৪৩ বছরের বকেয়া যন্ত্রণা কিংবা জন্মপরিচয়হীন কিছু বাস্টার্ডের গল্প………

874

বার পঠিত

” জয়া, জয়া… ”
মেয়েকে ডাকছে জাফর সাহেব। কিন্তু মেয়ের কোন সাড়া-শব্দই নেই ! নিজের ঘরেও নেই; কথায় গেলো মেয়েটা ! ভাবতে ভাবতে জাফর সাহেব তার বাড়ির উত্তর দিকে হাঁটতে লাগলো। হঠাৎ দেখল যে জয়া উত্তরের ঘরটি খোলার চেষ্টা করছে। খুব দ্রুত সেদিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। জয়া কিছু বুঝে উঠার আগেই ঠাস্‌ করে তার গালে একটা চড় বসিয়ে দিলো জাফর সাহেব।
” এর আগে কতো বার বলেছি যে, এখানে আসবে নাহ্‌।
আর তুমি কিনা এই ঘরটি খোলার চেষ্টা করছ..! অবাধ্য মেয়ে কোথাকার ”
কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো জয়া। জাফর সাহেব সেই ঘরটির দিকে একবার তাকালেন। নাহ্‌ আর সহ্য করতে পারছেন না তিনি। বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। খুব রাগ হচ্ছে তার; কেমন যেন একটা ঘৃণাও হচ্ছে। doctorate of pharmacy online

” কি আছে তোমার ঐ বদ্ধ ঘরে ??? ”
উত্তরের অপেক্ষা না করে আবারও জয়ার মায়ের প্রশ্ন-
” আজ ২৪ বছর ধরে দেখছি ঐ ঘরটা এইভাবে বন্ধ করে রেখেছ তুমি।
কখনো জানতে চাইলেও বলনি বরং ছটফট করে উঠে চলে গিয়েছো;
তাই কৌতূহল হলেও কিছু জিজ্ঞাসা করিনি কখনো।
কিন্তু আজ ঐ ঘরটা খুলতে গিয়েছে বলে তুমি জয়াকে মারলে !
আজ তোমায় বলতেই হবে কি আছে ঐ ঘরটাতে ?! ”

চোখদুটো রক্ত লাল হয়ে গেছে জাফর সাহেবের, মাথা থেকে ঘাড় পর্যন্ত প্রচণ্ড জ্বালা করছে। খুব রাগ নিয়ে তাকালো জয়ার মায়ের দিকে। বরাবরের মতোই জাফর সাহেবের সেই রাগী দৃষ্টি দেখে ভয় পেলো জয়ার মা। কিছু না বলে চলে গেলো তিনি। ছাদে গিয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকার পর এখন একটু ফ্রেশ লাগছে জাফর সাহেবের কাছে। হঠাৎ করে মনে পরল যে তিনটায় আজ তার একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। এখনি না বের হলে বড্ড দেরী হয়ে যাবে। বাড়ি থেকে রিক্সার পথ তার অফিসের। কিন্তু হেটে যেতেই পছন্দ করেন তিনি। বাড়ির সামনেই একটা টং দোকান। সারাদিন আড্ডাবাজি আর চা খাবার ধুম চলে সেখানে। কিন্তু জাফর সাহেবের কাছে মোটেই সেসব ভালো লাগে নাহ্‌। গেইট থেকে বের হতেই সেই দোকানটার মালিকের ছেলে তাকে সালাম দিলো। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির সাথে উত্তর নিলো সালামের। এলাকার লোকজনের কাছে অদ্ভুত এক চরিত্রের লোক জাফর সাহেব। এলাকাবাসীর মতে, অহংকারী স্বভাবের লোক তিনি। কারো সাথে আজ পর্যন্ত ঠিকভাবে ভালো-মন্দ কোন কথাই তিনি বলেন নি। চোখে-মুখে সবসময় একটা বিরক্তির ভাব নিয়ে চলাফেরা করেন তিনি। তবে তার মেয়ে আর স্ত্রী মোটেও সেরকম নয়। তারা বেশ অমায়িক। বাসার সামনের গলিটার শেষ প্রান্তে জাফর সাহেব। কয়েকজন ছেলে মিলে সেখানে ক্রিকেট খেলছে। এদের দেখেই মেজাজটা একটু খারাপ হয়ে গেলো তার।

” সারাদিন কোন পড়ালেখা নাই; শুধু খেলাধুলা আর চিৎকার, চেচামেচি !
যত্তসব বেয়াদব ছেলেপেলের দল। ”
নিজ মনেই বিড়বিড় করেতে থাকে জাফর সাহেব। অফিসে ঢুকেই দেখে যে রমিজ আলী নামের লোকটা তার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আরেকজনের সাথে কথা বলছে। এই লোকটাকে কিছুতেই তিনি সহ্য করতে পারেন নাহ্‌। বিছরি এক ভঙ্গিমায় পান খায় লোকটি। কথা বলার ধরনটাও বিরক্তিকর ! যাকে দেখেই পুরনো একটা স্মৃতি খুবই খারাপ একটা স্মৃতি মনে পরে যায় তার; যেই স্মৃতিটা বহু কাল ধরে ভুলতে চাচ্ছে সে। কোনোরকম মিটিং শেষ করে বাড়ির পথে রওনা দিলেন তিনি। নাহ্‌ , আজ আর হেটে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না তার। তাই একটা রিক্সায় করেই রওনা হলেন। বাড়ির সামনে নামতেই শুনলেন সেই দোকানটাতে কয়েকজন লোক মিলে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা করছে। একেকজন যুক্তি-তর্কের ঝড় তুলে দিচ্ছেন সেখানে। এসব দেখে আবারও খানিকটা বিরক্ত হলেন তিনি ।

” চলে আসছে একেবারে সরকার আর বিরোধীদল ! যত্তসব অহেতুক প্যাঁচাল ।”
আজকের দিনটা মোটেও ভালো যায়নি জাফর সাহেবের। সকাল থেকেই নানান সব কারণে তিরিক্ষি হয়ে আছে মাথাটা। হঠাৎ তার মনেহল যে সকালবেলা জয়াকে তিনি বেশ জোরে আঘাত করেছে। নাহ্‌ কাজটা তিনি একদম ঠিক করেন নি। মেয়েটাকে বুঝিয়ে বললেই পারতো। কিন্তু তিনি তো জয়াকে এর আগেও একবার বলেছিল ঐ ঘরটিকে নিয়ে এতো কৌতূহল না করতে। কিন্তু সে কথা শোনে নি। তাই তিনি যা করেছেন বেশ করেছেন। নিজ মনে ভাবছেন জাফর সাহেব। মেয়েটার ঘরের আলো বন্ধ কেন ! ও তো কখনো এতো তাড়াতাড়ি ঘুমায় নাহ্‌। ঘরে গিয়ে দেখল সত্যিই সে আজ ঘুমিয়ে পরেছে। জাফর সাহেব খুব ভালোবাসেন তাঁর মেয়েকে। কিন্তু কখনোই সেটার বহিঃপ্রকাশ করেননি। মেয়ের মাথায় কিছুক্ষণ হাত রেখে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন তিনি। ওদিকে জয়ার মা টেবিলে খাবার দিয়ে অপেক্ষা করছেন তাঁর জন্য। achat viagra cialis france

” জয়া খেয়েছে ? ”
কোন সাড়া নেই জয়ার মায়ের। চুপচাপ দুজনে খেয়ে নিয়ে যার যার মতো ঘুমাতে চলে গেলো। আজ থেকে টি২০ খেলা শুরু হয়েছে। জাফর সাহেব মিরপুরেই থাকেন। বাসা থেকে ১০-১৫ মিনিটের পথ স্টেডিয়াম। কখনই তিনি স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখেন নি। যা দেখার টিভিতেই দেখেছেন। স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার তেমন কোন ইচ্ছেই তাঁর নেই। তিনি আসলে ঠিক কোন দলটাকে সাপোর্ট করে সেটাই ঠিক ভাবে তিনি কখনো প্রকাশ করেন নি। তবে তিনি খেলা দেখেন। যাহোক, সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে এসে বসলেন। জয়া এমনিতে তাঁর বাবার পাশেই বসে কিন্তু আজ সে একেবারে কোণার চেয়ারটায় গিয়ে বসেছে। একটি বারের জন্যও সে তাঁর বাবার দিকে তাকায়নি। হঠাৎ পানির গ্লাসটা নিতে গিয়া বাবার চোখে চোখ পরে গেল তাঁর। ঠিক তখনই তাঁর চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরল। জাফর সাহেব সেটা দেখেও না দেখার ভান করে নাস্তা সেরে অফিসের পথে রওনা হল। কোনোদিন সে জয়ার গায়ে হাত তোলেনি। কাল প্রথমবারের মতো তাকে মেরেছে। নিজের কাছেও খারাপ লাগছে কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করেনি। কারণ তাঁর মনে হয়েছে যে সে যা করেছে ঠিক করেছে।

জয়ার কাছে তাঁর বাবাকে মাঝে মাঝে অদ্ভুত লাগে, অচেনা লাগে। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত সে তাঁর বাবাকে মন খুলে কথা বলতে কিংবা হাঁসতে দেখেনি। কিন্তু কি কারণে তাঁর বাবা এমনটা করে সেটা খুব জানতে ইচ্ছে হয় তাঁর। তবে ভয়ে কখনো সে তাঁর বাবাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করেনি কখনো। মায়ের কাছ থেকে জেনেছে তাঁর বাবাকে নাকি তাঁর মা-ও কখনো হাঁসতে দেখিনি। বাবার এমন আচরন মোটেও ভালো লাগে না তার। সবার বাবা কত্ত হাঁসি খুশি হয় কিন্তু তার বাবাটা… নানা রকম কথা ভাবতে ভাবতে কলেজে চলে গেলো জয়া।
অফিসে ঢুকেই সেই বিরক্তিকর রমিজ আলীর মুখোমুখি জাফর সাহেব। বিশ্রী একটা পানের গন্ধ তার সাথে। এই গন্ধটা জাফর সাহেবকে খুব পুরনো কিন্তু ভয়ংকর একটা স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়; যেই স্মৃতিটাকে সে কিছুতেই মনে করতে চায় না।

” কি সাহেব কেমন আছেন? ”
অদ্ভুত ভঙ্গিতে জাফর সাহেবকে প্রশ্ন করল রমিজ আলী। মুখে একরাশ বিরক্তি এনে জাফর সাহেব উত্তর দিলেন
” ভালো “।
” কেন যে এইসব লোকদের অফিসে ঢুকতে দেয়া হয় ! যত্তসব আন কালচার লোক ”
নিজ মনে বিড়বিড় করতে করতে নিজ কক্ষে চলে গেলেন জাফর সাহেব। রাহাত সাহেব আর জাফর সাহেব একই কক্ষে বসে। খেলা নিয়ে রাহাত সাহেবের উদ্দীপনার শেষ নেই; বাংলাদেশ টীমকে সে নিজের চেয়েও বেশী ভালোবাসেন। যখনই বাংলাদেশ আর পাকিদের খেলা হয় তখনই সে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখে; আর সাথে থাকে তার আদরের ছেলে দীপ্ত। কিন্তু এবার তার ছেলে কোন একটা কাজে বিদেশে থাকার কারণে তাকে বোধহয় একাই যেতে হবে ম্যাচটা দেখতে। একা একা খেলা দেখে মজা আছে নাকি ! অফিসে সবার চেয়ে জাফর সাহেবই তার বেশী ঘনিষ্ঠ। যদিও লোকটা গম্ভীর, তারপরেও তার কাছে জাফর সাহেবকে ভালো লাগে। তাই সে চিন্তা করলো যে জাফর সাহেবকে একবার বলে দেখবে তার সাথে ম্যাচ দেখতে যাবার কথা।

” কি খবর জাফর ভাই? আজ একটু বেশীই চুপচাপ মনে হচ্ছে… ”
চশমাটা নামিয়ে জাফর সাহেবের উত্তর-
” জী ভালো। আপনার কি অবস্থা ?”
” এইতো ভালো। আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিল-
” কি কথা?”
” বলছিলাম যে ২১ তারিখ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের খেলা। আমি তো প্রতিবারই সরাসরি স্টেডিয়ামে গিয়ে বাংলাদেশ-পাকিদের খেলা দেখি কিন্তু… ”
” কি কিন্তু ? ”
” এবারও ইচ্ছে আছে। তবে ছেলেটা দেশে না থাকায়, একা একা যেতে…
আপনি যদি আমার সাথে যেতেন খুব ভালো হতো।
আসলে একা একা খেলা দেখার চেয়ে সাথে সাথে কেউ থাকলে একটু বেশীই ভালো লাগে। ”
যদিও কিছুটা বিরক্ত হলেন জাফর সাহেব কিন্তু মানা করতে পারলেন নাহ্‌।
” আচ্ছা, ঠিক আছে যাবো। ”
মুখে কিছুটা তৃপ্তির হাঁসি এনে রাহাত সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করলো যে-
” তাহলে টিকেটটা বরং কিনেই ফেলি, জাফর ভাই? ”
উত্তরের অপেক্ষা না করে কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেন রাহাত সাহেব।
” একটা বিষয় নিয়ে এতোটা উৎসাহের কি আছে ! খেলা তো টিভিতেও দেখা যায়। ”

কিছুক্ষণ নিজমনেই কথা বললেন জাফর সাহেব। আজ অফিসে খুব একটা কাজ নেই। কয়েকটা হিসেব বাকি আছে; ওগুলো শেষ করেই বাড়ি চলে যাবেন তিনি। কিছুক্ষণ পর একজন পিয়ন এসে তাকে জিজ্ঞেস করলেন চা-কফি কিছু খাবেন কিনা। কোন উত্তর না দিয়ে কক্ষের চাবিটা পিয়নের হাতে দিয়ে বলল রাহাত সাহেব ফিরলে তাঁর কাছে চাবিটা দিয়ে দিতে। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে খবরের কাগজটা পড়তে পড়তে চোখটা লেগে আসল জাফর সাহেবের। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে চমকে গিয়ে উঠে পরলেন তিনি। খুব ঘাম হচ্ছে তাঁর, মাথা থেকে ঘাড়ের পেছন দিকটাই প্রচণ্ড ব্যাথা হচ্ছে, অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। নাহ্‌, পুরনো স্মৃতি গুলো কেন, কেন বার বার এভাবে তাঁকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় ! বিছানা থেকে নেমে সোজা উত্তরের সেই ঘরটির কাছে গেলেন তিনি। বন্ধ দরজাটার দিকে বার বার তাকাচ্ছেন তিনি। যতো বার তাকাচ্ছেন ঠিক ততবারই অসহ্য একটা জ্বালা হচ্ছে তাঁর বুকের মাঝখানটাতে। সে তাকাতে না চাইলেও বারবার তাঁর চোখ দুটি সেদিকে চলে যাচ্ছে। নাহ্‌ … এক ফোঁটা জল হ্যাঁ এক ফোঁটা জল যদি সে চোখ থেকে বের করতে পারতেন তাহলে তাঁর যন্ত্রণা অনেকটা কমে যেতো । কিন্তু অনেকবছর যাবত সে কাঁদতে পারে নাহ্‌। চাইলেও পারে না…

==============================================================
==============================================================

আজ ২১ তারিখ, রাহাত সাহেবের সাথে মিরপুর স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাবার কথা জাফর সাহেবের। তাঁর বাসা থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত মাত্র ১০-১৫ মিনিটের পথ । একটা ফোন কল আসলো জাফর সাহেবের। রাহাত সাহেবের ফোন, নিচে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। খুব উত্তেজনা আর উদ্দীপনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, একটা রিক্সাও ঠিক করে রেখেছেন। যতো দ্রুত সম্ভব স্টেডিয়ামে যাওয়া চাই। কারন আজ যে তাঁর প্রাণপ্রিয় টাইগারদের খেলা। হাতে একটা বাংলাদেশের পতাকা। জাফর সাহেব নিচে নেমে আসতেই রাহাত সাহেব বলল-
” উঠে পরুন…”
” হেঁটে গেলেই পারতাম। কাছেই তো… ”
রাহাত সাহেব একটু উত্তেজিত হয়েই বলল-
” নাহ্‌, রিক্সা করেই গেলেই ভালো হবে। যতো তাড়াতাড়ি যাবো, ততোই শান্তি…”

জাফর সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে রিক্সায় উঠে বসলো। বেশ সুন্দর একটা আবহাওয়া। স্টেডিয়ামের সামনে নামা মাত্রই অদ্ভুত এক উদ্দীপনা কাজ করছে রাহাত সাহেবের ভেতর। কিন্তু জাফর সাহেব একেবারেই নির্লিপ্ত ! জাফর সাহেবের এরকম নির্লিপ্ততা দেখে কিছুটা অবাক হলেন তিনি। যাহোক, স্টেডিয়ামে ঢুকে মাঝের দিকের দুইটা সিটে বসলেন তাঁরা। তাঁদের এক পাশের সিটগুলোতে এখনো কেউ বসেনি। আরেকপাশে অনেকগুলো অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়ে। তাঁদের গালে বাংলাদেশের পতাকা আঁকা। হাতে বাংলাদেশের অনেক বড় একটা পতাকা। খেলা শুরু হয়ে গেছে… প্রথমে বাংলাদেশের ব্যাটিং। কিছুক্ষণ পর রাহাত সাহেব লক্ষ্য করলেন যে তাঁদের পাশে যে সিটগুলো ফাঁকা ছিল তাতে বেশ কয়েকটা ছেলে এসে বসেছে। তাঁরা চোখে মুখে পাকিস্তানের পতাকা আঁকা, হাতেও একটা বেশ বড় আকারের পতাকা। খুবই রাগ হতে লাগলো তাঁর। কিন্তু খেলা দেখার নেশায় সে কিছু বলতে পারছিল নাহ্‌। কিন্তু জাফর সাহেব একবারও মাঠ ছাড়া অন্য কোন দিকে তাকান নি। কারন এতো লোকের ভিড় তাঁর ভালো লাগে নাহ্‌। তাই মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকাই ভালো। পারজগুলা পাকিস্তানের পতাকা উড়াচ্ছে। রাহাত সাহেবের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে; ইচ্ছে হচ্ছে সবগুলাকে ধরে থাপড়াতে। কিন্তু তিনি তাঁর রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে রাখছে বহু কষ্টে। ১১ অভারে হঠাৎ একজন টাইগার আউট হল ! আরে সাথে সাথে পারজগুলা পাকিস্তানের পতাকা উড়াতে উড়াতে ” পাকিস্তান জিন্দাবাদ ” বলে চিৎকার করে উঠলো। সেই চিৎকারের ধ্বনি কানে যাওয়া মাত্রই পুরো মাথাটা উলট-পালট হয়ে গেলো জাফর সাহেবের। বুকের ভেতরটা হাহাকার করতে লাগলো তাঁর। অস্থিরতায় নিমজ্জিত হয়ে গেলো তাঁর পুরোটা দেহ ! হ্যাঁ খুব পুরনো, খুব পুরনো ভয়ংকর সেই স্মৃতিটা তাঁর চোখের সামনে ভাসছে… অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে তাঁর। ঘাড় থেকে মাথার পেছনে আবারও সেই তীব্র জ্বালা…!

পাশ ফিরে আর কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সেই পারজগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো তিনি। হ্যাঁচকা টানে পাকি পতাকা বহনকারী ছেলেটাকে দাড় করে ফেলল। একটানে ছিঁড়ে ফেলল তাঁর পরিহিত পাকি জার্সিটা। প্রচণ্ড জোরে একটা চড় বসিয়ে দিল পারজটার গালে, সেই সাথে তার মুখে ছিটিয়ে দিলো একদলা থুথু ! আশেপাশের সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে জাফর সাহেবের দিকে। সবাই নির্বাক; নিরাপত্তা কর্মীরাও তাকিয়ে আছে অদ্ভুত ভঙ্গিমায়। জাফর সাহেব পারজটার হাত থেকে পাকি পতাকাটা নিয়ে পায়ের নিচে পিষতে লাগলো। আর চিৎকার করে পারজটাকে বলতে লাগলেন-

” হারামির বাচ্চা ! তুই মানুষের জন্ম নাহ্‌ !
তুই আমার দেশে, আমার মায়ের বুকের উপর দাঁড়িয়ে ” পাকিস্তান জিন্দাবাদ ” বলে চিৎকার করিস!
আমার মায়ের বুকে থাকার কোন অধিকার তোর নাই; তোর বাঁচার কোন অধিকার নাই।
এই দেশে থাকার কোন অধিকার তোর নেই।
তুই মর, তুই মর…! “

এই বলে পারজটার গলা চেপে ধরলেন জাফর সাহেব। রাহাত সাহেব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। এই জাফর সাহেব কে তিনি চেনেন নাহ্। তিনি তো জানতেন খুবই শান্ত-গম্ভীর স্বভাবের লোক তিনি। কিন্তু আজ হঠাৎ… দুজন পুলিশ এসে শান্ত করলেন জাফর সাহেব কে। কিন্তু কিছুতেই শান্ত হলেন নাহ্‌ তিনি। স্টেডিয়াম থেকে ছুটে বাড়ির পথে চলে গেলেন তিনি; পাগলের মতো ছুটছেন তিনি। বাড়ি ফিরে খুব জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলেন। জয়া দরজা খুলে দিলো। ঘাবড়ে গেলো বাবার এ অবস্থা দেখে। দরজা খোলা মাত্রই নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেলেন তিনি। নিজের আলমারিটা খুলে সেটার ড্রয়ারে পাগলের মতো কি যেন একটা খুজতে লাগলেন। জয়া তাঁর পেছন আসলো। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারছে নাহ্।

কিছুক্ষণ খোঁজার পর খুব খুবই পুরনো একটা চাবি নিয়ে আবারও ছুটলেন তাঁর সেই উত্তরের ঘরটার দিকে। আজ ৪৩ বছর যাবত বন্ধ এই ঘরটি। দরজাটা খোলার পর সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে নাহ্‌। জয়া একটা মোমবাতি নিয়ে আসলো। মোমবাতিটা নিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলেন জাফর সাহেব। মোমবাতির আলোয় মেঝেতে কালচে কালচে দাগ দেখলেন তিনি… এগুলো তাঁর বাবার রক্তের দাগ! ৪৩ বছর আগে ঠিক এইখানটাতে বসে জবাই করে মেরেছিল তাঁর বাবাকে ঐ পাকি শুয়রেরা। তীব্র যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে মারা যায় তাঁর বাবা। আর ঐ শূয়রেরা বিকট শব্দে হেঁসে উঠেছিলো। বাবাকে মেরে ফেলার পর চিৎকার করে পাশ থেকে ” পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে স্লোগান দিয়েছিলো একটা শুয়োর।
একটু সামনে আগাতেই সে খুঁজে পেলো একটা ছেঁড়া রক্ত মাখা শাড়ি। হ্যাঁ, এটা তাঁর মায়ের শাড়ি। শাড়িটার সাথে সাথে ঐ পাকি শুয়রেরা ছিন্ন-ভিন্ন করে করে দিয়েছিলো তাঁর মায়ের পবিত্র দেহটাকে। তাঁর মায়ের পেট থেকে বুট দিয়ে পিষে বের করে ফেলেছিল তাঁর অনাগত ৭ মাসের ভাইটিকে। সেই ছোট দেহটাকে বুটের তলায় নিয়ে পিষেছিল ওরা। irbesartan hydrochlorothiazide 150 mg

হ্যাঁ, এটা সেই রক্ত মাখা জামাটা। যেই জামাটা পরনে ছিল তাঁর বড় বোন। তাঁর থেকে মাত্র ২ বছরের বড় ছিল সে। রাক্ষসের মতো করে তাঁর পুরো দেহটিকে ভোগ করেছিল সেই নর পিশাচের দলেরা। এইতো সেই আলমারি, যার ভেতরে সে লুকিয়ে ছিল। লুকিয়ে লুকিয়ে সেদিন নিজের চোখে দেখেছিল সেই শুয়োরগুলোর তাণ্ডব। কিন্তু মৃত্যুর ভয়ে কিচ্ছু বলেনি সে আর একটা ১১ বছরের বালকের সেদিন কি-ই বা করার ছিল শুধু দেখা ছাড়া !! তারপরও সেই না পারার যন্ত্রণাটা আজো কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তাঁকে।
পুরনো সেই দুর্বিষহ, ভয়ংকর স্মৃতিগুলো মনে করতে করতে হঠাৎ নিচ থেকে তাঁর কানে ” জয় বাংলা ” স্লোগানটা ভেসে আসলো। সমস্ত যন্ত্রণাগুলো একপাশে রেখে দরজা ঘুলে নিচে তাকাতেই দেখল যে- সেখানে বসে থাকা ছেলেগুলো লাফাচ্ছে আর স্লোগান দিচ্ছে… দূর স্টেডিয়াম থেকেও ভেসে আসছে ” জয় বাংলা ” স্লোগান। কিছু বুঝে উঠার আগেই জয়া দৌড়ে এসে তাঁকে বলল-
” বাবা, আমরা পেরেছি। হ্যাঁ আমরা পেরেছি।
টাইগাররা জিতে গেছে বাবা। বাংলাদেশ জিতে গেছে… ”
জাফর সাহেব কিছু না বলে দ্রুত ঘরটিতে ঢুকে পরল। তাঁর মায়ের সেই রক্তমাখা শাড়িটি বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো-
” মা আমরা পেরেছি, সত্যি আমরা পেরেছি… ”
চোখ থেকে অঝোরে পানি পরছে তাঁর। ৪৩ বছরের জমানো এই চোখের পানি… তারপরেও শুঁকনো ঠোঁট দুটিতে একটা হালকা তৃপ্তির হাঁসি। হঠাৎ তাঁর কানে একটা চিনচিনে কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো। আরে এটা তো তাঁর বাবার কণ্ঠ ! হ্যাঁ, সেই কণ্ঠ এটা…
এটা তো তাঁর বাবার কণ্ঠের সেই ” জয় বাংলা ” ………

((বি.দ্রঃ- গল্পটি পূর্বে অন্য একটি ব্লগে প্রকাশ করা হয়েছিল))

You may also like...

  1. অংকুর বলছেনঃ

    চোখ থেকে অঝোরে পানি পরছে তাঁর। ৪৩ বছরের জমানো এই চোখের পানি…

    আমার চোখের পানিও আটকাতে পারলামনা । জয় বাংলা :-bd :-bd :-bd

  2. এটা কোন ছোটগল্প না….আমি মানতে নারাজ….!!!!! এটা আমাদের ইতিহাস….!!!!

    যখন পড়ছিলাম, শরীরের রোমকূপগুলো বিদ্রোহ ঘোষনা করেছিল….. জাফর সাহেবের যায়গায় হলে চু**য়া গুলোর দন্ডাদেশ কর্তন *************…..

    কিচ্ছু বলার নেই আপি…..!!!! লেখাটির মাধ্যমে মনে জায়গা করে নিলেন….!!!! zovirax vs. valtrex vs. famvir

    buy kamagra oral jelly paypal uk
  3. এটি পূর্বে কোন ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল, আপি? লিংক চাই….!!!!

  4. আপনি তো চমৎকার গল্প লিখেন!! দুর্দান্ত হয়েছে! ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ :-bd :-bd :-bd

    আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত আর মুখমণ্ডলের উষ্ণ স্রোতের মিলিত অনুভূতি অনেকদিন পাওয়া হয় নি…
    অসাধারণ… অসাধারণ… অসাধারণ…
    =D> =D> =D> =D>

  5. কিছু বলবার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি… :-< :-< :-( এত কষ্ট, এত যন্ত্রণা আর এত রক্তের দামে যে দেশ পেলাম, সেখানে আজো খেলার সাথে রাজনীতি মেশাতে না চাওয়া মানুষ দেখি… এর চেয়ে বড় কষ্ট আর হতে পারে না… ওরা যখন পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান তোলে, তখন অবাক হয়ে ভাবি, কি দরকার ছিল ৭১রের? কি দরকার ছিল মুক্তিযুদ্ধের? X-( X-( :-<

  6. আসলেই অসাধারণ হৃদয়গ্রাহী একটি গল্প :-bd :-bd :-bd :-bd :-bd :-bd =D> =D> =D> =D> ^:)^ ^:)^ ^:)^

    acne doxycycline dosage
  7. অনেক সুন্দর একটি গল্প আসলেই নাড়া দেওয়ার মতই কিছু …… হেডস অফ ^:)^

  8. ইলেকট্রন রিটার্নস বলছেনঃ

    কিছু কিছু জিনিস এতই চমৎকার হয়ে যা যে, চমৎকার কথাটাই কেবল সেটাকে ক্রেডিট দেয়ার জন্যে যথেস্ট হয়না। সেই জিনিসই হয়ে যায় সেটার তুলনা।

    তেমনই এক অসাধারন গল্প সৃষ্টি করলেন আপনি।

  9. আনন্দাশ্রু আর বেদনাস্রু মিলেমিশে একাকার
    শব্দচয়ন গুলো দুর্দান্ত ^:)^ ^:)^ ^:)^
    আপনাদের মত তরুণদের লেখা পড়ে আমাদের
    মত বহু মানুষের দেশপ্রেম দিনে দিনে বাড়তে আছে
    আপনাকে অনেক অনেক ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^ ^:)^
    আর %%- %%- %%- %%- %%- %%- %%-

আপনার ই-মেইল ও নাম দিয়ে মন্তব্য করুন *

Question   Razz  Sad   Evil  Exclaim  Smile  Redface  Biggrin  Surprised  Eek   Confused   Cool  LOL   Mad   Twisted  Rolleyes   Wink  Idea  Arrow  Neutral  Cry   Mr. Green

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong> can your doctor prescribe accutane

Heads up! You are attempting to upload an invalid image. If saved, this image will not display with your comment.

about cialis tablets