালের ১৮ আশ্বিন সংখ্যায় ‘বিদ্রোহী’র ব্যাঙ্গরূপ ‘ব্যাঙ’ রচনা করেছিলেন সজনীকান্ত দাস ছদ্মনামে। ‘ব্যাঙ’ এর শুরুটা হয়েছিল ঠিক এভাবে-

আমি ব্যাঙ

লম্বা আমার ঠ্যাং,

ভৈরব রভসে বর্ষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাঙ

আমি ব্যাঙ, synthroid drug interactions calcium

আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ;

শ্রাবণ-নিশার পরশে আমার সাহসিকা

অভিসারিকা

ডেকে ওঠে ‘বাপ বাপ’।

মোহিতলালের এরূপ আচরনে মর্মাহত হন কবি ভক্তরা। তারা কবিকে এর বিরুদ্ধে কিছু করতে বলেন। নজরুল সবার অনুরোধে লিখলেন “সর্বনাশের ঘন্টা”। এটি “কল্লোল” পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৩৩১ সালে। zoloft birth defects 2013

নজরুলের যখন আবির্ভাব তখন অবধারিতভাবেই বাংলা সাহিত্যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। এর মাঝেও নজরুল ছিলেন নিজস্ব স্বকীয়তায় পরিপূর্ণ। তিনি সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে অজস্র ফার্সি শব্দকে ঠাঁই দিয়েছেন বাংলাভাষায় এবং সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা ভাষার কোষাগার। সাম্যের কবি নজরুল সাম্য স্থাপন করেছেন নারী পুরুষের মাঝে, ধনী গরীবের মাঝে, ধর্ম গ্রন্থ সমূহের মাঝে। নজরুলের সাহিত্য জীবন ছিলো মাত্র ২৩ বছর। এই স্বল্প সময়ে তিনি প্রায় ৪ হাজার গান লিখেছেন, আট শতাধিক কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন ১৮ টি ছোটোগল্প, ৩ টি উপন্যাস, প্রায় ১০০ টির মত প্রবন্ধ ও আলোচনা গ্রন্থ এবং ৩ টি নাটক।

একনজরে আমরা দেখে নিই নজরুলের সৃষ্ট কিছু জনপ্রিয় গ্রন্থের নামের তালিকা।

  • কাব্যগ্রন্থঃ অগ্নিবীণা, দোলন চাঁপা, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, ছায়ানট, পূর্বের হাওয়া, সাম্যবাদী, চিত্তনামা, সর্বহারা, সিন্ধু হিন্দোল, জিঞ্জির, সঞ্চিতা, চক্রবাক, নির্ঝর, নতুন চাঁদ, সঞ্চয়ন, মরু ভাস্কর ইত্যাদি।
  • ছোটোদের কবিতার বইঃ  ঝিঙে ফুল, সাতভাই চম্পা, পিলে পটকা।
  • উপন্যাসঃ বাঁধনহারা, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা। doctorate of pharmacy online
  • গল্পগ্রথঃ ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, শিউলী মালা।
  • নাটকঃ ঝিলিমিলি, আলেয়া, মধুমালা।
  • ছোটোদের নাটকঃ পুতুলের বিয়ে।
  • প্রবন্ধ গ্রন্থঃ যুগবাণী, রাজবন্দীর জবানবন্দী, রুদ্র মঙ্গল, ধুমকেতু, দুর্দিনের যাত্রী। acne doxycycline dosage
  • সম্পাদিত পত্রিকাঃ নবযুগ, ধূমকেতু।
  • পরিচালিত পত্রিকাঃ লাঙ্গল, গণবানী।
  • সঙ্গীত গ্রন্থঃ বুলবুল (১ম ও ২য় খন্ড), চোখের চাতক, চন্দবিন্দু, নজরুল গীতিকা, নজরুল স্বরলিপি, সুরসাকী, জুলফিকার, বন-গীতি, গুলবাগিচা, গীতি শতদল, সুরবাহার, সঙ্গীতাঞ্জলি, স্বরলিপি, সুরমুকুর, রাঙাজবা, নজরুল গীতিমালা ইত্যাদি।
  • অনুবাদঃ রুবাইয়াত-ই-হাফিজ, কাব্য আমপারা, রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম।
  • স্কুল পাঠ্যঃ মক্তব সাহিত্য।
  • বিবিধ গ্রন্থাবলীঃ দেবী স্তুতি, সন্ধ্যামালতী।

সাম্যের কবি নজরুল ও মৌলবাদীদের রোষানলঃ   ব্যক্তিগত জীবনচর্যায় চরম অসাম্প্রদায়িক এই পুরুষোত্তম কবি নিজে মুসলমান বংশোদ্ভূত হয়েও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন হিন্দু বংশোদ্ভূত প্রমীলা দেবীর সঙ্গে। সব্যসাচী’ ক্ষণজন্মা এই কবি একদিকে লিখেছেন অভূতপূর্ব শ্যামা সঙ্গীত, অপরদিকে লিখেছেন কালজয়ী হামদ ও নাত। আল কোরআনের ৩০ পারার করেছেন বাংলায় কাব্যানুবাদ। তিনি ১০টিরও বেশি ধর্মদর্শনের মূলভাব আত্মস্থ করে রচনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের অভূতপূর্ব মহামানবিক কবিতা ‘সাম্যবাদী’। যা পাঠ করলে ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানী মানুষের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার আর স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিশ্বধর্মের মূল মর্মকথা । যার মধ্যে নিহিত রয়েছে নজরুলের আত্মদর্শন। এই কবিতায় নজরুল লিখেছেন,

কে তুমি? –পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভিল, গারো?

কনফুসিয়াস? চার্বাক-চেলা, ব’লে যাও বলো আরো-

বন্ধু,যা খুশি হও-

পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা –খুশি পুঁথিও কেতাব বও,

কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত, বাইবেল-ত্রিপিটক-

জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব পড়ে যাও, যতো সখ-

কিন্তু, কেনো এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?

দোকানে কেন এ দর –কষাকষি? পথে ফুটে তাজা ফুল!

তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,

সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজপ্রাণ?

তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,

তোমার হৃদয় বিশ্ব- দেউল সকলের দেবতার।

দূরদর্শী নজরুল ইসলাম ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানের কূটকৌশল। তিনি ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের কিছুকাল আগেই নবযুগ পত্রিকায় একটি কলাম লিখেন “পাকিস্তান নাকি ফাকিস্তান”। তিনিই  সর্বপ্রথম ফাকিস্তান শব্দটি ব্যবহার করেন। এই কলামে তিনি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কাফির সম্বোধন করেন। (সূত্রঃ কাজী নজরুল ও আবুল মনসুর আহমদ, মাহবুব আনাম, দৈনিক ইত্তেফাক ২৭/০৮/২০০০)

কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক অসময়ে দূরদর্শিতা দেখিয়েছিলেন যখন সত্যিকার অর্থেই কলকাতার হিন্দু প্রভাবশালীরা মুসলিম জনতার প্রবল প্রতিপক্ষ ছিলো। বঙ্গভঙ্গ রদ সহ অন্যান্য কারণে স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুদের উপর ক্ষোভ ছিলো মুসলিমদের। তাই তটকালীন সকল মুসলিমের প্রানের দাবী ছিলো আলাদা মুসলিম প্রদেশ তথা পাকিস্তান। বস্তুত, সাম্যের কবি নজরুল পাকিস্তানের হবু শাসকদের মাঝে দেখেছিলেন অশনী ছায়া। কিন্তু তাঁর এই দূরদর্শিতাকে মেনে নেয়নি মুসলিম সমাজ! তারা নজরুলের বিরোধীতা করলো। নজরুল আতংকিত হলেন বাংলা ভাষার মানুষদের জাতীয়তাবোধহীন উচ্ছৃঙ্খলতা দেখে। ফলশ্রুতিতে তিনি ১৯৪২ সালে নবযুগ (দ্বিতীয় পর্যায়, প্রথম প্রকাশ ১৯৪০) পত্রিকা এপ্রিল সংখ্যায় প্রবন্ধ লিখলেন নাম- “বাঙালি বাঙলা”। প্রবন্ধে তিনি শ্লোগান তুললেন, “বাঙলা বাঙালির জয় হোক। বাঙলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক!”

নজরুলের সঙ্গীতচর্চা মুসলিম সমাজে “না-জায়েজ” বলে গণ্য হত। কিন্তু শত সামাজিক বাধা থাকা সত্ত্বেও তিনি একাধারে রচনা করে গেচজেন ইসলামী সঙ্গীত ও শ্যামা সঙ্গীত! আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে গ্রামোফোন কোম্পানি যখন রিলিজ করলো তাঁর রচিত গান “রমজানের ঐ রোজার শেষে” তখন এক রকম আলোড়ন হয়ে গেল সারা বাংলা তল্লাটে। ঈদের কিছুদিন আগেই মুক্তি পেয়েছিলো এই গান। প্রথম  দিকে প্রডিউসার রাজি হননি। কিন্তু আব্বাস উদ্দীন একরকম গোঁ ধরলেন যে, প্রডিউসার গান রেকর্ড না করলে তিনি আর গান গাইবেন না। দায়িত্ব পড়লো কাজী নজরুলের কাঁধে। যখনই নজরুল অনুমতির কথা জানতে পারলেন তিনি জড়িয়ে ধরলেন আব্বাস উদ্দীনকে। ছোট্ট একটি রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আধা ঘন্টা পর বের হলেন হাতে কাগজ নিয়ে। আর রচিত হল সেই বিখ্যাত গান, যে গানটি ছাড়া বাঙালি মুসলিমের ঈদ সম্পন্ন হয়না! এটি এমন একটি গান যেটা বাঙালি মুসলমানের ঐতিহ্যের সাথে মিশে গিয়েছে।

অথচ, এই নজরুলই হয়েছিলেন মৌলবাদের নির্মম শিকার! প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করার অপরাধে তাঁকে এক প্রকার এক ঘরে করে দেয়া হয়েছিলো। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তখনকার এক খাঁটি মৌলভী ছিলেন মুনশী মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ। তিনি বেশি দিন আগে নয়, ১৩২৯-এ নজরুল সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন, ‘লোকটা মুসলমান না শয়তান?’ তারপর মুনশী সাব লিখেছেনঃ

এই উদ্দাম যুবক যে ইসলামী শিক্ষা আদৌ পায় নাই, তাহা ইহার লেখার পত্রে পত্রে ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পাইতেছে। হিন্দুয়ানী মাদ্দায় ইহার মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ। হতভাগ্য যুবকটি ধর্মজ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানদের সংসর্গ কখনও লাভ করে নাই … দুঃখের বিষয় অজ্ঞান যুবক এখনও আপনাকে মুসলমান বলিয়া পরিচয় দিতেছে! …নরাধম ইসলাম ধর্মের মানে জানে কি? খোদাদ্রোহী নরাধম নাস্তিকদিগকেও পরাজিত করিয়াছে। লোকটা শয়তানের পূর্ণাবতার। ইহার কথা আলোচনা করিতেও ঘৃণা বোধ হয়। …এইরূপ ধর্মদ্রোহী কুবিশ্বাসীকে মুসলমান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না, পুনর্জন্ম-বিশ্বাসী কাফের বলিয়াই পরিগণিত হইবে। খাঁটি ইসলামী আমলকারী থাকিলে এই ফেরাউন বা নমরুদকে শূলবিদ্ধ করা হইত অথবা উহার মুন্ডপাত করা হইত নিশ্চয়। (সূত্রঃ “মুসলমান কে ও কী” , মাতাল তরণী, হুমায়ূন আজাদ)

আবার এর জবাবে নজরুল তাঁর পত্রিকায় একটি কলামে বাঙলার মুসলিম সমাজের সমালোচনা করে বলেন,

মুসলমান সমাজ যে আমাকে কাফের খেতাব দিয়াছে তাহা আমি মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিয়াছি। ইহাকে আমি কোনদিন অবিচার বলিয়া অভিযোগের বিষয় করি নাই। কারণ আমার আগে ওমর খৈয়াম, শামসুদ্দিন হাফেজ কিংবা মনসুর আল হাল্লাজকেও কাফের বলিয়া ছিল।

অথচ আমি ভাবলেই এখন আশ্চর্য হই কিভাবে মৌলবাদী গোঁড়া মুসলিমরা নজরুলকে তাদের কপিরাইট দাবী করছে অহরহ! যেন নজরুলের উপর অধিকার কেবল তাদেরই! মূলত তারা নজরুলকে ভালোবাসেনা। তারা তাঁকে ব্যবহার করে প্রচারণা চালায় মাত্র। তাদের একাংশ মনে করে নজরুলই আবহমান বাংলার শেষ কবি এবং তাঁর পরে আর কোনো কবির দরকার নেই! কি বিচিত্র আচরণ এদের। এই বিষয়ে হুমায়ূন আজাদের উক্তি,

কাজী নজরুল ইসলাম এখন রাষ্ট্রধর্মী বাঙলাদেশের জাতীয় কবি-খাঁটি ইসলামী কবি।এক সময় তিনি ফতোয়াবাজদের জ্বালায় তিনি অস্থির ছিলেন; আর এখন যদি কবিতা লিখতেন, তবে আজ যারা তাকে জাতীয় কবি বানিয়েছে, তারাই তাঁকে কাফের বলে তার শির ছিঁড়তো।

ভাবতেই অবাক হই। সত্যিই কি বিচিত্র সেলুকাস!

জীবনের অপরাহ্নে নজরুলঃ  এটি জাতি হিসেবে বাঙালির জন্য লজ্জা জনক যে, আমরা নজরুলকে ভালো থাকতে দিই নি। আমরা চাইলেই পারতাম তাঁকে আরোগ্য করতে। কিন্তু পদে পদে তিনি অবহেলার শিকার হয়েছিলেন। আর এই অংশে আমি সেই করুণ কাহিনীর কথা বলবো। কিভাবে তিনি বঞ্চিত হয়েছিলেন তাঁর প্রাপ্য সম্মান থেকে।

জীবনের শেষদিকে কবি বিবেকানন্দ রোডেরএকটা ছোটোবাড়িতে বসবাস করতেন। কাজ করতেন গ্রামোফোন কোম্পানিতে।কিছুদিন পর কবি নিজে বিবেকানন্দ ঘরের রোডের একটি ঘরে রেকর্ডের দোকান খুলে বসলেন। নাম দিলেন কলগীতি। কবির কলগীতি ভালো চললেও তিনি ব্যবসার লাভ ক্ষতি বুঝতেন না খুব একটা। ফলে একরক বাধ্য হয়ে নিজেই বন্ধ করে দিলেন কলগীতি।

১৯৪০-১৯৪১ এর দিকে তিনি নবযুগ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হলেন। এটি নবযুগ পত্রিকার দ্বিতীয় পর্যায়। মালিক এ কে ফজলুল হক বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলেও নজরুলের বেতন বাকী ছিলো পাঁচ ছয় মাসের। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা হচ্ছিলো না। একধরনের গাঢ় অভিমান নিয়েই নজরুল পত্রিকার চাকুরী ছেড়ে দিলেন।এরই মাঝে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুতে কবি খুব মর্মাহত হলেন। তাঁর মৃত্যু উপলক্ষে হাওড়ায় এক বিরাট শোক সভায় কবি সভাপতি হলেন। এটাই ছিলো তাঁর সর্বশেষ সভা।

১৯২০ সালে তিনি সর্বশেষ চুরুলিয়া যান। এরপর আর যাননি। এমনকি মা জীবিত থাকতেও যাননি। মা মারা যাওয়ার পরেও না। এর পেছনের রহস্য আজও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। ১৯৩৯ সালে কবি পত্নী প্রমীলা প্যারালাইজড হয়ে পড়ে রইলেন বিছানায়। চারিদিকে অভাব অনটন, প্রিয় পুত্র বুলবুলের অকাল বিয়োগ, এসব কিছুতে কবি নিজেই অসুস্থ হয়ে গেলেন। প্রচন্ড মানসিক চাপে ভুগতে লাগলেন তিনি। ১৯৪২ সালের প্রথম দিকে ধীরে ধীরে নজরুল মানসিক ও শারিরীকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। জুলাই ৯ তারিখে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিলো তাঁর বেতারে। কিন্তু যাওয়া হয়নি।

এসময় তিনি ডাক্তার ডি এল সরকারের বাড়িতে থাকতেন। তিনি এমবিবিএস হলেও করতেন হোমিও চিকিৎসা। তিনি ভাব্লেন কবির ব্রেইন স্টোক। সে অনুসারে চললো হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা। কিন্তু কবির কোনো উন্নতি নেই। কবির অসুস্থতার খবর পেয়েও কেউ দেখতে এলোনা তাঁকে। ১৭ জুলাই কবি সুফি জুলফিকার হায়দার সাহেবকে একটি চিঠি লিখলেন। কবি একে ফজলুল হকের কাছে ৫/৬ ঘন্টা বসে থেও কোনো আর্থিক সাহায্য কিংবা তাঁর পাওনা বেতন পাননি। সুফী জুলফিকার হায়দার কবির চিঠি পেয়ে দেখা করেন তাঁর সাথে। তিনি হক সাহেবের কাছে নজরুলের অসুস্থতার কথা বিস্তারিত বললেন। কিন্তু এবারও কোনো গুরুত্ব দিলেননা হক সাহেব! নজরুল এবারও কোনো আর্থিক সহযোগীতা পেলেন না। শুধু অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদকে ফোনে বললেন যাতে ডাক্তার বিধান রায়কে দিয়ে নজরুলের চিকিৎসা করানো হয়। বিধান রায় চিকিৎসা চালাতে লাগলেন। কিন্তু উন্নতি নেই। কবির হাড়ের কাঁপুনি আরো বাড়তে লাগলো ক্রমশই। ১৯৪২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কবি কলকাতায় ফিরে এলেন।

ইতোমধ্যে দ্বিতীয়বার কবির অসুস্থতার কথা পত্রিকায় ছাপানো হল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হক সাহেব তখনো নির্বিকার রইলেন। কারোই যেন কোনো সময় নেই। অসুস্থতার খবর শুনে ছোটোভাই কাজী আলী হোসেন দেখতে আসেন কবিকে। এরপর কবির চিকিৎসা শুরু করলেন কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ। কিছুদিন পরই কবি একপ্রকার পাগলামি শুরু করলেন। একেক সময়ে প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। এইবার সবাই ভাবলো সিজোফ্রেনিয়া। এই অনুসারে কিছুদিন চিকিৎসা করা হল। কিন্তু উন্নতি নেই। এরপর কবিকে লুম্বিনিপার্ক হাসপাতালে ভর্তি করানো হল। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। সেখানে ৪ মাস থেকেও কোনো পরিবর্তন আসলো না। কবিকে নিয়ে আসা হল আবার বাসায়।

১৯৪৩ সালে ডাক্তার মুখার্জীর অক্লান্ত পরিশ্রমে, সজনীকান্ত দাস ও মুজাফফর আহমদের আগ্রহে একটি সাহায্য কমিটি গঠন করা হল। নানান কারণে ব্যর্থ হল কমিটি। এদিকে রোগ জটিল হতে জটিলতর হয়ে উঠলো। দেশে নানান রকম চেস্টা চললো। প্রথম শ্রেণীর চিকিৎসকরা পরামর্শ দিলেন কবকে ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের তান্ডবলীলা বিশ্বজুড়ে। ইউরোপ জুড়ে জার্মানি ন্যাৎসি বাহিনীর বিভৎস হত্যাযজ্ঞ।কবিকে ইউরোপ নেয়া সম্ভব হলনা। নজরুলের ছেলে কাজী সব্যসাচী (সানি) বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। ১ মার্চ ১৯৫০ তারিখে কায়েদে আজম রিলিফ ফান্ডের কাছে তিনি বাবার অসুস্থতার সাহায্য চেয়ে একটি চিঠি লিখেন। আমি পোস্টের প্রাসঙ্গিকতায় সেই চিঠিটি প্রকাশ করছিঃ-

মাননীয় সম্পাদক

কায়েদে আজম ত্রান তহবিল

ঢাকা।

মহোদয়,

বিনীত নিবেদন এই যে, আমার পিতা কবি কাজী নজরুল ইসলাম গত নয় বছর যাবত কোলকাতায় মারাত্মক অসুখে ভুগছেন। আমাদের নিদারুণ আর্থিক সংকটের কারণে গত কয়েক বছরের যাবত চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করা যাচ্ছেনা। বর্তমানে তিনি এত গুরুতর অসুস্থ যে সত্যি বলতে তাঁকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তোলা আমাদের সাধ্যাতীত। এ ব্যাপারে যদি আপনাদের মহতী ত্রাণ তহবিল থেকে কোনোরূপ আর্থিক সাহায্য না করেন তাহলে তাঁকে বিনা চিকিৎসায় এবং বিনা শুশ্রুষায় মারা যেতে হবে।

                 ২.কতগুলো আইনগত অসুবিধা যা এ পর্যন্ত অনুসন্ধান ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দূর করা যায়নি। যার ফলে আমার পিতার বহু বই ও রচিত গানের দ্বারা আমরা কোনো আর্থিক সুবিধা লাভ করতে পারিনি। বলাবাহুল্য আমরা তাঁর লিখা থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা না পেলেও কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে কবি তাঁর নিজের কাব্যসৃষ্টি দ্বারা কোনোরূপ উপকৃত হননি।

              ৩.বর্তমানে আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস হছে পশ্চিম বঙ্গ সরকার কর্তৃক আমার বাবাকে দেয়া ২০০ টাকা মাসিক সাহিত্য ভাতা। পূর্বপাকিস্তান সরকার কর্তৃক পেনসন মাসিক ১৫০ টাকা মঞ্জুরীর কথা শোনা গেলেও বাবা এখনো এক মাসের টাকাও পাননি। কাজেই পূর্ব পাকিস্তান কর্তৃক ঘোষিত মাসিক সাহিত্য ভাতার কোনো অস্তিত্ব নেই। এদিকে বাবার বর্তমান অবস্থা শোচনীয় হতে শোচনীয়তর হয়ে পড়ছে।

                 ৪.আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭ জন। আমার মা গত ১৩ বছর শয্যাশায়ী।

            ৫.আমাদের বর্তমান আয় দ্বারা সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই সামান্যতম আয় দ্বারা আমার অসুস্থ পিতা মাতার সংসারই চলেনা। আমাদের কথা বাদই দিলাম।  thuoc viagra cho nam

             ৬.আমাদের সংসার চালাতে গিয়ে বহু ঋণ নিতে হয়েছে। আমরা পূর্বেকার ভাড়াটে বাড়ি হতে বের হতে বাধ্য হয়েছি। সম্প্রতি কোলকাতায় আমাদের ১৬ রাজেন্দ্র লাল স্ট্রীটে চলে আসতে হয়েছে। যার মাসিক ভাড়া ১০০ টাকা। এখানে ছাদের উপর কুঠুরিতে থাকতে হচ্ছে যা নিশ্চিত ভাবেই আমার অসুস্থ মা বাবার জন্য আরো ক্ষতির কারন হচ্ছে।

           ৭. অবিলম্বে আমার মা বাবার জন্য চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবার সরবরায় অপ্রিহার্য হয়ে পড়েছে। তাঁর চিকিৎসা , বিশ্রাম ও নিরাময়ের জন্য তাঁকে পূর্ব পাকিস্তান চলে যেতে হবে।

            ৮.এসব ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করার জন্য আমাদেরকে সমস্ত ঋণ শোধ করে যেতে হবে। এজন্য আমাদের অগ্রীম ৫০০০ টাকার প্রয়োজন। এ টাকা আপনার কমিটির লোক মারফত কিংবা আপনার পছন্দনীয় আস্থাভাজন কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রদান করতে পারেন।

প্রযত্নেঃ  ড.এ ওয়াই এম আবদুল্লাহ

১ মৌলভী বাজার

১ মার্চ,১৯৫০

শ্রদ্ধাসহ,

আপনার একান্ত বিশ্বস্ত

কাজী সান-ইয়াৎ সেন

উপরোক্ত পত্রটি কায়েদে আজম রিলিফ ফান্ডের করাচিতে প্রধান শাখায় পাঠানো হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল তারা কাজী নজরুল ইসলামকে সহায়তা তো করেই নি, তার উপর হিন্দু , কাফির বলে গালাগাল দেয়। আর এটাই অবশ্যম্ভাবী ছিলো। অথচ স্বাধীনতার বিপক্ষের বাংলাদেশি আগাছারা কত সুন্দর ভাবে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে ব্যবসায় নেমেছে। ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে। ছি!

১৯৫২ সালের ২৭ জুন কাজী আবদুল ওদুদকে সম্পাদক করে “নজরুল নিরাময় সমিতি” গঠন করা হয়। ১৯৫৩ সালের ১০ মে কবিকে সস্ত্রীক লন্ডন পাঠানো হল। ডক্টর রাসেল ব্রেন, ই এ বেটন, ম্যাককিসক, উইলিয়াম স্যারগ্যান্টে প্রমুখ নামী দামী চিকিৎসকরা খুব চেস্টা করলেন রোগ মুক্তির জন্যে। কিন্তু কোনো ফল না হওয়ায় তারা অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। কবির শরীরের বিভিন্ন অংশের এক্সরে প্লেট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠানো হল। রিপোর্টে ধরা পড়লো কবির মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ সংকুচিত হয়ে আসছে। কবি যদি সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা পেতেন তাহলে তিনি আরোগ্য হতেন।

হাল ছাড়লেন না কবির বন্ধুরা। কবিকে নেয়া হল ভিয়েনার প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী ডক্টর হান্স ফকের কাছে। ডক্টর হান্স ফক দীর্ঘ পরীক্ষা শেষে বললেন অনেক দেরী হয়ে গেছে! কবির অসুখের নাম হল পিকস ডিজিসকবিকে ১৯৫৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর কোলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। লন্ডন ভিয়েনার সমস্ত রিপোর্ট একত্র করে পাঠানো হল সোবিয়েত ইউনিয়নে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। সবার মুখে এক কথা, “Sorry! It’s too late!”

১৯৬২ সালের ৩০ জুন কবিপত্নী মারা যান। তাঁকে কবর দেয়া হল চুরুলিয়ার পিরপুকুরে। কবি এতে যেন আরো বেশি নির্বোধ হয়ে পড়লেন। আড়ষ্ট হয়ে গেল কবির জিহ্বা। কবির সামনেই কবির প্রিয় পুত্র নিনি মাত্র ৪২ বছর বয়েসে ১৯৭৪ সালে মারা গেলেন। নির্বাক হতবুদ্ধি কবি যেন আরো বেশি ভেঙে পড়লেন। যদিও এইসব অনুভূতি তাঁর কাজ করছিলোনা তাও তাঁর পুত্রবধুদের ভাষায় তাঁর শুধু মনে হত যে, তাঁর কিছু নেই; কিছু একটা নেই।

কবি নির্বাক হয়ে রইলেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর গান-কবিতা শতগুণ বাকশক্তি নিয়ে জ্বলে উঠলো যেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর গান ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরনার সম্বল। মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে তারা গাইতো “কারার ঐ লৌহকপাট…” অবশেষে স্বাধীন হল বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৪ মে ১১ টা ৪০ মিনিটে কবিকে নিয়ে আসলেন বাংলাদেশের মাটিতে।

প্রথমে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বিপুল উদ্দীপনায় ২৫ মে কবির জন্মদিন পালিত হয়। এরপর তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হল।

কিছু অমলিন স্মৃতির রঙিন পাতাঃ

১৯৫৫ সালে ঢাকার বর্ধমান হাউজে শিল্পী আবদুল আলীম, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এর সাথে কবি (মাঝে)

কবিকে নিয়ে আসা হল ঢাকায়

ধানমন্ডি কবি ভবনে কবি ও বঙ্গবন্ধু

side effects of drinking alcohol on accutane

কবি তাঁর পরিবারের একাংশের সাথে

চুরুলিয়ায় নিজগৃহে স্বজনদের সাথে কবি।

কলকাতায় এক আড্ডা থেকে তোলা দুর্লভ একটি ছবি

কবির সঙ্গে রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চার প্রাণ পুরুষ আবদুল আহাদ

সান্ধ্য অনুষ্ঠানে নজরুল

প্রথম ছেলে বুলবুল কোলে নজরুল। নিচে বসে আছেন স্ত্রী প্রমীলা দেবী ও শাশুড়ি গিরিবালা

ধানমন্ডি কবি ভবনে

কবি নজরুল ও জসীমউদ্দীনের দুর্লভ ছবি, পিজি হাসপাতালের ১১৭ নং কেবিন

টাঙ্গাইলে কবি নজরুলের দুর্লভ ছবি। বামে নাতনী কাজী উমা এবং ডানে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের

তরুণ কবি

১৯৭৩ সালে ধানমন্ডির কবিভবনে কাজী তার পরিবারের সদস্যদের সাথে

কবির সাথে তাঁর সুহৃদ মোতাহার হোসেনের অত্যন্ত দুর্লভ একটি ছবি

কবি নজরুলের সাথে জসীমউদ্দীনের আরেকটি দুর্লভ ছবি

কবি নজরুলের সাথে জসীমউদ্দীনের আরেকটি দুর্লভ ছবি

লন্ডনে চিকিৎসারত অসুস্থ প্রমীলাদেবীর মাথার শিয়রে কবি নজরুল

পারিবারিক ছবিতে নজরুল

পুরস্কার ও সম্মাননাঃ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর কবিকে ডক্টর অব লিটারেচার উপাধি দেয়া হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। ১৯৭৬ সালে একুশে পদক নিজেই ধন্য হয়ে গেল তাঁর হাতের ছোঁয়া পেয়ে। কিন্তু যাঁর জন্য এত কিছু, তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে।১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী পদক প্রদান করে। ১৯৬০ সালে ভারত সরকার নজরুলকে পদ্মভূষন উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৬৯ সালে তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডি.লিট উপাধি পান।

পঞ্চত্বপ্রাপ্তিঃ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নজরুল তাঁর আজন্ম দারিদ্য হতে মুক্ত হয়েছিলেন সত্যি। কিন্তু এটাও হল বড্ড অসময়ে। তিনি উপভোগ করতে পারেন নি এর কিছুই। আজীবন দারিদ্রের সাথে লড়াই করে গেছেন তিনি। ১৯৭৫ সালে কবির স্বাথ্য দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কবি আক্রান্ত হন “ব্রাঙ্কো নিউমোনিয়া” রোগে। ২২ জুলাই তাঁকে পিজি হাসপাতালের ১১৭ নং কেবিনে ভর্তি করা হয়। ডাক্তার নুরুল ইসলাম (পরবর্তীতে জাতীয় ডাক্তার) এর নেতৃত্বে ডাক্তার নাজিমুদ্দৌলা, সেভিকা শামসুর নাহার কবির, সেবক ওয়াহিদুল্লাহ ভুঁঞা কবির চিকিতসা তদারকি করতেন। কিন্তু সক প্রচেস্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। walgreens pharmacy technician application online

২৬ আগস্ট , ১৯৭৬ সাল রবিবার। সকাল ১০ টা ২০ মিনিট। ৩৪ বছরের দীর্ঘ যন্ত্রনা থেকে কবি মুক্ত করে নিলেন নিজেকে। তাঁর বিদ্রোহী নিশ্বাসের সর্বশেষ স্ফুলিঙ্গটি বাংলার আকাশে ছড়িয়ে দিয়ে ৭৭ বছর ৩ মাস বয়সে কবি পাড়ি জমালেন অচেনা রাজত্বে। তাঁর শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে। সেখানে ঘুমিয়ে আছেন বাংলার বিদ্রোহকামী জনতার প্রথম বুলেট কিংবা প্রথম কবিতা। ঘুমাও কবি, ঘুমাও। ঘুমের বড় কষ্টে ভুগেছো তুমি। তুমি ঘুমাও……………

তথ্যসূত্রঃ 

  • নজরুল কিশোর-জীবনী, কেয়া বালা, কবি নজরুল সরকারি কলেজ
  • মাতাল তরণী, হুমায়ুন আজাদ
  • আমার বন্ধু নজরুল, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়
  • নজরুল জীবনী, রফিকুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ
  • বাঁধনহারা নজরুল, সিকান্দার ফয়েজ amiloride hydrochlorothiazide effets secondaires
  • কবি নজরুল ইসলামঃ স্মৃতি কথা, মুজাফফর আহমেদ
  • যুগ কবি নজরুল, আব্দুল কাদির
  • নজরুল চরিত মানস, সুশীলকুমার গুপ্ত
  • বিদ্রোহী কবি নজরুল, আবুল ফজল
  • নজরুল, হায়াৎ মামুদ

You may also like...

  1. দুরন্ত জয় বলছেনঃ

    :-bd :-bd :-bd

    অসাধারণ তথ্যবহুল এক পোস্ট।

    অনেক কিছু জানলাম জাতীয় কবি সম্পর্কে।

    পোস্টটি স্টিকির দাবী জানাচ্ছি।

  2. :-bd :-bd :-bd দারুন হ :য়েছে লেখাটি। স্টিকি করার দাবি জানাই।

  3. শঙ্খনীল কারাগার বলছেনঃ

    আসাধারণ তথ্যবহুল মেগা পোস্ট। নজরুলকে নিয়ে এমন গবেষণা মুলক বিশাল তথ্যসমৃদ্ধ পোস্ট এর আগে কোনো ব্লগে আমি দেখেছি বলে মনে পড়েনা। পোস্টটি স্টিকি করার আবেদন রইলো।

  4. তারিক লিংকন বলছেনঃ

    বাংলা ব্লগ না কেবল? বাংলা দৈনিকেও এতোটা তথ্যবহুল লিখা খুব একটা চোখে পরে না! আপনার পরিশ্রম তবেই সার্থক হবে যখন সবাই আপনার লিখার মূল চেতনাটা ধরতে পারবে। আপনাকে অফুরন্ত ধইন্যা…
    %%- %%- %%- %%- %%- =D> =D> =D> =D>

    আর বিদ্রোহী কবিকে ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^

    ক) আমার জানা মতে বিদ্রোহী কবি নজরুলও আরনেস্ট হেমিংওয়ের মত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোদ্ধাহত একজন যোদ্ধা!! আগামীকাল আমি তথ্যসুত্র সহ মূল তথ্য দেয়ার চেষ্টা করব!!!

    খ) নজরুলই মনে হয় বাংলা ভাষার প্রথম কবি যিনি ধর্মীয় দুইদল উন্মাদদের হাতে নাজেহাল হইছে এবং একপর্যায়ে দুই পার্টিই পারলে কোলে তুলে নাচছে!! আফসোস এইটাই ধর্ম-উম্মাদদের মৌলিক এবং অনন্য স্বভাব…

    গ) কৃষ্ণ মোহাম্মদের বাবা বিদ্রোহী নজরুল আজন্ম আপাদমস্তক একজন ইহজাগতিক শিল্প প্রতিভা ছিলেন।

    আপনার এই অসামান্য তথ্যভাণ্ডার ধর্ম-উম্মাদদের চোখ খুলবে কিনা জানি না তবে সত্যান্বেষীদের দারুণ কাজে দিবে।।

  5. মুহাম্মাদ অাশিকুর রহমান বলছেনঃ

    ধন্যবাদ, অসংখ অসংখ ধন্যবাদ।

  6. অসীম নন্দন বলছেনঃ

    সোজা প্রিয়তে রেখে দিলাম ^:)^

  7. আপনি মানুষ না এলিয়েন? আমার পড়া নজরুলকে নিয়ে সেরা লেখাগুলোর একটা এটা।

    m/ m/ m/

  8. শ্রাবণ বলছেনঃ

    আপনার প্রথম পোস্টটা পড়ে আপনাকে আউল ফাউল ব্লগার মনে করেছিলাম। সাম্প্রতিক পোস্টগুলো সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে।

    শুভকামনা রইলো।

    venta de cialis en lima peru
  9. বাহ্…. অসাধারণ…. শুধু তথ্যবহুল নয় লেখাটায় এমন একটা কিছুছিল যা পাঠকদের চুম্বুকের মত ধরে রেখেছে। ~O)

  10. চাতক বলছেনঃ

    ভৃগু ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেয়ার মত নবোদ্যমে শব্দের ছন্দে নাচার মত কাব্য প্রতিভা আজকাল জন্মায় না। জন্মালেও সেই ডঃ আজাদের মত করে নব্য পয়গম্বরদের পদচিহ্ন আঁকা দেখতে পায় মুক্ত-কবিদের বুকে।

    আপনার পোস্টে কোন সমালোচনা করব না শুধু বলব ইলেকট্রন রিটার্নস লাইক আ হ্যারিকেন।

    ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ :-bd :-bd :-bd :-bd :-bd m/ m/ m/ m/

  11. অংকুর বলছেনঃ

    অনেক তথ্যবহুল একটা পোস্ট । কাজী নজরুল ইসলাম আমার প্রিয় কবি । তার সম্পরকে জানতে পেরে অনেক খুশি হলাম :-bd :-bd :-bd :-bd :-bd

  12. দুরন্ত জয় বলছেনঃ

    পোস্টি স্টিকি করার জনু কতৃপক্ষকে ধন্যবাদ।

    প্রিয়তে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। এখন নিব…

  13. ইহাকে বলে তথ্যমূলক এবং বিশ্লেষণ মূলক পোস্ট। শুধু উইকি থেকে কপি পেস্ট না করে বই ঘেঁটে বিভিন্ন তথ্য নিয়ে বানানো পোস্ট। :bz :bz :bz :bz :-) :-) :-) =D> =D> =D> =D>

  14. আমি আগে কখনো জাতীয় কবিকে নিয়ে এতো তথ্য বহুল লেখা পড়ি নি !!!! দারুণ হইছে… =D> =D> =D> =D> =D> =D>

  15. স্পীকার বলছেনঃ

    নজরুলকে নিয়ে এরকম একটা বিস্তৃত লেখা পড়ে ভাল লাগল =D> =D> =D>

  16. এফ জেড করিম বলছেনঃ

    পোস্টটি অত্যন্ত সুন্দর একটা পোস্ট। অনেক তথ্যবহুল । লেখক , অনেক পরিশ্রম করে – লিখেছেন। কিন্তু , কয়েক জায়গায় লেখক – নজরুল এবং ইসলাম এবং নজরুলের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে একটু টানাটানি করবার চেষ্টা করেছেন। যেটার সাথে আমি কিছুদিন আগের প্রাসঙ্গিক একটি লিখার লিঙ্ক লেখককে দিচ্ছি .. . ( যদিও এখানে আস্তিক নাস্তিক ক্যাচাল ছিল , সেটা লেখক ইগ্নোর করলেই ভাল – শুধু রেফারেন্সটা দেখবেন )

    https://www.amarblog.com/fzkarimbd/posts/179324

    এরপর সেখানে আকাশ মালিককে করা কমেন্টগুলি দেখতে পারেন। বিষয়ের আল্টিমেট ফয়সালা করার জন্যে – একটা ফান পোস্ট দেয়া হয় – https://www.amarblog.com/fzkarimbd/posts/179354 ( অবশ্য , এটা করার জন্যে আমাকে আমার লেখা ফার্স্ট পেজে আস্ তে দেয়া হয়না )

    পোস্ট দুইটি আশা করি দেখবেন…
    একাংশে উল্লেখ আছে –
    নজরুল হিন্দু ধর্ম বিষয়ক কবিতা, গান কেন লিখেছিলেন। নজরুল বলেছেন, “আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই। অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার সৌন্দর্যের হানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি।” [শব্দ-ধানুকী নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমদ, পৃষ্ঠা ২৩৬,২৩৭]

    এখানে নজরুল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন হিন্দু মুসলমানের মিলনের জন্য তিনি এ কাজ করেছেন। তখনকার রাজনৈতিক আবহাওয়া সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন কি প্রচণ্ড হিন্দু মুসলিম বিরোধ তখন বিরাজমান ছিল।

    ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই ডিসেম্বর রবিবার কলিকাতা এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপুল সমারোহ ও আন্তরিকতা সহকারে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সেখানে তিনি বলেন,

    “কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়।

    আমি শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। [নজরুল রচনাবলী - ৮, পৃষ্ঠা ৩, ৫]

    তাহলে – কোনটা , হিন্দুও না , কাফেরও না – তাহলে – কি ?
    উত্তর নজরুলের মুখে -

    ১৯৪০ সালে কলিকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিরি ঈদ-সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণ নজরুল বলেছিলেন, “ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছে।” [নজরুল রচনাবলী - (৭) পৃষ্ঠা ৩৩]

    ( http://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%80_%E0%A6%A8%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B2_%E0%A6%87%E0%A6%B8%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AE – এখানে উল্লেখ আছে – নজরুল ১৯৪২ সালে বাকক্ষমতা হারান , আর এই উক্তিটি ১৯৪০ সালে , অর্থাৎ তাঁর লেখার শেষকালে।আপনার কি এরপরও সন্দেহ থাকবার কথা – তাঁর বিশ্বাস নিয়ে । )

    নজরুলের জীবনের একমাত্র সাক্ষাৎকার যেটা উনি ১৯৪০ সনে দিয়েছিলেন, চিরদিনের জন্য অসুস্হ হয়ে যাবার কিছুদিন আগে- সেখানে উনি বলেছিলেন,

    “মুসলমানরা যে একদিন দুনিয়াজোড়া বাদশাহি করতে সমর্থ হয়েছিল সে তাদের ইমানের বলে। আজ আমরা ইমান হারিয়ে ফেলেছি। ইমানের প্রকৃত অর্থ ‘পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পন’। ভারতে রাজা-বাদশাদের দ্বারা ইসলাম জারি হয় নাই। আর মানুষের মঙ্গলের বিধান করেছেন আউলিয়া ‘পীর’ বোজর্গান। সারা ভারতে হাজার আউলিয়ার মাজার কেন্দ্র করে আজো সেই শান্তির কথা আমরা শুনতে পাই। আমি মওলানা আকরম খাঁ ও মৌলবি ফজলুর হক সাহেবকে বলেছিলাম যে, আসুন, আপনারা সমস্ত ত্যাগ করে হজরত ওমর (রাঃ) ও আবুবকরের (রাঃ) আদর্শ সামনে রেখে সমাজে লাগি, আমি আমার সব কিছু ছেড়ে কওমের খেদমতে লাগতে রাজি আছি।” [অতীত দিনের স্মৃতি, সম্পাদনা - আব্দুল মান্নান সৈয়দ পৃষ্ঠা ১৯২,১৯৩]

    তারচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় :
    “পূজিছে গ্রন্থ’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন।”

    এটাও , ১৯৪০ সালে । বোবা হয়ে যাবার পূর্বমুহুর্তে।তার মানে শেষ দিকে ।

    ৫ / নজরুল বাংলা ভাষায় সর্বাধিক “হামদ-নাত” এর রচয়িতা।
    গ্রামোফোন কোম্পানী থেকে নজরুলের হামদ-নাত যখন বের হোতো, তখন মাঝে মাঝে রেকর্ডের ওপর “পীর-কবি নজরুল” লেখা থাকত।

    ৬ / ১৯২২-এর অক্টোবরে নজরুলের যে ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্য প্রকাশিত হয় তার ১২টি কবিতার মধ্যে ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তস্বরধারিণী মা’ আগমনী’, ‘ধূমকেতু’ এই পাঁচটি কবিতা বাদ দিলে দেখা যায় বাকি ৭টি কবিতাই মুসলিম ও ইসলাম সম্পর্কিত। (১৯২২) – অগ্নিবীণা , উনার জীবনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ।তাঁর মানে শুরু থেকেই।

    আশা করি বুঝেছেন।

    তারচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় :
    “পূজিছে গ্রন্থ’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন।”

    তারচেয়ে বড় বিষয় -
    এখানে , বলা হচ্ছে – মুহাম্মদ সাঃ নামের একজন মানুষের হাত দিয়েই তো , গ্রন্থ এসেছে – তাহলে কেন মানুষকে অপমান কর।যেখানে , স্রস্টা মানুষকে এতো মর্যাদা দিয়েছেন। এটা সত্য কারণ -
    এবং এই কবিতার শেষ লাইন হচ্ছে -

    এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।

    এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
    ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
    এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,
    এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!

    নবীর খোদার মিতা। সেই নবীও একজন মানুষ।

    আর উপরের লাইনের অর্থ হল – উনি ধর্মে ধর্মে প্রফেসীতে বিশ্বাস করতেন -

    যে সিদ্দিক আর আমীনে খুঁজিছে বাইবেল আর ঈশা,
    তাওরাত দিল বারে বারে যেই মোহাম্মদের দিশা,
    পাপিয়া কন্ঠ দাউদ গাহিল যার অনাগত গীতি,
    যে মোহাম্মদ অথর্ব্ববেদ-গান খুঁজিতেছে নিতি,
    সে অতিথি এল কতকাল ওরে আজি কতকাল পরে
    ধেয়ানের মণি নয়নে আসিল বিশ্ব উঠিল ভরে”
    সূত্রঃ মরু ভাস্কর (নওকাবা)-কবি কাজী নজরুল ইসলাম

    এজন্যেই , তিনি অন্যধর্মকে এতো মর্যাদা দিয়েছেন।

    আশা করি – আরও আগাতে পারবো… আপনার কথার প্রেক্ষিতে। আবারো বলি- আপনার পোস্টের বিষয়বস্তু অত্যন্ত চমৎকার – এবং পুরো পোস্টের সাথেই আমি একমত – শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বেলাটা ছাড়া। সুন্দর পোস্টের জন্যে আপনাকে অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ। :x :x :x :x

    • ইলেকট্রন রিটার্নস বলছেনঃ

      আমি আপনার কমেন্ট টা পড়ে একসাথে অবাক হয়েছি, আশ্চর্য হয়েছি, হতাশ হয়েছি। পোস্টের কোথাও আমি নজরুলকে ধর্ম বিদ্বেষী বলিনি। নজরুল অবশ্যই মুসলিম ছিলেন। তবে সাম্যবাদী মুসলিম। তিনি একহাতে অসংখ্য গজল লিখে গেছেন, অন্য হাতে লিখেছেন শ্যামাসঙ্গীত। তিনি নিজের সাম্যবাদী কবিতার মাঝেই নিজের পরিচয় দিয়ে গেছেন।

      কিন্তু আপনার কমেন্ট পড়ে প্রচন্ড অবাক হলাম। আপনি নজরুলকে একজন খাঁটি মৌলবাদী কবি হিসেবেই যে দাবী করলেন। আপনার কমেন্ট পড়ে মনে হচ্ছে নজরুল আল কায়দার কোনো সদস্য। মনে হচ্ছে, তিনি হিন্দুদের ঘরে আগুন দিয়ে বেড়াতেন।

      আমি বুঝলাম না। একজন স্বঘোষিত সাম্যবাদী, যিনি সারা জীবন ধর্মের সাম্য চেয়েছেন, যিনি হিন্দু বিয়ে করে কাফির উপাধী পেলেন, যিনি নিজের পুত্রের নাম রেখেছিলেন, কাজী সান ইয়াৎ সেন, কাজী কৃষ্ণচন্দ্র, যার স্ত্রী প্রতি সন্ধ্যায় ঘরে ধূপ জ্বালিয়ে উলু দিতেন, এমন একজন মানুষকে জোর করে মৌলবাদী বানাতে আপনাদের একটুও বাঁধে না? বেগম রোকেয়া মৌলবাদীর জ্বালায় কি পরিমাণ অতিষ্ঠ ছিলেন জানা আছে? অথচ, তাকে আপনারা “মুসলিম” নারী জাগরণের অগ্রদূত বলে এখন দাবী করেন। “আল কেমী” শাস্ত্রের উদ্ভাবক ইবনে সিনা কে আপনারা শান্তিতে রাখেন নি, ওমর খৈয়ামকে রাখেননি, আল হাজেন কে শান্তি দেন নি, শান্তি দেন নি আবদুস সালামকে, শান্তি দেন নি শামসুর রাহমান, শওকত ওসমানদের, শান্তি দিচ্ছেন না বর্তমানের হাসেম আল ঘাইলি কে, শান্তি দিচ্ছেন না কাউকে! কিন্তু এদের মৃত্যুর পর এদের কবরের উপরই শান্তির আগরবাতি জ্বালিয়ে নিজেদের সম্প্রদায়ের উৎকর্ষ দাবী করে বসবেন।

      একটা অনুরোধ করি? নজরুলকে প্লিজ ভাগ করবেন না। এই বেচারাকে একটু শান্তি দেন। ইনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। তার বিনিময়ে কিচ্ছু পান নাই। এমনকি চিকিৎসার জন্যও অ্যারাবিয়ান কান্ট্রি থেকে কোনো হেল্প পান নাই। এক কথায় বাংলা সাহিত্যে দুইজন অভাগা কবির একজন হলেন জীবনানন্দ, আরেকজন নজরুল। এদেরকে মৃত্যুর পর একটু শান্তি দেন।

  17. দারুন।
    স্টিকি করার আবেদন জানাই।

  18. কি লিখেছে গুরু, http://sovyota.com/wp-includes/images/smilies/77.gif নজরুল আমার ছোট্ট বেলার নায়ক! ক্লাস ফোরে প্রথম নজরুলের গান শিখেছিলাম _ “যায় ঝিলমিল ঝিলমিল, ঠেউ তুলে দেহের কোলে” আমার গানের স্যার আমাকে বলেছিলেন তোমার গলা নজরুলের গানের জন্য, সেই থেকে নজরুলকে গানের মাধ্যমে জেনেছি, আর পাঠ্য বইয়ে তো আরো আগে থেকেই চিনেছি! নজরুল চির যুবা, নিজেই নিজেকে বর্ননা করেছেন তিনি “মম এক হাতে বাকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রন তূর্য”

  19. নজরুল শুধু প্রিয় কবিই নয়, প্রিয় ব্যক্তিত্বও

  20. আবির দত্ত অভি বলছেনঃ

    …কিছু বলার ভাষা নেই…পড়তে গিয়ে চুম্বকের মত আটকে ছিলাম…এটাকেই ”লিখা” বলে…আপনি আসলেই বস…!!!

  21. সাধারণ কথক বলছেনঃ

    প্রচুর সময় এবং শ্রমসাধ্য লেখার জন্য আনুষ্টানিকভাবে ধন্যবাদ। মোহিতলাল মজুমদার সজনীককান্ত ছদ্মনামে ব্যাঙ কবিতা শনিবারের চিঠিতে দেননি। শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত এবং মোহিতলাল আলাদা দুই সাহিত্যিক। নজরুলের রাজনৈতিক জীবন ছুঁয়ে গেলে ভাল হত। নজরুল নিখিল ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। একবার নির্বাচনে প্রার্থীও হয়েছিলেন।.

    zovirax vs. valtrex vs. famvir
  22. অর্ধেক অর্ধেক করে দুবারে শেষ করলাম। কবিকে নিয়ে এর আগে এতো তথ্যসমৃদ্ধ লেখা আমি কখনোই পড়িনি। এখনকার প্রায় ৬০% তথ্য আমি নতুন করে জানলাম। এতো সুন্দর, তথ্যপূর্ণ ভাবে লেখাটা লিখবার জন্য এবং উনার সম্পর্কে জানানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

  23. রাহানুমা সারাহ্‌ বলছেনঃ

    অসাধারণ এবং তথ্যবহুল পোস্ট! নজরুলকে নিয়ে এমন একটা আর্কাইভ ভীষণ দুষ্প্রাপ্য!

  24. নজরুলের উপর লেখা মোটামুটি পরিপূর্ণ একটি পোষ্ট। তবে গোটা পোষ্টে একবারও নজরুলের প্রথম স্ত্রী সৈয়দা নিগারের কথা ঊল্লেখ নেই দেখে কিছুটা অবাক হয়েছি। ( কোন এক অজ্ঞাত কারনে যার সঙ্গে কবির সংসার করা হয় নি) ।প্রথম জীবনে নজরুলের কাব্য চর্চার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরনা ছিলেন সৈয়দা নিগার।

    • অপার্থিব বলছেনঃ

      সৈয়দা নিগার নয় হবে সৈয়দা নার্গিস খানম।

    • প্রায় অনেক বড় পোস্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক কিছুই এড়িয়ে গিয়েছি। এবং এটা অবশ্যই অন্যায় করেছি। ৪০০০+ পোস্টের একটা পোস্ট মানুষ এত আগ্রহ নিয়ে পড়বে সেটা হয়তো ভাবিনি। তবে, ইচ্ছা আছে এই পোস্টকে সমৃদ্ধ করার। উদাহরণস্বরূপ নজরুলের সৈনিক জীবনের ঘটনা গুলো নিয়ে মিনিমাম ১৫০০ শব্দ লিখা যায়। আমি এই পোস্ট ধীরে ধীরে আরো সমৃদ্ধ করবো। প্রয়োজনে এটাতে ১০/১২ হাজার শব্দ থাকবে। তাও, ডকুমেন্ট গুলো সব একসাথেই থাকবে। ইন্টারনেটে এমন একটা ডকুমেন্ট সম্ভবত খুব দরকার। মন্তব্যের জন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। :)

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.